পৃথিবীর বয়স ৪৫০ কোটি বছরের মতো। স্বাভাবিক নিয়মে পৃথিবীর আরো ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি বছর টিকে থাকার কথা। সে সময় নাগাদ সূর্য তার সব হাইড্রোজেন জ¦ালানি নিঃশেষ করে জ্বেলে প্রসারিত হবে এবং পৃথিবীসহ তার চারপাশের সবকিছু ভস্মীভূত করে দেবে, বিজ্ঞানীদের তাই ধারণা। অন্যদিকে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র পৃথিবীকে যে কোনো সময়েই ধ্বংস করে দিতে পারে। এই দুই চরম পরিণতির মাঝে রয়েছে পৃথিবীর আয়ু, যা কিনা মানুষের কর্মকাণ্ডের উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। পৃথিবী পৃষ্ঠের গড় উষ্ণতা বাড়ছে, পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এক সঙ্কটজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে সকল মানুষ। শতসহস্র বছর ধরেই পৃথিবীর গড় উষ্ণতা কখনো বেড়েছে কিংবা কখনো কমেছে। তবে এসব পরিবর্তন ঘটেছে অতি ধীরে ধীরে, একেকটি পরিবর্তনের জন্য দশ হাজার বছর থেকে লক্ষ বছর কেটে গেছে। কিন্তু এবারের পরিবর্তন ঘটছে অতি দ্রুত হারে। মানুষের বর্তমান প্রজন্মই প্রত্যক্ষ করেছে বর্তমান সময়ের গড় উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রাথমিক অবস্থা। আশঙ্কা করা হয়েছে যে, পরের দুই-তিন প্রজন্ম পৃথিবীর জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করবে।
বিশ্বের জলবায়ু যে আগের মতো নেই এবং এর পিছনে মানুষের কর্মকাণ্ডই সবচেয়ে বেশি দায়ী সে বিষয়ে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত প্রমাণ দাখিল করেছেন। বিজ্ঞানীরা এবার দাবি করছেন, প্রতি ১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর হবে। পৃথিবীর শুষ্কভাবাপন্ন এলাকাগুলো চাষের অযোগ্য হয়ে পড়বে। ফলে বর্তমানে জীববৈচিত্র্যর ৩০ শতাংশ হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁঁকিতে পড়বে। নানা ধরনের সমস্যা ছড়িয়ে পড়বে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ থেকে আফ্রিকায়। সবচেয়ে সঙ্কটে পড়বে আফ্রিকা মহাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া-যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান। এসব এলাকায় যেহেতু দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি, এখানেই দেখা দেবে নানামুখী ও সুদূরপ্রসারী সঙ্কট। দক্ষিণ এশিয়ায় বন্যার প্রকোপ বাড়বে, উপকূলীয় এলাকায় নদী তীর ভাঙনের ব্যাপকতা বাড়বে এবং ঘূর্ণিঝড়জনিত সমস্যাদির তীব্রতা বাড়বে। ধারণা করা হয়েছে, এতে দক্ষিণ এশিয়ার ৬০ কোটিরও বেশি মানুষের জীবন ও জীবিকা বহুবিধ সমস্যার মুখোমুখি হবে।
এক গবেষণা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ২০৩০ হতে ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রের উপরিতলের স্ফীতি ঘটবে বর্তমানের তুলনায় যথাক্রমে ১৪ ও ৩২ সেন্টিমিটার, যা ২১০০ সাল নাগাদ আরো বেড়ে দাঁড়াবে ৮৮ সেন্টিমিটার। এর ফলে উপকূলীয় লবণাক্রান্ত এলাকা সম্প্রসারিত হবে। ব্রিটেনের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ স্যার নিকোলাস স্টার্ন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন যা এ বিষয়ে বিশ্বে বাসীর করণীয় সম্পর্কে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করেছেন। এই প্রতিবেদন মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কমাতে হলে জীবাশ্ম জ¦ালানির ব্যবহার ব্যাপক পরিমাণে কমাতে হবে এবং অভিযোজনের লক্ষ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থায়ন ঘটাতে হবে।
একটু গভীরভাবে লক্ষ করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অতি সহজেই চোখে পড়ে। প্রথমত: পরিবেশের অধিকাংশ সংকট মানব সৃষ্ট। হয়ত প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত আহরণের ফলে তা সৃষ্টি হয়েছে। দ্বিতীয়ত: পরিবেশের সংকট অনেকাংশে পাশ্চাত্যের শিল্পোন্নত দেশগুলোর শিল্পজাত দ্রব্যাদির উৎপাদনের ফল। তৃতীয়ত: মানুষ ও পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্ক একটি জটিল, বহুমুখী বিষয় যা বিভিন্ন সময় স্থান কালের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন আবেষ্টনীর শৃঙ্খলে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। পরিবেশ একটি আন্তর্জাতিক বিষয় এবং স্বাভাবিক কারণেই পরিবেশ সংক্রান্ত সমস্যাবলি বহুমুখী এবং পরিধি পৃথিবীব্যাপী বিস্তৃত। পরিবেশ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করায় বিশে^র মানবকুল এখন শঙ্কিত। উন্নত বিশে^র উৎপন্ন দূষণ শুধুমাত্র সেই সকল দেশের ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে সীমিত না থেকে সমগ্র ভূ-মণ্ডলে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই চারিদিকে শোনা যাচ্ছে অবনতির সুস্পষ্ট পদধ্বনি, শোনা যাচ্ছে অশনি সংকেত।
৫ জুন পালিত হয়েছে বিশ্ব পরিবেশ দিবসে। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘ইকোসিস্টেম রেস্টোরেশন’ বা ‘বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার’।বিশ্ব পরিবেশ দিবসটি ইউএন ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধার দশক ২০২১-২০৩০ ঘোষণা করেছে। এই দশকের লক্ষ্য প্রতিটি মহাদেশে এবং প্রতিটি মহাসাগরে বাস্তুতন্ত্রের অবক্ষয় প্রতিরোধ বা থামানো এটি দারিদ্র দূরীকরণ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই এবং ব্যাপক বিলুপ্তিকে রোধ করতে সহায়তা করতে পারে। এটি কেবল তখনই সফল হবে যখন প্রত্যেকে অংশ নিবে। পাহাড়ের শিখর থেকে সমুদ্রের গভীরতায় বিলুপ্তির দ্বার থেকে উদ্ভিদ এবং প্রাণীকে ফিরিয়ে আনা। বাস্তুসংস্থান এবং জাতিসংঘ দশকেবিশ্ব পুনরুদ্ধারে বিশ্ব ব্যাপী আন্দোলনে সবাইকে যোগ দিতে হবে। আমরা সময়কে অবহেলায় ফিরিয়ে দিতে পারি না। আমরা বেশি বেশি গাছ লাগাতে পারি, আমাদের শহরগুলিকে সবুজ করতে পারি, আমাদের বাগানগুলি পুননির্মাণ করতে পারি, আমাদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে পারি এবং নদী ও উপকূল পরিষ্কার করতে পারি। আমরা প্রকৃতির সাথে শান্তি স্থাপন করতে পারি। আসুন আমরা সবাই সক্রিয় হয়ে উঠি, উদ্বিগ্ন নয়।
মো. জিয়াউর রহমান : পরিবেশ কর্মী ও কলামিস্ট।





Users Today : 16
Views Today : 16
Total views : 180715
