‘‘ভালো কাজ করে ভালো মানুষ হওয়া যায় না, কিন্তু প্রেমময় ঈশ্বরের কর্তৃক ভালো মানুষ হয়ে ভালো কাজ করা যায়।”
বিখ্যাত উক্তিটি করেছেন ষোড়শ শতাব্দীতে খ্রীষ্ট ধর্মসংস্কারক মার্টিন লুথার, তিনি মানুষ রূপে একজন শয়তান, মাতাল কর্কশ, মিথ্যাবাদী লোক, কিছু লোকের ধারণা এটাই ছিল। প্রোটেস্টান্টদের দৃষ্টিতে লুথার ছিল একজন বিনীত ধর্মাচার্য। যিনি রোমের খ্রীষ্ট শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য স্বয়ং বিধাতা কর্তৃক তুলে আনা একজন দেবদূত। তিনি এককভাবে পাশ্চাত্যের ধর্মবোধ ও সেক্যুলার
জন্ম ও পরিচয়:
মার্টিন লুথার ১৪৮৩ সালের ১০ নভেম্বর স্যাক্সনির এ্যাইসলেবেনের নিম্ন মধ্যবিত্ত এক পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন একজন খনি শ্রমিক। বাবার ইচ্ছা ছিল ছেলেকে আইনজীবী বানাবেন যাতে তাঁর ব্যবসায় সহায়তা করতে পারে। কিন্তু পরবর্তিতে তিনি জার্মানির রিফর্ম চার্চ সংস্কার আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে বির্তকে বিশেষ দক্ষতার কারণে তাঁকে সবাই ফিলসফার বলে ডাকত। তিনি ছিলেন একাধারে একজন ধর্মতত্ত্ববিদ ও লেখক। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম—দ্যা নাইটি-ফাইভ থিসেজ, লুথারস লাজ ক্যাটেকিজস, লুথারস স্নাল ক্যাটেকিজম,অন দ্যা ফ্রিডম অব দ্যা ক্রিশ্চান ।
বিবাহ ও পারিবারিক জীবন
পুরোহিতেরা বিবাহ করতে পারতেন না—এ নিয়মকে তিনি অবজ্ঞার সাথে উড়িয়ে দেবার জন্য ১৫২৫ খ্রীষ্টাব্দে লুথার ক্যাথারিন ভন বোরা নামে একজন প্রাক্তন সন্ন্যাসিনীকে বিবাহ করেন। পাঁচটি সন্তান ছিল।
সন্ন্যাসী জীবন ও অধ্যাত্মিক পরির্বতন
১৫০৫ সালে যখন তাঁর বয়স একুশ মারাত্মক বজ্রপাতসহ প্রচণ্ড ঝড়ের মধ্যে পড়লেন তিনি। আর তিনি মা মরিয়মের কাছে প্রার্থনা করেলেন যদি তিনি এই ঝড় থেকে রেহাই পান তাহলে তিনি সন্ন্যাসী জীবনযাপন করবেন। ঝড় থেকে রক্ষা পেয়ে তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলেন।
যাজক পদে অভিষেক:
এই ঘটনার দুই বছর পর তিনি ক্যাথলিক মণ্ডলীর পুরোহিত হিসাবে অভিষিক্ত হন। পুরোহিত হওয়ার পর তাঁকে উইটেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মশাস্ত্র পড়ানোর জন্য দায়িত্ব দেওয়ানো হয়। শিক্ষাদানের পাশাপাশি তিনি লেখাপড়া চালিয়ে যান। তিনি ধর্মতত্ত্বে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন এবং ধর্ম শাস্ত্রে একজন অধ্যাপক হোন।
স্বগের্র টিকিট বিক্রি:
সে সময় একজন প্রচারক বলেছেন, “একটি আত্মা স্বর্গে যায় তখন যখন দান বাক্সের একটি মুদ্রা শব্দ করে।’’ এসব কথা লুথারের ভালো লাগানি তাই তিনি এসব কথার প্রতিবাদ করনে। আদি ম-লীতে বাপ্তিস্ম নেওয়ার পর পাপ করাটা গুরুতর অপরাধ ধরা হত সে সময়। আর ফল ছিল বহিস্কার। এজন্য দীর্ঘদিন অনুতাপ করা লাগত। অনুতাপের প্রথা থেকে আজ পাপস্বীকার করার নিয়মটি চলে আসছে। স্বর্গের টিকিট বিক্রির কারণ হচ্ছে—রোমে সাধু পিতরের ক্যাথিড্রাল খুবই ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে, অর্থিক সংকট থেকে উদ্ধারের জন্য পোপ টাকার বিনিময়ে কিছু বিশপকে ক্ষমতা প্রদান করেন। এসব বিশপ তাদের টাকা তুলে নেওয়ার জন্য। টাকার বিনিময়ে স্বর্গের টিকিট বিক্রি করতে শুরু করে। কোনো ব্যক্তি অধ্যাত্মিক পরির্বতন না হলেও তিনি টাকার বিনিময়ে এই নিশ্চয়তা নিতে পারত। এমনকি মৃত ব্যক্তির জন্যও এই টিকিট কেনা যেত।
লুথারে ধর্মীয় আন্দোলন:
একদিন লুথার রোমীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের পত্র ৩:২৮ পদ পাঠ করেন, ‘‘কেননা আমাদের মীমাংসা এই যে, ব্যবস্থার কার্য ব্যাতিরেকে বিশ্বাস দ্বারাই মানুষকে ধার্মিক বলে গণিত করা হয়।’’ এখান থেকে তাঁর মানসিক যন্ত্রণার একটি উত্তর খুজেঁ পান। কেননা মানুষের নিজের ক্ষমতায় বা যোগ্যতায় নয় বরং প্রভুর আশীর্বাদে মানুষকে ধার্মিক বলে গণ্য করা হয়, এটি কাজের দ্বারা নয় বরং খোদার ভালোবাসার ফল। এর ফলে তিনি ম-লীতে যাজকদের মধ্যস্থতা অস্বীকার করেন। ১৫১১ সনে তিনি সংঘের কাজে রোমে যান। সেখানে গিয়ে তিনি সামাজিক দুর্নীতি ও পাপাচার দেখে তিনি মর্মাহত হন এবং এগুলোর বিরুদ্ধ তিনি আন্দোলন করেন। ১৫১৭ সালে তিনি তাঁর বিখ্যাত ৯৫ দলিল বা থিসিস লিখে উইটেনবার্গ র্গীজায় টাঙ্গিয়ে দেন।
লুথারে সম্মুখ সমস্যা:
লুত্থার প্রথম চিঠিতে বলেন, অর্থহীন আইন-কানুন সংস্কারের কথা; দ্বিতীয় চিঠিতে ৭টি সাক্রামেন্ট বাইবেল ভিত্তি নয় বরং ২টি পালনে জোর দেন। কেননা বাইবেল ভিত্তিক দুইটি বাপ্তিস্ম ও প্রভুর ভোজ। তৃতীয় চিঠিতে তিনি মণ্ডলীর এক আইন সব জায়গায় পালনীয় আবশ্যিক নয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৫২১ সালে রোমান সম্রাট পঞ্চম চার্লসের সামনে লুথারকে ডাকা হয়। লুথার প্রস্তুত হতে লাগলেন একটা বড়ো ধরনের বির্তকের জন্য। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি বুঝতে পারলেন। তাঁকে ক্ষমা চাওয়ার জন্য ডাকা হয়েছে। লুথারের এই আন্দোলন জার্মানদের জাতীয়তা বোধ জাগিয়ে তোলে। তারা দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় । এর মধ্যে কিছু কৃষক সামন্তরাজদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন ভূ-সম্পত্তির আশায়। পরিস্থিতি অবনতি হলে এই কারণে ১৫২৪-১৫২৫ এক ভয়াভয় যুদ্ধ হয়।
চার্চ বিভক্ত:
মার্টিন লুথার এমন অভিমত প্রকাশ করেন, যেন একটি মহাসভা আহ্বান করা হয়। কিন্তু অন্যদিকে এ কথা বলেন যে, মহাসভা ভুল ও করতে পারতেন। তিনি ১৫১৯ সালে বলেন, ‘‘এ বিষয়ে আমার সন্দেহ নেই যে, পোপ হলেন খ্রীষ্ট শত্রু। ১৫২০ সালের জুন মাসে পোপ অনুশাসনপত্র লুথারের ৪১ দফা ভ্রান্তমত বলে ঘোষণা করে এবং নতি স্বীকার করার জন্য দুই মাস সময় দেওয়া হয়। ১৯২০ সালে ১৯ ডিসেম্বর লুথার আনুষ্ঠানিকভাবে পোপের অনুশান পত্রটি পুড়িয়ে ফেলেন। ফলে ১৫২১ সালে জানুয়ারি মাসে তাঁকে মণ্ডলীচ্যুত করেন।
বাইবেল অনুবাদ ও নতুন দিগন্ত উন্মোচন:
তাঁকে মণ্ডলীচ্যুত করলে তিনি নিজকে গোপন করেন ১৯২১ সালে। এক মিটিং থেকে বাহির হলে লুথার বাড়ির পথ ধরলে পড়ে তাঁকে অপহরণ করা হয় তাঁকে মেরে ফেলার জন্য নয় বরং তাঁর অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ফ্রেডরিক দি ওয়াইজ তাঁর এক বাহিনী আগেই সেখানে মোতায়েন করেছিলেন। যাতে তাঁকে কেউ মেরে ফেলতে না পারে। এক সেনানিবাসে এক পোশাকে ৯ মাস তাঁকে অবরুদ্ধ করা হয়। তাঁর উপর চার্চের ক্রোধ যেন কমে। তিনি সেখানে বসে থেকে মূল গ্রিক ভাষা থেকে জার্মান ভাষায় বাইবেল অনুবাদ করেন। তাঁর আগে আর ৮ জন এই কাজটি করেছিলেন। তাঁদের সাথে লুথারের বাইবেলের মূল পাথর্ক্য, তিনি মাতৃভাষা, সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায়, খনি শ্রমিকদের ভাষায় করেছেন।
সাহিত্যকর্ম ও সফলতা:
সবাই এক কথায় স্বীকার নেয় লুথার দিয়েছে আধুনিকতা। জীবন কালে তিনি জার্মান ভাষাভাষী এলাকায় অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ছিলেন। যখন তিনি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতেন তখন হাজার হাজার মানুষ তাঁকে অভিনন্দন জানাতো। বিখ্যাত ব্রিটিশ ইতিহাস বিদ এন্ড্রু পেটিগ্রি লুথারের সমস্ত লেখা একসাথে এনে বলেছেন, এর সংখ্যা ১২০ ভল্যুম। ষোল শতকের প্রথমার্ধে জামার্নিতে যে বই ছাপানো হয়েছে, তার প্রতি তিনটি বইয়ের একটি লুথারের। লেখার মধ্যে দিয়ে লুথার জার্মান জাতির সাহিত্য গদ্য লেখার সূচনা করেন।
একটি বিশেষ কারণে লুথার তাঁর তিন ছেলেকে নিয়ে তাঁর জন্মস্থান ইসেলবেন যাওয়ার সময় বলেছিলেন, এই যাত্রায় তাঁর মৃত্যু হবে। আর তেমনটিই ঘটেছিল। আততায়ীদের হাতে তাঁর মৃত্যু হয়। সেখান থেকে তাঁর কফিন উইটেনবার্গে নিয়ে যাওয়ার পথে ৪৫টি ঘোড়ার বহর দ্বারা তাঁকে সম্মান দেখানো হয়। যে ক্যাসল চার্চে দরজায় লুথার একদিন ৯৫টি থিসিস পেরাক দিয়ে গেঁথে দিয়েছিলেন। সেই চার্চেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।
তথ্যসূত্র: এই চিহ্ন তুমি জয় লাভ করিবে-বিশপ হেমেন হালবার ও ইন্টারনেট।






Users Today : 36
Views Today : 40
Total views : 175484
