বিশেষ গল্প
দংশন
কুন্তলা ঘোষ
তমাল ছোটো থেকেই খুব মেধাবী ছিল। বাবা-মার একমাত্র সন্তান হওয়ায় সে যখনই যা আবদার করত তা পূরণ হত। তমালের মা সংগীতা সাহা হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন এবং বাবা তাপস সাহা সরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন। অর্থের অভাব না থাকলেও তারা একপ্রকার মিতব্যয়ী। শুধুমাত্র ছেলের আবদার তারা মুখ বুজে পালন করত। তাপস মাঝে মাঝে বলত যে, ছেলের সব কথা এভাবে মেনে নেওয়া ঠিক না। কিন্তু ছেলের প্রতি ভালোবাসায় অন্ধ ছিল সংগীতা। আর তাপসেরও সংগীতার কথার ওপর কিছু বলার সাহস ছিল না। সংগীতার স্বভাব খুব নরম ছিল। সে স্কুল থেকে সোজা বাড়িতে আসত । এসে খুব বেশি বাইরে যেত না। কারণ সে স্কুল থেকে ফিরে দু-একদিন রান্না করত অথবা বসে বসে টিভি দেখত। তাপস অবশ্য বরাবরই পরিশ্রমী। সে অফিসে যাওয়ার আগে এবং অফিস থেকে ফিরে নিজেই রান্না করে তার স্ত্রী ও ছেলেকে খেতে দিত। ছোটো থেকেই তমাল একটি সুখী গার্হস্থ জীবন দেখে বড়ো হয়েছে। সে এটা সবসময় দেখেছে তার বাবা-মা একে অপরকে কতটা ভালোবাসে। তমাল তখন চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ছে। প্রতিদিন বিকেলে ছাদে গিয়ে তমাল অংক করত। তমালের তেমন বন্ধু কেউ ছিল না। স্কুল থেকে ফিরে তার প্রাইভেট টিউটর আসত আর প্রতিদিন বিকাল ৫ টায় ছাদে বসে স্কুলের পড়াগুলো সে পড়ত। হঠাৎ সেদিন পাশের ছাদে দেখে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটা তার চেয়ে বয়সে ছোটো হবে। কিন্তু মেয়েটা দেখতে খুব সুন্দর, ঠিক যেন মহাভারতে বর্ণিত দ্রৌপদীর মতো। তমাল বয়সে ছোটো হলেও তার বই পড়ার একটা নেশা ছিল। এই বয়সেই সে পৌরাণিক থেকে আধুনিক সব বই-ই পড়ে ফেলেছে। পাশের ছাদের মেয়েটি তমালের সাথে কথা না বলেই খেলতে চলে গেল। মেয়েটি তার এক বান্ধবী প্রিয়ংবদার সাথে পুতুল খেলা নিয়ে ব্যস্ত। এভাবেই প্রতিদিন ৫ টায় তমাল ছাদে আসত আর মেয়েটিকে দেখত। হঠাৎ সেদিন ছিল শুক্রবার, পাশের বাড়ির মেয়েটি তার মাকে সাথে নিয়ে তমালের বাড়িতে এলো । সেদিনই প্রথম পরিচয়, মেয়েটির নাম নীরা। ক্লাস টুতে পড়ছে।
পরিচয় হওয়ার পর থেকে প্রতি শুক্রবার করেই মেয়েটি তমালদের বাড়িতে আসত। তমালের মা মেয়েটিকে খুব আদর দিত। একদিন সংগীতা তার কিছু গহনা দিয়ে আর শাড়ি পরিয়ে মেয়েটিকে সাজিয়ে তমালকে বলেছিল, দেখত তমাল, তোর বৌ পছন্দ হয়েছে। তমাল সেদিন কিছু না বললেও তার শিশু মনে সেদিন কথাটা দাগ কেটেছিল। এভাবেই দুবছর কেটে গেছে। ইতিমধ্যে নীরার বাবা বদলি হয়ে ঢাকা চলে গেলেন। তারপর আর নীরার সাথে যোগাযোগ হয়নি। তমাল পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে কিন্তু নীরাকে সে একদিনের জন্যও ভুলতে পারেনি।
তমাল এইচএসসিতে গোল্ডেন এ+ পাওয়ার পর তার বাবা-মা তাকে ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তির কোচিংয়ের জন্য ঢাকা পাঠায়। তমাল নীরার বান্ধবী প্রিয়ংবদার কাছ থেকে জেনেছিল যে নীরা ভিকারুননিসাতে পড়ছে। আর সোশ্যাল মিডিয়ায় তার একাউন্টও দেখেছে । নীরা এখন আরো বেশি সুন্দরী হয়েছে। কোচিং করতে গিয়ে তমালের পড়ায় একদমই মন ছিল না। সে প্রতিদিন গিয়ে নীরার স্কুলের সামনে বসে থাকত। এত মেধাবী হয়েও কোথাও যখন ভর্তির সুযোগ পেল না তখন তমাল মনে মনে ভাবতে শুরু করে যেভাবেই হোক পরেরবার ভর্তি পরীক্ষায় তাকে অবশ্যই ভালো করতে হবে। পরের বছর তমাল ইলেকট্রিকাল এন্ড ইলেকট্রনিক্সে ভর্তি হলো খুলনা ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে। কুয়েটে ভর্তি হওয়ার পর থেকে সে নীরার বান্ধবীর মাধ্যমে নীরাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু নীরা তার কোনো উত্তর দেয়নি। নীরা এসএসসি পাস করার পর আবার তমালদের শহরে ফিরে এলো, পরে তমাল জানতে পেরেছিল, নীরা রাশেদ নামের একটি ছেলেকে ভালোবাসত। ছেলেটির হাত ধরে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। পরে নীরার বাবা-মা জোর করে নীরাকে নিয়ে এসেছে। একারণেই খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তারা এখানে চলে এসেছে। এসব জানার পরও তমালের ভালোবাসা এতটুকু কমেনি। বরং সে নীরাকে আগের চেয়ে এখন বেশি ভালোবাসে।
তমাল এরমধ্যে একদিন নীরাকে মেসেঞ্জারে তার ভালোবাসার কথা জানায়—নীরা হ্যাঁ বা না কিছু না বললেও তমালের সাথে নিয়মিত কথা বলে। এভাবে দামি দামি গিফট নীরা সবসময় তমালের কাছে আবদার করত। আর তমাল তার সব আবদার পূরণ করত। নীরা সবসময় তমালকে বলত, আসলে তোমার সাথে আমার বাবা আমার বিয়ে দিবে না । কারণ তুমি তো সরকারি চাকরি করবে। আর আমার বাবা চায় আমার হাজব্যান্ড বেসরকারি কোনো কোম্পানি বা ব্যাংকে চাকরি করবে সেখানে অনেক বেতন থাকবে। তমালের বাবা-মার ইচ্ছে ছিল ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা বিসিএস ক্যাডার হবে। কিন্তু পড়াশেষে তমাল একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি শুরু করে। এরপর একদিন বাড়িতে যখন তমাল নীরার কথা বলে তখন তার বাবা আপত্তি জানায় কিন্তু অবশেষে মেনে নেয়। নীরা তখন একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স শেষ করেছে। বিয়ের পরই নীরা আমেরিকা চলে যায় এমএস করার জন্য। তমাল নীরাকে বলেছিল আমরা একসাথে যাব। নীরা বলেছিল, একসাথে গেলে আমার পড়ার খরচ কে চালাবে বল? বিয়ের পর তো আর বাড়ি থেকে টাকা নেওয়া যায় না!
নীরা আমেরিকা যাওয়ার পর প্রথম প্রথম তমালের সাথে নিয়মিত কথা হত। কিন্তু এখন টাকা যখন লাগবে তখন একটা করে মেইল পাঠায় নীরা। তমাল ভাবে, পড়াশোনা, এসাইনমেন্ট নিয়ে চাপের মধ্যে আছে। ইদানীং নীরার টাকার চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। মাসে মাসে এত টাকা দেওয়া তমালের জন্য অনেক কঠিন হয়ে যাচ্ছে। উপায় না দেখে অফিস থেকে ফিরে দুটো করে টিউশনি নিয়েছে। হঠাৎ সেদিন ছিল ১০ অক্টোবর নীরার জন্মদিন। নীরা সকালে ঘুম থেকে ওঠার সাথে সাথে তাকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য তমাল ফোন করে। ফোন রিসিভ করে একজন পুরুষ মানুষ। পরে নীরা জানায় সে নাকি তখন ল্যাবে ছিল। তমালের স্কুলের বন্ধু রিগ্যান নিউইয়র্কে থাকে। সে একদিন তমালকে মেসেঞ্জারে নীরার সাথে অন্য একটি ছেলের ছবি পাঠায় । তমালের প্রথমে বিশ্বাস হয় না কারণ ফটোশপের মাধ্যমে এই ছবিগুলো এখন করা যায় । রিগ্যান ফোন করে জানায় নীরা এখানে সুমন্ত নামে একটি ইন্ডিয়ান ছেলের সাথে লিভিংয়ে থাকে, গতমাসে তারা বিয়েও করেছে। তমালের বিশ্বাস করতে বড্ড কষ্ট হয়। নীরাকে ফোন দিলে তখন নীরা সব সত্যিটা জানায় । নীরা বলে আমার বর্তমান স্বামী সুমন্তর অনেক টাকা। আমার কোনো অভাব রাখবে না, এরপর থেকে নীরার সাথে তমালের আর কথা হয়নি।
আজ ২০ বছর যাবত তমাল তার পরিবার নিয়ে অস্ট্রেলিয়া আছে, একমাত্র মেয়ে রিমি তার মতোই মেধাবী হয়েছে। স্ত্রী সুমিতা খুব ঘরোয়া মেয়ে। সে আজ খুব সুখী। তমালের জীবনে ভালোবাসা আজ পূর্ণতা পেয়েছে।





Users Today : 7
Views Today : 9
Total views : 175513
