পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির ব্যাপক বিস্তৃতি ইতিমধ্যেই যথেষ্ট উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ, পদোন্নতি, নির্মাণ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অর্থ লোপাটের অভিযোগ উঠছে। শিক্ষকতার মতো মহৎ পেশার লোকদের এসব অনিয়ম-দুর্নীতি সমাজের প্রতিটি স্তরের পচনকেই যেন তুলে ধরছে।
শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তরে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রভাব শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনেও ফেলছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শুধু যে আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতিই হচ্ছে তা নয়-পছন্দের শিক্ষার্থীকে নম্বর বাড়িয়ে দেয়া, ভিন্নমতের শিক্ষার্থীর নম্বর কমিয়ে দেয়া, ফার্স্ট-সেকেন্ড বানানোর লোভ দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার, এমনকি নারী শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানির মতো ন্যক্কারজনক বিষয়ও মহামারী আকার ধারণ করেছে। এমন অবস্থায় দেশ ও জাতির ভবিস্যতের স্বার্থে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়ম-দুর্নীতি রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার বিকল্প নেই।
ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ দেশের ১৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম-দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত করছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। এছাড়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে। তদন্তের পর কমিশন দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করবে। বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত গুছিয়ে এনেছে ইউজিসি। অন্যদের বিরুদ্ধেও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, অনৈতিক কর্মকাণ্ড, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি, প্রকল্পের কাজে অর্থ লেনদেন, অবৈধ ভর্তি এবং অশোভন আচরণ, নারী কেলেঙ্কারীসহ বিভিন্ন রকমের অভিযোগ করা হয়েছে ইউজিসিতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের অনুসন্ধান করছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এ দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়মের প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে পূর্ণাঙ্গ তদন্তে নামা হবে বলে ইউজিসি সূত্রে জানা গেছে। ইতিমধ্যেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
এই প্রতিবেদনে দেশের দেশ পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ে উপচার্যদের দুর্নীতি, এর বিরুদ্ধে আন্দোলন ও সরকারের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করছি। সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বক্তব্য বিভিন্ন গণমাধ্যম, ইউজিসি’র জাতীয় শুদ্ধাচার বাস্তবায়ন কৌশলবিষয়ক সভা, ফেসবুক পেজ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।
-বিভাগীয় সম্পাদক
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফারজানা ইসলামকে অপসারণের দাবিতে আন্দোলনকারীদের হুঁশিয়ারি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হলে অসত্য অভিযোগ তুলে আন্দোলন করে ক্লাস বন্ধ রাখার জন্য তাদের শাস্তি পেতে হবে।
এমন প্রেক্ষাপটে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের ব্যাপারে তাদের সংগ্রহ করা তথ্য-উপাত্ত সংকলন করেছেন। তারা জানিয়েছেন, তথ্যগুলো শিক্ষামন্ত্রী এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন চেয়ারম্যানের কাছে দেবেন।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে তারা তথ্য উপাত্ত দিলেও অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব সরকারের বলে আন্দোলনকারীরা া মনে করছেন।
কারো বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা প্রমাণের দায়িত্ব আসলে কারঅভিযুক্তের নাকি অভিযোগকারীর? এটা নিয়ে এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বৃহৎ একটি অংশের আন্দোলনের মুখেও সরকারের অবস্থান উপাচার্যের পক্ষেই দৃশ্যমান হয়েছে। সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী আন্দোলনের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন।
অভিযোগের তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ করে তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব সরকারের

মির্জা তাসলিমা সুলতানা, অধ্যাপক, নৃ-বিজ্ঞান বিভাগ, জাবি
(ভিসির দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনরত একজন শিক্ষক)
অভিযোগের তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ করে তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব সরকারের বলে আমরা মনে করছি। আমরা উপাচার্যের দুর্নীতির তদন্ত চেয়েছি বারবার। ৮০-৯০ এর দশকে বোফর্স কেলেঙ্কারির যে খবর সংবাদ মাধ্যমে এসেছিল, তার সূত্রেই তদন্ত শুরু হয়েছিল। ফলে এখানে তদন্তের আগেই প্রমাণ দেয়ার বিষয় নেই। তবে আমরা যা জেনেছি, তাতো জানাবোই।
ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি 
এখানে অভিযুক্তকেই মূল দায়িত্ব নিতে হবে। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসবে আইন অনুযায়ী তাকেই নির্দোষ প্রমাণের জন্য দায়িত্ব পালন করতে হবে।
তবে সরকার এসব বক্তব্য মানতে কোনোভাবেই রাজি নয়।
আইন অনুযায়ী দুদকের তদন্ত শেষে মামলা হলে তখন অভিযুক্তকে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে হয়

আনিসুল হক, আইনমন্ত্রী
অভিযোগ প্রমাণের আগেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিয়ে বক্তব্য দেয়া বা কোনো প্রচারণা চালানো আইনসম্মত নয়। আইন অনুযায়ী দুদকের তদন্ত শেষে মামলা হলে তখন অভিযুক্তকে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে হয়। কিন্তু এর আগে দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে তথ্য উপাত্ত দিয়ে তা প্রমাণের দায়িত্ব অভিযোগকারীর ওপরই বর্তায়। দুদক প্রথমে অনুসন্ধান করবে। তাতে অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ পেলে তখন তারা তদন্ত করবে। সেই তদন্তে তথ্য প্রমাণ মিললে তখন মামলা করবে। এই অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার সময় অভিযোগকারীকেই তথ্য উপাত্ত দিয়ে অভিযোগের ভিত্তি প্রমাণ করতে হবে। ফলে অভিযোগকারীর দায়িত্ব থাকবে মামলা হওয়ার আগে অনুসন্ধান পর্যায়ে। আর মামলার পর তিনি যে নির্দোষ অভিযুক্তকে তা প্রমাণ করতে হয়।
উপাচার্য পূর্ণ নৈতিক অবস্থান হারিয়েছেন

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, অর্থনীতি বিভাগ, জাবি
যে সমস্যা সমাধানের জন্য জাহাঙ্গীনগর বিশ^বিদ্যালয়ের হল বন্ধ করা হয়েছে সেটা কোনো সমাধান নয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করার মাধ্যমে উপাচার্য পূর্ণ নৈতিক অবস্থান হারিয়েছেন। সরকারি ছাত্র সংগঠনের দ্বারাই দুর্নীতির বিষয়টা প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু সরকার কোনো প্রদেক্ষপ নেয়নি। উপাচার্য গণঅভ্যুত্থানের ভয়েই বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে রেখেছেন। ভিসি নিজেই আন্দোলনকে ভিসি বিরোধী আন্দোলনে রূপ দিয়েছে।
এই আন্দোলন জাহাঙ্গীরনগরের নয় তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে ভিসি নিয়োগ আইয়ুব খানের অধ্যাদেশ অনুযায়ী চলছে। যার ফলে ভিসি নিয়োগ সরকারের কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে।
রাজনৈতিক চাপে বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতি?
একজন উপাচার্য যদি দুর্নীতি করতে না চান, তাহলে তাঁকে কেউ দুর্নীতি করাতে বাধ্য করতে পারেন না। বরং দুর্নীতি অন্যের কারণে হয়Ñএ কথা বলার মধ্য দিয়ে উপাচার্যদের দুর্নীতি করার পথ প্রশস্ত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়ার জন্য যখন ব্যক্তিত্ব-আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হন্যে হয়ে রাজনৈতিক নেতাদের কাছে ছুটে বেড়ান, তখনই তাঁর নীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকাটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
উপাচার্য যখন স্বজনপ্রীতিমূলক নিয়োগ দেন তারপর থেকেই তার দুর্নীতির পথ শুরু হয়। কিন্তু উপাচার্য নিজে সচেষ্ট থেকে, যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন, তাহলে অন্যায় হওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। বরং দুর্নীতিপ্রবণ উপাচার্যরা এমন সদস্যদের দিয়ে বোর্ড গঠন করেন, যাতে নিজেদের স্বেচ্ছাচারিতার পথ প্রশস্ত হয়।
রাজনৈতিক তদবির থেকে শুরু করে মন্ত্রিপরিষদের সচিবেরা পর্যন্ত প্রার্থী নিয়োগে সুপারিশ করছেন
অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ, উপাচার্য , রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়
চার মাস আগে উপাচার্য পদে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করে অনেক চ্যালেঞ্জে পড়েছি। আমার বাসায় ডানে-বাঁয়ে, সামনে-পেছনে সবখানে চাকরি প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্তের ছড়াছড়ি। রাজনৈতিক তদবির থেকে শুরু করে মন্ত্রিপরিষদের সচিবেরা পর্যন্ত প্রার্থী নিয়োগে সুপারিশ করছেন। এভাবে চললে বিশ্ববিদ্যালয়ে শুদ্ধাচার বাস্তবায়ন কীভাবে সম্ভব?’
একজন উপাচার্য যদি দুর্নীতি করার ইচ্ছে পোষণ করেন, তাহলে তিনি উপাচার্য পদে যোগদান করেই দুর্নীতিপ্রবণ শিক্ষক-কর্মকর্তাদের পাশে নেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরের পদগুলো বণ্টনের বেলায় যোগ্যতার পরিবর্তে আনুগত্যকে প্রাধান্য দেন। মেধাবী শিক্ষক নিয়োগের পরিবর্তে ভোটার নিয়োগে সচেষ্ট হন। শিক্ষকদের বিভেদের রাজনীতিতে ঠেলে দেন।
একজন উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংগঠনগুলো যাতে সুস্থ ধারায় চলে, সে ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু যেসব উপাচার্য ব্যক্তিস্বার্থে ছাত্রসংগঠন ব্যবহার করতে চান, তাঁরা ছাত্রদের দিয়ে অন্যায় করান। উপাচার্যরা ব্যক্তিগত স্বার্থে বেশি দুর্নীতি করেন। রাজনীতিকের কাঁধে অস্ত্র রাখার স্বার্থে তাঁদের দু-একজন নিয়োগ দেন। কিছু হলেই সব সময় রাজনীতিকের ওপর দায় চাপান।
আমাদের দেশে উপাচার্যরা ব্যক্তিগত স্বার্থে বেশি দুর্নীতি করেন। রাজনীতিকের কাঁধে অস্ত্র রাখার স্বার্থে তাঁদের দু-একজন নিয়োগ দেন। কিছু হলেই সব সময় রাজনীতিকের ওপর দায় চাপান। যদি কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি দুর্নীতি করাতে বাধ্য করতে চান, সরকার নিশ্চয়ই উপাচার্যের পাশে দাঁড়াবে। আর একান্তই যদি নীতির ওপর থাকা সম্ভব না হয়, তাহলে তিনি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেবেন।
উপাচার্যদের দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে হবে
অধ্যাপক আব্দুল মান্নান, সাবেক চেয়ারম্যান, ইউজিসি
কৃষকের ট্যাক্সের টাকায় বিশ্ববিদ্যালয় চলে। উপাচার্যদের বেতন হয়। এ কারণে নিজেদের দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। এ বোধ সৃষ্টি হলে কোনো উপাচার্যই রাজনৈতিক চাপের কাছে হেরে যাবেন না।
দুর্নীতিবাজ উপাচার্যের শাস্তি কি শুধুই অব্যাহতি?
সব উপাচার্যই দুর্নীতিগ্রস্ত নন। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সম্পর্কে অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি। সরকার যে উপাচার্যকে দিয়ে অন্যায় কাজ করাতে চায়, এই সত্যি নয়। এমন হলে সরকার অভিযুক্ত উপাচার্যদের অব্যাহতি দিত না। কিন্তু অব্যাহতিই কি শাস্তি হতে পারে? আমাদের দেশে শাস্তির প্রয়োগ খুব কম হলেও সাবেক রাষ্ট্রপতি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন থাকা ব্যক্তির শাস্তি হয়েছে। কিন্তু উপাচার্যদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা লক্ষ করা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যায় হলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের দুর্নীতির বিরুদ্ধে যখন আন্দোলন করেন, তখন সরকার তাঁকে অব্যাহতি দিয়ে নিরাপদে সরিয়ে নেন। পদ থেকে উপাচার্যকে সরিয়ে নেওয়ার মধ্যে তাঁর প্রতি অনাস্থা প্রমাণিত হয়।
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী দুর্নীতিবাজ উপাচার্যদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। শুধু তা-ই নয়, উপাচার্যদের মধ্যে যাঁরা দুর্নীতি করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠার আগেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তদন্ত কমিটিগুলোকে শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে
ড. কাজী শহীদুল্লাহ, চেয়ারম্যান, ইউজিসি
অভিযোগ তদন্তের পর প্রমাণ হলে দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হবে। অভিযোগ কখনও সত্য হয়, আবার কখনও অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় না। আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে প্রমাণ খুঁজে বের করা। ইউজিসি থেকে আমরা সে চেষ্টা করছি। বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচর্যের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত গুছিয়ে এনেছি। আমাদের সুপারিশ করার দায়িত্ব, সুপারিশ বাস্তবায়ন করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনিয়ম, বিশেষ পদক্ষেপ নেয়া দরকার
জাতি হিসেবে সব ক্ষেত্রে পতনেরই লক্ষণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন অনিয়ম। রাষ্ট্রের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি শিকড় গাড়লে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানই বা এর বাইরে থাকে কী করে! বর্তমানে এমন একটি পর্যায়ে অবস্থান করছি, যখন একটি মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। এ পর্যায়ে এসে কোনো ক্ষেত্রেই দুর্নীতি-অনিয়মকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়ার সুযোগ নেই। অনিয়ম-দুর্নীতি করে রক্ষা পাওয়া যাবে নাÑএটি নিশ্চিত করা দরকার সর্বাগ্রে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ প্রায় নেই-ই। অভিযোগ উঠলে ইউজিসি তদন্ত করে; কিন্তু ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। এভাবে চললে অনিয়ম বন্ধ হবে না। সরকারকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব ক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে, না-হয় জাতির পচন চলতেই থাকবে। রুদ্ধ হয়ে যাবে ফেরার পথ।
নাজিম উদ্দিন, বিশেষ প্রতিবেদক।
ছাত্র আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ও ইতিহাস থেকে বর্তমানের ছাত্র রাজনীতি পুরো উল্টোপথে এগোচ্ছে। ছাত্র রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটাই প্রতীয়মান। বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের বিচার ও নীতি-আদর্শভ্রষ্ট ছাত্র রাজনীতির বিপক্ষে সারাদেশের শিক্ষার্থীরাই সরব হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাটি বুয়েট বা পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ের হলগুলোয় নতুন নয়। আবাসিক হলের আসন পাওয়ার ব্যাপারটি বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্র রাজনীতের একটি বড়ো বিষয়। আসন সংকটের কারণে ঢাকার বাইরে থেকে আসা প্রথম বর্ষে শিক্ষার্থীকে অনেক সময়ই গণরুম বা হলে থাকার ব্যবস্থা করে দেয় ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলো। আর এর জন্য প্রথম বা দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীকে না চাইলেও রাজনৈতিক দলের মিছিলে যেতে হয়। তা সে ওই মতাদর্শে বিশ্বাসী হোক না হোক। যখনই ক্ষমতার পালাবদল হয় তখন দেখা যায় ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠনগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ন্ত্রণের জন্য তারা হলগুলোর নিয়ন্ত্রণ দখল করে। অতীতে এরকম নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ, এমনকি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে। এই নিয়ন্ত্রণের মূলে থাকে তাদের একছত্র আধিপত্য, চাঁদাবাজি, তাদের টেন্ডারবাজি, প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এক ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। এটা একটি বড়ো রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, যার পেছনে সামাজিক, সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিক ক্ষমতার বিষয় থাকে। অথচ ছাত্র রাজনীতি মানে হলো ছাত্ররা নিজের স্বার্থে কথা বলবে। ছাত্রলীগ বা ছাত্রদল বা যেকোনো ছাত্র সংগঠনের উদ্দেশ্য কী? ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব করা। আমরা কিন্তু সেটা দেখিনি। বরং তারা তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য এবং তাদের সুবিধার জন্য বেশি লড়ে গেছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে তাদের ভাবার সময় নেই।
ছাত্রলীগ বা ছাত্রদলের মতো ছাত্র সংগঠনগুলোকে যতদিন মূল সংগঠন থেকে আলাদা করা না যাবে ততদিন এই অবস্থার পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে সেটা করতে হলেও মূল রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা জরুরি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে বর্তমান সময়ের ছাত্র রাজনীতি চরম এক অনাস্থার প্রতিচ্ছবি। এমন অবস্থা থেকে ছাত্র সংগঠনগুলো নীতি-আদর্শের পথে ফিরতে চায় কিনা, অথবা আদৌ ফিরতে পারবে কিনা, সেটাই হয়ত এখন এসব দলের জন্য সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ।
এছাড়াও উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনার সময় এসে গেছে। শিক্ষকদের রাজনৈতিক মত ও বিশ্বাস থাকতেই পারে-কিন্তু সাংঘর্ষিক বিভাজিত শিক্ষক-রাজনীতিও যে শিক্ষার পরিবেশ কলুষিত করছে তা নিশ্চয়ই অস্বীকার করার উপায় নেই।
প্রতিবাদী হওয়ার জন্য রাজনৈতিক দলের প্রভাবে থাকা কখনোই অপরিহার্য শর্ত হতে পারে না। সা¤প্রতিক সময়ে কোটাবিরোধী আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন কোনো ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠেনি, গড়ে উঠেছিল প্রয়োজনের তাগিদে, স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে। ছাত্ররাজনীতির নতুন লক্ষ্য নির্ধারণের সময় এসেছে। ছাত্র রাজনীতি হতে হবে স্বাধীন। তারা কোনো দলের লেজুড়বৃত্তি করবে না। তারা ছাত্রদের নিয়ে কাজ করবে। তাহলেই ছাত্র রাজনীতি আবার গৌরবের ধারায় ফিরবে। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই।





Users Today : 92
Views Today : 101
Total views : 177352
