আমি স্বপ্ন দেখি। এই কথাটা নতুন নয়। এটা বলেছিলেন মার্টিন লুথার কিং সেই ২৮ আগস্ট ১৯৬৩ সালে। স্বপ্ন যে আমরাও দেখি না তা নয় । তবে তার দেখা আর আমার দেখার মধ্যে অনেক অনেক পার্থক্য আছে। তার স্বপ্নের মধ্যে ছিল জনগণের মঙ্গলের সু-সমাচার। আর আমি দেখি আমার নিজের মঙ্গলের জন্য কতটা কি করা যায় তাই নিয়ে। ছোট্ট এ জীবনে কত কিছুই না ভেবে ভেবে সপ্ন দেখলাম আর ওগুলোকে নিজের সুবিধাজনক ঝুড়ি ভরে ভরে রেখে দিয়েছি গুদামজাত করে। শুধুই হয়ত সুবিধাজনক সুযোগের অপেক্ষা। কিন্তু সবাই কি সেই স্বপ্নের সুযোগ ধরতে পারে। সুতা কেটে নিজের স্বপ্নটা উড়ে গিয়ে অন্যের কাছে ধরা দেয়। আর তখন আমার স্বপ্নগুলো হয়ত ভাবনা পর্যন্তই শেষ হয়ে যায়। কারো কারো জীবনে হয়তবা সফলতা ধরা দেয় কেননা সুযোগ পরবর্তী ধাপগুলো ভাববার সময় সে হয়তবা পায় না কিন্তু আমি বারবার ভাবি তাই। এটাকে আমি কি তবে বিফলতা বলব? আমার চোখে নিশ্চয়ই না। তবে মার্শাল আর্ট সম্রাট ব্রুসলি কিন্তু এটাকে কৌশলে বিফলতাই বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কোনো বিষয় নিয়ে বেশি ভাবেলে তা কখনোই অর্জন করা যায় না। আসলেই, কেননা কোন অর্জন বা সফলতা এত সহজ বিষয় নয় যে সে এমনি এমনি এসে ধরা দেবে অমার কাছে। যুগ যুগ ধরে মনস্তাত্বিক চিন্তাধারার পরবর্তী ধাপগুলো পেরিয়ে তবেই তো যুদ্ধের শক্তি সঞ্চয় করতে হয় আর তখনি তো সফলতার ধাপে পৌঁছতে সুবিধা হয়। নেলসন ম্যান্ডেলা এই বিষয়টা খুব ভালোভাবে জানতেন ও অনুধাবন করেছিলেন। আর তাই তো তিনি ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৫৩ সালে বলেছিলেন, ‘স্বাধীনতা অর্জনের কোনো সহজ পথ নেই।’ এটাই তো সত্যি কথা। বাস্তব সত্য যা আমাদেরকে কত রক্তপাতের দ্বারা স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়েছে । আর এটা যদি এত সহজ লভ্যই হতো তবে অনেক পূর্বে-২৩ মার্চ ১৭৭৫ সালে প্যাট্রিক হেনরি অত সহজেই কি আর বলতেন, ‘আমাকে স্বাধীনতা দাও নয় তো মৃত্যু।’ এটা যেন পৃথিবীর এই প্রান্ত আর ঐ প্রান্ত । আর তাই তো মহাত্মা গান্ধী দেশের জনগণের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করতে বললেন। তিনি ৮ আগস্ট ১৯৪২ সালে ‘ভারত ছাড়, বৃটিশ খেদাও (কুইট ইন্ডিয়া )’ আন্দোলনের ডাক দিলেন। এত কিছুর পরেও স্বপ্ন যেন সহজেই বাস্তব হতে চায় না। আমরা দেখতে পাই উইনস্টন চার্চিলের কথায় আরেক সুর। তিনি হয়ত মানুষকে অনেক কিছু দেওয়ার পরেও মনের কষ্টেই বলেছিলেন, ‘দেওয়ার মতো আর কিছুই আমার নেই। আমার এখন আছে শুধু রক্ত কষ্ট অশ্রু আর ঘাম। না হয় আমি স্বাধীনতার জন্য এগুলোও দিয়ে দিলাম।’ কিন্তু তা দিয়েই বা কি লাভ , যদি আমরা অব্রাহাম লিংকনের সুরে বলতেই না পারি। তিনি বলেছিলেন, ‘জনগণের সরকার, জনগনের দ্বারা সরকার, জনগণের জন্য সরকার।’ আমরা কি এখন এই কথাতে আছি না কি সকল কথা মানি কিন্তু তালগাছটা আমার সেই সূত্রে আছি সেটাই যেন বুঝতে পারছি না। আমরা কি পূরণ করতে পারছি বা পেরেছি কি ঐ লোকগুলোর স্বপ্ন। স্বাভাবিক স্বাধীনতা তো আমাদের কোনদিনও ছিল না। সেটা বুঝতে পেরেছিলেন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির একজন যিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর সেই স্বপ্নের স্বাধীনতাকে আমাদের দোড় গোড়ায় পৌঁছে দিতে নিজের জীবন বাজী রাখলেন। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বজ্রকণ্ঠে হুংকার দিয়ে বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।’ স্বাধীনতার পাশাপাশি মুক্তির প্রয়োজন। নইলে সেই স্বাধীনতা মূল্য সাধারণ জনগনের কাছে কতটা মূল্যবান তার একটা প্রশ্ন তো থেকেই যায়। কেননা মৌলিক চাহিদা পূরণে এখনো আমাদের যতটা কৌশলিক অসুবিধায় পড়তে হয়। যারা এটার ভুক্তভুগি তারা এটা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারে। আর সেই স্বাধীনতার ডাকের ধারাবাহিকতা চলতে থাকলো আমাদের অর্জনের গাড়ি। আমরা আজ সেই মহান জিনিসটি হাতে পেয়েছি । কিন্তু পদমর্য়দা এগুলো মøøান করে দিচ্ছে। আমরা যেন পদ-মর্যদা পেলেই সব কিছুই ভুলে যাই। ভুলে যাই আমাদের অতীত। ভুলে যাই ঐ সব মুক্তিপাগল মানুষগুলোর কথা, তাদের মনের সাধ, যারা নিজের জীবনের জন্য, নিজের ভবিষ্যৎ তহবিলের জন্য কোনো চিন্তাই করেনি। চিন্তা শুধু জনগণের ভালোর, জনগণের সুখ ও সমৃদ্ধির । আমরা আজকের নেতা পর্যায়ের মানুষগুলো কতটা মনে রেখেছি তাদের সেই আদর্শিক কথা। এই পৃথিবীতে আমাদের জীবনে যেমন স্বাধীনতার দরকার আছে, তেমনই মৃত্যু পরবর্তী স্বাধীনতার ও দরকার আছে। সেই জীবনে স্বাধীনতার জন্য কেউ হাত বাড়িয়ে আমার আপনার জন্য অপেক্ষা করে আছে। আমরা এই যুগের সম্পদের মোহে আমাদের চেতনায় হয়ত হিসেব মেলাতে পারছি না। কিন্তু মেলানো অবশ্যই প্রয়োজন।
অলোক মজুমদার : চিকিৎসক ও লেখক।





Users Today : 17
Views Today : 17
Total views : 180716
