সুপ্তির বয়স যখন চার বছর তখন ওর মা মাত্র তিনদিনের জ্বরেই মারা যায়। দু-বছরের মেয়েকে নিয়ে রথীন বাবু তখন দিশেহারা। রথীন বাবু মিরপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। আশপাশে তার আত্মীয়-পরিজন কেউ ছিল না। চাকরিসূত্রেই রথীন দাস মিরপুরে বসবাস করতেন। তার গ্রামের বাড়ি বরিশালে। স্ত্রী নীতুর ইচ্ছাতেই মিরপুরে একটা একতলা বাড়ি কিনে বসবাস শুরু করেন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর মেয়ে সুপ্তিকে নিয়েই শুরু হয় তার নতুন জীবন। আত্মীয়, বন্ধু সবাই বলেছিল দ্বিতীয় বিয়ে করার জন্য। কিন্তু রথীন তার মেয়ের কথা ভেবে আর বিয়ে করেননি। রথীন যখন স্কুলে যেতেন তখন মেয়েকে কাজের মহিলার কাছে রেখে যেতেন। এভাবেই বড়ো হতে থাকে সুপ্তি। বাবা ও মেয়ে একে অপরকে জড়িয়ে তারা বেঁচে ছিল। সুপ্তির যখন পাঁচ বছর বয়স তখন একদিন তার খুব জ্বর। রথীন বাবু দিন-রাত এক করে মেয়ের সেবা করেছিলেন। মাত্র তিন দিনের জ্বরে তার স্ত্রী মারা যায়। এজন্য সুপ্তির জ্বর হলেই তার বাবা অস্থির হয়ে যেতেন।
মিরপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করে সুপ্তি কলেজে ভর্তি হয়। রথীন বাবুর খুব ইচ্ছা ছিল মেয়ে ডাক্তার হবে। সুপ্তি সরকারি মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পেল না। তার বাবা চাইলেন, বেসরকারি মেডিক্যালে পড়াতে। কিন্তু সুপ্তি রাজি হয়নি। ওর ইচ্ছা ছিল নিজের যোগ্যতায় কিছু করার। সুপ্তি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি অনুষদে ভর্তি হয়। বাড়ি থেকে এতদূরে মেয়েকে পাঠানোর ইচ্ছা তার বাবার ছিল না, কিন্তু মেয়ের জেদের কারণে অবশেষে রথীন বাবু রজি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকে বেশ আনন্দেই কাটছিল সুপ্তির দিন। পনের দিন পর পর তার বাবা এসে দেখে যেত। অকস্মাৎ ছন্দপতন ঘটে গেল। সুপ্তি তখন অনার্স ফাইন্যাল ইয়ার পরীক্ষা দিয়েছে। পরীক্ষা শেষ হলেই তার বাবার আসার কথা ছিল। সেদিন ছিল বুধবার। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরই সুপ্তি ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছে। সারাদিন অপেক্ষা করার পরও তার বাবার খবর নেই। রাত ১০ টায় পুলিশ স্টেশন থেকে ফোন এলো, বাবা টাঙ্গাইলে রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছেন। বাবার মৃতদেহ নিয়ে রাতেই সুপ্তি মিরপুরে চলে গেল। বাবার শ্রাদ্ধের পর সুপ্তি আবার ক্যাম্পাসে ফিরে এলো। সুপ্তির জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেছে। সুপ্তির তখন কিছুই মনে থাকত না। ঘুম থেকে ওঠার পর প্রায় দিনই তার রুমমেটরা দেখত বিছানায় বসে আছে, সারারাত ঘুমাত না। কেউ জোর করে ক্যান্টিনে নিয়ে না গেলে তার খাওয়া হতো না। বেশ কয়েকবার সে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছে। সেদিন বিকালে সুপ্তি হল থেকে বের হয়ে কে আর মার্কেটের পেছনের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রেললাইনের ওপর দিয়ে হাঁটতে থাকে। পেছনে যে ট্রেন আসছে সেদিকে সুপ্তির কোনো খেয়ালই ছিল না। হঠাৎ করেই একটি ছেলে দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে রেললাইনের ওপর থেকে পাশে লাফ দেয়। ততক্ষণে সুপ্তি জ্ঞান হারিয়েছে। পারিজাত নামের সেই ছেলেটি চোখে মুখে জল দিয়ে সুপ্তির জ্ঞান ফেরায়। পারিজাত সুপ্তির দুই বছরের সিনিয়র। পারিজাতও কৃষি অর্থনীতি অনুষদ থেকেই অনার্স, মাস্টার্স শেষ করেছে। এজন্য সে আগে থেকেই সুপ্তিকে চিনত এবং মনে মনে সুপ্তিকে ভালোবাসত। কিন্তু সুপ্তি পারিজাতকে চিনত না। সেদিন জ্ঞান ফেরার পর পারিজাত যখন সুপ্তিকে জিজ্ঞেস করে, কেন সে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিল তখন সুপ্তি সব কথা বলে। সুপ্তি চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। তার বহুদিনের কষ্ট সে উজার করে দেয় পারিজাতের কাছে। পারিজাত সেদিন সুপ্তিকে কথা দেয় যে সুপ্তির পাশে সে সবসময়ই থাকবে। এরপর থেকেই পারিজাতের চেষ্টায় সুপ্তি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে।
মাস্টার্স শেষ হওয়ার পরই সুপ্তি ব্যাংকে চাকরি পেয়ে যায়। পারিজাত তখনও ভালো কোনো চাকরি পায়নি। একটা পেস্টিসাইড কোম্পানিতে স্বল্প বেতনে চাকরি করছে। পারিজাতের পারিবারিক অবস্থা ভালো ছিল না। তার বপা বোন ছিল, ছোটো ভাই ছিল। সংসারের পুরো দায়িত্ব ছিল পারিজাতের ওপর। এজন্য সুপ্তিকে বিয়ে করার ইচ্ছা থাকলেও পারিজাত মুখ ফুটে বলতে পারেনি। সুপ্তি বলেছিল, আমার তো আর নিজের বলতে কেউ নেই। এখন তোমার পরিবার তো আমারও পরিবার তাই তাদের প্রতি আমারও কর্তব্য আছে। এরপরে তারা দুজনে বিয়ে করে। বিয়ের চার মাস পর পারিজাত বিসিএস সমবায় ক্যাডারে চাকরি পায়। পারিজাতের দিদি পল্লবীর বিয়ে ঠিক হয়। তখন পারিজাত খুব চিন্তার মধ্যে পড়ে। তার নতুন চাকরি। কীভাবে সবটা হবে বুঝতে পারে না। সুপ্তি তার জমানো টাকা এবং গহনা দিয়েই পল্লবীর বিয়ে দেয়। খুব আনন্দেই কাটছিল তাদের সংসার। বিয়ের তিন বছর হয়ে গেছে পারিজাতের বাবা-মা প্রতিনিয়ত সুপ্তিকে কথা শোনাতো কেন তার বাচ্চা হয় না। পারিজাত চুপচাপ শুনত কিন্তু কোনো প্রতিবাদ করত না। সুপ্তি নীরবে চোখের জল ফেলত। বেশ কিছুদিন যাবত রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে পারিজাতকে বিছানায় দেখা যেত না। গভীর রাতে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে কথা বলত। সুপ্তি ভাবত হয়ত, বন্ধুদের সাথে কথা বলছে। পারিজাতকে সন্দেহ করার কথা কোনোদিনও তার মনে আসেনি। একদিন সুপ্তির কলিগ অনিতা দিদি বলেছিল, পারিজাতকে একটা মেয়ের হাত ধরে ধানম-ি লেকের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে দেখেছে। সুপ্তি কথাটা শুনে হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। বলেছে, হাত ধরে হেঁটেছে তো তাতে কী হয়েছে? অনিতা বলেছিল, ‘সুপ্তি এভাবে অন্ধের মতো কাউকে বিশ্বাস করো না’। সুপ্তি মনে মনে ভাবতো যে পারিজাতের জন্য সে একটা নতুন জীবন পেয়েছে। তাই সে কোনোভাবেই তাকে ঠকাতে পারবে না। দুইদিনের জন্য পারিজাত চট্টগ্রাম গিয়েছিল,বলেছিল অফিসের কাজে যাচ্ছে। এর মধ্যে পারিজাতের অফিসের কলিগ রুম্মন ভাই সুপ্তিকে ফোন করল, সুপ্তির শরীর কেমন আছে জানার জন্য। শুনে সুপ্তি অবাক হয়ে গেল যে, পারিজাত অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে সুপ্তির অসুস্থতার কথা বলে। এই প্রথমবার সুপ্তির মন ছ্যাঁত করে উঠলো। মনকে বুঝাল, নিশ্চয়ই পারিজাতের কোনো সমস্যা হয়েছে। দুইদিন পর পারিজাত ফিরে এল গভীর রাতে। এসে সুপ্তিকে বলল, আমাদের আর একসাথে থাকা চলবে না। আমি শ্রীমাকে ভালোবাসি। শ্রীমার আগের হাজব্যান্ড মারা গেছেন, তার একটি মেয়ে আছে। সুপ্তি সেদিন আর কোনো প্রশ্ন করেনি। নীরবে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। ডিভোর্সের পর সুপ্তি বদলি হয়ে মিরপুরে চলে আসে।
এভাবেই একাকী কাটছিল তার জীবন। হঠাৎই অফিসের কাজে ঢাকা গিয়েছে। ঢাকা কলেজের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় চোখে পড়লো, এক ভদ্রলোক পাগলের মতো বিড়বিড় করছে। একা একা কখনো হাসছে, আবার কখনো কাদছে। লোকটিকে দেখে সুপ্তি চিনতে পারল, এই তার পারিজাত। সুপ্তি কথা বলার চেষ্টা করল কিন্তু পারিজাত তাকে চিনতে পারল না। এসময় পারিজাতের ছোটো ভাই পিয়াস এসে পারিজাতকে বাড়িতে নিয়ে গেল। পিয়াসের কাছ থেকে সুপ্তি সবটাই জানতে পারল। তাদের ডিভোর্সের পর শ্রীমা আস্তে আস্তে পারিজাতের সব টাকা নিজের কাছে নিয়ে নেয়। শ্রীমা শর্ত দিয়েছিল যে বিয়ের আগে পারিজাতের গ্রামের বাড়িটা তার নামে লিখে দিতে হবে। পারিজাত রাজি হয়নি। তাই বিয়েটা হয়নি। পারিজাত পরে জানতে পারে, শ্রীমার একাধিক ছেলের সাথে শারীরিক সম্পর্ক আছে। এসব জানার পর থেকে পারিজাত পাগল হয়ে গেছে। সুপ্তি পারিজাতকে নিয়ে মিরপুর চলে যায়। তার সেবা এবং ভালোবাসা দিয়ে পারিজাতকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনে। একদিন পারিজাত তাকে নতুন জীবন দিয়েছিল। এবার সুপ্তি পারিজাতকে নতুন জীবন দেয়। এতদিনে তার পারিজাতের কাছে থাকা ঋণ শোধ হলো।





Users Today : 67
Views Today : 68
Total views : 177471
