জীবনটা আমার বড্ড দীর্ঘ হয়ে গেছে। এখন একশো পাঁচ বছর চলছে। এত বয়সে অবশ্য আমার বেঁচে থাকা উচিত ছিল না। তবে ভাগ্য দেবতা আমার প্রতি প্রসন্ন নন বিধায় বেঁচে আছি। আমার পরিবারে নাতি-নাতনি সবাই আমাকে খুব আদরে রেখেছে। আজ এত আনন্দের মধ্যে থেকে বারবার মনে পড়ছে আমার ছোট বোনটির কথা। আজ পাঠকদের ওর গল্প শোনাবো বলেই খাতা নিয়ে লিখতে বসেছি। রুক্মিণী আমার আদরের রুকু। আমার থেকে বার বছরের ছোট। আমাদের পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিল সে। আমি অবশ্য চতুর্থ। ছোট থেকেই ওর সকল আবদার আমি পূরণ করতাম। বড় দুই বোনের অনেক আগেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। তবে আমার ইচ্ছে ছিল রুক্মিণীকে আমি বিএ পাস করাবো। ছোট থেকেই ও পড়তে বড় ভালোবাসত। দুপুরে যখন আমি ঘুমিয়ে পড়তাম তখন আমার ঘরে এসে আমার গল্পের বইগুলো নিয়ে পড়ত। দেখতে দেখতে ছোট রুক্মিণী তের বছরে পা দিয়েছে। বাবা অনেক আগেই ওর বিয়ে দিয়ে দিতেন, তবে আমি এবং আমার বড় জামাইবাবুর আপত্তির কারণে বাবা সেটা করতে পারেননি। ছেলেপক্ষ দেখতে এসেছে । ছেলে লেখাপড়া তেমন জানে না তবে জমি আছে অনেক আর মিষ্টির দোকান আছে। আমার বোনকে একবার দেখেই ওরা পছন্দ করে নিল। কারণ আমার বোনটি মহাভারতে বর্ণিত শ্রীকৃষ্ণের স্ত্রী রুক্মিনীর মতোই সুন্দরী। বিয়ে ঠিক হলে রুক্মিণী কাঁদতে কাঁদতে আমার ঘরে গেল। আমি বাবাকে অনেক বোঝালাম কিন্তু কিছুতেই তাকে টলাতে পারলাম না। অবশেষে রুক্মিণীকে বললাম, তুই বড় জামাইবাবুকে চিঠি লিখে সব জানা। বড় জামাইবাবু মালদহতে থাকতেন। চিঠি পাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই দেশে এলেন। এসেই বাবাকে বললেন,আমি রুকুকে সাথে করে নিয়ে যাই। ও তো মাত্র ক্লাস সেভেন এ পড়ছে। অন্তত মেট্রিকুলেশনটা পাস করুক। তারপর আমি নিজেই ওর বিয়ে দিয়ে দিব। বাবা কিছুতেই রাজি হলেন না। জামাইবাবু এক প্রকার রাগ করেই বাড়ি থেকে চলে গেলেন। তারপর এক শুভদিনে রুকুর সাথে রসময়ের বিয়ে হয়ে গেল। আমাদের বাড়িতে থাকতে রুকুকে কোনোদিন কিছুই করতে হয় নি। ও বাড়িতে গিয়ে সংসারের সব কাজ এমনকি মিষ্টি বানানোর কাজেও তাকে হাত লাগাতে হতো। রসময় ছিল খুব অলস প্রকৃতির এবং খুব বোকা । তার অন্য ভাইয়েরা প্রায়ই তাকে ঠকিয়ে জায়গা লিখে নিত। রুকুর বিয়ের পর একদিন জামাইবাবু এসে বেশ কিছু গল্পের বই আমাকে দিয়ে গেল। পরে আমি রুকুর শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে দিয়ে এসেছিলাম। রুকু বইগুলো পেয়ে খুব খুশি । কিন্তু এগুলো পড়ার সময় তার নেই। রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে হ্যারিকেনের আলো জ্বেলে বই পড়ত।
বিয়ের একবছর পর মেয়ে হলো ওর। নাম রাখলাম নিবেদিতা। এরপর তার দুই ছেলের জন্ম হলো। নিবেদিতার যখন বারো বছর বয়স তখনই এক সম্ভ্রান্ত ঘরে তার বিয়ে হয়ে গেল। এরপর রুকুর বড় ছেলের বিয়ে দিয়ে রুকু একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবে ভেবেছিল। কারণ মেজো ছেলের এখনো বিয়ের বয়স হয়নি। আর সেজো ছেলের বয়স ষোল বছর আর ছোট মাত্র পাঁচ বছরের। রুকুর তখন ভরা সংসার। হঠাৎ করেই দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। রুকু অবশ্য স্বাধীনতা যুদ্ধ কী তা জানতো না। ২৫ মার্চের পর থেকে সারা দেশ তখন এলোমেলো হয়ে গেছে। রুকুর বড় ছেলে একদিন তার বৌ, ছেলেমেয়ে সাথে নিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিল। যাওয়ার সময় সেজো ভাইকেও সাথে নিয়ে গেল। সেদিন ছিল বুধবার। রুকুদের আশপাশের বেশিরভাগ বাড়িই ফাঁকা হয়ে গেছে। রুকু রসময়কে অনেকবার বলেছে—চলো, আমরাও ভারতে চলে যাই। আর্মিরা নাকি হিন্দু শুনলেই মেরে ফেলছে। রুকুর বিয়েতে তার বাবার দেওয়া চল্লিশ ভরি গহনা ছিল। রুকু ভেবেছিল এগুলো চুলার ভেতরে ছাই চাপা দিয়ে লুকিয়ে রাখবে। কিন্তু রসময় সব গহনা তার কাছ থেকে নিয়ে বললো, এগুলো আমি আমার বন্ধুর বাড়িতে রেখে আসি। এরপর রাস্তায় বের হওয়ার পর দেখলো আর্মির গাড়ি। ভয়ে একটা ঝোপের আড়ালে এসে আশ্রয় নিল। তারপাশে আর একটি ঝোপের আড়ালে ছিল তার মেজো ছেলে। আর্মিরা আসার পর আশপাশে কাউকে খুঁজে না পেয়ে ফিরে যাচ্ছিল। হঠাৎই একজন রাজাকার এসে আর্মিদের দেখিয়ে দিল, হুজুর, এখানে এক হিন্দু লুকিয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে টেনে হিঁচড়ে রসময়কে সেখান থেকে কয়েকজন বের করে আনলো। বুকে একটা গুলি করলো কিন্তু তখনো তার প্রাণ আছে। নরপিশাচগুলো তখন রসময়কে গাড়ির সাথে দড়ি দিয়ে বেঁধে গাড়ি চালাতে লাগল । যতক্ষণ না পর্যন্ত ওর শরীরটা ছিঁড়ে মাটিতে মিশে গেল ততক্ষণ এ অত্যাচার চলল। এ বীভৎস দৃশ্য দেখার পর রসময়ের মেজো ছেলে বাড়িতে গিয়ে তার মাকে সব বললো। সব শুনে রুকু দিশেহারা হয়ে গেল। এক প্রতিবেশীকে সাথে করে রুকু মেজো ছেলেকে ভারতে তার দিদির কাছে পাঠিয়ে দিলো। এরপর সে তার ছোট ছেলেকে কোলে করে পথে বের হলো। হাতে একটা পয়সাও ছিল না। কারণ রসময় বের হওয়ার সময় টাকা, গহনা সব সাথে নিয়ে গিয়েছিল। পথঘাট কিছুই ওর চেনা নেই। পাগলিনীর মতো একা হেঁটে চলেছে। সামনে সারি সারি মানুষ পিঁপড়ের মতো হেঁটে চলেছে। কখনো বা জঙ্গল পেরিয়ে, কখনো বা জলাশয় পাড়ি দিয়ে। দুইদিন ধরে তার খাওয়া নাই, ঘুম নাই। হঠাৎ দেখে দূর থেকে কে যেন তাকে ডাকছে মা ঠাকরুণ । রুকু সামনে তাকিয়ে দেখলো। এ তো অনিমেষ, তাদের বাড়িতে দুধ দিতো। অনিমেশ জোর করে তার মামার বাড়িতে রুকুকে নিয়ে গেল। রাতে মাড় ভাত খেয়ে রুকু ঘুমাতে গেল। হঠাৎ মাঝরাতে শুনলো আর্মি আসছে। সাথে সাথে আবার রাস্তায় বের হয়ে গেল। এভাবে কয়েকদিন হাঁটার পর অবশেষে আগরতলা পৌঁছে গেল। এরপর ভারতে কয়েক মাস কাটানোর পর যখন দেশ স্বাধীন হলো তারপর দেশে ফিরে এলো। শুরু হল তার দ্বিতীয় জীবন যুদ্ধ । তার ঘরবাড়ি সব আত্মীয়রা দখল করে নিয়েছে। রসময় নাকি জীবিত থাকতেই সব বিক্রি করে দিয়েছে। অনেক কাকুতি মিনতি করে প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় দুইটা ঘর পেল। এরপর অনেক কষ্টে নিজে মিষ্টি বানিয়ে বিক্রি করা শুরু করলো। এভাবেই তার ছেলেদের মানুষ করা শুরু করল। ছোট দুই ছেলেকে সাথে নিয়ে আলাদা সংসার শুরু করে দিল। দুই ছেলেই যখন উপার্জন করা শুরু করেছে তখন রুকু একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলা শুরু করেছে। কিন্তু ততদিনে তো রুকু বুড়ো হয়ে গেছে। এখন তার শরীরে শক্তি নাই। চোখে দেখে না, কানেও ভালো করে শুনতে পায় না। একারণে নাতি,নাতনীরা তাকে সবসময় অবহেলা করে।
আজ আর রুকুকে পরিশ্রম করতে হয় না কিন্তু আজও তার শান্তি হয়নি। তবে ভাগ্য দেবতা আমার রুকুর প্রতি অবশেষে প্রসন্ন হয়েছে। আমার আগেই আমার আদরের রুকু পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে।





Users Today : 111
Views Today : 114
Total views : 175840
