দেশীয় প্রজাতির মাছের ভাণ্ডার হিসেবে প্রসিদ্ধ চলনবিল। এই অঞ্চলে স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতিতে দেশীয় প্রজাতির মাছের শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রচেষ্টা সম্পূর্ণরূপে থমকে গেছে। দাতা সংস্থার অর্থে পরিচালিত প্রকল্পটি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চলছিল। তবে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে না হতেই চাতাল মালিকরা ফিরে গেছেন আবার সেই সনাতন পদ্ধতিতে শুঁটকি তৈরিতে। চলনবিল অঞ্চলে মিঠা পানির দেশীয় প্রজাতির মাছের শুঁটকি দেশে ও দেশের বাইরে ব্যাপক চাহিদা থাকলেও ইতিমধ্যেই এর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্র তেকে জানা যায়, চলনবিলে প্রায় এক হাজার ৭৫৭ হেক্টর আয়তনের ৩৯ টি বিল, চার হাজার ২৮৬ হেক্টর আয়তন বিশিষ্ট ১৬টি নদী এবং ১২০ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট ২২টি খাল রয়েছে। মূলত বর্ষা মৌসুম নদীর বিশেষ করে আষাঢ় থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত চার মাস বিলে পানি থাকায় চলনবিলের জলায়তন বিস্তৃতি হয়। আর মাছের প্রজননকাল থেকে শুরু করে শুষ্ক মৌসুম পর্যন্ত মিঠা পানির মাছের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্রে পরিণত হয় চলনবিল। এ সময় শত শত টন বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরা পড়ে জেলেদের জালে। এ বিলের মাছ দিয়ে দেশের মিঠা পানির মাছের বড়ো একটি অংশের চাহিদা পূরণ করা হয়ে থাকে।
সেই মাছ শরৎ হেমন্ত এমনকি শীতকালের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলনবিলের বিভিন্ন প্রজাতির মাছের যেমন টেংরা, পুটি, টাকি, ঢেলা, মওলা, চেঁলা, চিংড়ি, বোয়াল, শোলসহ বেশ কয়েকটি প্রজাতি মাছের শুঁটকির চাহিদা রয়েছে দেশ-বিদেশে। চলনবিলের হান্ডিয়াল বিলের শুঁটকি ব্যবসায়ী গোপেন হালদার জানান, চলনবিলের মাছের শুঁটকি পার্শ্ববর্তী ভারত, আমেরিকা, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, বাহারাইন, কাতার ও দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়ে থাকে।
এ বিষেয়ে রাজশাহী মৎস্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. শাহীনুর রহমান জানান, বৃহত্তর চলনবিল ও তার প্লাবনভ‚মিতে প্রতি বছর গড়ে চার শ থেকে সাড়ে চার শ মেট্রিক টন দেশীয় প্রজাতির শুঁটকি উৎপাদন হয়ে থাকে। যার বাজার মূল্য টাকার অংকে প্রায় ২৫ থেকে ২৮ কোটি টাকা। প্রাচীনকাল থেকেই চলনবিল এলাকার জেলেরা সনাতন পদ্ধতিতে মাছের শুঁটকি করে আসছেন। এ জন্য তারা উঁচু বাঁশের মাচা তৈরি করে, কাঁচা মাছ রোদে শুকায়ে শুঁটকি তৈরি করে থাকেন। সা¤প্রতিক বছরগুলোতে মাছের পচন রোধে এবং পোকা ও মাছি মুক্ত রাখতে অনেক সময় কীটনাশকসহ রাসায়নিকজাত দ্রব্য মেশানোর অভিযোগ উঠলে শুঁটকির বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ কারণে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে শুঁটকি তৈরি করার জন্য ২০১৪ সালে চলনবিলের চাতাল মালিকদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি একটি প্রকল্প হাতে নেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়ন প্রকল্প (হেকেপ)।
এ পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার মহিষলুটিতে প্রকল্পটি পরিদর্শনে আসেন ভারত, মালয়েশিয়ার বিশেষজ্ঞসহ বাংলাদেশের মৎস্য অধিদপ্তরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ। তাঁরা প্রকল্পটি দেখে আশ্বস্ত হন।
একাধিক শুঁটকির আড়তদার জানান, পরিচ্ছন্ন পরিবেশে দেশীয় প্রজাতির মাছের শুঁটকি উৎপাদন করায় সে সময় এর চাহিদাও বৃদ্ধি পায় । কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো গত ২০১৬ সালে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়া মাত্রই চাতাল মালিকরা প্রকল্প সহযোগিতা না পেয়ে তারা ফের তাদের নিজস্ব সনাতন পদ্ধতিতে শুঁটকি তৈরি শুরু করেন।
দেশীয় প্রজাতির মাছের শুঁটকি দেশে ও দেশের বাইরে ব্যাপক চাহিদা ফিরিয়ে আনতে এ বিষয়ে সরকারকেই সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে উৎপাদনকারীদের ঋণ ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সেই সাথে স্থানীয় বাজার তৈরি ও আধুনিক পদ্ধতিতে উৎপাদন করা গেলে দেশি বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও এর চাহিদা বৃদ্ধি পাবে।
এম আতিকুল ইসলাম বুলবুল/ সময়ের বিবর্তন





Users Today : 59
Views Today : 62
Total views : 177313
