আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ওপেন ডোরস্’ এবং ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াচ লিস্ট’র ২০২৪ এবং ২০২৫ সালের তথ্যানুযায়ী খ্রিষ্টানদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক বা নিপীড়নমূলক দেশগুলোর তালিকায় ভারতের অবস্থান ১১তম। ২০২৪ সালে কমপক্ষে ১৬১জন খ্রিষ্টানুসারীকে বিশ্বাসের কারণে হত্যার শিকার হতে হয়েছে। ২০২৫ সালে ইউনাইটেড ক্রিশ্চিয়ান ফোরাম (ইউসিএফ) মতানুযায়ী, নভেম্বর পর্যন্ত ৭০৬টির বেশি নির্যাতন-অত্যাচারের ঘটনার তথ্য সংগৃহীত হয়েছে। অপরদিকে ইভানজেলিক্যাল ফেলোশিপ অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা ২০২৩ সালে ৬০১টি, ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় অন্তত ৮৩০টি, এটি ছিল বিগত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২৫ সালের সংঘটিত প্রায় ৯৩ শতাংশ ঘটনার কোনো তদন্ত হয়নি। সহিংসতার মধ্যে রয়েছে—শারীরিক আক্রমণ, প্রার্থনায় বাধা, গির্জা ভাঙচুর, সামাজিকভাবে বর্জন এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তরের অভিযোগ তুলে যাজকদের হেনস্তা করা। দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটিতে মোট জনসংখ্যার প্রায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী অর্থাৎ সংখ্যায় প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখের মতো বিশ্বাসী বসবাস করেন।
সহিংসতার মানচিত্রটি লক্ষ করলে একটি রাজনৈতিক ধরন চোখে পড়ে। উত্তর প্রদেশ থেকে ছত্তিশগড়, রাজস্থান, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, কর্নাটক, গুজরাট, মধ্য প্রদেশ। মধ্যপ্রদেশের জাবালপুর থেকে শুরু করে ওড়িশা, হরিদ্বার, এমনকি রাজধানী দিল্লিতেও বজরং দলসহ উগ্র সংগঠনগুলোর টার্গেটে পরিণত হয়েছে খ্রিষ্টানুসারীরা। এসব রাজ্যে চরমপন্থী বয়ান এখন স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের কাজেও প্রভাব ফেলেছে। ওডিশার বালাসোরের ঘটনা—ক্যাথলিক যাজক ও সন্ন্যাসিনীরা ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে একদল উগ্রবাদীর আক্রমণের শিকার হোন। কোনো প্রমাণ ছাড়াই তাদের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ধর্মান্তরের অভিযোগ আনা হয়েছিল। ক্যাথলিক বিশপস্ কনফারেন্স অব ইন্ডিয়া এই হামলাকে একটি উদ্বেগজনক জাতীয় প্রবণতার অংশ বলে বর্ণনা করেন, যেখানে ধর্মীয় গুরুদের ক্রমেই সন্দেহ ও সহিংসতার লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। মধ্যপ্রদেশের জাবালপুরে ডায়োসিসের ভিকার জেনারেলসহ জ্যেষ্ঠ যাজকরা থানার ভেতরেই লাঞ্ছিত হোন। তারা মূলত সন্দেহজনক অভিযোগে আটক খ্রিষ্টান পুণ্যার্থীদের পক্ষে কথা বলতে সেখানে গিয়েছিলেন। মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুরে ক্ষমতাসীন বিজেপির জেলা সহ-সভাপতি অর্জুন ভার্গবের অপর একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এতে দেখা যায়, গির্জার অনুষ্ঠানে একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নারী ও তার সন্তানদের ওপর চড়াও হয়েছে অর্জুন। তিনি এক নারীকে লাঞ্ছিত করেন। ওই নারীকে উদ্দেশ্য করে অর্জুনকে বলতে শোনা যায়, তিনি এই জন্মেও দৃষ্টিহীন, আগামী জন্মেও দৃষ্টিহীনই থাকবেন। এমনকি চার্চে সিঁদুর পরে বাচ্চাদের নিয়ে একে এসেছেন সে প্রশ্নও করেন অর্জুন। অর্জনের দল দাবি করে আসছে, দৃষ্টিহীন ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জোর করে ধর্মান্তকরণ করা হয়ে থাকে এই গির্জায়। সেই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছেন তিনি। তবে খ্রিষ্ট বিশ্বাসী ও গির্জার কর্মকর্তাগণ বলিষ্ঠ কণ্ঠে অস্বীকার করে বলেন, অনুষ্ঠানটি ছিল—প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য একটি দাতব্য সমাবেশ।
ছত্তিশগড়ে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে দেখা গেছে, পাচার বা জোরপূর্বক ধর্মান্তরের অভিযোগে রেলস্টেশন ও গণপরিবহণ পয়েন্টগুলো থেকে খ্রিষ্টান যাজক ও সন্ন্যাসিনীদের আটক করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো বরাবরই অস্বীকার করে আসছে, খুব কমই অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। মধ্যপ্রদেশের সাতনা জেলায় গ্রামের রাস্তায় ক্রিসমাস ক্যারল গাইতে গাইতে যাচ্ছিল দুজন যাজকসহ একদল খ্রিষ্টানুসারী। আচমকাই উগ্র হিন্দুত্ববাদী বজরং দলের কিছু লোকজন তাদের রাস্তা আটকে অভিযোগ তোলে তারা এলাকায় ধর্মান্তকরণ করছেন। পুলিশ এসে ওই খ্রিষ্টানদেরই গ্রেফতার করে, হামলাকারীরা তাদের একটি গাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। ৮ জুন বোর্সি গ্রামে রবিবার গির্জা চলাকালীন একদল হিন্দু চরমপন্থী ‘পিনিয়ল প্রেয়ার ফেলোশিপে’ হামলা চালায়। গির্জার চেয়ার, বাদ্যযন্ত্র, পবিত্র বাইবেল পোড়ানোসহ উপস্থিত খ্রিষ্টভক্তদের ওপর উপর্যুপুরি হামলা চালায়।
রায়পুর, ছত্তিশগড়, ভারতের একটি গির্জায় উগ্রবাদীদের সগৌরবে হামলার ভিডিও মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়েছে। খ্রিষ্ট বিশ্বাসীদের সবচেয়ে বড় ও ধর্মীয় উৎসব শুভ বড়দিন উদ্যাপনের লক্ষ্যে সাজ-সজ্জায়পূর্ণ গির্জাতে একদল ধর্মীয় উম্মাদ লোক আক্রমণ করে সমস্ত কিছু ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে। বড়দিনের অনুষ্ঠানে, গির্জায় থাকা সান্তাক্লজের কুশপুত্তলিকা পুড়িয়েছে। গির্জায় থাকা পবিত্র বাইবেল, সংগীত পুস্তকসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুস্তক পুড়িয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও ২০ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ধর্মান্তকরণ বিরোধী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে বলে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুরেন্দ্র জৈন জানিয়েছিলেন। ছত্তিশগড় রাজ্যের কাঁকের জেলায় শেষকৃত্য অনুষ্ঠানেও বিপত্তি ঘটেছে সাম্প্রতিকালে। জেলার বাদেতেভদা গ্রামে একটি খ্রিষ্টান পরিবারের বিরুদ্ধে গ্রামবাসী ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো পরিবারের কর্তার সমাধিস্থলকে কেন্দ্র করে বির্তকের জন্ম দেয়। ইউনাইটেড ক্রিশ্চিয়ান ফোরাম এক বিবৃতিতে জানিয়েছে—২০২৫ সালে ভারতজুড়ে শেষকৃত্য সংক্রান্ত অন্তত ২৩টি ঘটনায় খ্রিষ্টানদের ওপর হামলার তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। এরমধ্যে ছত্তিশগড়েই ঘটেছে ১৯টি ঘটনা। ঝাড়খণ্ডে ২টি, ওডিশা ও পশ্চিমবঙ্গে ১টি করে। ২০২৪ সালে সংখ্যা ছিল—চল্লিশার্ধো। ছত্তিশগড়ে ৩০টি, ঝাড়খ-ে ৬টি, বাকিগুলো বিহার ও কর্র্নাটকে। ছত্তিশগড়ে খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে ২৪ ডিসেম্বর বন্ধের ডাক দিয়ে ঘৃণামূলক ডিজিটাল পোষ্টার ছড়ানোর ঘটনা ঘটেছে। খ্রিষ্টানুসারীদের ওপর উগ্রবাদীদের চড়াও উৎসাহিত এবং সহিংসতার পথকে প্রশস্ত করেছে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সিবিসিআই কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলোর কাছে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছে আবেদন জানানো হয়েছিল—যাতে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বড়দিন শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতির পরিবেশে উদ্যাপনের সুযোগ দেওয়া হয়।
২০২৫ সালে আমরা পর্যবেক্ষণ করেছি—ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের কেরালা রাজ্যের লোক ভবনের খ্রিষ্টানুসারীদের বড়দিনের ছুটি বাতিল করে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে সুশাসন দিবসে উপস্থিতিকে বাধ্যতামূলক করা হয়। ইতিপূর্বে ক্যালেন্ডারে বছরের দ্বিতীয় মাস ফেব্রুয়ারি মাসের পাতায় ভি ডি সাভারকারের প্রতিকৃতি ছাপানো হয়। বিষয়টিকে নিছক ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে না দেখে বরং একটি নির্দিষ্ট আদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০১১ সালের আদমশুমারী অনুাযায়ী, কেরালা রাজ্যে খ্রিষ্টানদের সংখ্যা হলো ৬১ লক্ষ ৪১ হাজার ২৬৯ জন যা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৮.৩৮ শতাংশ। উত্তর প্রদেশেও যোগী আদিত্যনাথ সরকার ঘোষণা করেছিল—বড়দিনে স্কুলগুলো বন্ধ থাকবে না এবং শিক্ষার্থীদের অটল বিহারি বাজপেয়ির অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হবে।
ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শাসিত হরিয়ানা রাজ্যের গুরুগ্রামের (সাবেক গ্রাম গুরগাঁও) পাতৌদি শহরে বড়দিনের অনুষ্ঠানে অন্তত ২০ জন হিন্দুত্ববাদী দল একটি স্কুলে প্রবেশ করে। একজন ঔদ্ধত্ত কণ্ঠে ভাষণ দেন—‘‘আমরা যিশুকে অসম্মান করি না। কিন্তু ভারতীয় সংস্কৃতিকে এরা ধ্বংস করছে। এদের রুখতে আপনারা সাহায্য করুন। সবাই চিৎকার করে বলুন জয় শ্রীরাম, সনাতন ধর্মের জয়।’’
ডিসেম্বরে গুজরাটে স্বয়ং মাদার তেরেসার মিশনারিজ অব চ্যারিটির বিরুদ্ধে জোর করে ধর্মান্তকরণের অভিযোগ আনা হয়। বলা হয়, মিশনারি অব চ্যারিটির একটি আবাসে ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত ধর্মান্তকরণ হয়েছে। প্রায় একই সময়ে একই কারণে মধ্যপ্রদেশের বিদিশা জেলার সেন্ট জোসেফ স্কুলে হামলা চালান হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কর্মীরা। মিশনারিজ এবং সেন্ট যোসেফ স্কুল কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করেছে। গুজরাটের আহমেদাবাদ শহরে ২০ এপ্রিল ইস্টার সানডের গির্জা চলাকালে খ্রিষ্টানদের ওপর হামলা চালায় বজরং দল ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। তারা গির্জায় প্রবেশ করে লাঠি হাতে স্লোগান দিতে দিতে হট্টগোল করে।
জানা গেছে, দক্ষিণ ভারতের বিজেপি শাসিত রাজ্য কর্র্নাটকে সাম্প্রতিকালে ধর্মান্তর বিরোধী বিল পাস হয়েছে। ইতিপূর্বে উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ এবং হিমাচলে এ আইনটি পাস হয়েছে। একই সাথে এই তিন রাজ্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন-অত্যাচার ক্রমান্বয়ে বেড়েছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো মনে করছে। ইভানজেলিক্যাল ফেলোশিপ অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে—চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর মাসের মধ্যে কর্ণাটকে খ্রিষ্টান সম্প্রদায় ৩৯ বার আক্রান্ত হয়েছে।
উত্তর প্রদেশের আলিগড়ে ‘হিন্দু জাগরণ মঞ্চের’ সভাপতি সোনু সবিতা বলেছেন, ‘‘বড়দিন পালনের নামে খ্রিষ্টান সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না। অভিযোগ রয়েছে, খ্রিষ্টান স্কুলগুলোতে, ‘বিপদটা হলো স্কুল কর্তৃপক্ষ বাচ্চাদের স্কুলের ডায়েরিতে লিখে পাঠাচ্ছে তোমাদের সান্তাক্লজের পোশাক, ক্রিসমাস ট্রি, কেক-চকোলেট-টফি এটা সেটা নিয়ে আসতে হবে, নইলে জরিমানা হবে।’’ সোনু সবিতা বলেছেন, ‘‘আর এটা শুধু ক্যাথলিক স্কুলে নয়, প্রায় সব স্কুলেই। তাই আমরা পরিষ্কার বলেছি, খ্রিষ্টান বাচ্চাদের নিয়ে যা খুশি কর—কিন্তু হিন্দু বাচ্চাদের কিছুতেই তোমরা এভাবে জোর করে বড়দিন পালন করাতে পারো না।’’
ভারতে বর্তমানে ধর্মান্তর বিরোধী আইন (Anti-conversion Law), যা অনেক রাজ্যে ‘ধর্ম স্বাধীনতা আইন’ (Freedom of Religion Act) হিসেবে পরিচিত, মূলত জোরপূর্বক বা প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ম পরিবর্তন বন্ধ করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রাজস্থানসহ ১২টিরও বেশি রাজ্যে এই আইন কার্যকর রয়েছে।
এই আইনে প্রধানত যা লেখা রয়েছে—
১. নিষিদ্ধ পদ্ধতি: বলপ্রয়োগ (Force), প্রলোভন (Inducement/Allurement), প্রতারণা (Fraud), ভুল তথ্য প্রদান (Misrepresentation) বা বিয়ে করার উদ্দেশ্যে ধর্মান্তরিত করা দ-নীয় অপরাধ।
২. শাস্তি: অপরাধের ধরন অনুযায়ী ১ থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রয়েছে। রাজস্থানের ২০২৫ সালের নতুন বিলে কিছু ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে।
৩. বিশেষ সুরক্ষা: নারী, শিশু বা তফশিলি জাতি/উপজাতির (SC/ST) সদস্যদের ধর্মান্তরিত করার ক্ষেত্রে সাজার পরিমাণ অনেক বেশি রাখা হয়েছে।
৪. পূর্ব ঘোষণা বা নোটিশ: কেউ ধর্ম পরিবর্তন করতে চাইলে সাধারণত ১ থেকে ২ মাস আগে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের (DM) কাছে লিখিত ঘোষণা দিতে হয়। এটি না করলে ধর্মান্তর অবৈধ বলে গণ্য হতে পারে।
৫. বিয়ের মাধ্যমে রূপান্তর: শুধুমাত্র ধর্মান্তরের উদ্দেশ্যে করা বিয়েকে অনেক রাজ্যে ‘বাতিল’ বা ‘অবৈধ’ ঘোষণা করার বিধান আছে।
৬. প্রমাণের দায়ভার: যিনি ধর্মান্তর করাচ্ছেন (যেমন-কোনো ধর্মগুরু বা অন্য ব্যক্তি), সাধারণত তাকেই প্রমাণ করতে হয় যে ধর্মান্তরটি জোরপূর্বক বা প্রলোভন দেখিয়ে করা হয়নি।
৭. ব্যতিক্রম: ‘ঘর ওয়াপসি’ বা নিজের পূর্বপুরুষের ধর্মে ফিরে আসাকে অনেক রাজ্যে এই আইনের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে।
ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের সংবিধানে কী আছে—
অনুচ্ছেদ ২৫ (১) জনশৃঙ্খলা, সুনীতি ও স্বাস্থ্য এবং এই ভাগের অন্য বিধানাবলীর অধীনে, সকল ব্যক্তির বিবেকের স্বাধীনতার এবং স্বাধীনভাবে ধর্ম স্বীকার, আচরণ ও প্রচার করিবার অধিকার সমভাবে থাকিবে।
(২) এই অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই এরূপ কোন বিদ্যমান বিধির ক্রিয়া প্রভাবিত করিবে না অথবা রাজ্য কর্তৃক এরূপ কোনো বিধি প্রণয়নে অন্তরায় হইবে না, যাহা—
(ক) ধর্মাচরণের সহিত সংশ্লিষ্ট কোনো অর্থনৈতিক, বিত্তীয়, রাজনৈতিক বা অন্য প্রকার ধর্মনিরপেক্ষ কর্মপ্রচেষ্টা প্রনিয়ন্ত্রিত বা সঙ্কুচিত করে;
(খ) সমাজের কল্যাণ ও সংস্কারের অথবা সার্বজনিক প্রকৃতির হিন্দু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ সর্ব শ্রেণীর ও সর্ব বিভাগের হিন্দুগণের জন্য উন্মুক্ত করিবার ব্যবস্থা করে।
মানবাধিকার সংগঠন পিপলস ইউনিয়ন অব সিভিল লিবার্টিজের সভাপতি ওয়াই জে রাজেন্দ্র বলেছেন, বিলটি সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেছে। বলা হয়েছে—‘সকল ব্যক্তির বিবেকের স্বাধীনতা এবং স্বাধীনভাবে ধর্ম স্বীকার, আচরণ ও প্রচার করিবার অধিকার সমভাবে থাকিবে।’’
নিউইয়র্ক টাইমস বলেছে, ‘‘খ্রিষ্টান বিরোধী বাহিনী ভারতের গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছে, গির্জায় হামলা চালাচ্ছে, ধর্মীয় পুস্তক পোড়াচ্ছে, স্কুল আক্রমণ করছে, প্রার্থনাকারী ব্যক্তিদের হেনস্তা করছে। সরকারি নথি ও একাধিক সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে বলা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীন দলের সদস্য ও পুলিশ আক্রমণকারী ব্যক্তিদের সাহায্য করছে।’’ মহারাষ্ট্রের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাডনবিসের স্ত্রী বড়দিনের থিমে আয়োজিত একটি চ্যারিটি ইভেন্ট সাপোর্ট করে সোশ্যাল মিডিয়াতে তোপের মুখে পড়েছিলেন। শুনতে হয়েছে—‘‘আপনি কি গোপনে খ্রিস্টান হয়েছেন না কি?’’ তবে বিজেপি’র মুখপাত্র অনিলা সিং দাবি করেছেন—খ্রিষ্টান সংস্কৃতির ওপর এই ধরনের হামলাকে বিজেপি মোটেও সমর্থন করে না। তার যুক্তি, ‘‘বিজেপির চিন্তাধারা ও মানসিকতায় এই ধরনের দাবির কোনো ঠাঁই নেই—আমরা সব ধর্মের উৎসব মিলেমিশে পালন করাতেই বিশ্বাসী। আমি নিজে ক্যাথলিক কনভেন্ট স্কুলে পড়া সত্ত্বেও নিজেকে সাচ্চা হিন্দু বলেই মনে করি।’’
ক্যাথলিক বিশপস কনফারেন্স অব ইন্ডিয়া (সিবিসিআই) এক বিবৃতিতে বলেছে, শান্তিপূর্ণ ক্যারল গায়ক ও গির্জায় প্রার্থনারত মানুষের ওপর হামলা ভারতের সংবিধানে নিশ্চিত ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ও ভয়হীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত। বিশপ থিওডোর মাসকারেনহাস বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘‘এ দেশে এখন যা ঘটছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটা ঐতিহ্য আছে ভারতে, এবং অতীতে ওডিশার কা-ামাল আর গুজরাটের ডাং এলাকায় কিছু ঘটনা ছাড়া কখনও ভারতে খ্রিষ্টানদের এমন হামলার মুখে পড়তে হয়নি।’’
২০২৪ সালের বড়দিন পূর্বে দেশের ৪০০ জনের অধিক খ্রিষ্টিয়ান নেতা ও ৩০টি চার্চ প্রধানমন্ত্রী মাননীয় নরেন্দ্র মোদি এবং রাষ্ট্রপতি শ্রীমতি দ্রৌপদী মুর্মকে স্মারকলিপি প্রদান করে আশঙ্কার কথা জ্ঞাত করানো হয়েছিল। ভারতের খ্রিষ্টানদের ওপর ধর্মীয় সহিংসতা বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানান হয়। জানিয়েছিলেন—অসহিষ্ণুতার মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছিয়েছে। ভাবনার বিষয় হলো—সরকার খ্রিষ্টানুসারীদের নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো উদ্যোগই গ্রহণ করেনি। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর বিবৃতি দিয়ে হিন্দুদের বড়দিন পালন থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করেছে। এর মাধ্যমে খ্রিষ্টানদের সাংস্কৃতিক প্রকাশকে ‘বিদেশি’ ও ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বারে বড়দিনের সব অনুষ্ঠানকে বাতিল করতে হয়েছে কারণ হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো সেগুলোকে ‘হিন্দু বিরোধী’ বলে দাবি করে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। বর্তমান ভারতের ক্রমবর্ধমান হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি ক্ষুদ্র নমুনা, যেখানে জনজীবনে ধর্মীয় সহনশীলতা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। যে দেশ বৈচিত্র্য ও সভ্যতাগত বহুত্ববাদ নিয়ে গর্ব করে, সেখানে বড়দিনের ছুটি বাতিল থেকে শুরু করে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর শারীরিক আক্রমণ গুরুতর এক কলঙ্ক। ভারতের সংবিধান ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমনাগরিকত্বের নিশ্চয়তা দিলেও বাস্তবে তা রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। পবিত্র হিসেবে গণ্য স্থানগুলো এখন সহিংসতার মুখে নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে—জনপরিসরে খ্রিষ্টানদের উপস্থিতিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।
এখন প্রয়োজন পবিত্র সংবিধানে বর্ণিত ধর্মীয় স্বাধীনতার যে অধিকারগুলো দেওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিত করতে সরকারকে বাধ্য করা। প্রয়োজন আন্তঃধর্মীয় সংলাপ দিকে মনোযোগ দেওয়া, মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া, নিজেদের মধ্যে ঐক্যেবদ্ধ হয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হওয়া। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও দার্শনিক রাধাকৃষ্ণন মনে করতেন, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়, বরং সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন। তিনি মনে করতেন, ধর্মীয় স্বাধীনতা মানুষকে আধ্যাত্মিক পূর্ণতা লাভে সহায়তা করে এবং এটি গণতন্ত্রের একটি মূল ভিত্তি।
তথ্যসূত্র: ১. কালবেলা, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫; ২. দৈনিক সংগ্রাম, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫; ৩. দৈনিক ইত্তেফাক, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫; ৩. দৈনিক প্রথম আলো, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫; ৪. বিবিসি বাংলা, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২৫।






Users Today : 45
Views Today : 50
Total views : 175494
