১৪ ফেব্রয়ারি ভ্যালেন্টাইন ডে বলতে, আমাদের ধারণা তরুণ-তরুণী, প্রেমিক-প্রেমিকারা হাতে হাত রেখে ঘুরে বেড়াবে, গল্প-গুজব করবে, একজন অন্যজনকে ফুল, কার্ড, চকলেট ইত্যাদি দিয়ে শুভেচ্ছা জানাবে, এ সময় ফুলের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। দিনটি সম্পর্কে আবার অনেক বাজে মন্তব্য আছে। অনেকে আবার এই দিনটি নিষিদ্ধ করতে ইচ্ছেমতো উঠে পড়ে লেগেছে। আমি শুধু এতটুকু বলতে চাই, পৃথিবী ততদিন বেঁচে থাকবে, যতদিন পৃথিবীতে ভালোবাসা থাকবে।
ভ্যালেন্টাইন দিনটি নাম করণের পিছনে রয়েছে এক করুণ ইতিহাস। তৃতীয় শতাব্দীতে রোমে সম্রাট ক্লোডিয়াস ২ (২১৩-২৭০ খ্রী.) এর সময়ে ভ্যালেন্টাইন নামে একজন পুরোহিত ছিল। বিশেষ করে তিনি যুবক-যুবতীদের মাঝে কাজ করতেন কিন্তু বিশেষ কারণে পুরোহিত সম্রাটের রোষানলে পড়েন। কারণ হলো সম্রাট তখন সেনাবাহিনীতে লোকবল বাড়াতে চাচ্ছেন, কিন্তু যুবকরা সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে চাচ্ছিল না। কারণ তাদের পরিবার ও স্ত্রী আছে। রাজ্য বিবাহিত যুবকেরা অবিবাহিত যুবকদের চেয়ে দুর্বল। তাই রাজা জারি করলেন যুবকেরা আর বিবাহ করতে পারবে না কিন্তু যুদ্ধে যেতে হবে। বিষয়টি অমানবিক হলেও প্রতিবাদ করার মতো কারও সাহস ছিল না। আর কাউ এ বিষয়ে প্রতিবাদ করলে তাদের মৃত্যুবরণ করতে হবে। আর এই পরিস্থিতিতে একজন খ্রিষ্টান পুরোহিত (ধর্মযাজক) এগিয়ে আসলেন এবং গোপনে বিবাহ উপযুক্ত ছেলে-মেয়েদের বিবাহ দিতে শুরু করলেন। এই পুরোহিতের নাম ভ্যালেন্টাইন। যখন সম্রাট এই ঘটনা জানতে পারলেন তখন তিনি খুব রেগে গেলেন। তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করলেন। প্রচলিত আছে, ভ্যালেন্টাইন যখন কারাগারে ছিলেন তখন কারারক্ষীর মেয়ে ভ্যালেন্টানের প্রেমে পড়েন, কারণ প্রায়ই তিনি ভ্যালেন্টাইনকে দেখতে আসতেন। এর কিছু দিন পর ১৪ ফেব্রুয়ারি সম্রাটের নির্দেষে ভ্যালেন্টানের শিরচ্ছেদ করা হয়। কথিত আছে, ওই দিনে প্রথম তিনি মেয়েটিকে জানান তার ভালোবাসার কথা চিঠির মাধ্যমে, যেখানে লেখা ছিল, “from your valentines”। প্রায় ১৭০০ বছর আগে ঘটে যাওয়া এই দিনটিকে ইউরোপে পরিচিত করে তোলেন চতুদর্শ শতকের জিওফ্রে চসার নামে এক ভদ্রলোক। ধীরে ধীরে এর ব্যাপ্তি বিশ্বের প্রায় সব দেশে পৌঁছায়।
ভালোবাসা নাকি ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে নাকি ভালোবাসার সংজ্ঞা বদলে যায়। যে প্রিয় মানুষটাকে ছাড়া আপনার জীবন অসর্ম্পূণ, যাকে নিজের চেয়ে বেশি ভালোবাসেন তাকে ছাড়া জীবন একদিনেও চলবে না। কিন্তু সে ধারণা একদিন ভুল বলে প্রমাণিত হয়। জীবন বহমান, কারো অনুপস্থিতে জীবন থেমে থাকে না। একটা কথা প্রায় শোনা যায়, ‘‘আমি তোমাকে ভালোবাসি নিজের চেয়েও বেশি।” আমার কাছে এর চেয়ে বড়ো মিথ্যা আর কিছু হতে পারে না। মানুষ নিজের চেয়ে অন্য কাউকে বেশি ভালোবাসতে পারে না। হতে পারে মা-সন্তানের ভালোবাসার সম্পর্ক। বাবা-মা’র সাথের সম্পর্ক। কাছের মানুষের সাথে সম্পর্ক। পৃথিবীতে রক্তের সম্পর্ক বলতে কিছু নেই, স্বার্থ যতদিন সম্পর্ক ততদিন। স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে ব্যস্ততা দেখিয়ে ভুলে যায়। পৃথিবীতে ব্যস্ততা বলতে কোনো কিছু নেই, পৃথিবীতে সবাই ব্যস্ত, মায়ের কোলের শিশুটাও ব্যস্ত আপন গণ্ডিতে। হয়ত কাউকে এড়িয়ে চলার নাম ব্যস্ততা। হয়ত কাউকে সময় না দেওয়ার নাম ব্যস্ততা। হয়থ কাউকে অবহেলা করার নামেই ব্যস্ততা। তারপরেও এর মধ্যে মানুষ-মানুষকে ভালোবাসে, ভালোবাসার মধ্যে অনেক স্বার্থ থাকে, থাকে অনেক কারণ। ভালোবাসার স্বার্থ হাসিল হলে ভালোবাসাও ফুরিয়ে যায়। তারমানে কি পৃথিবীতে ভালোবাসা বলতে কিছু নাই? একটা প্রবাদ আছে, সরকারি চাকরি আর সত্যিকার ভালোবাসা নাকি যোগ্য ছেলেরা পায় না, কথাটা পুরোটা সত্যিই না হলেও মিথ্যা নয়। যারা ভালোবাসা নিয়ে খেলা করে তারা নাকি ভালোবাসা পায়, কিন্তু যারা প্রকৃতভাবে ভালোবাসা তারা কখনেই ভালোবাসা পায় না। মানুষের মন রংধনুর মতো, ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায়। কখন যে কাকে ভালো লাগে যায় তা বলা যায় না। তবে কাউকে ভালো লাগা অপরাধ নয়। কিন্তু সব ভালো লাগা ভালোবাসায় পূর্ণতা পায় না, কারণ ভালোলাগা আর ভালোবাসা এক না। কার জন্য বুকের মধ্যে শূন্যতা অনুভব করা,কারো সাথে চলার জন্য তীব্র ইচ্ছা, তাকে নিয়ে ভাবার নাম ভালোবাসা। প্রথমে দেখা, দেখা থেকে ভালো লাগা, তারপর চেনা-জানা, নিজেদের মধ্যে বোঝা পড়া, বিশ্বাস সৃষ্টি আর এভাবে ভালোবাসার জন্ম হয় ।
ভালোবাসা একটি তালগাছের মতো, একটি বীজ থেকে যেমন একটি পূর্ণাঙ্গ গাছের সৃষ্টি হয় তিলে তিলে যত্ন করে। আবার একটি গাছ বেড়ে উঠতে অনেক সময় লাগে। অনেক কষ্ট পরিশ্রেম করতে হয়, কিন্তু একটা পূর্ণাঙ্গ গাছ নষ্ট করতে মাত্র অল্প কিছু সময় লাগে, করাত দিয়ে কাঁটতে। তেমনি যদি ভালোবাসায় কখন ও অবিশ্বাস প্রবেশ করে সেই অবিশ্বাস, করাতের মতো ভালোবাসাকে নষ্ট করে দেয়, তাই ভালোবাসা বেঁচে থাকে বিশ্বাসের উপর, বিশ্বাস ছাড়া ভালোবাসা কখনই টিকে থাকতে পারে না। রংধনুতে সাতটি রং থাকে, একারণে রংধনু এত সুন্দর দেখায়, তেমনি ভালোবাসায় দুঃখ-কষ্ট, হাসি-কান্না মিশে থাকে বলে, ভালোবাসা মানুষের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকা। শুনেছি মেয়েরা নাকি সহজে প্রেমে পড়ে, আবার প্রেমে পড়লে সহজে ভুলতে পারে, যখন একটা মেয়ে কারও প্রেমে পড়ে তখন তার জন্য সব কিছু বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত। এমনকি নিজের পরিবারকে বিসর্জন দিয়ে দেয়। আমি বলতে চাই, ভালোবাসা নির্দিষ্ট কারো জন্য নয় ভালোবাসা সবার জন্য, বিধাতার সব সৃষ্টির জন্য।
ভালোবাসা দিবসের তাৎর্পয কী? এই ভালোবাসা কি প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ, নাকি সবাইকে ভালোবাসতে বলে? দিনটির মর্মবাণী—আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে মুক্তি হওয়া, পরের জন্য নিজকে উৎসর্গ করা, নিঃস্বার্থভাবে মানুষকে ভালোবাসা। ভালোবাসা আমাদের উৎসর্গ করতে শিখায়। শেখায় হাসি আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে। সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে শুধু তরুণী-তরুণী শুধু নয়, নানা বয়সের মানুষের ভালোবাসার বহুমাত্রিক রূপ।






Users Today : 8
Views Today : 8
Total views : 177259
