শুভ বড়দিন। খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের সবচাইতে বড় ধর্মীয় উৎসব। এই দিনে কুমারী মরিয়মের (মরিয়ম আ.) গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন খ্রিষ্টধর্মের প্রবর্তক যীশুখ্রিষ্ট (ঈসা আ.)। খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন, পৃথিবীতে শান্তির ললিত বাণী ছড়িয়ে দিতে এবং মানবজাতিকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করার জন্য এই ধরাধামে আগমন ঘটেছিল মহান যীশুর। তিনি প্রচার করেন সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমা। খ্রিস্টানদের বিশ্বাস অনুসারে, ডিসেম্বরের ২৫ তারিখের ঠিক নয় মাস আগে মেরির গর্ভে প্রবেশ করেন যীশু। সম্ভবত, এই হিসাব অনুসারেই ২৫ ডিসেম্বর তারিখটিকে যীশুর জন্ম তারিখ ধরা হয়।
বিখ্যাত লেখক হোমার স্মিথ তাঁর ম্যান অ্যান্ড হিজ গডস গ্রন্থে লেখেন, “২৫ ডিসেম্বরের এই স্থানীয় উৎসব গ্রিক সৌর উৎসব ‘হেলিয়া’র সঙ্গে মিশিয়ে রয়েছে। ডিসেম্বরের ২১-২২ তারিখে সূর্যের উত্তরায়ণ শুরু হয়, ঠান্ডায় জমে যাওয়া ইউরোপের মানুষের নিকট বছরের কঠিনতম সময়ের অবসান ঘটে, বাকি শীতটা পার করিয়ে দেয়া যাবে এই স্বস্তি হতেই শীতের উৎসব শুরু হয়েছিল” যা বড়দিনের মাধ্যমে নবরূপ লাভ করে। খ্রিষ্টধর্ম মতে, যীশু খ্রিষ্ট এই পুণ্যময় দিনে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে বেথলেহেমে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর অনুসারীরা মনে করেন যে, দুই সহস্রাধিক বছর পূর্বে এই পৃথিবী যখন তমসাচ্ছন্ন ছিল, মহামতি যীশু আলোর দিশারী হয়ে পথ দেখিয়েছেন মানবজাতিকে। অত্যন্ত দীনবেশে, একটি গো-শালায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। আজীবন দীনবেশে জীবনাচরণ করে তিনি দুঃখী দরিদ্র মানুষের পক্ষে এবং সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় কাজ করে গেছেন।
বড়দিন খ্রিষ্টীয় ধর্মানুষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও, বিশ্বময় একাধিক অ-খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ও বড়দিন উৎসব পালন করে। বড়দিন উদ্যাপনে উপহার দেওয়া, সংগীত, বড়দিনের কার্ড বিনিময়, গীর্জায় ধর্মোপাসনা, ভোজ, এবং বড়দিনের বৃক্ষ, আলোকসজ্জা, যীশুর জন্মদৃশ্য এবং হলি সমন্বিত এক বিশেষ ধরনের সাজসজ্জার আয়োজন করা হয়।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার কবিতায় মহান যীশুর সেই দারিদ্র্যের সেই দীনতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান। তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিষ্টের সম্মান।’
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, খ্রিষ্টধর্মের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে গভীর ‘ভালোবাসা’। ‘ঈশ্বর’ ও ‘ভালোবাসা’ মহান যীশুর কর্মকা-ের জন্য পরিপূরক হয়ে উঠেছে। বিশ্বের কোটি কোটি খ্রিষ্টান ধর্মানুসারীর নিকট যীশু হলেন ঈশ্বরপুত্র। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে তিনি ক্রুশবিদ্ধ হন। কিন্তু ক্রুশে বিদ্ধ অবস্থাতেও তিনি ছিলেন ক্ষমাশীলতায় উদ্ভাসিত। এটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ যে, যে সাতটি বাণী ক্রুশবিদ্ধ অবস্থায় মহাত্মা যীশু উচ্চারণ করেছিলেন, তার প্রথম কথাটিই হলো ক্ষমা। জীবনাচরণে তিনি প্রেম, সেবা ও সৌহার্দ্যরে প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। যীশুর ধর্ম-কর্ম-জীবন যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর বিপুল সংখ্যক মানুষকে অন্ধকার হতে আলোর পথে পরিচালিত করেছে, অসত্য হতে সত্য পথের দিশা দিয়াছে যা আজও প্রবহমান। আমরা জানি, সকল ধর্মের মৌলিক সত্য ও সারসত্য হল মানবকল্যাণ। খ্রিষ্টধর্মও তার ব্যতিক্রম নয়। বর্তমানে সারা পৃথিবীতে প্রায় সোয়া দুই শতাধিক কোটি মানুষ খ্রিষ্টধর্মের অনুসারী। বাংলাদেশে রয়েছে সকল ধর্মের-সম্প্রদায়ের মানুষের অপূর্ব সহাবস্থান। যদিও প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার এই দেশে খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তবে এই উপমহাদেশে খ্রিষ্টান সমপ্রদায়ের ইতিহাস চারশত বছরের অধিক। বাংলাদেশে খ্রিস্টান সম্প্রদায় সংখ্যায় কম হলেও তাদের শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান আমাদের জন্য দৃষ্টান্ত। এদেশে পতুর্গীজদের আগমনের পরপরই খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বসবাস শুরু হয়। যশোরের শিমুলিয়া, নাভারণ, ঝিকরগাছা, গদখালি, মণিরামপুর, কেশবপুর, নওয়াপাড়া, রাজঘাট, খুলনার খালিশপুর, দৌলতপুর, বটিয়াঘাটার বাজুয়া, পাইকগাছা, সাতক্ষীরার তালা, বরিশালের সাগরদি, গৌরনদী, বাকেরগঞ্জ, পাদ্রী শিবপুর, দেশান্তরকাঠি, পটুয়াখালীর মাটিভাঙ্গা, ঢাকার নাগরী, তুমিলিয়া, ভাদুন, মিরপুর, চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গীবাজার, পাথরঘাটা, এনায়েত বাজার, জামালখান, আনোয়ারা দেয়াংপাহাড়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের বসতিসহ শিক্ষা-সংস্কৃতির কেন্দ্র রয়েছে। বিশেষ করে, দেখার বিষয় যে, যেখানে খ্রিস্টান সম্প্রদায় তাদের বসতি ও গীর্জা গড়ে তুলেছে, সেখানে তারা ন্যূনতমপক্ষে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। যে প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের শিক্ষা প্রসারে ব্যাপক ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।
বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রেই বড়দিন একটি প্রধান ধর্মীয় উৎসব এবং সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়। তবে চীন (হংকং ও ম্যাকাও বাদে), জাপান, সৌদি আরব, আলজেরিয়া, থাইল্যান্ড, নেপাল, ইরান, তুরস্ক ও উত্তর কোরিয়ার মতো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দেশে বড়দিন সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয় না।
সাংস্কৃতিক ও জাতীয় ঐতিহ্যগত পার্থক্যের কারণে, দেশ ভেদে বড়দিন উৎসব উদযাপনের রূপটিও ভিন্ন হয়ে থাকে। জাপান ও কোরিয়ার মতো দেশে খ্রিষ্টানদের সংখ্যা আনুপাতিকভাবে কম হলেও বড়দিন এদের একটি জনপ্রিয় উৎসব। বড়দিন উপলক্ষে এসব দেশে উপহার প্রদান, সাজসজ্জা, ও বড়দিনের বৃক্ষের মতো বড়দিনের ধর্মনিরপেক্ষ দিকগুলো গৃহীত হয়।
বিশ্বব্যাপী খ্রিষ্টান সম্প্রদায় নানাভাবে বড়দিন উদ্যাপন করে থাকে। গীর্জার উপাসনায় যোগ দেওয়া সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় প্রথা বলে মনে করেন তারা। বড়দিন উৎসব পর্বের অন্যতম অঙ্গ হল গৃহসজ্জা ও উপহার আদান-প্রদান। কোনো কোনো খ্রিষ্টীয় সম্প্রদায়ে ছোটো ছেলে-মেয়েদের দ্বারা খ্রিষ্টের জন্মসংক্রান্ত নাটক অভিনয় করানো হয়। আবার খ্রিষ্টানদের কেউ কেউ তাদের গৃহে পুতুল সাজিয়ে খ্রিষ্টের জন্মদৃশ্যের ছোটো প্রদর্শনীও করে থাকেন।
২৫ ডিসেম্বর অধিকাংশ দেশে, প্রতি বছর বড়দিন পালিত হলেও রাশিয়া, জর্জিয়া, মিশর, আর্মেনিয়া, ইউক্রেন ও সার্বিয়ার মতো কয়েকটি ইস্টার্ন ন্যাশানাল চার্চ ৭ জানুয়ারি তারিখে বড়দিন পালন করে থাকে।
বড়দিনে দেশের সব গীর্জায় ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টানসম্প্রদায় প্রার্থনা ও মানবের কল্যাণ কামনায় নিজেদের আত্মনিয়োগ করবেন। বড়দিনের বড় মাহাত্ম্য হতে হবে, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় মানবপ্রেম ও মানবসেবায় ব্রত হওয়া। আজকের এ শুভদিনে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের জন্য রইল প্রীতি-শুভেচ্ছা। শুভ বড়দিন।
জেমস আব্দুর রহিম রানা : গণমাধ্যমকর্মী ও জাতীয় পরিচালক, রূহানী চার্চ বাংলাদেশ ট্রাস্ট।





Users Today : 29
Views Today : 33
Total views : 175648
