সপ্তাহের প্রথম দিন, সেই স্ত্রীলোকেরা খুব ভোরে ঐ সমাধিস্থলে এলেন। তাঁরা যে গন্ধদ্রব্য ও মসলা তৈরি করেছিলেন তা সঙ্গে আনলেন। তাঁরা দেখলেন সমাধিগুহার মুখ থেকে পাথর খানা একপাশে গড়িয়ে দেওয়া আছে; কিন্তু ভিতরে ঢুকে সেখানে প্রভু ঈসা মসীহ দেহ দেখতে পেল না। তাঁরা তখন অবাক বিস্ময়ে সেই কথা ভাবছেন, সেই সময় উজ্জ্বল পোশাক পরে দুজন ব্যক্তি হঠাৎ করে তাদের সামনে দাঁড়ালেন, ভয়ে তারা নিচু ও নতজানু হয়ে রইলেন। ঐ দুজন তাদের বললেন, তোমরা তাঁকে মৃতদের মাঝে খুঁজছ কেন? তিনি এখানে নেই, তিনি পুনরুত্থিত হয়েছেন। তিনি যখন গালীলে ছিলেন তখন তোমাদের কী বলেছিলেন! মনে করে দেখ? তিনি বলেছিলেন, মানবপুত্রকে অবশ্যই পাপী মানুষদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হবে ; তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ হতে হবে; আর তিনদিনের দিন তিন আবার মৃতদের থেকে জীবিত হয়ে উঠবেন। তখন ঈসা মসীহ সব কথা তাদের মনে পড়ে গেল। তারপর তারা সমাধিগুহা থেকে ফিরে এসে সেই এগারো জন প্রেরিতদের ও তাঁর অনুগামীদের এই ঘটনার কথা জানালেন। কিন্তু প্রেরিতদের কাছে সে সব প্রলাপ বলে মনে হল, তাঁরা সেই স্ত্রীলোকদের কথা বিশ্বাস করলেন না।
কিন্তু পিতর উঠে দৌড়ে সমাধিগুহার কাছে গেলেন। তিনি নীচু হয়ে ঝুঁকে পড়ে দেখলেন, কেবল যীশুর দেহে জড়ানো কাপড়গুলো সেখানে পড়ে আছে; আর যা ঘটেছে তাতে আশ্চর্য হয়ে ঘরে ফিরে গেলেন। (লূক ২৪:১-১২) কারণ প্রভু যীশু পুনরুত্থিত হবেন তিনি তা পূর্বেই বলেছিলেন। তারঁ এই কথার পূর্ণতা পেল। প্রভু ঈসা মসীহ জীবনে আর অনেক ঘটনার পূর্ণতা আমরা পাই, যেমন—
আল্লাহ প্রতিজ্ঞা করেছেন, স্ত্রীলোকের মধ্যে দিয়ে একজন ব্যক্তি আসবেন যিনি শয়তানের মস্তক পিষে দিবেন (তৌরত শরীফ, পয়দায়েশ ৩:১৫) । তাহলে এখন প্রশ্ন! স্ত্রীলোকের মধ্যে দিয়ে এ পৃথিবীতে কে এসেছেন? প্রধান দুই ধর্মীয়গ্রন্থ বাইবেল ও কুরআন এক কথায় স্বীকার করে নেয় একমাত্র ঈসা মসীহ এই পৃথিবীতে বাবা ছাড়া মায়ের মধ্যে দিয়ে এসেছেন। এটা আল্লাহর অলৌকিক কাজ। পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই অদ্বিতীয় ।
তারপর যদি আমরা দেখি তাহলে হয়রত মুসা নবীর মধ্যে দিয়ে আল্লাহ বলেছেন, “তোমার ভাইদের থেকে তোমার মতো একজন দাঁড় করাব, যার কথায় তোমাদের চলতে হবে, তার মুখ দিয়ে আমি আমার কথা বলব, সে আমার বাধ্য থাকবে, তাঁর কথা যদি কেউ না শোনে তাকে দোষী বলে গণ্য করা হবে ” (তৌরত শরীফ, দ্বিতীয় বিবরণ ১৮:১৬-১৬) উক্ত পদ যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে আমরা দেখি যে ,কার মধ্যে দিয়ে আল্লাহ তাঁর মুখের কথা বলেছেন নিশ্চই ঈসা মসীহ মধ্যে দিয়ে । হয়রত দায়ূদ নবীর মধ্যে দিয়ে আল্লাহ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তাঁকে ক্রুশে হত্যা করা হবে।
এরও প্রায় ৭০০ বছর পূর্বে আল্লাহ ইশাইয়া নবীর মধ্যে দিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন ঈসা মসীহ একজন সতী অবিবাহীত কুমারী গর্ভে জন্মীবেন তাঁর নাম রাখা হবে ইম্মানুয়েল (ইশাইয়া নবীর কিতাব ৭:২)
ঈশ্বর হয়রত যিরমিয় নবীর মাধ্যমে এই ভবিষদ্বাণী করেছিলেন, “রামায় ভীষণ কান্নাকাটির শব্দ শোনা যাচ্ছে; রাহেলা তার সন্তানদের জন্য কাঁদছে, কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না, কারণ তারা আর নেই” ( যিরমিয় ৩১:১৫)
এই ঘটনার আগে স্বর্গদূত ইউসুফকে ভবিষদ্বাণী / ভঃবি করেছিল তারা যেন শিশু যীশুকে নিয়ে মিশরে চলে যায়। মিশরে চলে গিয়ে শিশু ঈসা মসীহ রাজা হেরোদের হাত থেকে রেহাই পায়। রাজা হেরোদ মারা গেলে পরে তারা মিশর দেশ থেকে ফিরে এসে গালিল প্রদেশের নাশরত গ্রামে বাস করেছিলেন কেননা নবীদের মধ্যে দিয়ে এই কথা বলা হয়েছিল তাকে নাসরতীয় বলা হবে “কাল পূর্ণ হলো” (গালাতীয় ৪:৫) হয়রত মালাখী নবীর পর প্রায় ৪০০ বছর পর্যন্ত কোনো নবী ছিল না। তখনকার লোকেরা মসীহের আশায় ছিল। রোমীয়রা সারা পৃথিবী শাসন করছিল। ইহুদিরা রোমীয়দের দ্বারা অত্যাচারিত ও নির্যাতনে নিপীড়িত। তারা আশা করেছিল মসীহ আসবেন এবং তাদের উদ্ধার করবেন। আর এ কারণে রাজা হেরোদ সেই সময়ের সেই সব অবুঝ ও নিরপরাধী শিশুদের উপর হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল। সত্যিই ঈসা মসীহ এসেছিলেন তবে রাজা বেশে নয় দরিদ্র বেশে পাপীদের মুক্তি দিতে।
প্রভু যীশুর জন্ম ও মৃত্যু কোনো ঐতিহাসিক পটভূমিতে লেখা নয় বরং তা আধ্যাত্মিক। যখন আমরা তাঁকে হৃদয়ে ধারণ করি তখন তিনি আমাদের জীবনে বাস্তব হয়ে উঠেন। যখন আমরা ভালোবেসে মানুষের মাঝে অকাতরে বিলিয়ে দেই তখন তিনি আমাদের হৃদয়ে জন্মগ্রহণ করেন ।
প্রভু ঈসা মসীহ ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার তিনদিন পর পুনরুত্থিত হয়ে এই ধরাতে আবার আগমন করেন। ঈসা মসীহ এই পুনরুত্থান/আগমনের দিনটিকে ঈসা মসীহ বিশ্বাসীগণ ইস্টার সানডে হিসাবে পালন করে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ইস্টার সানডে উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করেন প্রাণপ্রিয় খ্রীষ্টভক্তগণ। ইস্টার সানডে হলো ৪০ দিন উপবাসের শেষ দিন। গুড ফ্রাইডে পালনের পরই আসে ইস্টার সানডে। এ সময়ে উপবাসসহ প্রার্থনা করা হয়, কারণ এই দিনে সবকিছুর উপর বিজয় লাভ করে ঈসা মসীহ পুনরুত্থিত হয়েছেন ।
রোববার পবিত্র ইস্টার সানডে। এই দিনে প্রায় ২০০০ বছর পূর্বে ঈসা মসীহ কবর থেকে পুনরুত্থিত হয়েছিলে। পবিত্র বাইবেল মতে, আল্লাহর দক্ষিণ পাশে বসে আছেন, এবং শেষ বিচার করতে আসবেন। ঈসা মসীহ এই পুনরুত্থানের সংবাদ খ্রীষ্ট সমাজের জন্য খুবেই আনন্দের এবং তাৎপর্যপূর্ণ। এই দিনটি সকল খ্রীষ্টানেরা ইস্টার সানডে হিসাবে পালন করে। এই দিনটি সকল পাপীদের জন্য গুরুত্বপূণ, কারণ তাদের স্বর্গে যেতে আর কোনো বাধা রইল না।
দিনটির তাৎপর্য:
সাধু পৌল বলেন, হে আমার প্রিয় ভ্রাতৃগণ সুস্থির হও, নিশ্চল হও, প্রভুর কার্য সবর্দা উপচিয়ে পড়ে, কেননা তোমরা যান যে, প্রভুতে তোমাদের পরিশ্রম নিষ্ফল নয়” (১ম করি ১৫:৫৮)
ঈসা মসীহ পুনরুত্থান ব্যতিরেকে খ্রীষ্ট বিশ্বাসীর বিশ্বাস ও জীবন নিরর্থক ও প্রশ্নবোধক। মসীহ যদি পুনরুত্থিত না হয়ে থাকেন। তাহলে মিথ্যাই তোমাদের বিশ্বাস; তোমরা আজও তোমাদের সেই পাপী অবস্থাতেই পড়ে আছ! যীশুর পুনরুত্থান সকল পাপ ও মন্দতার ওপর সুনিশ্চিত বিজয়। যীশু খ্রীষ্টের পুনরুত্থান উৎসবের ঐকান্তিক কামনা হোক মৃত্যুঞ্জয়ী খ্রীষ্টের সাথে কবর থেকে উঠে পুনরুত্থিত জীবন শুরু করা। পুনরুত্থিত খ্রীষ্টের জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হয়ে নতুন মানুষে রূপান্তরিত হওয়া ।
ঈসা মসীহ আমাদের নিস্তার পর্বের মেষশাবক যিনি, তিনি কি বলীরূপে উৎসর্গকৃত হননি? সুতরাং এসো অমরা এই উদ্যাপন করি পুরোনো খামির দিয়ে নয়, ধৃষ্টতাও অধর্মের খামি নিয়ে নয় বরং আন্তরিকতা ও সত্যনিষ্ঠার খামিরবিহীন রুটি নিয়ে (১ম করি ৭-৮) ঈসায়ী জীবন তো নেতিয়ে পড়া, ঝিমিয়ে পড়া জীবন নয় বরং অন্ধকারের পথ পরিহার কর আলোর পথে এগিয়ে চলা। মৃতদের মধ্যে থেকে মসীহ যেমন পিতার মহিমাশক্তিতে পুনরুত্থিত হয়েছেন, তেমনি আমরাও যেন এক নব জীবনের পথে চলতে পারি; (রোমীয় ৫: ৩-৭) এই বাণীর বাস্তবায়নই প্রতিদিন আমাদের ব্যক্তি জীবনে পুনরুত্থান ঘটায়। যেখানে অন্যায়-অন্যায্যতা ও পাপময়তা ঘটছে, সেখানেই ঈসা মসীহ ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃত্যুর বাস্তবতা খুবই প্রকটভাবে অনুভূত হচ্ছে। দেশের মধ্যে চলমান প্রতিহিংসা, ধ্বংসযজ্ঞ, জীবন বিনাশ অত্যন্ত নির্মমভাবে মৃত্যুর সত্যতা ব্যক্ত করেছে। পুনরুত্থান আমাদের ক্ষমাশীল ব্যক্তি ও আলোকিত মানুষ হওয়ার প্রেরণা দান করে। কেননা প্রভু ঈসা মসীহ সব কিছুর উপর বিজয়ী হয়েছে, তাই আমরা ও বিজয়ী, পুনরুত্থানের বারতা তো স্বাধীন ও মুক্ত হওয়ার আহ্বান। আমরা আলোর পথেই চলব।
আমাদের জীবনে ঈসা মসীহ পুনরুত্থান কী আবেদন সৃষ্টি করে? এটাই আমাদের অনুধ্যানের বিষয়। পুনরুত্থানের চেতনা আমাদের প্রত্যাহিক জীবনে কর্মপ্রেরণা হয়ে উঠুক। পুনরুত্থান উৎসব পালনের মধ্যে দিয়ে সকলের হৃদয়-মনে এই প্রতিজ্ঞা বদ্ধপরিপর হোক সমাজের কলুষতা দূরীভূত করে শুভ শক্তির উদ্ভব, কুরুচিপূর্ণ সাংস্কৃতিক অগ্রাসন বন্ধ হোক। পুনরুত্থান আমাদের ক্ষমাশীল ব্যক্তি ও আলোকিত মানুষ হওয়ার প্রেরণা জাগাক।
নাহিদ বাবু: খ্রীষ্টয় ধর্মতত্ত্বে অধ্যয়নরত ও লেখক।





Users Today : 13
Views Today : 13
Total views : 177416
