ঝুম বৃষ্টি আর চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার। রাত নয়টার একটু বেশি হবে। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে শরিফ একটা প্রায় আধভাঙা বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝে বিজলি চমকাচ্ছে, বিজলির আলোতে শরিফ বাড়িটা যতটুকু দেখল তাতেই বুঝতে পারল বহুদিন হয় এ বাড়িতে কারো পা পড়েনি। মাথার চুল আর শরীরের অনেকটাই ভেজা শরিফের। ঠান্ডায় কাঁপছে।
অল্প কিছুদিন হলো ঢাকা এসেছে শরিফ, শহরটা এখনও প্রায় অচেনা। শরিফ ছাত্র হিসাবে মোটামুটি ভালো। ইন্টারমিডিয়েটের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়ে গেছে। যদিও নিজের পছন্দের বিষয় নয়, তবুও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বলে কথা। তাই নিজের ছোট্ট প্রিয় শহর, কাছের মানুষ, পরিচিত মুখ, পরিচিত জায়গা আর মা সবাইকে রেখে শরিফ চলে এসেছে ঢাকা। পড়তে। শরিফের বাবা বেঁচে নেই। সে যখন ক্লাস নাইনে পড়ে তখন বাবা মারা যায়।
ঢাকা এসে শরিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে একটা মেসে উঠেছে। এর আগে সে আর কখনও ঢাকা আসেনি, তাই শহরটা একদমই অচেনা। তার ওপর এত বড়ো শহর। ঢাকায় আসার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এলাকার এক বড়ো ভাইয়ের মাধ্যমে সে একটা টিউশনি পেয়ে যায়। সে যেখানে থাকে সেখান থেকে অনেক দূরে। একদম এ-মাথা থেকে ও-মাথা। মাস শেষে টাকাটা নিতান্তই দরকার তাই সে রাজি হয়ে যায়। মা মাস শেষে তার জন্য কিছু টাকা পাঠায় কিন্তু সে চায় মায়ের কষ্ট খানিকটা কমাতে। তাই দূর হওয়া সত্তে¡ও সে পড়াতে শুরু করে দিল।
দুই
প্রতিদিনের মতো সেদিনও রাত নয়টার দিকে পড়ানো শেষ করে বের হয়েছে শরিফ। সে যে জায়গায় পড়াতে যায় এলাকাটা এখনও বেশ পুরোনো। পুরোনো আমলের বাড়িঘর, অনেক গাছপালাও আছে। যদিও ঢাকা শহর তবে এখনও ইট-কাঠের জঞ্জাল হয়ে যায়নি। ও যে বাসায় পড়ায় মূল রাস্তা সেখান থেকে অনেক দূর। অনেক দূর হেঁটে এসে মূল রাস্তায় উঠে ফিরতি বাস ধরতে হয়। আজও পড়ানো শেষ করে বাস ধরবে বলে বড়ো রাস্তার দিকে হাঁটতে শুরু করেছিল শরিফ। যেই কিছু দূর হেঁটে এসেছে তখনি শুরু হলো প্রচণ্ড বাতাস, সেই সাথে তুমুল বৃষ্টি। রাস্তায় অল্প যে কয়েকজন মানুষ ছিল সবাই যে যেদিকে পারল ছুটল নিরাপদ আশ্রয়ের আশায়। সেও ছুটল। এর মধ্যে কারেন্টও চলে গেছে। দৌড় শেষে শরিফ নিজেকে আবিষ্কার করল একটা পুরোনো আধভাঙা বাড়ির বারান্দায়। চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার। আশেপাশে কোথাও কোনো মানুষজন নেই। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে, পড়ছে তো পড়ছেই। বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর একটু একটু ভয় পেতে শুরু করল শরিফ। না, ভুত-টুতের ভয় না। ভয়টা অন্য জায়গায়, আজকে বেতন পেয়েছে সে, তারপর মাও টাকা পাঠিয়েছে। সব টাকাই ও পকেটে রেখেছিল। যখন বৃষ্টি শুরু হয়েছিল, পড়িমরি করে ছুঠেছিল। টাকাগুলি পকেটে আছে তো? টাকাগুলি পকেটে আছে কিনা দেখবার জন্য পকেটে হাত দিতেই, বুকটা ধরাস করে উঠল শরিফের!
তিন
শরিফের ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে একজন বৃদ্ধ লোক। ঠিক শরিফের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু লোকটা আসল কোথা থেকে? সে তো কারো আসবার কোনো লক্ষণ বা কোনো শব্দও পায়নি। মনে হচ্ছে হুট করে একদম আকাশ থেকে এসে পড়েছে। অবশ্য এই অন্ধকার আর বৃষ্টির শব্দে বুঝতে না পারারই কথা। অন্ধকারের মধ্যে যতটুকু দেখা যায় সে খুব খেয়াল করে দেখল বৃদ্ধ লোকটাকে। মুখভর্তি কাঁচা-পাকা দাঁড়ি, উশকো-খুশকো চুল। পরনে মলিন পাঞ্জাবি। বৃদ্ধ লোকটা তার দিকে তাকিয়ে, মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল,
-কি খোকা ভয় পেয়েছ?
-অন্ধকারে হঠাৎ এভাবে সামনে এসে দাঁড়ালে যে কেউ চমকে যাবে।
তার কথা শুনে বৃদ্ধ লোকটা আবার মুচকি হাসল। তারপর আবার বলল,
-বৃষ্টি তো থেমে গেছে, তুমি কোনদিকে যাবে?
-আমি যাব বড়ো রাস্তায়, যেখান থেকে বাস ধরা যায়। কিন্তু বৃষ্টি শুরু হবার পর দৌড় দিয়ে ঠিক কোথায় যে আসলাম ঠিক বুঝতে পারছি না। আমি আবার এ এলাকাটা ভালো করে চিনিও না।
-আমি চিনি। আমি ঐদিকেই যাব। চল আমার সাথে।
বৃদ্ধ লোকটার কোথায় কিছু একটা ছিল। শরিফ না করতে পারল না।
-ঠিক আছে চলুন।
শরিফ আর বৃদ্ধ লোকটা পাশাপাশি চলতে শুরু করল। বৃষ্টি প্রায় কমে গেছে। অল্প গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি এখনও হচ্ছে। কিন্তু শরিফ আর দেরি করতে চাইল না। আরো দেরি হলে শেষে গাড়ি পাওয়া যাবে না। দুজন পাশাপাশি হেঁটে চলেছে। নির্জন, অন্ধকার রাস্তা। বৃদ্ধ লোকটা এমনভাবে হাঁটছে দেখে মনে হচ্ছে না অন্ধকারে পথ চলতে ওনার কোনো কষ্ট হচ্ছে। বরঞ্চ দেখে মনে হচ্ছে উনি দিনের আলোতে হেঁটে চলেছেন। বেশ খানিকটা হাঁটার পর শরিফ বড়ো রাস্তা দেখতে পেল। ছুটে যাওয়া গাড়ির আলো এসে পড়ছে। বৃদ্ধ লোকটা বলল, বড়ো রাস্তা এসে গেছে।
শরিফ বৃদ্ধ লোকটাকে ধন্যবাদ দিবে বলে ঘাড় ঘোরাল, কিন্তু বৃদ্ধ লোকটা কোথাও নেই। যেন একেবারে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
এরপর শরিফ যতদিন ওই এলাকায় পড়াতে গেছে, দেখার চেষ্টা করেছে ওরকম কোনো বৃদ্ধকে দেখা যায় কিনা-কিন্তু না, এরপর সে আর কখনই ওই বৃদ্ধ লোকটাকে দেখতে পায়নি।
চার
এরপর অনেকগুলি বছর কেটে গেছে। শরিফ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষ করবার পর ইংল্যান্ড এসেছে উচ্চতর ডিগ্রি নিবে বলে। ওর রেজাল্ট ভালো ছিল, তাই ইংল্যান্ডের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়ে যায়। ও যেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায় তা লন্ডন শহর থেকে বেশ অনেক দূর। এখানে আসবার পর শরিফ ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ে তার পড়াশুনা নিয়ে। ভালো ছাত্র হবার কারণে শিক্ষকদের সুনজরে পড়ে যায়। এর মধ্যে একজন শিক্ষকের অ্যাসিসটেন্ট হিসাবে কাজ করবার সুযোগও পেয়ে যায়। তাই প্রতিদিন নিজের ক্লাস, লাইব্রেরি এসবের পর ওকে অনেকটা সময় দিতে হয় তার স্যারের সাথে। ফিরতে ফিরতে প্রায়ই অনেক রাত হয়ে যায়। সে যে জায়গাটায় থাকে তা ওর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেশ খানিকটা দূরে। একটু খরচ বাঁচানোর জন্য এই দূরে বাসা নেওয়া। সমস্যা একটাই, রাত বেশি হলে হেঁটে ফেরা ছাড়া উপায় থাকে না।
সেদিনও কাজ শেষ করতে করতে শরিফের অনেক রাত হয়ে যায়। যখন সে রাস্তায় বের হলো তখন পুরু এলাকা একদম চুপচাপÑএমনিতেই এদিকে লোকজন কম , তার ওপর বৃষ্টি, সাথে ঠান্ডা। শরিফ রাস্তায় নেমে হাঁটতে শুরু করল। নিজের হাঁটার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। কিছুদূর যাওয়ার পর সে তার বেশ খানিকটা পিছনে কিছু ছেলের হইহল্লা শুনতে পেল। ছেলেগুলি তাকে উদ্দেশ্য করেও কিছু কথা ছুড়ে দিচ্ছে। একটু ভয় পেল শরিফ। এই ছেলেগুলি বিপজ্জনক হয়। একা পেলে কখনও কখনও সব কিছু কেড়ে নেয়। ছেলেগুলির পায়ের শব্দ আর চেঁচামেচির শব্দ খুব দ্রুত কাছে চলে আসছে।
পাঁচ
শরিফ দ্রুত পা চালাতে শুরু করল। আতঙ্কিত বোধ করতে শুরু করেছে সে। তার হাতে বেশ দামি একটা ঘড়ি আছে। তার কাছে এ ঘড়িটা অমূল্য। এই ঘড়িটা বাবার স্মৃতি। আসার সময় মা এ ঘড়িটা তার হাতে পরিয়ে দিয়েছিল।
সে বুঝতে পারল ছেলেগুলি দৌড়াতে শুরু করেছে, সেও দৌড়াতে শুরু করল। কোনদিকে গেল ঠিক বুঝতে পারল না। অন্ধকারে একটা বাড়ির দেয়ালে গা ঢাকা দিল সে। টিপটিপ বৃষ্টি পড়েই যাচ্ছে। ছেলেগুলি হেঁটে আসছে, কাছাকাছি এসে ওদের হাঁটার শব্দ থেমে গেল। সেই সাথে ওদের কথাও। কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। আবার কথা বলতে শুরু করল ছেলেগুলি-ধীরে ধীরে তাদের কথা দূরে যেতে যেতে আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল। তারমানে ওরা চলে গেছে। হাঁপ ছেড়ে বাঁচল শরিফ। কিন্তু ঠিক একটু পরেই মনে হলো কোথায় সে! চারপাশে অন্ধকার, টিপটিপ বৃষ্টি, নির্জন রাস্তা, কোথাও কেউ নেই। ছেলেগুলি কোথাও ঘাপটি মেরে নেই তো। সে যে রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে তাও সে বুঝতে পারছে। এই ঠান্ডার মধ্যেও সে দরদর করে ঘামতে শুরু করেছে। ঠিক সে মুহ‚র্তে হঠাৎ সে দেখতে পেল তার সামনে এক বৃদ্ধ উদয় হল। খানিকটা চমকে উঠল সে। বৃদ্ধ যেন আকাশ থেকে পড়ল-আর একটু হলে তাল সামলাতে না পেরে পড়ে যাচ্ছিল ও। একটু ধাতস্ত হয়ে বৃদ্ধের দিকে তাকাল ও। মলিন আর শরীর থেকে বেশ বড়ো একটা কোট, ঢলঢলে প্যান্ট, প্রায় ছেড়া জুতা আর মাথায় একটা হ্যাট পরে আছে বৃদ্ধ লোকটা। উশকো-খুশকো, কাঁচা-পাকা দাড়ি। বৃদ্ধ লোকটা তার দিকে তাকিয়ে আছে, মুখে স্মিত হাসি। বৃদ্ধের মুখের দিকে তাকিয়েই একটা ধাক্কা খেল শরিফ। সেই একই চেহারা-অবিকল এক। অনেকদিন আগে ঢাকায় এক বৃষ্টির রাতে সে পথ হারিয়েছিল আর তাকে পথ দেখিয়েছিল এক বৃদ্ধ। যার খোঁজ সে আর কখনই পায়নি সেই বৃদ্ধ আর এই বৃদ্ধ,তাদের চেহারা অবিকল এক। তফাৎ শুধু গায়ের রঙ।
খাঁটি বৃটিশ উচ্চারণে বৃদ্ধ তাকে জিজ্ঞেস করল,
-তুমি কি পথ হারিয়ে ফেলেছ, খোকা?
শরিফ উত্তর দিল- হ্যাঁ, পথ হারিয়ে ফেলেছি।
তারপর জিজ্ঞেশ করল,
-কিন্তু তুমি কে? এখানে হঠাৎ কোত্থেকে এলে? বৃদ্ধ উত্তরে কিছুই বলল না। শুধু
তার দিকে তাকিয়ে আবার মুচকি হাসল। তারপর বলল, আমার সাথে এস। শরিফ মোহগ্রস্তের মতো তার সাথে চলতে শুরু করল। পাশাপাশি নিঃশব্দে হাঁটছে দুইজন। এখনও বৃষ্টি হচ্ছে তবে খুবই অল্প। এই বৃষ্টিতেই শরিফের চুল, কাঁধ ভিজে গেছে। শরিফ মাথা ঘুরিয়ে বৃদ্ধের দিকে তাকাল এবং অবাক হয়ে লক্ষ করল বৃদ্ধের গায়ে বৃষ্টির একটা ফোটাও পড়েনি। এটা কি করে সম্ভব! দুজন মানুষ বৃষ্টিতে পাশাপাশি হাঁটছে, একজনের চুল-মাথা ভিজে গেল আর অন্যজন একেবারে খটখটে শুকনো। ভাবনার রেশ না কাটতেই শরিফের চোখে আলো এসে পড়ল। দূরে মানুষজন দেখা যাচ্ছে, সাথে গাড়ি-ঘোড়াও। শরিফ বৃদ্ধকে ধন্যবাদ দেবার জন্য ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখল, কিন্তু কোথাও কেই নেই। বৃদ্ধ যেন বাতাসে মিলিয়ে গেছে।
শরিফের আবারও অনেক বছর আগের ঢাকার সেই বৃদ্ধের কথা মনে পড়ে গেল। এখন তার স্পষ্ট মনে পড়ছে, সেই রাতেও বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃদ্ধ লোকটা তার পাশেপাশে হাঁটছিল কিন্তু সেই রাতেও সেই বৃদ্ধেরও মাথা, চুল সবই ছিল খটখটে শুকনা।
টিপটিপ বৃষ্টির মধ্যে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল শরিফ, ছুটন্ত গাড়ির হেডলাইটের আলো এসে পড়ছে শরিফের চোখে-মুখে, আর কেন জানি কী কারণে হু হু করে উঠল ওর মনটা।





Users Today : 94
Views Today : 103
Total views : 177354
