গতবারের লেখাটি অসম্পূর্ণ রেখেই শেষ করেছিলাম। লেখাটি শেষ করার পর প্রতিদিন যে হারে দুর্নীতির কেচ্ছা প্রকাশ হতে শুরু করেছে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো কোনো সুযোগ নেই। বাংলায় বলে লজ্জায় মাথা কাটা যায়। সম্প্রতি দুর্নীতির যে কেচ্ছা ও বর্ণনা প্রকাশ পাচ্ছে তাতে করে কত হাজার যে মাথা বলি হয়েছে তার ইয়াত্তা নেই। তথাপি সুখের বিষয় এই যে সেই সমস্ত মাথা কাটা লোকগুলো আবার নতুন মাথা নিয়েই সমাজে বাস করছে।
সেই বহু বছর আগের কথা, সনটা ঠিক মনে নেই। ১৯৬৫ সালে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংগঠিত হয়েছিল সেই সময় প্রকাশ্য দিবালোকে একটি মানুষকে খুন করা হয়েছিল। তখন পাকিস্তানি আমল-মৃত দেহটি রাস্তায় পড়ে ছিল প্রায় ঘণ্টাখানেক। আশ্চর্যের বিষয় এই যে তখন শহরের যানবাহনের তেমন প্রচলন ছিল না ঠিক কিন্তু মৃত দেহটিকে ঘিরে কোনো ভিড় গড়ে ওঠেনি বরং ভয়ার্ত মানুষ রক্তাক্ত মৃত দেহটিকে রাস্তায় রেখে এড়িয়ে গেছে। পুলিশ এসে মৃত দেহটিকে সরিয়ে ফেলে। রাস্তা-ঘাট, দোকান-পাট সব জনমানব শূন্য হয়ে পড়ে। মনে আছে, ভয়ে আতঙ্কে হিন্দুরা বেশ কয়দিন ঘর থেকে আর বের হয়নি। আমরা তখন ফরাশগঞ্জ এলাকায় থাকতাম। একদিকে থাকত হিন্দুরা আরেক দিকে মুসলমান বিহারীরা মাঝখানে আমরা। পাড়ায় আমরা সম্প্রীতির ভাব দেখেছি। যেই বিহারীরা হিন্দুদের ওপরে খড়গহস্ত ছিল তাড়াই পাড়ার হিন্দুদের সাহস যুগিয়েছিল বলেছিল, “ডরহ্ মাৎ আমরা যতদিন আছি তোমাদের কিচ্ছুটা হবে না।” আমরা খ্রিষ্টান আমরা হিন্দুদের মতো ভীতু না হলেও আমার বাবা-মা যে কিছুটা ভয়গ্রস্ত হয়নি এমনটা নয়-কারণ ভয় একটা সংক্রামক ব্যাধির মতো। আমরা যে সেই ভয়ে সংক্রমিত হয়েছিলাম তা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই। তখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটলেও পাড়ায় পাড়ায় হিন্দু মুসলমানদের মাঝে সম্প্রীতির একটা ভাব বজায় থাকত। তাই বলে দাঙ্গায় হতাহতের সংখ্যা ও হিন্দু হত্যা ও বিতারণের সংখ্যাও কম ছিল না। তথাপি আমার মনে হয় সংখ্যাতত্তে¡র দিক থেকে ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হিন্দুরা বিহŸল হয়ে পড়েছিল। “সব ঠিক হায়, সব ঠিক হো যায় গা” বলে তদানিন্তন পাকিস্তানের সরকারের আপাতদৃষ্টে তাদের দেওয়া সান্ত¡না রাজনৈতিকভাবে যতটা না সফল করেছিল প্রকৃত পক্ষে হিন্দুদের ভীতগ্রস্ততা থেকে সুরক্ষা করতে পারেনি। তারপরে ভারত থেকে শত শত মুসলমান বিহারীরা উদ্বাস্তু হয়ে যখন আসতে শুরু করল তখন আবার দৃশ্যপট পালটাতে শুরু করে। হিন্দু মুসলিম বিদ্বেষকে মূল করে অনেক রাজনীতিবিদ তাদের রাজনীতির স্বার্থক চাল চেলে গেছেন। কিন্তু এদেশ থেকে হিন্দু বিতারণের সংখ্যা কমাতে পারেনি। সাম্প্রতিক দাঙ্গায় তখন সমাজে প্রধান ভয় হিসাবে কাজ করেছিল। দুর্নীতির খবর তখন সাধারণের মাঝে তেমন একটা চাউর হতে পারেনি। পাঁচ বছরের মাঝেই হিন্দুদের সংখ্যা দেশে ২০ শতাংশের বেশি নেমে গেল। পাক-ভারত স্বাধীনতার সময় যখন এ দেশে হিন্দুদের সংখ্যা প্রায় ৪০-৪৫% ছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর সেটা নেমে ১৫% এসে ঠেকেছিল। বর্তমানে তা ১০-১১% এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে (পরিসংখ্যনসমূহ নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ না করা হলেও তবে তা কাছাকাছি হবে বলেই বিশ্বাস করি)।
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর হিন্দুদের বিতরণ করতে গিয়ে বাঙ্গঙালি জাতি হিসাবে আমরা যে নিদারুণ সমস্যা কবলিত হয়েছি তা আস্তে আস্তে এখন উপলব্ধি করতে পারছি। অনেকেই হিন্দুদের কমে যাওয়া উল্লেখ করে সুপরিকল্পিতভাবে হিন্দুদের তাড়িয়ে দেওয়ার একটা কৌশল হিসেবেই দেখেন এবং হিন্দুদের তাড়িয়ে দেয়ার ফলে হিন্দুদের ছেড়ে যাওয়া সম্পত্তি ও ব্যবসা যারা কুক্ষিগত করেন তাদের মধ্যে অনেকেই আজ সনামধন্য রাজনীতিবিদ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। রাজনীতিবিদদের খেলায় হিন্দু বিতরণের কৌশলটি প্রায় সকলেই বোঝেন তথাপি বুক চেতিয়ে কেউ স্বীকার করতে চান না ফলেই সেই অন্যায্য দাঙ্গাকারীদের কৃতকর্ম যখন জায়েয হয়ে যায় তখন রাজনৈতিক কৌশলে সেই সমস্ত দুর্নীতি সামাজিক প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। হিন্দু সম্পত্তি দখল করে রাজনীতির আড়ালেই এই কুকর্মগুলো করা হয়েছিল। সেই থেকে আজ পর্যন্ত অনেক রাজনীতির খেলা চলে আসছে। পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে “হিন্দু সম্পত্তি অর্পিত আইন” এর নামে বিভিন্নভাবে একইভাবে চলে আসছেÑএর ব্যাখ্যা ও উপব্যাখ্যা দিয়ে বেশিরভাগ বঞ্চিত হিন্দুরাই এই দুর্নীতি থেকে মুক্ত হতে পারেনি। যে সমাজে এ হেন দুষ্কর্ম রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা পায় সেই সমাজে এখন তো আর হিন্দুদের সেই অবস্থান নেই যাতে করে আবার একটা সাম্প্রতিক দাঙ্গা ঘটিয়ে কেউ আঙুল ফুলে কলা গাছ হবে। সুতরাং সম্প্রতি যে সমস্ত দুর্নীতির কথা প্রকাশ পাচ্ছে সেই সমস্ত দুর্নীতির মূল উৎস বলে অনেকেই বিশ^াস করে। বিচারহীনতা আজ দেশকে বর্তমান অবস্থায় দাঁড় করিয়েছে।
এখন অনেকেই শঙ্কিত আছেন, বিশেষ করে যারা দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল বৈভবের অধিকারী হয়েছেন তারা একটু বেশি চিন্তিত আছেন ‘কি জানি কি হয়’ ভেবে। আমাদের মতো আমজনতার মনেই এই প্রশ্ন জাগছে এর পরে কী হবে। সব দুর্নীতিগ্রস্তরাই কি ধরা পড়বে নাকি আই ওয়াসের মতো কিছু কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত যাদের ইতিমধ্যে ধরা হয়েছে তাদের শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে। আমরা অপেক্ষায় আছি, মিডিয়ার মাধ্যমে জেনেছি গ্রেফতারকৃতরা ইতিমধ্যে পুলিশের কাছে অনেক বাঘা বাঘা গডফাদারদের নাম প্রকাশ করে দিয়েছেন। সেই সমস্ত গডফাদারদের নাম কি শুধু পুলিশের খাতায় থাকবে? নাকি উৎসাহ মিটাবার জন্য আমরাও সেই সমস্ত নাম অবগত হতে পারবো। বহু বছর আগে পার্সনেল ম্যানেজমেন্টের ওপর একটি প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম। এক প্রশিক্ষক উদাহরণ ছলে বলেছিলেনÑ ‘শাস্তি দিতে হলে শ্রমিক শ্রেণির স্টাফদের আর্থিক জরিমানা প্রদান করতে হয়। কিন্তু সম্মানিত লোকদের একটু সম্মানহানি করে ছেড়ে দিলেই তার উপযুক্ত বিচার হয়ে যায়’। বর্তমানে যারা সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত তাদের মধ্যে যদি কারও নাম দুর্নীতির খাতায় প্রকাশ হয়ে পড়ে তাহলে কি বিচার যথার্থ হবে? মোটেই না। তার কারণ সাম্প্রতিক কালে ঘটে যাওয়া দুর্নীতিগ্রস্ত ছাত্রনেতাদের স্বীকাক্তির মাধ্যমে জানা যায় যে, আজ ছাত্র লীগের মধ্যে যারা সব চেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত তারাই এক কালে ফ্রিডম পার্টির সদস্য ও ছাত্রদলের নেতৃত্ব দিয়েছে। ঘুষ দিয়ে ছাত্রলীগে নাম লিখিয়ে এখন তারাই দুর্নীতির শিখরে উঠে বসেছে।
সুতরাং দুর্নীতিগ্রস্ত যারা বামাল ধরা পড়েছেন তাদের যথার্থ বিচার করতে গেলে সেই সমস্ত দুর্নীতিবাজদের প্রতিষ্ঠা করার জন্যে দুর্নীতি করেছেন তাদের অবশ্যই উপযুক্ত বিচার হওয়া একান্তই আবশ্যক। তা নাহলে হাজার কোটি টাকা লোপাট করে একশ কোটি টাকার সম্মান খুইয়ে তারা আবার সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সুযোগ খুঁজে নিবে। এ পর্যন্ত শুধুমাত্র দুর্নীতির ফলে সামাজিক দৃষ্টিকোণের প্রেক্ষাপটের উল্লেখ করা হলো কিন্তু দুর্নীতি যে কীভাবে আমাদের মানসিক পারিবারিক ও আত্মিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে তা আগামী সংখ্যায় লিপিবদ্ধ করে এই বিষয়ের যবনিকাপাত টানব।
ড. এলগিন সাহা : কলামিস্ট ও এনজিও ব্যক্তিত্ব।





Users Today : 34
Views Today : 34
Total views : 177437
