ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনসাসনেস’ (ইসকন) নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক আলোচনা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই ইসকনের একাধিক নেতৃবৃন্দ ও অনুসারীদের নামে চট্টগ্রামের কতোয়ালী থানায় রাষ্ট্রদ্রোহীর মামলা করা হয়েছে। তবে ইসকনের দাবি, এটি একটি রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় সংগঠন। ইসকন বাংলাদেশ বরাবরই সকলের প্রতি মানবিক সহমর্মিতা ও ধর্মীয় সহনশীলতার বার্তা প্রচার করেছে এবং জাতীয় সম্প্রীতি ও ঐক্যের পক্ষে কাজ করেছে।’ মূলতঃ সাতটি উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করে চলেছে ইসকন—
১। ভগবত্তত্বজ্ঞান প্রচার করা এবং সমস্ত মানুষকে পারমার্থিক জীবনযাপনে অনুপ্রাণিত হতে শিক্ষা দেওয়া;
২। শ্রীমদ্ভগবদগীতা এবং শ্রীমদ্ভাগবতের অনুসরণে কৃষ্ণভাবনার অমৃত প্রচার করা;
৩। সংস্থার সদস্যদের পরস্পরের কাছে টেনে আনা এবং শ্রীকৃষ্ণের কাছে টেনে আনা;
৪। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রবর্তিত সমবেতভাবে ভগবানের দিব্যনাম কীর্তন করার যে সংকীর্তন আন্দোলন;
৫। সংস্থার সদস্যদের জন্য এবং সমস্ত সমাজের জন্য পবিত্র স্থান নির্মাণ করা;
৬। সরল এবং অত্যন্ত স্বাভাবিক জীবনধারা সম্বন্ধে শিক্ষা দেওয়ার জন্য সদস্যদের পরস্পরের কাছে টেনে আনা;
৭। পূর্বোল্লিখিত উদ্দেশ্যসমূহ সাধন করবার জন্য সাময়িক পত্রিকা, গ্রন্থ ও অন্যান্য লেখা প্রকাশ করা ও বিতরণ করা।

১৯৬৬ সালে সুদুর আমেরিকায় অভয়চারণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ইসকন নিয়ে প্রচ্ছন্ন এবং প্রকাশ্যে অভিযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিককালে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের হাজারী লেনে ‘হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ’র নেতৃবৃন্দরা প্রকাশ্যে বলেছেন, ‘ইসকন একটি ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের লালিত-পালিত জঙ্গি সংগঠন’। আমাদের কাছে মনে হয়েছে, ধর্ম ও দেশকে অনেক সময় আমরা গুলিয়ে ফেলি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে খ্রিষ্টান ধর্মের প্রাধান্য থাকায়, খ্রিষ্টান রাষ্ট্র হিসেবে সমাধিক পরিচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সংগঠনটির পাশে এক সময় দাঁড়িয়েছিল জে স্টিলসন জুডা, হারেভে কক্স, ল্যারি শিন ও টমাস হপকিন্স। ব্যস, আর দরকার নেই—কেননা তারা খ্রিষ্টান; বিশ্বাসগতভাবে কী বিশ্বাস করে সেটি কিন্তু আদৌ আমাদের জানা নেই। আমেরিকা ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী, প্রথম সংশোধনীতে বলা হয়েছিল, ‘সবাই নিজেদের ধর্ম পালনে স্বাধীন এবং রাষ্ট্র কোনো বিশেষ ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করবে না। এখানে তৃতীয় রাষ্ট্রপতি জেফারসনের অভিমত প্রাণিধানযোগ্য, ‘তোমাদের মতো আমিও বিশ্বাস করি, ধর্ম শুধু মানুষ ও তার স্রষ্টার মধ্যে সম্পর্কিত একটি বিষয়। মানুষ তার বিশ্বাস ও প্রার্থনার জন্য শুধু তার স্রষ্টার কাছেই দায়বদ্ধ। আইনের আওতায় শুধু মানুষের কর্মকেই ফেলা যায়, বিশ্বাসকে নয়।’ এটির মধ্যে দিয়েই ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যে বিভেদকারী দেয়াল হয়ে থাকল। পবিত্র বাইবেলে বর্ণিত রয়েছে, ‘যাহা যাহা কৈসরের, কৈসরকে দেও, আর যাহা যাহা ঈশ্বরের, ঈশ্বরকে দেও’। সেক্ষেত্রে খ্রিষ্টান দেশ ও খ্রিষ্টান ধর্মের ওপর দায় চাপিয়ে দিয়ে এদেশে বসবাসরত খ্রিষ্টানুসারীদের প্রতি হেয়জ্ঞান এবং ধর্মকে দোষারোপে তারা হীনম্মন্যতায় ভুগবেন, এটি নিঃসন্দেহে বলা যায়।
রাজপথের জনসমাবেশে দায়িত্বশীল ব্যক্তিগণ যখন খ্রিষ্টান তথা খ্রিষ্টানুসারী, ধর্মের ওপর জঙ্গিত্বের তিলক এঁকে দেন; এটিতে বাংলাদেশে বসবাসরত খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরাও আহত হয়ে থাকেন। বোধ করি, কোনো ধর্মই জঙ্গি তৎপরতাকে সমর্তন করে না। ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, বাহাইসহ সকল ধর্মেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, শান্তি, সৌভ্রাতৃত্ব, পারস্পারিক ভালোবাসা ও সম্মান তথা অসাম্প্রদায়িকতার কথাকেই মানব সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে বদ্ধ পরিকর। ধর্মকে উপজীব্য করে ধর্মের উগ্রবাদীরা বিশ্বের সব প্রান্তেই রয়েছে, এদের প্রতিরোধেও রয়েছে অজস্র মানুষ। যখন প্রকাশ্যে খ্রিষ্ট ধর্মকে অভিযুক্ত করা হয়, সাথে সাথে এদেশে থাকা খ্রিষ্টানুসারীদের দিকে প্রতিবেশী ধর্মের লোকজন আড়চোখে চেয়ে থাকে। তারা মনে করেন, আশেপাশে থাকা খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীরাও জঙ্গি, কিংবা জঙ্গি তৎপরতাকে মদদ দেন! কোনো গির্জাঘর অথবা ক্রুশ চিহ্নের ঘরগুলোকে অজান্তেই মনে হবে, এখানে দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড বা দেশের মানুষের অমঙ্গলের কাজগুলোর আখড়া। আমাদের মধ্যে অযথা পারস্পারিক সন্দেহ, দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের মতো বিষয়গুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। আর এই ভ্রুণের জন্ম রাজনৈতিক দলগুলো থেকে, যা কখনোই কাম্য নয়।
যীশু খ্রিষ্টের নামানুসারে তাঁর অনুসারীদেরকে খ্রিষ্টান অভিধা দেওয়া হয়েছে শত-সহস্র বছর পূর্বে। প্রভু যীশু খ্রিষ্ট তৎকালীন ধর্মীয় উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন, পারস্পারিক ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব, মমত্ববোধ এবং একে-অপরের প্রতি দায়িত্বশীলতার নৈতিক দৃষ্টান্ত। বলেছেন, ‘তোমার প্রতিবাসীকে আপনার মত প্রেম করিবে’। পুনরাবৃত্তি করেছেন, ‘তোমাদের শত্রুদের ভালোবাসো এবং যারা তোমাদের তাড়না করে তাদের জন্য প্রার্থনা কর।’ একধাপ এগিয়ে প্রভু যীশুর খ্রিষ্টের অন্যতম শিষ্য যোহন লিখেছেন, ‘যদি কেহ বলে আমি ঈশ্বরকে প্রেম করি, আর আপন ভ্রাতাকে ঘৃণা করে, সে মিথ্যাবাদী; কেননা যাহাকে দেখিয়াছে, আপনার সেই ভ্রাতাকে যে প্রেম না করে, সে যাঁহাকে দেখে নাই, সেই ঈশ্বরকে প্রেম করিতে পারে না’ (১ম যোহন ৪: ২০)। খ্রিষ্ট থেকে খ্রিষ্টান, যিনি মানব প্রেমের মাহাত্ম্য ঘোষণা করেছেন; সেই নামটি অবশ্যই সম্মানিত ও উচ্চীকৃত। তার অনুসারীরা খ্রিষ্টের আদর্শকে ভুলুণ্ঠিত করতে পারে, সেজন্য যেমন কোটি কোটি খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীকে দায়ী করা যায় না। অনুরূপভাবে ধর্মের দিকেও তজর্নী অঙ্গুলি নির্দেশিত করা কতোটুকু যৌক্তিকতা রয়েছে, সেটি অবশ্যই বিবেচ্য।






Users Today : 18
Views Today : 20
Total views : 175464
