হতাশায় পড়েনি এমন মানুষ আছে বলে তো আমার মনে হয় না। আমি তো অনেকবার হতাশায় পড়েছি। মাঝে মাঝে জীবনের প্রতি যে বিতৃষ্ণা আমার হয়নি তা নয়। কিন্তু হতাশার কাছে হেরে যাইনি আমি। অর্থনৈতিক সমস্যা থেকে শুরু করে সকল সমস্যাই আমার জীবনে এসেছে। হতাশা মাঝে মাঝেই আসত আবার চলে যেত। আমাকে তো হতাশা খেতে বসেছিল এক সময়। আমি যখন খারাপের সর্বোচ্চ ধাপে পৌঁছলাম আর তখন দেখলাম আমাকে নিয়ে খেলছে অনেকেই আমার এই হতাশার সুযোগ নিয়ে। আমি সুকৌশলে সেখান থেকে বের হতে পেরেছিলাম জন্যেই হয়ত আজ এই সেবামূলক পেশার সাথে যুক্ত হতে পেরেছি।
লেখাপড়া জীবনেও যে হতাশ হইনি তা নয়। অর্থনৈতিক অভাব ছিল চিরদিনই আমাদের পরিবারে। কেননা কৃষি নির্ভরশীল পরিবারে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো অবস্থা হয়। আমারো হয়ত তাই হয়েছিল। বাবা সামান্য বেতনে চাকুরি করতেন রুপপুর গার্লস স্কুলে। সে সময় বেতন যে খুব বেশি পেতেন তাও নয়। পাঁচ ভাইবোন সহ বাবা-মা, জেঠা, ঠাকুমাসহ দু-একজন অতিথিসহ পরিবার মেইনটেন করতে অনেক হতাশায় বাবা যে পড়েনি তা নয়। কেননা পৃথিবীর সব বাবারাই তাদের পরিবারের জন্য হতাশায় ভোগে। আবার নিজে লেখাপড়া বন্ধ করে তাদের নতুন আরেক হতাশায় ফেলে দিলাম।
পরে যখন আমার বোধ হলো যে আমি নিজে হতাশায় থেকে সবাইকে হতাশায় ভুগাচ্ছি তখন মনে মনে ভাবলাম আমি ডাক্তারি পড়বো। সংসারের অবস্থা তখন আরো বেশি টানাটানিতে ছিল। বাবা টাকা দিতে অস্বীকার করল। কেননা তিনি টাকা পাবেন কোথায় সে বোধ আমার ভেতরে কাজ করেনি তখন। বোনগুলো বিবাহযোগ্যা। সবার লেখাপড়া কাপড়-চোপরসহ সংসার চালাতেই বাবা হতাশায় ভুগছেন। এর মধ্যে নতুনভাবে টাকা দিতে হলে জমি বিক্রি ছাড়া আর কোনো উপায় তার নেই।
আমিও নাছড়বান্দা হয়েই রইলাম। এক সময় তার মনের অনিচ্ছা সত্ত্বেও টাকা দিতে রাজী হলো। আর আমি পূর্বের হতাশা থেকে বেরিয়ে নতুন উদ্যমে শুরু করলাম আমার লেখাপড়া। অনেক কষ্টের পরে একটা একটা করে শেষ করে, চেম্বার শুরু করলাম্ সেটাও হবে ১৯৯৩ সালের কথা। সবই যেন নতুন। নতুন কাজ নতুন পরিবেশ । সব মিলিয়ে বেশ ভালোই লাগছিল ।
অনেক সাধ ছিল সার্জারিতে এগুবো। আর সেইভাবে নিজে শ্রম দিতে শুরু করলাম। আমার সার্জারির গুরু ডা. নূর মোহম্মদ স্যারের সেই কথাটা আজও আমার প্রাণে বাজে। তিনি বললেন কী পড়েছো বা কী শিখেছো সব ভুলে যাও। মনে করো কিছুই শেখনি আজ শিখবে। ওয়াশ নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াও। ব্যাস মুহূর্তের মধ্যেই আমার সব হতাশা কটিয়ে উঠলাম ভাবলাম। সার্জারেিত তাঁর সাথে ৬/৭ বছর কাজ করার পরে তিনি আমাকে বললেন সার্জারিতে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে কাজ করতে। নইলে কোনো সময় সমস্যা হলে তুমি ফেঁসে যেতে পারো। হতাশা আবার নতুন করে আমাকে আঁকড়ে ধরলো। সেই সুযোগ আর হয়নি আমার যে সার্জারিতে উচ্চতর কোন ডিগ্রি নেবো । আমি ঐ দিন আমার চেম্বারে বসে অনেক অশ্রুপাত করেছিলাম । ভাবছিলাম সব শেষ হয়ে গেল। হতাশা আবার নতুন করে দেখা দিলেও সেখানেও ভেঙে পড়িনি আমি। পরে চিন্তা করলাম অপারেশনের আগেই আমি সার্জনকে সব বলতে চেষ্টা করব। আর সেটা হবে আল্ট্রাসাউন্ড।
সেইভাবে নিজেকে আবার নতুনভাবে তৈরি করলাম আর খুঁজতে থাকলাম কোথায় গেলে ভালো করে শিখতে পারবো। একসময় সেটা পেলাম আর প্রায় পাঁচ বছর বিভিন্ন কোর্স শেষ করলাম। হতাশা কিছুটা হলেও কাটলো। নতুনভাবে জীবনটাকে সাজাতে আবার নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করলাম। বেশ অনেক দিন চলতে থাকল খুব ভালোভাবেই। নিজের কাজকে আরো সম্প্রসারণ করতে পার্টনার নিলাম। সকল কাজ খুব সুন্দরভাবে চলতে থাকল। সেখানেও হতাশা আমার পিছু ছাড়লো না। নতুনভাবে মনোমালিন্য দেখা দিলো আমাদের মাঝে। সব ছেড়ে আবার যে বাড়িতে সেই বাড়িতেই বসে থাকতে হলো। অনেক হতাশা এবারো আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। টাকা-পয়সা তো জমিয়ে রাখতে পারিনি। তার পরেও যেটাকু ছিল তাও শেষ হয়ে গেল। আর যেন হৃদয়কে আটকে রাখতে পারছি না কিছুতেই। হঠাৎ হৃদয়ে অনুভব করলাম কে যেন বলছেন তোকে উঠে দাঁড়াতেই হবে।
আমি সেই আত্মিক নির্দেশনামতো কুষ্টিয়ায় ডা. মান্নান ভাইয়ের চেম্বারে গেলাম। আল্ট্রাসাউন্ড কোর্স করার সময় তার সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়। এক পর্যায়ে আমার সকল হতাশার কথা তাকে বলতেই তিনি মুহূর্তের মধ্যে আমার সকল হতাশা যেন দূর করে দিলেন। এবার ভাবলাম আর কোথাও যাবো না নিজেই নিজের মতো করে সৎভাবে বাঁচতে যেটুকু করার তাই করব । এটাতে গিয়ে দেখলাম সৎভাবে বাঁচা খুবই কঠিন কাজ। আর যখন আমি আমার নামে নতুন লাইসেন্স করার জন্য অফিসে ধর্না দিলাম। কত নিয়ম-নীতির হিসেব দেখালো আর তা দেখে আমার চোখ ছানাবড়া হতে লাগলো । হতাশা আবার আকড়ে ধরলো ।
বাড়ি ফিরে এসে অনেক চিন্তা করতে থাকলাম এটা নিয়েও। এ সময় আমার হৃদয়ে কেউ একজন আবার কথা বলে বললো তোকে ধৈর্য হারালে চলবে না। সমাজ বা রাষ্ট্রের নিয়মেই তোকে চলতে হবে। প্রেরিত পৌলের সেই অমর বাক্য আমার কাছে এলো। আর তা হলো রোমীয় ১৩ : ৭ যাঁর যা প্রাপ্য তা তাকে দাও। যাঁকে কর দিতে হয়, কর দাও। যাঁকে শুল্ক দিতে হয়, শুল্ক দাও। যাঁকে ভয় করতে হয়, তাকে ভয় কর। যাঁকে সমাদর করতে হয় ,তাকে সমাদর কর। কাজে লাগিয়েছি সেটাকেই। আর নতুন কিছুর জন্য অপেক্ষা করে কিছুটা হলেও সফল হয়েছি। পূর্ণ সফলতা এই জীবনে কেউই পায় না। তবে আমি যেটুকু পেয়েছি তাতেই সন্তুষ্ট আছি। ঈশ্বর যেন আমাকে এই সন্তুষ্ট থাকতেই সাহায্য করেন।





Users Today : 87
Views Today : 94
Total views : 177234
