যিশু খ্রিষ্টের পুনরুত্থান সম্পর্কে পবিত্র বাইবেলে বর্ণিত রয়েছে,‘বিশ্রামবারে তাঁহারা বিধিমতে বিশ্রাম করিলেন। কিন্তু সপ্তাহের প্রথম দিন অতি প্রত্যূষে তাঁহারা কবরের নিকটে আসিলেন, যে সুগন্ধি দ্রব্য প্রস্তুত করিয়াছিলেন, তাহা লইয়া আসিলেন; আর দেখিলেন, কবর হইতে প্রস্তরখানা সরান গিয়াছে, কিন্তু ভিতরে গিয়া প্রভু যীশুর দেহ দেখিতে পাইলেন না। তাঁহারা এই বিষয় ভাবিতেছেন, এমন সময়ে, দেখ, উজ্জ্বল বস্ত্র পরিহিত দুই পুরুষ তাঁহাদের নিকটে দাঁড়াইলেন। তখন তাঁহারা ভীত হইয়া ভূমির দিকে মুখ নত করিলে সেই দুই ব্যক্তি তাঁহাদিগকে কহিলেন, মৃতদের মধ্যে জীবিতের অন্বেষণ কেন করিতেছ? তিনি এখানে নাই, কিন্তু উঠিয়াছেন।’ পবিত্র কোরআন শরিফের সূরা মারইয়াম ৩৩ আয়াতে ঈসা মসীহের জন্ম, মৃত্যু ও পুনরুত্থান সম্পর্কে এক সাক্ষ্য রয়েছে— “আমার প্রতি শান্তি যেদিন আমি জন্মলাভ করেছি, যেদিন আমার মৃত্যু হবে এবং যেদিন জীবিত অবস্থায় আমি উত্থিত হব”। খ্রিষ্ট বিশ্বাসীরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী, তিনি পাপের শৃঙ্খল ভেঙে মানবজাতিকে মুক্ত করেছেন; স্রষ্টার সাথে পুনর্মিলনে সেতুবন্ধন রচনা করতে সমর্থ হয়েছেন।
খুব ভোরে ঘটনাটি ঘটেছিল! ভূমিকম্প হলো, কবরের পাথর খানা সরানো ছিল! যীশুর মৃতদেহটি সেখানে ছিল না। দূত মহিলাদের দেখা দিলেন এবং সুখবরটি জানালেন। যীশু নিজেই তাদের সঙ্গে দেখা দিলেন এবং তাদেরকে আজ্ঞা দিলেন যেন শিষ্যদের কাছে গিয়ে খবরটি পৌঁছিয়ে দেয়। মহিলারা দ্রুত দৌড়ে গিয়ে খবরটি শিষ্যদের জানালেন। পিতর এবং তাঁর প্রিয় শিষ্য কবরের দিকে দৌড়ে গেলেন এবং সত্যি সত্যি তারা কবরটি শূন্য দেখতে পেলেন। কাঁদতে দেখে দূত মহিলাদের জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কাঁদছ কেন? মগ্দলীনী মরিয়ম উত্তর দিলেন যে, যীশুর মৃতদেহটি হারানো গেছে। তারপর যীশু নিজেই মহিলাদের জিজ্ঞাসা করলেন যে, তোমরা কাঁদছ কেন? মরিয়ম আবার ঐ একই উত্তর করলেন, যীশুর মৃতদেহটি হারানো গেছে কারণ মরিয়ম মনে করেছিলেন যে তিনি বাগানের মালি। কিন্তু হঠাৎ করে যখন যীশু নাম ধরে ডাকলেন ‘মরিয়ম’! তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারলেন ও উত্তর দিলেন ‘রব্বুনি’ যার অর্থ গুরু বা শিক্ষক। যীশু মরিয়মকে নির্দেশ দিলেন যেন খবরটি তাড়াতাড়ি শিষ্যদের কাছে পৌঁছে দেয়। মরিয়ম যথা সম্ভব দেরী না করে দৌড়ে গিয়ে শিষ্যদের কাছে সুখবরটি জানালেন যে “আমি যীশুকে দেখেছি”। কিন্তু শিষ্যরা কোনো মতে বিশ্বাস করতে চাইলেন না যে, যীশু প্রথমবারের মতো মরিয়মের কাছে দেখা দিলেন এবং তিনি পুনরুত্থিত হয়েছেন! ক্রুশারোপণ এবং ক্রুশে ঝুলন্ত অবস্থায় মৃত্যুর পর যীশুর দেহ কবরস্থ করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি তৃতীয় দিবসে পুনরুত্থিত হয়েছেন (১ করিন্থীয় ১৫:৩,৪)। খ্রিষ্ট যে পুনরুত্থিত হয়েছেন তার বহু প্রমাণ বাইবেলে আছে—
১. শূন্য কবর—যীশু খ্রিষ্টের দেহ কবরে পাওয়া যায়নি (যোহন ২০:১-২);
২. স্বর্গদূতদ্বয়ের ঘোষণা ছিল যে, তিনি মৃতদের থেকে উঠেছেন (মার্ক ১৬:৬-৭; লূক ২৪:৪-৮);
৩. দাফনের কাপড় কবরে পড়ে ছিল (লূক ২৪:১২);
৪. পুনরুত্থানের পরে যে সকল স্ত্রীলোক যীশুকে দেখেছেন, তারা সাক্ষ্য দিয়েছেন (মথি ২৮:৮-১০);
৫. ইম্মায়ুর পথে দু’জন শিষ্যকে দেখা দেওয়া; কথা-বার্তা বলা ও একসাথে খাওয়া-দাওয়া করা (লূক ২৪:১৩-৩৫);
৬. যীশু তাঁর শিষ্যদেরকে, পরে পাঁচশতেরও অধিক বিশ্বাসী এবং পৌলকে দেখা দেন (লূক ২৪:৩৬-৪৯; ১ করিন্থীয় ৩-৬);
৭. যীশু পুনরায় থোমা ও অন্যান্য শিষ্যদেরকে দেখা দেন (যোহন ২০:২৪-৩১);
৮. পুরাতন নিয়মের নবিগণ ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, যীশু মৃতদের মধ্য থেকে উঠবেন (গীতসংহিতা ১৬:৮-১১);
৯. যীশু খ্রিষ্ট নিজেই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তিনি মৃতদের থেকে পুনরুত্থিত হবেন (মার্ক ১৪:২৮; যোহন ১১:২৫);
১০. পুনরুত্থানের পরে চল্লিশ দিন ধরে প্রভু যীশু এ পৃথিবীতে দৈহিকভাবে ছিলেন (প্রেরিত ১:১-৩)।
এছাড়াও পবিত্র বাইবেলের নতুন নিয়ম থেকে মথি ২৭: ৫৭-২৮: ২০; মার্ক ১৬:১-২০; লূক ২৪: ১-৫২; যোহন ২০: ১-২১:২৫; প্রেরিত ১: ১-১১; ১ করিন্থীয় ১৫:৩-৬; ১ করিন্থীয় ১৫:২০-২৩।
খ্রিষ্ট সত্যিকারের দেহ নিয়েই মৃতদের মধ্যে থেকে উত্থাপিত হয়েছেন। খ্রিষ্ট ধর্মের মূলভিত্তি খ্রিষ্টের পুনরুত্থান এবং সুসমাচারের কেন্দ্রবিন্দু হল খ্রিষ্টের পুনরুত্থান। পুনরুত্থান দ্বারা তিনি স্বপরাক্রমে ঈশ্বরের পুত্র বলে নির্দিষ্ট (রোমীয় ১:৪) এবং তিনি যা কিছু বলেছেন তার সবই যে সত্য, পুনরুত্থানই হল তার প্রমাণ (মথি ২৮:৬)। খ্রিষ্টের পুনরুত্থান প্রমাণ করে যে, আমাদেরও পুনরুত্থান হবে (১ করিন্থীয় ১৫:২০-২২) এবং আমাদের বিচার হবে (প্রেরিত ১৭:৩১)। বিশ্বাসীদের জন্য খ্রিষ্টের পুনরুত্থান ঈশ্বরের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে (রোমীয় ৪:২৫)। খ্রিষ্টের পুনরুত্থানের মধ্য দিয়েই বিশ্বাসীরা তাঁর পরিচর্যার দায়িত্ব পেয়েছেন (ইফিষীয় ১:১৯-২২)। খ্রিষ্টের পুনরুত্থান বিশ্বাসীদের পুনরুত্থানের নিশ্চয়তা (২ করিন্থীয় ৪:১৪)। তাঁর পুনরুত্থানের মধ্য দিয়ে তিনি মণ্ডলীর মস্তক হয়েছেন (ইফিষীয় ১:১৯-১২২)। খ্রিষ্ট আমাদের জন্য মহা-পুরোহিত হিসাবে স্বর্গে কাজ করছেন (ইব্রীয় ৪:১৪-১৬)। খ্রিষ্টের পুনরুত্থান যদি না হয়ে থাকে তবে আমাদের বিশ্বাস বৃথা এবং আমরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভাগা (১ করিন্থীয় ১৫:১২-১৯)।
কালভেরীতে ক্রুশে যীশু মানবের জন্য ক্ষমার উপহার দিয়েছেন এবং আমাদের পাপের শাস্তি থেকে উদ্ধার করেছেন। তিনি যখন এই পৃথিবীতে এসেছিলেন, তখন মানুষ ঈশ্বরের শত্রু ছিল কিন্তু যখন তিনি স্বর্গে ফিরে গেলেন; তিনি তাঁর পিতার সাথে পৃথিবীর পুনর্মিলন ঘটালেন। এভাবে তিনি ক্রুশে তাঁর রক্ত সেচনের মাধ্যমে শান্তি স্থাপন করলেন। এমন শান্তি আর কোনোদিন স্থাপিত হয়নি, আর হবেও না।
মিথুশিলাক মুরমু : খ্রীষ্টিয় ধর্মতত্ত্ববিদ, আদিবাসী গবেষক ও লেখক।





Users Today : 12
Views Today : 12
Total views : 177415
