ইঞ্জিল শরীফ; ২ করিন্থীয় ৪ : ১৬—৫ : ১০ আয়াত
আমাদের জীবনের আসল লক্ষ্য কী? আমরা যখন এই জগতে বসবাস করছি তখন আমাদের এক একজনের এক এক রকম লক্ষ্য থাকে। আর সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমরা জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাই।
হযরত ঈসা মসীহের সাহাবী হযরত পৌল আমাদের জীবনের সত্যিকারের আসল লক্ষ্য নিয়ে বলতে গিয়ে আমাদেরকে উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “এজন্য আমরা হতাশ হই না। যদিও আমাদের দেহ ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে, তবুও আমাদের অন্তর দিনে দিনে নতুন হয়ে উঠেছে।” (১৬ আয়াত)
একজন মানুষ যখন বৃদ্ধ তখন তিনি নিরুৎসাহিত হয়ে থাকেন এই ভেবে যে, তিনি কখন মৃত্যুবরণ করবেন। হয়ত অনেকে ভাবতে থাকে কত কত লক্ষ্য ছিল কিন্তু এগুলো তো পূরণ হলো না। যদি আরো কিছু সময় পাওয়া যেত তাহলে হয়ত সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে পারতাম। কিন্তু হযরত পৌল বলছেন, আমাদের নিরুৎসাহিত হবার কোনো কারণ নেই। কারণ আমাদের দৈহিক মনুষ্য ক্ষয় পেলেও অন্তুরের মনুষ্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।
১৭ আয়াতে তিনি বলেছেন, “এখন আমরা অল্প কালের জন্য যে সামান্য কষ্টভোগ করছি তার ফলে আমরা চিরকালের মহিমা লাভ করবো। এই মহিমা এত বেশি যে, তা মাপা যায় না।” এটা সত্যি যে এই পৃথিবীতে আমাদের কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে। নানান দুশ্চিন্তায় আমাদের দিনাতিপাত করে যেতে হচ্ছে। যদিও এসব আমাদের জীবনে ঘটে চলেছে বটে, তাতে আমরা পরজগতের জন্য অমূল্য ধন সঞ্চয় করছি। সেই ধন অনন্তকালস্থায়ী। তা কখনও নষ্ট হবে না। তিনি বলেছেন, “যা দেখা যায় আমরা তা দিকে দেখছি না, বরং যা দেখা য়ায় না তার দিকেই দেখছি। যা দেখা যায় তা মাত্র অল্প দিনের, কিন্তু যা দেখা যায় না তা চিরদিনের” (১৮ আয়াত)।
তাহলে এ প্রশ্ন আসতেই পারে, আজকে আমাদের লক্ষ্য কী? দৃশ্যত নাকি অদৃশ্য। যেমন আমরা যা চোখে দেখছি যেমন গাছ-পালা বা অন্যান্য জিনিস এর সবকিছু দৃশ্যত। কিন্তু বাতাস বা অক্সিজেন যা আমাদেরকে প্রতি মুহূর্তে বাঁচিয়ে রাখছে তা অদৃশ্য। হযরত পৌল বলছেন, যা আমরা দেখতে পাচ্ছি তা আমাদের আসল লক্ষ্য নয়। কারণ তা ক্ষণকালস্থায়ী। কিন্তু যা আমরা দেখতে পারছি না বা অদৃশ্য তা অনন্তকালস্থায়ী। আর আমাদের জীবনের জন্য অদৃশ্যটুকু বেশি প্রয়োজনীয়।
মানবজাতির জীবনের জন্য খোদার ভালোবাসা, অনুগ্রহ, বেহেস্ত-দোজখ, খোদার দেয়া নাজাত বা পাপের ক্ষমা লাভ এসব কিছু অদৃশ্য বটে, তবে অনন্তকালস্থায়ী।
হযরত পৌল পুনরায় বলছেন, “আমরা একথা জানি যে, এই পৃথিবীতে যে তাঁবুতে আমরা বাস করি, অর্থাৎ যে দুর্বল দেহে আমরা আছি তা যদি নষ্ট হয়ে যায় তবুও খোদার দেয়া একটা ঘর আমাদের আছে। এই ঘর মানুষের হাতের তৈরি নয়, তা বেহেস্তে চিরকাল ধরেই আছে” (৫ : ১আয়াত)। আমরা কি জানি খোদা আমাদের জন্য চিরস্থায়ী ঘর তৈরি করে রেখেছেন? আমরা যে তাম্বুরূপ জাগতিক ঘরে বসবাস করছি তা হলো আমাদের এই মাটির দেহ। তাম্বু সবসময়ের জন্য অস্থায়ী। যেকোনো কারণে যেকোনো সময়ে তা ভেঙে পড়বে। কিন্তু ঘর সহজে ভাঙবে না, তা অনেক দিন থাকবে। একইভাবে খোদা বেহেস্তে আমাদের জন্য যে ঘর তৈরি করে রেখেছেন তা চিরস্থায়ী। আমাদের দেহ নামের তাম্বুখানি সামান্য আঘাতে শেষ হয়ে যাবে। নানান রোগ-ব্যাধি, করোনা মহামারিতে বিশ্বব্যাপী কত লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে জাগতিক তাম্বুর থেকেও ক্ষণস্থায়ী। তাই এই দেহ জাগতিক অর্থাৎ এই পৃথিবীর জন্য নির্মিত। কিন্তু আর একটা তাম্বু বা ঘর রয়েছে যা হাত দ্বারা তৈরি করা হয়নি তা বেহেস্তে আছে। তার বয়স অনন্তকাল।

হযরত ঈসা মসীহ বলেছেন, “আমার পিতার বাড়িতে থাকার অনেক জায়গা আছে। তা না থাকলে আমি তোমাদের বলতাম, কারণ আমি তোমাদের জন্য জায়গা ঠিক করতে যাচ্ছি” (ইউহোন্না ১৪:২ আয়াত)। হযরত ঈসা বলেছেন, আমি যেখানে থাকি তোমরাও সেখানে থাকবে। কারণ পিতা-খোদার বাড়িতে থাকার অনেক জায়গা আছে। কিতাব এই কথা আমাদের বলে যে, হযরত ঈসা মসীহ জীবিত এবং খোদার কাছে আছেন।
হযরত পৌল বলেছেন এই পৃথিবীতে আমরা সবাই দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলছি। তিনি বলেন, “এই দেহে থাকা অবস্থায় আমরা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলছি এবং সমস্ত অন্তর দিয়ে চাইছি যেন বেহেস্তের সেই নতুন দেহ দিয়ে আমাদের আবৃত হয়” (৫ : ২ আয়াত)। যার একলক্ষ টাকা আছে সে আরও এক লক্ষ টাকা চায়, যার একটি সন্তান আছে সে আরও একটি সন্তান চায়, যার একটা বাড়ি আছে সে আরও একটি বাড়ি চায়—এভাবে প্রত্যেকটি মানুষ হৃদয়ে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলছে। ৪ আয়াতে বলছেন, “সত্যি এ দুর্বল দেহে থাকা অবস্থায় আমরা বোঝার ভারে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলছি।” আমরা এ জগতে নিজের দেহ ঢাকার জন্যে পোশাক পরি। এনিয়েও আমাদের দীর্ঘনিঃশ্বাস রয়েছে। কে কত ভালো বা দামী পোশাক পরে নিজের দেহকে ঢাকবো। কিন্তু আমরা আমাদের অন্তরের দেহকে ভালোবাসা, নম্রতা, বিশ্বস্ততা, সততা ইত্যাদি দিয়ে ঢাকতে কতটুকু দীর্ঘনিঃশ্বাস নিচ্ছি। তাই হযরত পৌল বলেছেন, ক্ষয়ণীয় দেহের পর আমরা যে অক্ষয় দেহ পাব তা উলঙ্গ থাকবে না। সেই দেহ অক্ষয় পোশাকে ঢাকা থাকবে যা ময়লা হবে না, পুরোনোও হয়ে যাবে না। কিন্তু আজ আমরা বেহেস্তের সেই অক্ষয় পোশাক ছেড়ে পৃথিবীর ক্ষয়ণীয় সবকিছুর মধ্যে জড়িত হয়ে গেছি।
হযরত ঈসা মসীহ পুনরুত্থিত হয়েছেন। তিনি এখন বেহেস্তে আছেন। তাই আমরাও কোনো একসময় এই জাগতিক দেহ ত্যাগ করে ঈসা মসীহের মতো নুতন পুনরুত্থিত দেহ ধারণ করব। এই বিষয়ে হযরত পৌল বলেছেন, “এরই জন্য খোদা আমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁরই প্রথম অংশ হিসাবে তিনি পবিত্র আত্মাকে আমাদের দিয়েছেন” (৫ : ৫ আয়াত)। মানুষ সৃষ্টির রহস্য তিনি এখানে বর্ণনা করেছেন। খোদা আমাদেরকে শুধু এই পৃথিবীতে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্য পাঠাননি, বরং অক্ষয় জীবন-দান ও তাঁর সাথে অক্ষয় দেহ নিয়ে বেহেস্তে থাকার জন্য তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। তাই আমরা যখন বেহেস্তে যাব তখন সেখানে আমাদের জন্য সবকিছু থাকবে। কোনো রকম অভাব সেখানে থাকবে না।
তাই আমরা যা চোখে দেখছি শুধু তার উপর নির্ভর করে পথ চলছি না বরং যা দেখা যাচ্ছে না তার উপর বিশ্বাস নিয়েই আমরা চলছি। “যা দেখা যায়, আমরা তো তার দ্বারা চলি না, বরং বিশ্বাসের দ্বারা চলাফেরা করি” (৭ আয়াত)। সেই বিশ্বাসে চলতে হলে আমাদের প্রয়োজন সাহস।
হযরত পৌল বলেছেন, “এজন্য কখনও আমাদের সাহসের অভাব হয় না, … আমাদের সাহস আছে আর আমরা দেহের ঘর থেকে দূর হয়ে প্রভুর সঙ্গে বাস করাই ভালো মনে করি” (৬, ৮ আয়াত)। আমাদের জন্য এই জগত হলো প্রবাস-জীবন। অনেকটা বিদেশির মতো ক্ষণস্থায়ী বসবাস। কিন্তু আমাদের জন্য রয়েছে নিবাস যা নিজের স্থান বা ঘর। হযরত পৌলের আকাক্সক্ষা হলো যেন ঈসা মসীহের সঙ্গে বাস করতে পারেন। তাই তিনি বলেছেন, ‘আমি মরলেই বাঁচি।” আমাদেরকে মরতে হবে। জগতে লোভ-লালসা, দলাদলি, মন্দতা, অভিলাষ ইত্যাদির কাছে আমাদেরকে মরতে হবে। আমাদের এই দেহ থেকে দূরে বাস করতে হবে। এই দেহকে কবরে রাখতে হবে, যেন আমরা নুতন দেহ লাভ করতে পারি। এই ক্ষয়ণীয় দেহকে সরিয়ে রেখে প্রভুর কাছে অর্থাৎ ঈসা মসীহের কাছে আমাদেরকে আসতে হবে। তাহলেই আমরা চিরকালের থাকার ঘর বেহেস্তে যেতে পারব।
তাই আমাদের জীবনের মূল লক্ষ্য কী? হযরত পৌল বলেছেন, “সেজন্য আমরা দেহের ঘরে বাস করি বা না করি, আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে প্রভুকে খুশী করা” (৯ আয়াত)। আমরা যেখানেই থাকি না কেন, যে অবস্থাই থাকি না কেন—আসল কথা হলো যেন আমরা খোদার প্রীতির পাত্র হই, তাহলে আমরা কোথায় আছি তাতে কিছু যায় আসে না।
ঈসায়ী বিশ্বাসীদের জন্য হযরত ঈসা মসীহের পুনরুত্থান হলো জীবনের পথ। আমরা যেন স্থায়ী জীবন লাভ করি সেজন্য ঈসা মসীহ পুনরুত্থিত হয়েছেন। আজ আমরা আমাদের জীবনকে কোন দিকে পরিচালনা করছি তার হিসাবও একদিন আমাদেরকে দিতে হবে। হযরত পৌল বলেছেন, “এর কারণ হলো, মসীহের বিচার-আসনের সামনে আমাদের সকলের সব কিছু প্রকাশ করা হবে, যেন আমরা প্রত্যেকে এই দেহে থাকতে যা কিছু করেছি, তা ভালো হোক বা মন্দ হোক, সে হিসাবে তার পাওনা পাই।”
পাস্টর এ এম চৌধুরী: খ্রীষ্টিয় ধর্মতত্ত্ববিদ, লেখক ও কলামিস্ট;
মডারেটের ঈসায়ী চার্চ বাংলাদেশ।





Users Today : 54
Views Today : 55
Total views : 177458
