১৯৭৩ সাল থেকে দেশে বীমা কার্যক্রম শুরু হয়। এখন বিভিন্ন ধরনের বীমার আওতায় আছে দুই কোটিরও কম মানুষ। এত দীর্ঘ বছর পরও বীমার আওতায় এত কম মানুষ আসার কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বীমা কোম্পানিগুলোর প্রতি মানুষের চরম অনাস্থার কারণে হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সাধারণ বীমা ও জীবন বীমা কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শুরু হওয়া বীমা খাতে এখন সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে আশিটি কোম্পানি সক্রিয় আছে। এর মধ্যে জীবন বীমা নিয়ে কাজ করা কোম্পানির সংখ্যা ৩৫টি আর সাধারণ বীমা নিয়ে কাজ করে আরও ৪৬টি প্রতিষ্ঠান।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন দীর্ঘকাল সরকার গুরুত্ব না দেয়ায়, সঠিক বীমা এজেন্ট তৈরি না হওয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে গ্রাহকরা এজেন্টদের প্রতারণার শিকার হওয়ায় বীমা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে যা এ শিল্পের বিকাশে অন্যতম বাধা হিসেবে কাজ করছে।
মূলত বীমা কোম্পানিগুলো গ্রাহক সংগ্রহ ও তাদের কাছ থেকে প্রিমিয়াম আদায়ের কাজটি এজেন্টদের মাধ্যমেই করে থাকে। বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স এসোসিয়েশন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইনস্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি উভয়ই যদিও বলছে বীমা নিয়ে নতুন একটি আইন হয়েছে এবং এরপর বীমা খাতে শৃঙ্খলা আসতে শুরু করেছে।
কিছু ক্ষেত্রে কোম্পানি ও এজেন্টের লোভের শিকার হয় গ্রাহকরা
শেখ কবির হোসেন, সভাপতি ইনস্যুরেন্স এসোসিয়েশন।
পরিস্থিতি অনেক পাল্টেছে। ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। তবে হ্যাঁ গ্রাহকদের বীমা সম্পর্কে সঠিক না জানার সুযোগে কিছু কোম্পানির সুযোগ গ্রহণের প্রবণতার জন্য অনেকের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা আছে। আশা করছি সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তাতে এগুলো সামনে কমে আসবে। বীমা খাতের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এসব বিষয়ে দেখভালের জন্য একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন করেছে সরকার কিন্তু সেখানে লোকবল এত কম যে তাদের সেই সামর্থ্যই গড়ে ওঠেনি। কিছু ক্ষেত্রে কোম্পানি ও এজেন্টের লোভের শিকার হয় গ্রাহকরা।
এখন নিয়ম পরিবর্তন করেছে সরকার। এখন প্রথম বছরে এজেন্টরা যে কমিশন পাবেন, তার ১০ শতাংশ কেটে রাখা হবে। এই ১০ শতাংশ পাবেন তারা দ্বিতীয় বছরের কমিশনের সঙ্গে। এটা করায় দ্বিতীয় বছরে গ্রাহকদের ধরে রাখার ব্যাপারে এজেন্টদের মনোযোগ বেড়েছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এর ভালো ফল পাওয়া যাবে।
বীমা নিয়ে যত অভিযোগ
বীমা হলো নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে জীবন, সম্পদ বা মালামালের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি কোনো প্রতিষ্ঠানকে স্থানান্তর করা এবং এর মাধ্যমে ব্যক্তি বা বীমা প্রতিষ্ঠান অর্থের বিনিময়ে মক্কেলের আংশিক বা সমস্ত সম্ভাব্য ঝুঁকি গ্রহণ করে থাকে।
কোনো কোনো বীমার ক্ষেত্রে এটি এক ধরনের বিনিয়োগও, অর্থাৎ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার কথা ভেবে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বা প্রিমিয়াম জমা রাখা হবে যা গ্রাহক নির্দিষ্ট মেয়াদের পর ফেরত পাবে। আর এ সময়ের মধ্যে তিনি অসুস্থ বা মৃত্যুবরণ করলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি চুক্তি অনুযায়ী সহায়তা দেবে।
বাংলাদেশে সাধারণত দুই ধরনের বীমা হয়-১. জীবন বীমা এবং ২. সাধারণ বীমা। জীবন বীমায় একজন ব্যক্তি নিজের বা পরিবারের কোন সদস্যের জীবন বীমা করাতে পারেন।
এতে বীমাকারী ব্যক্তির মৃত্যুর পর পরিবার অথবা নমিনি করা ব্যক্তিকে বীমাকৃত অর্থের পুরোটাই প্রদান করা হবে।
বীমা নিয়ে সাধারণ জনগণ কী ভাবছে
শারমিন সুলতানা, বেসরকারি চাকরিজীবী।
আমার কাছে প্রায়ই এজেন্টরা আসেন বীমা করাতে, কিন্তু আমার এতে আস্থা নেই। বীমা ব্যাপারটাই আমার কাছে কেমন যেন মনে হয়। টাকাটা কাকে দিচ্ছি ও আসলেই এ টাকা আর ফেরত পাবো কিনা এটি আমি জানি না। তাই ব্যাংকে ডিপিএস করি কিন্তু বীমা করিনি।
খাদিজা বেগম, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত।
আমার স্বামী কয়েক বছর বীমা করেছিলেন কিন্তু পরে জমা দেয়া টাকাটাই আর ফেরত পাননি। এরপর থেকে আমাদের বীমার প্রতি আস্থা একদম চলে গেছে।
বিমা অধিদপ্তর বিলুপ্ত করে সরকার ২০১১ সালে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (আইডিআরএ) গঠন করেছিল। কিন্তু গত এগারো বছরেও প্রতিষ্ঠানটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি। যদিও এর কর্মকর্তারা বলেছেন, তারা এখন সরকারি বীমা কোম্পানিগুলোর অটোমেশন করাতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় কাজ করছেন। তবে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এ প্রক্রিয়ায় বেসরকারি খাতকে রাখা না হওয়ায় এর খুবি বেশি সুফল সাধারণ মানুষ পাবে না।
মেয়াদ শেষে টাকা না পাওয়া বা পলিসি বাতিল হয় কেন
মেয়াদ শেষে টাকা না পাওয়া বা পলিসি বাতিল হওয়ার অনেক কারণই আছে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে এজেন্টরা বীমা করার সময় গ্রাহকের কাছ থেকে বিষয়গুলি লুকিয়ে রাখার বা অস্পষ্টতা রাখার চেষ্টা করেন। ফলে গ্রাহকের অসচেতনতাসহ বিভিন্ন আইন-কানুনের ফাঁক গলে মেয়াদ শেষে টাকা না পাওয়া বা পলিসি বাতিল হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।
পলিসি চলমান না রাখলে বা প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি অনুযায়ী নিয়মিত প্রিমিয়াম পরিশোধ না করলে পলিসি আর কার্যকর থাকে না
জাহিদুল ইসলাম, কর্মকর্তা, মেটলাইফ।
পলিসি চলমান না রাখলে বা প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি অনুযায়ী নিয়মিত প্রিমিয়াম পরিশোধ না করলে পলিসি আর কার্যকর থাকে না। অনেক গ্রাহক নিয়মিত প্রিমিয়াম দেন না। তখন পলিসি অকার্যকর হয়ে পড়ে। বা অনিয়মিত দেয়ার কারণেও অনেক সময় মেয়াদ শেষে টাকা পাওয়া যায় না। আবার বীমার নিয়ম অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিয়মিত প্রিমিয়াম না দিলে তখন গ্রাহক যত টাকা জমা দিয়েছেন তার চেয়ে কম টাকা ফেরত পান। এসব বীমার নিয়ম যা বিশ্বজুড়েই আছে। এখানে সমস্যা হলো এজেন্টরা এসব বিষয় অনেক সময় গ্রাহককে বলেন না। আবার গ্রাহকরাও অনেকে সব জানার চেষ্টা না করে গ্রাহক হয়ে যান।
এজেন্টরা গ্রাহককে কেন বিস্তারিত বলেন না
অনেক এজেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ যে তারা গ্রাহককে আগে থেকে সবকিছু বলেন না বলে নিয়মিত প্রিমিয়াম না দিলে যে ক্ষতি হতে পারে তা গ্রাহকের জানা থাকে না। এতদিন এজেন্টরা গ্রাহকের প্রথম কিস্তি থেকেই তার কমিশন নিয়ে নিতেন। ফলে পরবর্তী কিস্তিগুলো ঠিক মতো গ্রাহক দিচ্ছে কিনা সেটি তারা আর দেখভাল আগ্রহী হতেন না। আবার যেহেতু কিস্তি চলমান না রাখলে পলিসি বাতিল হয়ে যায় তাই কোনো কোনো কোম্পানিও সে সুযোগ নিয়ে যারা দ্বিতীয় বা পরবর্তীতে কিস্তি ঠিক মতো না দেয় তাদের পলিসি বাতিল করে অর্থ হাতিয়ে নিতো।
পলিসি ল্যাপস হয়ে বাতিল হলে সেই পলিসির দায় আর কোম্পানির থাকে না
সৈয়দ আব্দুল হামিদ
বীমা বিষয়ে গবেষক ও শিক্ষক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইন্সটিটিউট, ঢাবি।
কোনো গ্রাহক পলিসি চলমান না রাখলে কোম্পানির লাভ, কারণ পলিসি ল্যাপস হয়ে বাতিল হলে সেই পলিসির দায় আর কোম্পানির থাকে না। ক্লায়েন্টরাও সচেতন না। এজেন্টরা নক না করলে অনেকে নিয়মিত প্রিমিয়াম দিতে চান না। ফলে পুরোটাই কোম্পানির লাভ। এখনি দেশের অন্তত দুই কোটি মানুষকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনা যায়। দেশে এখন সাড়ে সতের কোটি মোবাইল ফোন আছে এবং মাসে দশ টাকা করে কেটে নিলে বছরে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা আসবে যা দিয়ে সহজেই ক্যান্সার, কিডনি ও হার্টের মতো বড়ো রোগের চিকিৎসার জন্য এককালীন ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ সহায়তা দেয়া সম্ভব হবে।
মোবাইল অপারেটররা সরকারি সংস্থাকে টাকাটা দিবে। আবার ব্যাংকে যাদের অ্যাকাউন্ট আছে এমন শিক্ষার্থী, গার্মেন্টস কর্মী, সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী ছাড়াও আনুষ্ঠানিক খাতে আরও যে ৫০ লাখের মতো কর্মী আছে তাদের এ বীমার আওতায় সম্ভব মাসে মাত্র দশ টাকা প্রিমিয়াম নিয়েই।
তবে বীমার ক্ষেত্রে গ্রাহককে সচেতন হতে হবে এবং তাদের জেনে বুঝে ভালো প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বীমা অর্থ জমা দিতে হবে। নিজের দরকার হবে না বলে অনেকে স্বাস্থ্যবীমা করাতে চান না যা একটি ভুল চিন্তা। স্বাস্থ্য বীমায় সবাই টাকা পেলে তো কোম্পানি চলবে না। তবে সবাই বীমাটি করলে যার দরকার হবে সে প্রয়োজনের সময় অর্থ সহায়তা পেতে পারে।
সার্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা চালু কতটা সম্ভব?
সৈয়দ আব্দুল হামিদ এবং শেখ কবির হোসেন দুজনেই বলছেন সরকার নীতি গ্রহণ করলে এটি খুব সহজেই করা যায়। উভয়েই বলছেন নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হবে, আর এগিয়ে আসতে কোম্পানিগুলোকে।
প্রতারণার শিকার না হতে কোন বিষয়গুলো খেয়াল করতে হবে
বীমা বিশেষজ্ঞদের মতে বীমা করার আগে গ্রাহককে বেশ কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। এগুলো হলো:
● বীমা করার আগে সংশ্লিষ্ট বীমার শর্তাদি দেখে, জেনে এবং বুঝে নিতে হবে।
● প্রিমিয়াম জমা দেয়ার নিয়মাবলী এবং সময়সীমা পার হয়ে গেলে কী করণীয় ভালো করে জেনে নিতে হবে।
● মেয়াদ পূর্তির পর ঠিক কত টাকা এবং কতদিনের মধ্যে সে প্রতিশ্রুত অর্থ পাওয়া যাবে, তা নিশ্চিতভাবে জেনে নিতে হবে।
● মেয়াদ পূর্তির পর যথাসময়ে প্রতিশ্রুত অর্থ পাওয়া না গেলে গ্রাহকের কী আইনি সুরক্ষা থাকছে সেটা জেনে নিতে হবে।
সাধারণ জনগণ ভবিষ্যতের কথা ভেবেই বীমা করে থাকে। কিন্তু তাদের নিজেদের অসচেতনতা ও কিছু কিছু বীমা কোম্পানি ও তাদের এজেন্টদের চতুরতা, লোভের কারণে এখনও পর্যন্ত বীমার প্রতি মানুষের আস্থা সেভাবে গড়ে ওঠেনি। অনেকে প্রতারণারও শিকার হয়েছে। এজন্য গ্রাহকদের বীমা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণার পাশাপাশি সরকারেরও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন আছে। সরকার ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে সবার জন্য স্বাস্থ্য বীমা চালু করার। আর তা করতে হলে সমগ্র বীমা ব্যবস্থাকেই একটা সুশৃঙ্খল পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনতে হবে।
নাজিম উদদীন, বিশষে প্রতিবেদক।





Users Today : 13
Views Today : 15
Total views : 175519
