বাংলাদেশে বর্তমান সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৮টি। এর মধ্যে ১৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নেই। সেগুলোতে ভাড়া করা ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জের রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় একটি। স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করলো। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও কর্তৃপক্ষ সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের বুড়ি পোতাজিয়ার চলনবিলের অংশে ১০০ একর জায়গা ভরাট করে স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ করতে চায়। ইতিমধ্যে সকল বন্দোবস্ত শেষের দিকে। কিন্তু এর মাধ্যমে আমরা কি পাচ্ছি? দেশের শিক্ষার মান বৃদ্ধি হচ্ছে নাকি প্রাকৃতিক সম্পদ নষ্ট হচ্ছে?
চলন বিল বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বিল এবং সমৃদ্ধ জলাভূমি। ৬টি জেলার ৪১ উপজেলার ১ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে চলনবিল। চলনবিলে ১০৫ প্রজাতির দেশি মাছ, ২৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৭ প্রকারের উভচর প্রাণী, ৩৪ প্রজাতির পাখি এবং অসংখ্য জলজ উদ্ভিদ রয়েছে।
এ জায়গায় রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনা নিয়ে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে , ১০০ একরের মধ্যে ইতিমধ্যে ৪ একর ভরাট করার কারণে বড়াল নদের পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাকি ৯৬ একর ভরাট করা হলে বর্ষাকালে চলনবিল ও বড়াল নদের পানিপ্রবাহ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

শুষ্ক মৌসুমে জায়গাটি গোচারণ ভূমি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এখানে স্থাপনা হলে গোচারণ ভূমির পরিমাণ কমে আসবে। জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়বে। পরিবেশ ও পানিবিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘‘এভাবে পানিপ্রবাহের স্থানে বাধা তৈরি করে কংক্রিটের স্থাপনা নির্মাণ করা হলে সেটি একদিকে চলনবিলের জলজ বাস্তুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, অন্যদিকে পানির এই শক্তিশালী প্রবাহ বাধা পেলে তা আশপাশের এলাকার জন্য জলাবদ্ধতা ও বন্যার প্রকোপ বাড়িয়ে তুলবে’’।
বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভাব নেই। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়েও মান নেই, শিক্ষারও মান নেই। দেশের বিভাগীয় শহর শেষ করে জেলা উপজেলা শহরে বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ চলছে। অথচ শিক্ষার মান তলানিতে। এভাবে গণহারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে কর্তৃপক্ষ কি শিক্ষার মান বৃদ্ধি করতে চায়? বর্তমান বাংলাদেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তো আছেই। এছাড়া রয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক কলেজ, যেগুলোতে সম্মান স্নাতক পড়ানো হয়। কিন্তু সেই বিশ্ববিদ্যালয় গুলো কতখানি উন্নত! কতখানি শিক্ষার্থীদের উপযোগী! সবাই জানি বাংলাদেশে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেই দিকেই যদি তাকাই তাহলে বুঝা যাবে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় কতটুকু শিক্ষার্থী উপযোগী! এরপর বাংলাদেশের ক্যামব্রিজ খ্যাত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়―ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়েই সমস্যা লেগে আছে। আবাসিক সমস্যা, হলগুলোতে খাবার সমস্যা, অস্বাস্থ্যকর খাবার, নিরাপত্তাহীনতা, ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষক রাজনীতি ইত্যাদি লেগেই আছে। অথচ সেগুলো কর্তৃপক্ষের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। নতুন করে আরো বিশ্ববিদ্যালয় তৈরিতে ব্যস্ত। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তো একাডেমিক ভবন পর্যন্ত নাই। পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্যা সমাধান না করে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করে কি কর্তৃপক্ষ দেশের শিক্ষার মান বাড়াচ্ছে নাকি তলানিতে নিয়ে যাচ্ছে!
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান কীভাবে বৃদ্ধি পাবে?
বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষক রাজনীতি আছে। শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ করেন, শিক্ষার মান স্বাভাবিক ভাবেই বৃদ্ধি পাবে। জরিপ করে দেখেন ক’জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পড়াশোনা করে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে? ক’জন শিক্ষার্থী ক্লাস করতে শ্রেণি কক্ষে যায়! অধিকাংশের বেশিই যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস উপস্থিতির উপর নম্বর পাওয়া যায়, তাই শিক্ষার্থীরা ক্লাসে যায়। এরপর জরিপ করেন ক্লাসে গিয়ে ক’জন শিক্ষার্থী মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করে? খুবই কম সংখ্যক পাবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে দু-একজন শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষক আছে, তাদের ব্যতীত। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস উপস্থিতির উপর নম্বর না থাকলেই কোনো শিক্ষার্থীই ক্লাস করতে যেত না। এর কারণ কি? এর দায়ভার কার? এর দায়ভার কি শিক্ষার্থীদের দিবেন? এর সম্পূর্ণ দায়ভার প্রশাসনের উপর। এর দায়ভার শিক্ষকদের উপর। বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের পাঠদান একদম নিম্নমানের। শিক্ষার্থীরা বিরক্ত। কিন্তু নিরুপায়। বর্তমান শিক্ষকরা তো শিক্ষক হিসেবে ক্যাম্পাসে আসে না, শিক্ষক হিসেবে শ্রেণি কক্ষে আসে না, আসে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হয়ে, আসে রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য। তাহলে সেই শিক্ষক কিভাবে শিক্ষার্থীবান্ধব হয়? কীভাবে শিক্ষার্থীদের মন জয় করতে পারবে? তাহলে কীভাবে একজন শিক্ষার্থী ক্লাসে এসে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে পারবে?
শিক্ষক যে এক ঘণ্টা ক্লাসে থাকেন, শিক্ষার্থীদের বিরক্ত করে দিয়ে যায়। অথচ এই শিক্ষার্থীরা স্কুল জীবনে, কলেজ জীবনে সেরা শিক্ষার্থী ছিল। নিয়মিত ক্লাস যেত, পড়াশোনা করতো। তখন তাদের বিরক্ত লাগেনি। এখন কেন লাগছে?
বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করেন, শিক্ষার মান স্বাভাবিক ভাবেই বৃদ্ধি পাবে। ছাত্র রাজনীতি দেখে আসতেছি কতটা ভয়ংকর! র্যাগিং, গেস্ট রুম, মিছিল, মিটিং, সভা, সেমিনার, অমুক নেতার সভা-তমুক নেতার সভা, মারামারি, হত্যা এসবই। ক্যাম্পাস একদম উত্তপ্ত। এই ক্যাম্পাস কতটুকু শিক্ষার্থী উপযোগী? কতটুকু পড়াশোনার পরিবেশ বজায় রাখে? অথচ এসব নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কর্তৃপক্ষের আছে শুধু জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি।
বিশ্বের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং এ সামনের সারিতে কখনো বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে? পায়নি। কারণ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই যোগ্যতা নেই।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশন (টিএইচই) বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাঙ্কিকিং অনুযায়ী ‘২০২৫ সালে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাঙ্কিংয়ে প্রথম ৮০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই। আবার এশিয়া অঞ্চলে সেরা ৩০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও বাংলাদেশের কোনো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জায়গা হয়নি। আবার, বিশ্বের সব দেশের বিশ্ববিদ্যালয় জরিপে, যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থা কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডসের (কিউএস) র্যাঙ্কিংয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বের সেরা ৬০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ‘কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিংস ২০২৬: টপ গ্লোবাল ইউনিভার্সিটিস’র তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এবারের অবস্থান ৫৮৪তম।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেসকল সমস্যা আছে তা চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে। আবাসন সমস্যা দূর করতে হবে। শিক্ষার্থীদের গবেষণার উপকরণাদিসহ সকল দিক দিয়ে সুযোগ প্রদান করতে হবে। ক্যাম্পাসে রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগে দক্ষতার সহিত করতে হবে। ক্যাম্পাসগুলোকে ডিজিটালাইজেশন করতে হবে। আধুনিকায়ন করতে হবে। জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাস নেই সেগুলো বন্ধ করতে হবে। প্রাকৃতিক সম্পদ নষ্ট করে বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করে শিক্ষার মান তলানিতে নিয়ে যাওয়ার কোনো মানেই হয় না। দিনের পর দিন প্রাকৃতিক সম্পদের উপর হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।
মোজাহিদ হোসেন: কলাম লেখক ও শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।





Users Today : 28
Views Today : 31
Total views : 175475
