সাম্প্রতিকালে একটি নিউজ আমার দৃষ্টিগোচরে এসেছে, সেটি হলো ফরিদপুরে একদল নামধারী খ্রিষ্টান চক্র বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর নারী-পুরুষকে খ্রিষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করার অভিযোগ উত্থিত হয়েছে। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ও প্রিন্টিং মিডিয়া থেকে জানা যাচ্ছে, ইতিমধ্যেই কয়েকজনকে ধর্মান্তরকরণ করা হয়েছে। ফরিদপুর জেলা সদরের ঈশানগোপালপুর ইউনিয়নের দূর্গাপুর গ্রামের আলমগীর বেপারী (৪৫) ও তার স্ত্রী আম্বিয়া বেগম (৪০), দুই ছেলে সিয়াম বেপারী (২২) ও সোহান বেপারী (১৪) ধর্মান্তরিত হয়েছে; আরো অনেককে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে চক্রটি। চক্রটি জেলার নর্থচ্যানেল ইউনিয়ন, মধুখালী, সদরপুর, চরভদ্রাসন ও ভাঙ্গায় পুরোদমে প্রচার-প্রচারণার কাজ চালাচ্ছে। চক্রটি—প্রথমত অর্থের লোভ-লালসা, বাউল বেশে চলাফেরা ও বাউল গানের আসর, বিশেষ সময় ৪০ দিন উপোস করে এবং অনুসারীদের মাথার চুল ছেঁটে ফেলে ন্যাড়া হোন। এ বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন ও আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। ঘটনার শিকার ষাটোর্ধ তমিজউদ্দিন বেপারী (৬৫) অভিযোগ করে বলেছেন, আলমগীর তার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দুই থেকে তিন বছর আগে খ্রিষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করেছে। তখন তাদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে কয়েকবার সালিশও হয়েছে। পরবর্তীকালে তমিজউদ্দিন বেপারীর নাতনি অর্থাৎ একই গ্রামের আইয়ূব আলীর কিশোরী মেয়ে ওই চক্রের ফাঁদে পড়ে বাড়ি থেকে চলে যায়। পরে তার মা রওশন আরা (৪২) বাদী হয়ে ফরিদপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। আইনজীবী ইমরান হোসেন রিম বলেছেন, ‘‘এ চক্র ইসলাম ধর্ম থেকে ইতিমধ্যে ৫-৭ জনকে খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত করেছে। তারা হতদরিদ্র, গরিব ও অসহায়দের টার্গেট করে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ধর্মান্তরিত করছে। এমন একটি ঘটনার একটি মামলা ফরিদপুরের আদালতে চলমানও রয়েছে। যে মামলার শুনানি আগামী ১০ অক্টোবর ধার্য করা হয়েছে।’’ ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. আব্দুল জলিল বলেছেন, ‘বিষয়টি আমাদের নলেজে আছে। এ সংক্রান্ত একটি মামলাও হয়েছে। আমরা এ সংক্রান্ত আরও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। যে বিষয়টি আমাদের কাছে বিবেচ্য হয়ে উঠেছে, সেটি হলো—তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, রীতি-নীতি ও কার্যকলাপ কোনোটাই খ্রিষ্টান ধর্মের মূল স্রোতের সাথে চলে না। হতে পারে এই গ্রুপগুলো বিভ্রান্তিমূলক/কাল্ট মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সত্যিকারের খ্রিষ্টান ধর্মের মহানুভবতা, যিশু খ্রিষ্টের শিক্ষা, আদর্শ ও মূল্যবোধকে জলাঞ্জলি দিয়ে খ্রিষ্টান ধর্মের বিষয়ে একটি বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে। ফলস্বরূপ সমগ্র বাংলাদেশে খ্রিষ্টান ধর্মের বিষয়ে জনসাধারণের, এমনকি প্রশাসন ও আইনের দৃষ্টিতে গ্রাহ্যণীয় নয়।

বর্ণনায় রয়েছে—
প্রথমত—লোভ লালসা: লোভ লালসা কিংবা ছল চাতুরী দিয়ে সাময়িকভাবে কাউকে আকৃষ্ট কিংবা ধর্মে দীক্ষিত করা যায় কিন্তু সেটি বেশিদিন স্থায়িত্ব লাভ করতে পারে না। অর্থাৎ অস্বীকার নয় কিন্তু কোনো ধর্মের গুডউইলকে নষ্ট করার জন্য এরূপ অভিযোগই যথেষ্ট। যারা লোভী ও অর্থের মোহের পেছনে দৌড়ায় তারা তো ধর্মকে নয় অর্থের লাভের আসায় ধর্ম পরিবর্তনে আকাঙ্খী হয়। ভূঁইফোড় প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিগুলো জায়গা জায়গায় মানুষের ধর্মকে নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে নিজেরা ফায়দা লুটে থাকে। ফরিদপুরের স্থানীয় গির্জার পুরোহিতদের সাথে কথা বলে যেটি ওয়াকিবহাল হয়েছি, সেটি হলো ফরিদপুরের কোনো গির্জা, মিশন কিংবা খ্রিষ্টান পরিচালিত কোনো প্রতিষ্ঠানও এরূপ কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত নন এবং তারা নিজেরাই খ্রিষ্টানদের নামে পরিচালিত উদ্যোগে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। খ্রিষ্টানুসারীরা কখনোই কাউকে লোভ-লালসা বা অর্থের বিনিময়ে ধর্মান্তরিত করে না, আইনগতভাবে যেমন অপরাধ; ধর্মীয়গতভাবেই এটি অন্যায্য এবং ধর্মীয় গ্রহণীয় নয়।
দ্বিতীয়ত—বাউল বেশে চলাফেরা ও বাউল গানের আসর: বাউল বেশে চলাফেরা এটিও খ্রিষ্টান সমাজে দৃশ্যমান নয়। অবশ্য দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ‘সেবক সমিতি’ নামে একটি খ্রিষ্টান সঙ্গীত ও প্রচার দল রয়েছে, এদের কোনো সুনির্দিষ্ট চার্চ নেই; অনেক চার্চের সমন্বয়ে গঠিত সেবক সমিতি। এরা মূলতঃ খ্রিষ্টিয়ান দেহতত্ত্ব গানের মধ্যে দিয়ে যিশু খ্রিষ্টের মহত্ত্বতা, গৌরব ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে থাকেন। প্রভু যীশু খ্রিষ্টকে ছাড়া কোনোভাবেই অন্যকোনো গান আয়োজিত ধর্মীয় সভায় পরিবেশিত হয় না। বাউল বেশে চলাফেরা ও বাউল গানের আসর নিজেরা কখনোই আয়োজন করেন না। সেবক সমিতি নিজেদের উদ্যোগে ধর্মীয় সভা, ধর্মীয় প্রার্থনা সভা, বিশেষ উৎসর্গীকৃত সভা আয়োজন ও উপস্থিত হয়ে থাকেন। ধর্মীয় সঙ্গীতকে বাউল সঙ্গীত হিসেবে কখনোই তুলনীয় নয়। মোটকথা, নব উদ্ভাবিত লোকজন খ্রিষ্টানুসারীদের সুনাম, ধর্মসভা ও প্রার্থনা সঙ্গীতকে অনুসরণ করে এক প্রকার ধর্মীয় বিদ্বেষ সৃষ্টি ও ধর্মের মৌল ভাবনাকে বিকৃত করতে সচেষ্ট হয়েছে।
তৃতীয়ত—মাথার চুল ছেঁটে ফেলে ন্যাড়া: খ্রিষ্টানুসারীদের মধ্যে ক্যাথলিক, এ্যাংলিকান, ব্যাপ্টিষ্ট, লুথারেন, মেথোডিষ্ট, পেণ্টিকষ্টাল প্রভৃতি মতাদর্শের বিশ্বাসী থাকলেও প্রথমবারের মতো শ্রবণ করেছি যে, একদল খ্রিষ্টান মাথার চুল ছেঁটে ফেলে ন্যাড়া হয়ে থাকেন। থিওলজিগত ভিন্নতা থাকলেও প্রভু যিশু খ্রিষ্টকে ঈশ্বরের পুত্র, পবিত্র আত্মা এবং স্রষ্টা ঈশ্বর এই ত্রিত্বের বিষয়ে সাদৃশ্যতা হুবহু রয়েছে। আচার-অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যতা রয়েছে কিন্তু অমিল নেই। আশ্চর্য হয়েছি, এই নামধারী খ্রিষ্টানুসারীরা নারী-পুরুষ উভয়েই মাথার চুল ছেঁটে ফেলে সম্পূর্ণ ন্যাড়া হয়ে থাকেন। খ্রিষ্টান যাজকগণ নিজেদের অভিরুচি অনুযায়ী সাধারণ জীবন যাপনে চুল, দাড়ি, পোশাক-পরিচ্ছেদ পরিধান করেন। তবে কোনো কোনো মতাদর্শের যাজকগণ যাজকীয় পোশাক-আসাক পরিধান করে ধর্মীয় কার্যাদি সম্পাদন করেন, এটি তাদের কাছে আবশ্যিক পালনীয়। এ জাতীয় ভ্রান্তিতা থেকে সর্বশ্রেণীর জনসাধারণকে সজাগ থাকার আহ্বান জানাই।
সাম্প্রতিককালে খ্রিষ্টান ধর্মের নামে দেশি ও বিদেশি ব্যক্তিবর্গ প্রচারে নেমে পড়েছে। যিশু খ্রিষ্টের নামে যেমন কুরুচিপূর্ণ তথ্যাদি প্রচার, বিশ্বাস সম্পর্কেও বিভ্রান্তিমূলক কথাবার্তা উত্থাপন করে সত্যিকারের খ্রিষ্টানুসারীদের সম্পর্কে জনসাধারণ বিতর্কিত মনোভাব ধারণ করছে। আসুন, খ্রিষ্টের স্বার্থেই এরূপ ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে প্রতিহত করি। প্রভু যীশু খ্রিষ্টের সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, ‘‘ভণ্ড ভাববাদীদের থেকে সাবধান। তারা তোমাদের কাছে নিরীহ মেষের ছদ্মবেশে আসে অথচ ভেতরে তারা হিংস্র নেকড়ে বাঘ।’’






Users Today : 3
Views Today : 3
Total views : 175447
