জাতিসংঘ প্রতিটি বছরকে এক একটি বর্ষ হিসেবে ঘোষণার ধারাবাহিকতায় ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দকে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করে। আদিবাসী বর্ষের মূলসুর ছিল—‘আদিবাসী জনগণ : এক নতুন অংশীদারিত্ব’।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৯৪ সালে রেজুলেশন ৪৯/২১৪ গ্রহণ করে ৯ আগস্টকে আদিবাসী দিবস হিসেবে পালনের জন্য সদস্য দেশসমূহকে যথাযোগ্য মর্যাদাসহকারে পালনের জন্য আহ্বান জানায়। বাংলাদেশ সরকার এদেশে আদিবাসীদের অস্তিত্ব অস্বীকার করে আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে আদিবাসী দিবস উদ্যাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেননি; অপরদিকে জাতিসংঘের প্রতিটি দিবসকে যথাযোগ্য মর্যাদায় গুরুত্বসহকারে উদ্যাপন করে থাকে। আমরা গভীরভাবে অবলোকন করেছি যে, বাংলাদেশ মিশনের তৎকালীন ফাস্ট সেক্রেটারি ইকবাল আহমেদ বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই।’
তিনি আরো বলেন, ‘জাতিসংঘের মূল্যবান সময় নষ্ট না করে প্রকৃত আদিবাসীদের জন্য কাজ করা উচিত।’ ইতিপূর্বেও জাতিসংঘের বিশেষ সভাতে সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ইফতেখার আহমেদ চৌধুরীও আদিবাসীদের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছিলেন। ২০০৬ সালের ২৯ শে জুন ১/২ নং কার্যবিবরণীতে নথিভুক্ত মানবাধিকার পরিষদের সুপারিশ, যার মাধ্যমে পরিষদ আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘ ঘোষণাপত্র গ্রহণ করেছিল। ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর ৬১/১৭৮ নং কার্যবিবরণীর মাধ্যমে সাধারণ পরিষদ আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র গ্রহণ করা হয়। এই সময়েও জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের প্রতিনিধি ইশরাত জাহান আহমেদ বলেছিলেন, তাঁর মিশন যেকোনো অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠীর অধিকারের প্রতি সমর্থন করে। বাংলাদেশ প্রধান প্রধান সকল মানবাধিকার চুক্তির প্রতি অনুগত রয়েছে এবং আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকার সমর্থন করে। কিন্তু এই ঘোষণাপত্রে কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে, বিশেষ করে ‘আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী’র সংজ্ঞা নির্ধারিত হয়নি বা সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত হয়নি। অধিকন্তু ঘোষণাপত্রের উপর সকল সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে সর্বসম্মত সমর্থন নেই। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ ভোটদানে বিরত থাকে। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে আসে—আমরা সাঁওতাল, উরাঁও, মুণ্ডা, মাহাতো, মাহালী, কোল, রাজোয়াড়, মুসহড়, গারো, হাজং, তুরী, ইত্যাদি জাতিগোষ্ঠী আমরা কে? আমাদের পরিচয় কী?
ক. আইনগতভাবে আদিবাসীত্ব: প্রজাস্বত্ব আইন জারি হয় ১৮৮৫ খ্রি.। প্রায় চল্লিশ বছর পর এই আইনে সপ্তম অধ্যায়ের সপ্তম ‘ক’ অধ্যায় নামে সংযোজিত হয়; এই সংযোজিত অধ্যায়ে আদিবাসীদের সম্পত্তি হস্তান্তর করার বিষয় সম্পর্কে নিয়ম-নীতি লিপিবদ্ধ হয়। এই অধ্যায়ের শিরোনাম ছিল ‘ ‘Restriction on alienation of Land by Aboriginals’। বর্তমানে স্টেট এ্যাকুইজিশান এ্যান্ড টেন্যান্সি এ্যাক্টের শিারোনামও ঐ একই। বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইনে সপ্তম ‘ক’ অধ্যায়টি সংযোজিত করা হয় ১৯১৮ খ্রি. ২নং বঙ্গীয় আইন (Beng Act II of 1918) দ্বারা। সপ্তম ‘ক’ অধ্যায়টি ১৯১৮ সালে সংযোজিত হলেও বর্তমান পশ্চিম বঙ্গের বীরভূম, বাঁকুড়া ও মেদিনীপুর জেলার সাঁওতালদের ক্ষেত্রে আইনটি মূলত ১৯১৬ সাল থেকে কার্যকর করা হয়েছে। অর্থাৎ ঐ জেলাসমূহের সাঁওতালগণ যদি ১৯১৬ সালের নভেম্বর মাসের প্রথম তারিখে বা তারপর কোনো দলিল সম্পাদন পূর্বক কোনো সম্পত্তি হস্তান্তর করে থাকে তবে তা বাতিল বলে গণ্য হবে। অন্যান্য আদিবাসীগণের ক্ষেত্রে সরকারি প্রজ্ঞাপন মারফর সপ্তম ‘ক’ অধ্যায়ের বিধানসমূহ কার্যকর করার এক বৎসর পূর্ব হতে ঐ আদিবাসীগণ দ্বারা সম্পত্তি হস্তান্তর দলিলের উপর কার্যকর করা হয়েছে। বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কার্যকর ছিল। বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইনের স্থলে স্টেট এ্যাকুইজিশন এ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্ট ১৯৫০ সালে প্রণীত হয় এবং তা ১৯৫১ খ্রি. কার্যকর করা হয়। আদিবাসীদের জন্য বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইনের সপ্তম ‘ক’ অধ্যায়ে যে বিধানাবলী সন্নিবেশিত করা হয়েছিল তার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় স্টেট এ্যাকুইজিশন এ্যান্ড টেন্যান্সি এ্যাক্টের ৯৭ নং ধারায় অক্ষুণ্ন রাখা হয়। স্টেট এ্যাকুইজিশন এ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্টের ৯৭ নং ধারা আদিবাসীগণ কর্তৃক সম্পত্তি হন্তান্তরের উপর বিধি-নিষেধ বহাল রাখা হয়। ৯৭ নং ধারা অনুযায়ী আদিবাসীগণ হলেন—সাঁওতাল, বানিয়া, ভূইয়া, ভূমিজী, ডালু, গারো, গন্দ, হাদি, হাজং, হো, খারিয়া, খারওয়ার, কোচ (ঢাকা বিভাগ), কোরা, মগ (বরিশাল জেলা), মাল ও সুরিয়া পাহাড়িয়া, মেচ, মুণ্ডা, মুণ্ডাই, ওরাঁও এবং তুরী। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম’র মতে, ৪৫টি জাতিগোষ্ঠী এবং অন্যান্য গবেষকদের মতানুযায়ী ৭৫টি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী এদেশে বসবাস করে।
রাজনৈতিক দলের মুখপত্র হিসেবে আপনারা আমাদেরকেই আদিবাসী হিসেবে উল্লেখ করেছেন—
ক.১ তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৩ সালে আদিবাসী বর্ষ উপলক্ষে প্রদত্ত বাণীতে বলেছেন, ‘শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে আদিবাসী জনগণ নানামুখী শোষণ ও বঞ্চনার শিকার। শাসক শ্রেণীর দীর্ঘদিনের সীমাহীন উপেক্ষা আর অবহেলার ফলে তাদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতিও আজ বিলুপ্তির পথে। …বাংলাদেশেও কখনও কখনও বনায়নের নামে, সবুজ বিপ্লবের নামে, প্রচারসর্বস্ব উন্নয়নের নামে আদিবাসীদের উচ্ছেদ, নিজ বাসভূমি থেকে বিতাড়িত। আজও কোথাও কোথাও আদিবাসীদের অনিশ্চিত জীবন কাটাতে হয়। বেঁচে থাকার যে ন্যূনতম মৌলিক অধিকার তা থেকে বঞ্চিত হতে হয়। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং কর্মসংস্থানের ন্যূনতম সুযোগটুকু থেকে তাদের উপেক্ষিত জীবন কাটাতে হয়। মানবিক জীবনযাপন, সৃজনশীল প্রতিভার বিকাশ, মেধা ও শ্রমশক্তি নিয়োগের অধিকার থেকে তাদের দূরে সরিয়ে রাখা হয়। দেশ ও জাতীয় উন্নয়নে তাদের অবদান অবশ্যই গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হবে। এই দেশের যোগ্য নাগরিক হিসেবে মর্যাদার সঙ্গে বসবাসের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে’।
ক.২ ২০০৮ সালের নির্বাচনের পূর্বে জাতির উদ্দেশ্যে নির্বাচনী ভাষণে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর সন্ত্রাস ও বৈষম্যমূলক আচরণের অবসান ঘটনো হবে। ভূমির উপর তাদের অধিকার নিশ্চিত করা হবে। এবং তারা তাদের আচার আচরণ সংস্কৃতি ধর্ম যাতে সহজভাবে পালন করতে পারে সে স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করা হবে’ (সংবাদ ২৯.১২.২০০৮)।
ক.৩ ২০০৯ খ্রি. আদিবাসী দিবস’র বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘…নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রেখে আদিবাসী জনগণ যাতে সবার মতো সমান মর্যাদা ভোগ করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করা আমাদের কতর্ব্য। …জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত আদিবাসী অধিকার ঘোষণাপত্র বাস্তবায়নেও আমরা একযোগে কাজ করতে চাই।’
খ. ২০০৩ খ্রি. তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আদিবাসী দিবস উপলক্ষে এক বাণীতে বলেছিলেন, ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে আমি বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল আদিবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। আমাদের জনগোষ্ঠীর একটি অংশ আদিবাসী। আদিবাসীরাও আজ সকলের মতোই সমান মর্যাদাসম্পন্ন বাংলাদেশের নাগরিক। মুক্তিযুদ্ধে যেমন দেশগঠনেও তেমনি আদিবাসীগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আদিবাসীদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, পরিবেশ, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে আমরা বিভিন্নমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে চলেছি। আদিবাসীদের রয়েছে এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি। এই ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি আমাদের জাতীয় সম্পদ। আমি আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে আমাদের আদিবাসী জনগণের কল্যাণ ও সাফল্য কামনা করি।’
গ. বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সংসদ রাশেদ খান মেনন বলেছেন, ‘সাংবিধানিক স্বীকৃতি না থাকা ও ঐতিহ্যগত ভূমি ও বন অধিকার ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে আসায় বাংলাদেশের আদিবাসীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে’ (সংবাদ ২৩. ৭. ২০১০)। অন্য জায়গায় বলেছেন, ‘সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেলেই তারা এর মাধ্যমে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবে’ (সংবাদ ১০.৮.২০০৯)।
ঘ. বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি সাংসদ হাসানুল হক ইনু বলেছিলেন, ‘আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে জাতীয় সংসদ বিশেষ উদ্যোগ নেবেন’ (প্রথম আলো ৯.৮.২০০৯)।
ঙ. সাম্যবাদী দলের নেতা ও শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়–য়া বলেছেন, ‘আদিবাসীদের অধিকার সাংবিধানিকভাবে দিতে উদ্যোগ নেওয়া হবে’ (প্রথম আলো ১০.৮.২০০৯)।
চ. চারদলীয় জোট সরকারের শাসনামলে (এপ্রিল ৯, ২০০৭) রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ সফর করেন পার্বত্য চট্টগ্রামের নীলগিরি ও আদিবাসী ম্রো এম্পুপাড়া। আদিবাসীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা দেয়া হবে।’
ছ. সাবেক রাষ্ট্রপতি জেনারেল হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ এ বছরের প্রথম দিকে আদিবাসী অধ্যুষিত বৃহত্তর ময়মনসিংহ এলাকা পরিদর্শনকালে আদিবাসীদের সাথে মতবিনিময় করেছেন এবং আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদানে তার দলের কোনো আপত্তি নেই বলে উল্লেখ করেছেন।
সাংগাঠনিকভাবে বা সংগঠন থেকে গৃহীত হয়ে জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে নির্বাচনী ইশতেহারে আদিবাসীদের বিষয় উল্লেখ করে ঘোষণা দিয়েছিলেন—
১. আওয়ামী লীগ ২০০১ খ্রি. ‘পশ্চাৎপদ অঞ্চল ও অনুন্নত সম্প্রদায়’ শিরোনামে উল্লেখ করেছিলেন—ক. ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ১৯৭৫ সালের পর আমাদের সংবিধানে পরিপন্থী বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ইতিমধ্যে তার অবসান ঘটিয়েছে। ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পাদন ও অর্পিত সম্পত্তি আইন বাতিলসহ যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, তার ফলে ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় ও গোত্র নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বজনীন মানবাধিকার। ভবিষ্যতে এই অর্জনসমূহকে আরও সংহত ও বিকশিত করা হবে। খ. দেশের প্রতিটি অঞ্চলের সুষম বিকাশ ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পশ্চাৎপদ অঞ্চলসমূহের উন্নয়ন এবং উপজাতি, আদিবাসী ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের অগ্রগতির জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে। জাতিগত সংখ্যালঘুসহ দেশের সকল নাগরিকের ধর্মীয় আচারবিধি পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে। দেশের সকল নৃ-জাতিগোষ্ঠীর ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতির উন্নয়নে বিশেষ যত্ন নেয়া হবে।
১.ক. আওয়ামী লীগের ২০০৮ খ্রি. নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে, ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, আদিবাসী ও চা বাগানে কর্মরত শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর ওপর সন্ত্রাস, বৈষম্যমূলক আচরণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের চির অবসান, তাদের জীবন, সম্পদ সম্ভ্রম, মানমর্যাদার সুরক্ষা এবং রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সর্বক্ষেত্রে সমান অধিকারের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে। আদিবাসীদের জমি, জলাধার এবং বন এলাকায় সনাতনি অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণসহ ভূমি কমিশন গঠন করা হবে। সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-জাতিগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্যমূলক সকল প্রকার আইন ও অন্যান্য ব্যবস্থার অবসান করা হবে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং আদিবাসীদের জন্য চাকরি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। অনগ্রসর অঞ্চলসমূহের উন্নয়নে বর্ধিত উদ্যোগ, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, আদিবাসী ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের অধিকারের স্বীকৃতি এবং তাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীবনধারার স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণ ও তাদের সুষম উন্নয়নের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে।’
৩. জাতীয় পার্টি (এ) ২০০১ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করেছিল ‘আদিবাসী’ শিরোনাম দিয়ে। ‘আদিবাসী জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ করা হবে।
৪. ১১ দল ২০০১ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘সংখ্যালঘু জাতিসত্তা ও আদিবাসী সমাজ’ ক্যাপসান দিয়ে বলেছিল—‘সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোর স্বকীয়তার পূর্ণাঙ্গ সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হবে।
৪ . বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টির ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়—ক. সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোর স্বকীয়তার পূর্ণাঙ্গ সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা। জাতিসংঘ আদিবাসী অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর প্রদান এবং সেই অনুসারে দৃঢ় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। গ. সকল সংখ্যালঘু জাতিসত্তার স্বার্থ রক্ষা, অধিকার নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহায়তা প্রদান এবং বিকাশের জন্য এ সকল জাতিসত্তার মানুষদের প্রতিনিধিত্ব সংবলিত পৃথক প্রশাসনিক বিভাগ ও আদিবাসী কমিশন প্রতিষ্ঠা করা। শিক্ষা, চাকরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের জন্য বিশেষ কোটার ব্যবস্থা রাখা। ঘ. ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত ‘পার্বত্য চুক্তি’র পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য গঠিত ‘ভূমি কমিশন’ সঠিকভাবে কার্যকর করার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের বাস্তুভিটা ও ভূমির অধিকার ফিরিয়ে দেয়া। ঙ. জাতিগত সংখ্যালঘু ও আদিবাসী সমাজ অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ভূমি ও প্রাণবৈচিত্র্য জীববৈচিত্র্য বিনাশকারী সব ধরনের তৎপরতার অবিলম্বে বন্ধ করা। আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি ও বনের ওপর আদিবাসীদের অধিকার ও অংশীদায়িত্ব নিশ্চিত করতে ভূমি কমিশন গঠন করা। ইকোপার্ক, পর্যটন কেন্দ্র ইত্যাদি গড়ে তোলার সময় আদিবাসীদের ওপর নিপীড়ন, আদিবাসীদের জীবন-জীবিকাকে বিপন্নকরণ, বাস্তুচ্যুতকরণ ইত্যাদি বন্ধ করা। সংখ্যালঘু জাতিসত্তার জনগণের অস্তিত্ব, পরিবেশ, প্রকৃতি ও জীবিকাকে বিপন্ন করে—এমন ধরনের তথাকথিত ‘উন্নয়ন’ প্রকল্প বাস্তবায়ন বন্ধ করা। যেকোনো প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের আগে স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। চ. আলফ্রেড সরেন, পীরেন স্নাল, সত্যবান হাজং, চলেশ রিছিল হত্যাকা-সহ আদিবাসীদের ওপর হত্যা, অত্যাচার, উৎপীড়নের ঘটনার বিচার করা। সমতল ভূমির সাঁওতাল, গারো, হাজং, ওরাঁওসহ সকল সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার নিশ্চিত করতে একটি ‘ভূমি কমিশন’ গঠন করা ও সংশ্লিষ্ট এলাকার খাস জমি বণ্টনে তাদের অগ্রাধিকার দেয়া। এ বিষয়ে ১৯৫০ সালের ভূমিস্বত্ব আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
৫. জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) ২০০১ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করেছিল—ক. মানবাধিকার কমিশন গঠন করে জনগণের মৌলিক অধিকারসমূহের ওপর রাষ্ট্র, সরকার কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনধিকার হস্তক্ষেপ বন্ধ করা হবে। খ. নারী সমাজ, সংখ্যালঘু, আদিবাসীসহ সমাজের দুর্বল জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সকল বৈষম্যমূলক আইন, পদ্ধতি, প্রথা ও আচরণ বিলুপ্ত করা হবে। গ. রাষ্ট্র সরকার ও প্রশাসন সকল জনগোষ্ঠীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে এবং বৈষম্যমূলক কর্মপদ্ধতি বিলুপ্ত করা হবে।
বর্তমান সরকারের উদ্যোগে আদিবাসীদের সম্পৃক্তকরণে চলমান কার্যক্রম—
১. জাতীয় সংসদে আদিবাসী বিষয়ক ককাস গঠন করা হয়েছে।
২. ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য ৫২৬ এবং সমতল অঞ্চলের আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় মাত্র ২০ কোটি টাকা।
৩. পিআরএসপিতে আদিবাসী কথা এবং আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।
৪. শিক্ষানীতিতে সুস্পষ্টভাবে আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।
৫. সাফ গেমস এবং বিশ্বকাপ ক্রিকেটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আদিবাসীদের উপস্থিতি এবং আদিবাসী সংস্কৃতি উপস্থাপন করা হয়েছে।
৬. মহান জাতীয় সংসদে মাননীয় সাংসদবর্গ, মন্ত্রীবর্গ, স্পিকার আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির পথে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
৭. মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, নারী, আদিবাসীদের জন্য বিশেষ বিসিএসের পরিকল্পনা করছে সরকার। জাতীয় সংসদে সাধনা হালদারের প্রশ্নের জবাবে সংসদকাজে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এ কথা জানান। (প্রথম আলো ৪.৩.২০১১)।
৮. পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় আদিবাসী ছাত্র-ছাত্রীর পাস নম্বর কমিয়ে মোট নম্বরের ৩৫ শতাংশ করার সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি (প্রথম আলো ২.৩.২০১১)
৯. সরকার সমতলের আদিবাসীদের জন্য একটি আলাদা ভূমি কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে (প্রথম আলো ৩১.৩.২০১১)।
স্বাধীন বাংলাদেশে ২০১১ সালের ৫ই জুন পর্যন্ত অর্থাৎ পঞ্চদশ সংশোধনী পর্যন্ত আমরা আদিবাসী হিসেবেই চিহ্নিত, আখ্যায়িত এবং আইন দ্বারা শাসিত হয়েছি। তৎকালীন এবং বর্তমান মহাজোট সরকারই সেদিন আদিবাসীদের অধিকার, দাবি দাওয়া নিয়ে সামনের কাতারে থেকে সামিল হয়েছিলেন। সেদিন পর্যন্ত আমরা ছিলাম আদিবাসী, কিন্তু সংবিধান সংশোধনীর পরই হয়ে গেলাম নৃ-গোষ্ঠী, উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা কিংবা অন্যন্য জনগোষ্ঠী। তবে আশ্চার্যের বিষয় হচ্ছে কী, আজ পর্যন্ত এই শব্দগুলোর কোনো সঠিক সংজ্ঞা আমরা পায়নি। আমি তো সেই ব্যক্তিই, সেই মনমানসিকতা, চিন্তা-চেতনা এবং স্বভাবের অধিকারী। শরীরের পোশাক বদলিয়ে তো আর মনকে বদলানো যায় না। আমরা তো মনে প্রাণে আদিবাসী, আদিবাসী শব্দটিই আমাদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছে।’ মহান মুক্তিযুদ্ধের বীরমুক্তিযোদ্ধা কাকা দাসু মুরমুও আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, সরকার বদলে গেলেই কি আমাদের নাম বদলে যাবে? আগামীতে আরো নতুন সরকার যদি আসে; তারা যদি আবারো দেশের পবিত্র সংবিধান সংশোধন করেন এবং নামটি জংলী, ময়লা কিংবা জনগোষ্ঠী হিসেবে সাঁতাল, ধাঙ্গড়, বুনো নামে অভিহিত করে, সেক্ষেত্রে আমাদের প্রকৃত পরিচয় কী বদলে যাবে! সাঁওতাল কী সাঁতাল হয়ে যাবে? সত্যিই এটির সঠিক জবাব আমার জানা নেই।
মিথুশিলাক মুরমু : আদিবাসী গবেষক ও লেখক।





Users Today : 54
Views Today : 65
Total views : 177950
