তোমাকে হারানোর আজ এক বছর হয়ে গেল। এই এক বছর আমি যে কীভাবে কাটিয়েছি তা একমাত্র আমি এবং আমার সৃষ্টিকর্তা জানেন। তুমি যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিলে যে তোমার জন্য ভরা এক সংসার রেখে যাব। সত্যিই তুমি তোমার কথা রেখেছো। এক সুখের স্বর্গ আমার আছে, কিন্তু সেই স্বর্গে আমার দেবী নেই। আমার জীবন এভাবে শূন্য করে তুমি পরপারে গিয়ে কী সুখ লাভ করেছ তা আমি জানি না আর জানতেও চাই না। এতটুকু জানি, আমি আজ বড্ড একা।
তোমার বাৎসরিক অনুষ্ঠানের সব কাজ আমি নিজের হাতে করেছি। এলাকার সব মানুষকে আমি বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিমন্ত্রণ করে এসেছি। যারা গরীব তাদের অনেককেই নতুন কাপড় কিনে দিয়েছি। মানুষকে কিছু দিতে তুমি খুব পছন্দ করতে। তবে সেদিন আমাদের সামর্থ্য ছিল না। তবুও দেখেছি তুমি বেতনের টাকা থেকে জমিয়ে কত গরীব ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ায় সাহায্য করেছ। তোমার পারলৌকিক অনুষ্ঠানের খরচ আমি ছেলে-মেয়েদের কাছ থেকে নিইনি বলে ওদের সে কি রাগ! ওরা তো বোকা। কেমন করে বুঝবে তোমার-আমার সাত জন্মের বন্ধনের কথা! ওরা ভেবেছিল পঁচাশি বছরের এক বৃদ্ধ কীভাবে একা একা এত বড়ো একটা আয়োজন করবে! জীবনের ঊনষাট বছর যে মানুষটি আমাকে দিয়েছে আর তার জন্য এই সামান্য কিছু কি আমি করতে পারব না? মনে পড়ছে আজ থেকে ষাট বছর আগের সেই দিনের কথা। আমি প্রশান্ত সরকার। সবে বিএ পাস করেছি। বাড়ির কাছে হাইস্কুলে চাকরির জন্য দরখাস্ত করেছিলাম। চাকরিটা সহজেই হয়ে গেল। বাবা প্রমোদ সরকার। হাইস্কুলের শিক্ষক ছিলেন। বাবার ইচ্ছে ছিল আমিও শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিব। একমাত্র সন্তান ছিলাম। আমার যখন বার বছর বয়স তখন হঠাৎ মা মারা যায়। আমার কষ্ট যাতে না হয় এজন্য বাবা আর বিয়ে করেননি। পাড়া-প্রতিবেশী,আত্মীয়-স্বজন সবাই বলেছিল কিন্তু বাবা কারো কথা শোনেনি। বাবা ছিলেন এক কথার মানুষ। একবার যে সিদ্ধান্ত নিতেন সেটা আর বদলাতেন না। চাকরি পাওয়ার একমাস পরই বাবা একদিন আমাকে ডেকে বললেন, প্রশান্ত তোমার পিসিমা তোমার জন্য একটি মেয়ে দেখেছে। মেয়ের বাড়ি বগুড়াতে। আমাদেরই স্বজাতি। এবারই মেট্রিক পাস করেছে। সেকেন্ড ডিভিশনও পেয়েছে। আমি একদিন যাবো মেয়েটিকে দেখতে। কোনোদিনই বাবার মুখের ওপর কথা বলিনি। তাই আজও সাহস করে বাবাকে বলতে পারলাম না যে, বাবা আমিও তোমার সাথে মেয়েটিকে দেখতে যাব। শুধু বাবার মুখ থেকে জানতে পেরেছিলাম মেয়েটির নাম প্রমীলা।
আমার অবস্থা ছিল রবীন্দ্রনাথের হৈমন্তী গল্পের অপুর মতো। পার্থক্য এটুকুই, অপু তার হবু স্ত্রীর প্রকৃত নাম না জেনেই নাম দিয়েছিল শিশির। আর আমার প্রমীলার নামটা জানা ছিল। আমাদের বাড়িতে কাজ করেন নীরেন কাকা, মা মারা যাওয়ার পর থেকে আমি তার কাছেই মানুষ। কাকার কাছ থেকে জানলাম যে, বাবা আসছে শুক্রবার বগুড়া যাচ্ছেন। এও শুনলাম যে বাবা একরকম পাকা কথা বলতেই সেখানে যাচ্ছেন। আমি আশায় ছিলাম যে বাবা হয়ত যাওয়ার আগের দিন অন্তত আমাকে জানাবেন। বৃহস্পতিবার রাতে বাবা আর আমি একসাথে খেলাম তারপর ঘুমাতে গেলাম। শুক্রবার ভোর পাঁচটা থেকেই দেখি নীরেন কাকা এসে ডাকাডাকি শুরু করে দিয়েছে। ঘুমের মধ্যেই বললাম, এত সকালে কেন ডাকছো? বাবুসোনা তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও। তোমাকে বগুড়া যেতে হবে। কথাটা শুনে মনের মধ্যে একটা খুশির বন্যা বয়ে গেল, কিন্তু ভাষায় প্রকাশ করলাম না। তাড়াতাড়ি চা খেয়ে, রেডি হয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাবাকে বললাম, আমাকে নিয়ে যাওয়ার কী দরকার ছিল! আপনি পছন্দ করলেই তো হয়ে যেত। বাবা বললেন তোমরা আজকালকার ছেলে, তোমাদের নিজেদের একটা পছন্দ আছে বৈকি! বাবার সাথে বগুড়া গেলাম। প্রথমে গিয়ে পিসিমার বাড়িতে উঠলাম আমরা। পরে পিসিমাকে সাথে নিয়ে প্রমীলাদের বাড়ি উপস্থিত হলাম। আমরা গিয়ে বসার পর জলখাবার দিল। এরপর প্রমীলা তার কাকিমার সাথে চায়ের ট্রে হাতে করে ঘরে ঢুকল। বাবা বলল, তোমার যদি কিছু জিজ্ঞেস করার থাকে করে নাও। পিসিমা বললেন, ওর আবার কী বলার আছে। বাবা বরাবরই আধুনিক চিন্তা চেতনার মানুষ ছিলেন। আমি উত্তর করলাম কিছু জিজ্ঞেস করার নেই। পরে যখন জানতে চাইলেন মেয়েকে কি তোর পছন্দ হয়েছে? মাথা নিচু করে সায় দিয়েছিলাম, লজ্জায় সেদিন হ্যাঁ বলার সাহস হয়নি। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের, সুশ্রী মেয়েটির প্রেমে আমি সেদিনই পড়েছিলাম। বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। পরের মাসেই বিয়ের তারিখ। প্রমীলার বাবা বলেছিল, বিয়েতে যৌতুক দিবে। বাবা রাগ করে বলেছিল, যে সম্পদ আপনি আমার ঘরে দিলেন তার যে কত মূল্য তা আপনি হয়ত জানেন না। আমি ঠিক আগলে রাখবো। বিয়ের পর প্রমীলা নিজের হাতে সংসার গুছিয়ে নেওয়া শুরু করল। মা ছিল না বলে ওকে দেখিয়ে দেওয়ার কেউ ছিল না। বেশ চলছিল আমাদের নতুন জীবন। এরপর আমাদের ঘর আলো করে আমাদের ছেলে জন্ম নিল। বাবা নাম রাখল পার্থ। পার্থর যখন দুই বছর বয়স, বাবা একদিন প্রমীলাকে ডেকে বলল, মা তোমার নিজের পায়ে দাঁড়াতে ইচ্ছা করে না? মা তুমি চাকরি করো। প্রমীলা বলেছিল, বাবা তাহলে আমার সংসার কে দেখবে? আমি যখন প্রশান্তকে একাই মানুষ করেছি আর মা তুমি চাকরি করে সংসার চালাতে পারবে না? মেয়েরা সবই পারে মা। বাবার চেষ্টায় প্রমীলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করল। খুব সকালে প্রমীলা ঘুম থেকে উঠে কাজ সেরে স্কুলে চলে যেত। এর দুই বছর বাদে ঘর আলো করে আমাদের জমজ মেয়ে জন্ম নিল। স্বাগতা আর আগতা। সংসারের খরচ যখন বাড়তে শুরু করলো আমি প্রথমবার বুঝতে পারলাম যে, প্রমীলা চাকরি করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সঠিক কাজ করেছে। শুরুতে আমি এটার বিপক্ষে ছিলাম, বাবার ভয়ে মুখে কোনো কথা না বললেও মনে মনে বিরক্ত ছিলাম। পার্থ যখন ডাক্তারিতে চান্স পেল তার একবছর পরই বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। পার্থর পড়ার খরচ চালাতে স্কুলের পাশাপাশি আমি টিউশনি করা শুরু করলাম। প্রমীলাকে দেখতাম সারাদিন স্কুল করে আসার পর বাড়িতে এসে সেলাই মেশিন নিয়ে বসত। অনেকবার বলেছি। এত পরিশ্রম করার দরকার নেই। বলতো, মেয়েরাও দুইদিন পরে ভালো জায়গায় ভর্তি হবে কত খরচ বল তো! প্রতিবার পূজার সময় দেখতাম প্রমীলা নতুন শাড়ি কিনে গরীব কাউকে দিত। নিজের জন্য কখনোই কিনতে দেখতাম না।
আমিই জোর করে কিনে দিতাম। বলতো ছেলে-মেয়েরা চাকরি পেলে আমার কি শাড়ির অভাব হবে? দুই মেয়েই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একসাথে ভর্তি হয়ে গেল। পার্থ ডাক্তারি পাস করে চাকরিও পেয়েছে। দুটি মেয়েরই বিয়ে দিয়েছি। একজন আমেরিকা থাকে আর আরেকজন ঢাকা। পার্থর বিয়ে নিজেদের পছন্দে দিতে চেয়েছিলাম। তবে ছেলে নিজেই মেয়ে পছন্দ করেছে। আমার ইচ্ছে ছিল না। প্রমীলা বলেছিল সব মেনে নিতে। ওর কথা কোনোদিন ফেলিনি। দুজনই রিটায়ার করেছি। তাই কাজ নাই বললেই চলে। ছেলে পুজোর সময় বা ছুটি পেলেই আসে। তবে তার বাড়ি আমি যাইনি। মেয়ে এসে দুজনকে আমেরিকা নিয়ে গেল। ভাবলাম, নিজের খরচে তো প্রমীলাকে কোথাও নিতে পারিনি। আজ মেয়ের জন্য যদি নতুন দেশ দেখতে পায় তো মন্দ কী! আমেরিকা গিয়ে বেশ আনন্দেই ছিলাম। বাংলাদেশের অনেকের সাথে দেখা হতো মাঝে মাঝে। হঠাৎ একদিন প্রমীলা অসুস্থ হয়ে গেল। তাকিয়ে দেখলাম আর কথা বলতে পারছে না। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে ডাক্তার বললো, স্ট্রোক করেছে। প্যারাপ্লেজিয়া নামক প্যারালাইসিস রোগে আক্রান্ত। হাঁটা-চলার ক্ষমতা নেই। আস্তে আস্তে কথা বলতে পারতো। মেয়ে চাকরি করত। একটা নার্স রেখে দিয়েছিল। তবে প্রতিদিন আমি নিজে প্রমীলার সব কাজ করে দিতাম। আমার এই চুরাশি বছর বয়সেও ওকে কোলে তুলে আমি ওয়াশরুম পর্যন্ত নিয়ে যেতাম। আমি নিজে হাতে ওকে খেতে দিতাম। প্রমীলার দুচোখ দিয়ে শুধু অশ্রু বয়ে যেত। প্রমীলার সব কাজ করে দেওয়ার মধ্যেই যে আমার আনন্দ ছিল। ওর জন্য কিছু করার আনন্দ। ডাক্তার যেদিন ওকে আইসিইউতে রেখে দিল সেদিনও প্রার্থনা করেছিলাম, ফিরে এসো সুস্থ হয়ে। আমি ঠিক তোমাকে সুস্থ করে তুলতে পারব।
আজকাল অনেককেই বলতে শুনি, বিয়ে করে এক বৌকে নিয়ে কি সারা জীবন কাটানো যায়! পরকীয়া করছে কিন্তু আমার প্রমীলা তো এত বছরেও আমার কাছে কোনোদিন পুরাতন হয়নি, আমি বারবার ওর প্রেমে পড়েছি। ও মারা যাওয়ার পর অনেকেই বলেছে এভাবে বিছানায় পড়ে থাকার চেয়ে মারা গিয়ে বেঁচে গেছে। কিন্তু আমি তো এভাবে বাঁচতে চাইনি। প্রমীলার হাতটি ধরেই তো আমি বাঁচতে চেয়েছি। আমার এই দীর্ঘ জীবন আজ বড্ড একাকী লাগে।





Users Today : 21
Views Today : 26
Total views : 184625
