সৃষ্টির শুরুতে ঈশ্বর মহাকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেন। তখন পর্যন্ত দুনিয়ার কোনো আকার ছিল না, জীবন্ত কোনো কিছু ছিল না। প্রথম দিন ঈশ্বর সৃষ্টি করেন আলো, আলোর নাম তিনি দিলেন দিন আর আঁধারের নাম তিনি দিলেন রাত, দ্বিতীয় দিন ঈশ্বর জলকে আলাদা করেছিলেন। আলাদা জায়গার নাম দিয়েছিলেন আসমান ও জমিন, তৃতীয় দিন সৃষ্টি করেন সাগর, নদী, চমৎকার উদ্যান, চতুর্থ দিন সৃষ্টি করেন চন্দ্র, তারা, গ্রহ, পঞ্চমদিন সৃষ্টি করেন সমুদ্রের জীব-জন্তু-মাছের সমারহ। আল্লাহ সব কিছু সৃষ্টি করেছেন অনেক সুন্দর ও মনোরম করে, সবকিছু বংশবৃদ্ধি করার ক্ষমতা দিয়েছেন। আল্লাহ দেখলেন সব কিছু অতি উত্তম। তাই ৬ষ্ঠ দিনে ঈশ্বর নিজের (ঐশ্বরিক) মতো করে মানুষ সৃষ্টি করেন। সমস্ত সৃষ্টির ওপর মানুষকে রাজত্ব ও দেখাশুনার ভার দিয়েছিলেন। আর সপ্তমদিনে ঈশ্বর কোনো কিছু সৃষ্টি করেন এই জন্য মানুষ সপ্তাহে কোনো এক দিন কোনো কাজ করে না। ঈশ্বর নাকে ফুঁ দিয়ে আদমকে জীবন বায়ু দিয়েছিলেন। আর আদমের পাঁজরের হাড় দিয়ে হবাকে ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন। হবাকেদেখার পর আদম বলেছেন, এবার হয়েছে, এ আমার অস্থির অস্থি। হবাকে দেখার পর আদম অনেক খুশি হয়েছেন। এদোন বাগানে অনেক সুখে শান্তিতে আদম-হবা ছিল কিন্তু মানুষ আর ঈশ্বরের শত্রু শয়তান আর ঠিক থাকতে পারলো না। সে মানুকে অবাধ্য করলেন। ঈশ্বর আদম-হবা যে নেকি-বন্ধি গাছের ফল খেতে নিষেধ করেছিল। সেই গাছের ফল শয়তান তাদেরকে ফাঁদেফেলে, লোভ দেখিয়ে খেতে বাধ্য করেছিল, মানুষ যখন গন্ধম ফল খেয়ে ঈশ্বরের সমান হতে চাইল তখন মানুষ অবাধ্য ও লোভের ফলে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে পাপ করল, ঈশ্বর পাপ করার আগ পয়ন্ত আদম-হবার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতেন। পূর্বে সেদিন ও ঈশ্বর আদম-হবার সঙ্গে দেখা কররা জন্য এসেছিল। কিন্তু ঈশ্বর যখন আদমকে ডেকেছিল তখন আদম নিজকে লুকিয়ে নিয়েছিল, ঈশ্বরকে বলেছিল সে নাকি উলঙ্গ, ঈশ্বর তাকে জিজ্ঞাস করেছিলেন তোমাকে কে বলেছিল, তুমি যে উলঙ্গ? আদম তখন হবাকে দোষারোপ করার চেষ্টা করেছে, আর তাদের সেদিন উলঙ্গতা ঢাকার জন্য পশুর চামড়া ব্যবহার করেছিলেন। অনেকে মনে করেন মানুষের পাপের জন্য এটা প্রথম কোরবানী। তারপর ঈশ্বর আদমকে অভিশাপ করেছিলেন, তোমাকে সারা জীবন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে খেতে হবে, নারীকে অভিশাপ দিয়েছিলেন স্বামীর জন্য তোমার প্রচুর মায়া হবে, প্রসব বেদনায় তুমি কাতরাবে। সাপকে অভিশাপ দিয়েছিল তুমি সারা জীবন বুকেব ওপর ভর দিয়ে চলবে, ধুলা খাবে এবং নারীর বংশের মধ্যে দিয়ে এমন একজন আসবে যে তোমার মস্তক চূর্র্ণ করবে।
ঈশ্বর অনেক ভালোবেসে মানুষ সৃষ্টি করেছিলেন, রুহানিকভাবে (আধ্যাত্মিক) তাঁরই মতো করে। ঈশ্বর মানুষকে বংশবৃদ্ধি করার ক্ষমতা দিয়েছিলেন এবং পৃথিবীর সব কিছুর ওপর রাজত্ব করতে বলেছিলেন, মানুষ স্বর্গীয় সুখে-শান্তিতে এদোন বাগানে ছিলেন, কিন্তু তখনি ঘটল অঘটন, মানুষ ও ঈশ্বরের শত্রু শয়তান, আর স্থির থাকতে পারল না। সে মানুষ ও ঈশ্বরের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করলেন,সে মানুষকে অবাধ্য করলেন ঈশ্বর থেকে। এতে ঈশ্বর অনেক কষ্ট পেলেন তাঁর প্রিয় মানুষের অবাধ্যতায়। যেহেতু ঈশ্বর শতভাগ পবিত্র তাই তাঁর পক্ষে পাপযুক্ত মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা সম্ভব না। অবাধ্যতার মাধ্যমে মানুষ পাপে পতিত হয়েছিলেন।আর এ জন্যই পূর্বের সর্ম্পক ফিরিয়ে আনার জন্য মানুষের পবিত্র হওয়ার দরকার। যুগে যুগে মানুষ পাক-পবিত্র হবার জন্য কুরবাণী দিতেন, কিন্তু এটা ছিল ক্ষণস্থায়ী।
তাই ঈশ্বর সিন্ধান্ত নিলেন তাঁর প্রিয় পুত্রকে এই পৃথিবীতে পাঠাবেন। আমরা পূর্বে দেখেছি যে, ঈশ্বর প্রতিজ্ঞা করেছেন, স্ত্রীলোকের মধ্যে দিয়ে একজন ব্যক্তি আসবেন যিনি শয়তানের মস্তক পিষে দিবেন (তৌরত শরীফ পয়দায়েশ ৩ : ১৫)। তাহলে এখন প্রশ্ন স্ত্রী লোকের মধ্যে দিয়ে এ পৃথিবীতে কে এসেছেন। প্রধান দুই ধর্মীয়গ্রন্থ বাইবেল ও কুরআন এক কথায় স্বীকার করে নেয় একমাত্র যীশু খ্রীষ্ট এই পৃথিবীতে বাবা ছাড়া শুধু মায়ের মধ্যে দিয়ে এসেছেন। এটা ঈশ্বরের অলৌকিক কাজ। এই পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই অদ্বিতীয়। তারপর যদি আমরা দেখি তাহলে হয়রত মুসা নবীর মধ্যে দিয়ে ঈশ্বর বলেছেন “তোমার ভাইদের থেকে তোমার মতো একজন দাঁড় করাব, যার কথায় তোমাদের চলতে হবে, তার মুখ দিয়ে আমি আমার কথা বলব, সে আমার বাধ্য থাকবে, তাঁর কথা যদি কেউ না শোনে তাকে দোষী বলে গণ্য করা হবে ” (তৌরত শরীফ দ্বিতীয় বিবরণ ১৮ : ১৬-১৬)। উক্ত পদ যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে আমরা দেখি যে, কার মধ্যে দিয়ে ঈশ্বর তাঁর মুখের কথা বলেছেন নিশ্চই যীশু খ্রীষ্টের মধ্যে দিয়ে।
যীশু খ্রীষ্টের জন্মের প্রায় ৭০০ বছর পূর্বে ঈশ্বর ইশাইয়া নবীর মধ্যে দিয়ে ভবিষদ্ববাণী করেছিলেন খ্রীষ্ট একজন সতী অবিবাহীত কুমারী গর্ভে জন্মীবেন তাঁর নাম রাখা হবে ইম্মানুয়েল (ইশাইয়া নবীর কিতাব ৭ : ২) আর সেই ভবিষ্যদ্বাণীর পূর্ণতা আমরা দেখতে পাই (মথি ১ : ১৮-২৫) মিকার্হ নবীর মধ্যে দিয়ে ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, “এহুদিয়া দেশের বেথেলহেম এহুদিয়ার মধ্যে তুমি কোনোমতেই ছোটো নও, কারণ তোমার মধ্যেথেকেই এমন একজন শাসনকর্তা আসবেন, যিনি আমার ইসরাইল জাতিকে পরিচালনা করবেন। এর পূর্ণতা আমরা দেখতে পাই (মথি ২ : ১) এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মরিয়ম ও ইউসুফ কিন্তু গালীল প্রদেশে নাসরতের অধিবাসী ছিলেন। কিন্তু যীশুর জন্মের পূর্বে সম্্রাট অগাস্টাস সিজার ঘোষণা করলেন সবাইকে নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে তার নাম লেখাতে হবে মরিয়ম ও ইউসুফ ছিল নবী দায়ূদের বংশের লোক তাই তাদেরকে জেরুশালেমে গিয়ে নাম লেখাতে হবে। তাই তারা গালীলের প্রদেশের নাসরত থেকে এহুদিয়া প্রদেশের জেরুশালেমে গেলেন আর ঠিক তাখনেই যীশুর জন্ম হলো।এ দ্বারাসেই নবীর ভবিষ্যৎবাণীর পূর্ণতা লাভ করে।
স্বর্গদূত ইউসুফকে বলেছিলেন, তারা যেন শিশু যীশুকে নিয়ে মিশরে চলে যায়। মিশরে চলে গিয়ে শিশু যীশু রাজা হেরোদের হাত থেকে রেহাই পায়। রাজা হেরোদ মারা গেলে পরে তারা মিশর দেশ থেকে ফিরে এসে গালিল প্রদেশের নাশরত গ্রামে বাস করেছিলেন কেননা নবীদের মধ্যে দিয়ে এই কথা বলা হয়েছিল তাকে নাসরতীয় বলা হবে। “কাল পূর্ণ হলো” (গালাতীয় ৪ : ৫)। তখনকার লোকেরা মসীহের আশায় ছিল। রোমীয়রা সারা পৃথিবী শাসন করতেছিল। ইহুদিরা রোমীয়দের দ্বারা অত্যাচারিত ও নির্যাতনে নিপীড়িত। তারা আশা করেছিল মসীহ আসবেন এবং তাদের উদ্ধার করবেন। আর এ কারণে রাজা হেরোদ সেই সময়ের সেই সব অবুঝ ও নিরাপরাধ শিশুদের ওপর এই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল। সত্যিই যীশু এসেছিলেন তবে রাজা বেশে নয় দারিদ্র বেশে পাপীদের মুক্তি দিতে।
যীশু খ্রীষ্ট পৃথিবীতে মাত্র ৩২/৩৩ বছর বেঁচে ছিলেন, তাঁকে ঈশ্বরের বিশেষকার্য সাধনের জন্য ক্রুশে জীবন দিতে হয়েছিল, যদিও-বা তাঁকে ক্রুশে দেওয়ার মতো কোনো দোষ খুঁজে পাননিরোমীয় সম্রাট পন্তিয় পীলাত, তারপরেও তাঁকে এই শান্তি ভোগ করতে হয়েছিল। তিনি ছিলেন ঈশ্বরের মেষশাবক ও চূড়ান্ত কোরবানি “ঈশ্বর মানুষকে এত ভালোবাসলেন যে তাঁর প্রিয় পুত্রকে দান করলেন, যে কেউ সেই পুত্রের ওপর ঈমান আসে সে বিনষ্ট না হয় কিন্তু অনন্ত জীবন পায় (ইঞ্জিল শরীফ ইউহোন্না ৩ : ১৬)।
প্রতি বছর বড়দিন আসে আমাদের জানিয়ে যায়, মানুষ্যপুত্র দারিদ্রবেশ ধারণ করে এসেছিল এই ধরণীতে, তিনি মানুষকে ভালোবাসে অন্যন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, প্রভু যীশু এই পৃথিবীতে যে শান্তি স্থাপনের জন্য যে ত্যাগ করিছিলেন, তা আবার ফিরে আসুক, পৃথিবীতে।
সব ধর্মই সম্প্রীতির কথা বলে। এ সম্প্রীতি বজায় রাখলেই বিশ্ব শান্তিময় হবে। মানুষ মানুষের জন্য, মানবতার সেবাই সবচেয়ে উত্তম ধর্ম। পৃথিবী হোক শান্তিময়, বন্ধহোক সকল হানাহানি, ফিরে আসবে পৃথিবীতে শান্তি, এটাই হোক শুভ বড়দিনের বারতা।





Users Today : 129
Views Today : 167
Total views : 182015
