আমি একটা সুন্দর পৃথিবী চাই। আমরা একটা সুন্দর পৃথিবী চাই। তোমরা আমাকে একটা সুন্দর পৃথিবী উপহার দাও। আমি ঈশ্বরদী বাজারে ঢুকলেই, আমাদের এক কমরেড জাহিদুল ইসলাম রিপন ভাইয়ের ফুলের দোকানে বসে চা-বিস্কুটা খাই আর এই সমাজ নিয়ে আলোচনা করি। আলোচনাটা নিতান্তই নিজেদের মধ্যেই রাখি কেননা এখন তো কান কথা বিকৃতভাবে ছড়াতে দেরি লাগে না। সম্প্রতি এমন এক চা-বিস্কুটের আলাপে কথা হতে হতে রিপন ভাই বলছিল, আমরা একটা সুন্দর পৃথিবী চাই। তোমরা আমাকে একটা সুন্দর পৃথিবী উপহার দাও। এই বিষয় নিয়ে কিছু লিখেন। আসলে আমার প্রতিটা লেখার মধ্যেই আমি সমাজের অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরতে চেষ্টা করি। যদিও আজ আমরা এখন ঢুকে গেছি বৈষম্যপূর্ণ সমাজে, যেখান থেকে সুন্দর পৃথিবী গড়ার আশা খুবই নগণ্য। আসলে সব কিছু চাইলেই যে পাবো তাও তো নয়, আবার সবার চাওয়া তো এক নয়। তবে এই যে চাইলাম সেটাও তো একটা ইতিহাস হয়ে থাকল। আমরা আসলে চাই এমন একটা সমাজ যেখানে মানুষ শুধুই মানুষ নামের জীব হিসেবেই তার স্বীকৃতি পাবে, কোনো বৈষম্য বা শ্রেণী বা ধনী গরীবের কোনো বিভেদ থাকবে না মানুষে মানুষে। চাই বৈষম্যহীন, শোষণহীন, বিভেদহীন, জাতী-ধর্ম-বর্র্ণ-গোত্রহীন, সকল মানুষের জন্য সুন্দরভাবে বাসযোগ্য একটা সুন্দর পৃথিবী। যেখানে কোনো চিকিৎসালয় হবে না ব্যাবসার কেন্দ্র, থানা হবে না টর্চার সেল, ধর্ম হবে না কোনো বাধার কারণ, অফিস আদালত হবে না কোনো হয়রানির মাধ্যম, স্কুল কলেজ হবে না শুধু মানুষের উপকারের জন্য জ্ঞান অর্জন ছাড়া, অন্য কোনো শিক্ষার মাধ্যম। আবার যেখানে থাকবে খাদ্য নিরাপত্তা, চলাচলে নিরাপত্তা, কথা বলায় নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা, কর্মের নিরাপত্তা। আজ নিরপত্তাহীন সমাজে প্রতিদিনই পত্রিকা খুললেই দেখি, শিশু থেকে বৃদ্ধা ধর্ষিত হচ্ছে, খুন হচ্ছে, নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। পুরুষরাও যে নির্যাতন থেকে বাদ যাচ্ছে তা নয়। আসলে সামাজিক সচেতনতার অভাবেই এই সামাজিক অপরাধগুলো সংগঠিত হতে থাকে ও হচ্ছে। নিজেকে না বদলিয়ে অন্যকে বদলানোর কথা বললে কি সে বদলাতে পারে? আবার অপরাধীদের বিচারগুলোও কেমন যেন মনে হয় বৈষম্যের চাদরে আবৃত্ত থাকে। আসলে মনের বেদনায় কতই না চিন্তা করি আমি। কোনো কোনো সময় এই বেদনা হাসপাতালের বিছানায় বা মৃত্যুর দিকেও নিয়ে যেতে চায়। লোভের পৃথিবীতে নিজেকে নির্লোভ রাখা খুবই কঠিন কাজ। এই লোভ চিরকালের জন্য কত পবিত্র সম্পর্ককে নষ্ট করে দেয়। মন থেকে কাছের মানুষগুলোকে অনেক দূরে ঠেলে দেয়। ভালোর আর কোনো চিহ্ন থাকে না তখন। মন্দকেই ভালো বলার সংস্কৃতিতে নিমজ্জিত করে ফেলি নিজেকে। স্বার্থপর লোভ, অর্থের নেশায় মাতাল স্বভাব, ক্ষমতার অনৈতিক ব্যবহার, অহংকার, সঠিক বিচার প্রক্রিয়াকে দূষিত বা বিকৃত করা, এইগুলো কেন যে এই সমাজের একটা প্রচলন হয়ে গেছে। আমরা দাবি করি জ্ঞান-বিজ্ঞানে কতই না অগ্রসর হয়েছি। এটা সত্য কথা। কেননা গুহা থেকে প্রাসাদ, চাকা থেকে মহাকাশযান, আগুন থেকে লেজার রশ্মি, হাত পাখা থেকে এয়ার কন্ডিশনার, প্রদীপ বা মশাল থেকে পাওয়ার হাউজ, অপারেশনের নরুণ থেকে মাইক্রো সার্জারি এই সবই আমাদের নাগালের মধ্যে ধরা দিয়েছে। অসলেই মানব প্রজাতির সেই সংস্কৃতির অগ্র গমন হয়েছে ঠিকই কিন্তু মানুষের থেকে মানুষের অন্তরের দূরত্ব সেই সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই যে ঈদের ছুটি বা পুজোর ছুটিতে আর নানী বাড়ি যেতে হয় না আমাদের সন্তান বা নাতি নাতিনীদের। সেই পোস্টকার্ড বা খামে কারো কুশল সংবাদের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। ৬ মাস বা বছর পরে কারো বাড়িতে গেলে, সেই তখন যে অন্তরের টান ছিল, আজ আর তা দেখা যায় না। আধুনিকতা আমাদের কত সহজেই অন্তরের দূরত্ব সৃষ্টি করে দিয়েছে। অলীক জ্ঞানে আমরা নিজেদের কতভাবেই না সাজাই। অলীক বিশ্বাস, অলীক নিরাপত্তা, অলীক ইচ্ছাপূরণ, অলীক পরজন্মের চিন্তা। এগুলোই মানুষে মানুষে বিভাজন রেখা তৈরি করে দিচ্ছে চরমভাবে। আর এই অলীক মহাজ্ঞানেই পরিচালিত হচ্ছে আমাদের সমাজ বা রাষ্ট্র তাই মাঝে মাঝে মনে হয়।। তীব্র অলীকতাও আমাদের মাঝে অদৃশ্য এক দেয়াল তৈরি করে দিচ্ছে। সবাই যেন যার যার মতো করে দর্শন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি সামনের দিকে। একজন যখন কোনো দর্শনের আলোকে আত্মঘাতী হয়ে জীবনের মায়া ত্যাগ করতে নিজেকে প্রস্তুত করছে, তখন তাকে আমরা টেরোরিস্ট বা ক্রিমিনাল বলে আখ্যায়িত করছি। হয়ত তার দর্শনে সে ঠিকই ছিল। আমার দর্শনে আমি ঠিক। নইলে এমন হবে কেন।
আসলে আমি সুন্দর পৃথিবী চাইলেই কি আর তা পেয়ে গেলাম। আবার এই ঘুণে ধরা সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই বা কতক্ষণ মাজা সোজা করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারব আমি। ভয় হয় কখেনো যদি রাষ্ট্রীয় কোনো শক্তি আমার বাক রুদ্ধ করতে মরিয়া হয়ে যায়। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘‘দিনের তাপে রৌদ্র জ্বালায়, শুকায় মালা পুজোর থালায়, এই মøানতা ক্ষমা করো, ক্ষমা করো প্রভু।’’ তার মানে তিনিও সারেন্ডার করলেন তার প্রভুর কাছে। আসলে সভ্যতা যখন নিজের সম্মান রক্ষার্থে ব্যর্থ হয়, তখন সেই সভ্যতাকে পরিত্যাগ করাই ভালো। নিজেকে গুটিয়ে নির্জনে প্রকৃতির মধ্যে হারিয়ে ফেলাই ভালো। সেখানে নিজেকে অদৃশ্য শক্তির কাছে সমর্পণ না করে আর উপায় থাকে না।
কাকে প্রেম দেবো আর কার কাছ থেকে প্রেম পাওয়ার আশা করব আমি। কবি নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, আমি প্রেম দিতে ও প্রেম নিতে এসেছিলাম কিন্তু সেই প্রেম আমি পেলাম না। তিনি কোন প্রেমের কথা বলতে চাইছেন। তিনিও তাহলে শেষে সারেন্ডার করলেন।
আমাদের কমরেড জসিম উদ্দীন মন্ডল, যিনি তার জীবনের সমস্ত সময়ই মানুষের মঙ্গলের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। এক সময় তিনি বলেছিলেন, দরখাস্ত করে বা হুজুরের পান পড়া দিয়ে বা সেøাগান দিয়ে, এই সমাজ একচুলও পরিবর্তন করা যাবে না। কিন্তু তিনিও তার অন্তিমকালে সারেন্ডারের সুরেই বলেছিলেন যে, সুদীর্ঘ জীবনের খাতায় হিসেব মেলাতে গিয়ে দেখি শূন্য।
আবার আমি আমার একটা কবিতায় লিখেছিলাম, ফসলে ফলে ভরেছো গোলায়, গ্রীষ্মের ফল ঐ চলে যায়, উৎসবে মোহে গানে ও বিলাপে, দুঃখের কঠিন দিনের বেলায়। অন্ন জলের পিপাসায় নয়, হৃদয়ে তবু কেন দুর্ভিক্ষ হয়, শ্রবণে দর্শনে ক্ষুধা থেকে যায়, জীবনের বাণী কানে বাজে নাই। স্বপ্ন সাধে ঘুরিয়া ফিরিয়া, কাটানু সময় হাসিয়া খেলিয়া, বসন্তের পরে বর্ষা আসিয়া ডুবিয়ে দিলো বরষায়। টসটসে ফল অকালে ঝরিয়া, রেখে গেল শুধু শূন্য করিয়া, আশা যত ছিল শেষ হয়ে গেল, এক নিমিষের দোলায় ।
ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের একটা কথা দিয়েই কথা দিয়েইে শেষ করতে চাই। তিনি বলেছিলেন, চোখের সামনে মানুষ অনাহারে মরিবে, ব্যধি জরা মহামারিতে উজাড় হয়ে যাবে, আর দেশের মানুষ চোখ বুজে ভগবান ভগবান করবে। এমন ভগবৎ প্রেম আমার নেই, আমার ভগবান আছে মাটির পৃথিবীতে, স্বর্গ আমার চাই না। বারে বারেই যেন ফিরে আসি এই মর্তের বাংলায়, মানুষের সেবার উদ্দেশ্যে।
তাই আসুন না, আমরা সবাই এই মর্তের মানুষের কথা ভাবি। তাদের সুখ দুঃখে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াই। আগামীর সুন্দর পৃথিবীর জন্য নিজেকে সঁপে দেই।
অলোক মজুমদার : চিকিৎসক ও লেখক।





Users Today : 12
Views Today : 13
Total views : 184106
