খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শুভ বড়দিন বা হ্যাপি ক্রিসমাস ডে। বর্তমান সময়ে সারা বিশ্বব্যাপী যে দিনটাকে সবচেয়ে বেশি মানুষ উদ্যাপন করে সেটি হচ্ছে বড় দিন। যীশু খ্রীষ্টের জন্মদিন। ফিলিস্তিনের বেথেলহেমে এই দিনে এক জরাজীর্ণ গোয়ালঘরে জন্ম নিয়েছিলেন এক মহামানব যার নাম যীশু খ্রীষ্ট। তখন থেকেই খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বীরা এই দিনটিকে বড়দিন হিসেবে পালন করে আসছে। প্রায় দুই হাজার বছরের অধিক কাল ধরে পালিত হয়ে আসছে বড় দিন। ব্যাপক আড়ম্বরের মাধ্যমে দেশে দেশে এ দিনটি পালিত হয়। সান্তা ক্লজের আবির্ভাব, ক্রিসমাস ট্রি, আলোকসজ্জা, উপহার, কেক, ঘোরাঘুরি, মজার খাবার, গির্জায় প্রার্থনা এবং প্রিয়জনের সান্নিধ্যে কাটানো হয় দিনটি পরম আনন্দে। এটা খ্রীষ্ট ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব।
খ্রীষ্ট ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করে, খ্রীষ্ট ধর্মের প্রবর্তক প্রভু যীশু ঈশ্বরের পুত্র। পৃথিবীতে শান্তির বাণী ছড়িয়ে দিতে, মানবজাতিকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালনা করতে এবং সৃষ্টিকর্তার মহিমা প্রচারের লক্ষ্যে প্রভু যীশুর পৃথিবীতে আগমন ঘটেছিল। দুই হাজার ২২ বছর আগে তিনি আশ্চর্যজনকভাবে ঐশী শক্তিতে কুমারী মা মরিয়মের কোলে জন্মগ্রহণ করেন। মানবজাতির প্রতীক্ষিত মুক্তিদাতা প্রভু যীশু ৩০ বছর বয়সে প্রকাশ্যে প্রচার শুরু করেন।
ইতিহাস অনুযায়ী রোমান সাম্রাজ্যের সময় ৩৬৬ খ্রীষ্টাব্দে প্রথম বড়দিনের উৎসব পালন করা হয়। পোপ জুলিয়াস প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে যীশু খ্রীষ্টের জন্মদিন উপলক্ষে বড়দিন উৎসব পালন করার ঘোষণা দেন। সেই থেকে দেশে দেশে এই দিনটি পালন হয়ে আসছে। তবে এর আগে বড়দিনের উৎসব তেমন জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না এবং তা ইউরোপের বাইরে ছড়ায়নি। মূলত মধ্যযুগের পরে একেবারে আধুনিক সময়ে বড়দিনের উৎসব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। বলতে গেলে অনেকটা ঔপনিবেশিকতার হাত ধরে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে তা সার্বজনীন উৎসবে রূপ নিয়েছে। ডিসেম্বর মাসের পঁচিশ তারিখ যীশু খ্রীষ্টের জন্মদিন উপলক্ষে বড়দিন পালন করা হয়। তবে এদিনটি যীশু খ্রীষ্টের জন্মদিন কিনা তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বীদের মতে এই তারিখের ঠিক নয় মাস আগে মা মরিয়মের গর্ভে এক আলোক জ্যোতির মতো প্রবেশ করেন যীশু। সে হিসাবে ২৫ ডিসেম্বর তারিখটি যীশু খ্রীষ্টের জন্মদিন ধরা হয়। খ্রীষ্টান ধর্মের প্রবর্তক যীশু খ্রীষ্টের জন্ম হয় অলৌকিকভাবে। খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বীদের মতে যীশু খ্রীষ্ট পৃথিবীতে মানুষ রূপে জন্ম নেন পৃথিবীর পাপাচার হতে মানুষকে মুক্তি দিতে। মানুষের মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় করতে। বড়দিন এখন খ্রীষ্টান ধর্ম ছাড়িয়ে সব ধর্ম বর্ণের মানুষের কাছে আবেদন সৃষ্টি করেছে। অন্য তথ্যমতে এটি ঐতিহাসিক রোমান উৎসব। পবিত্র বাইবেলে যীশুর জন্মদিন সম্পর্কে পরিষ্কার কিছু উল্লেখ নেই। এর ইতিহাস জানতে যেতে হবে যীশু খ্রীষ্টের জন্মের আগে মানব সভ্যতার গোড়ার দিকে। রোম সাম্রাজ্যে ইউরোপের সবচেয়ে বড় উৎসব ছিল তাদের কৃষি দেবতা এবং শনি গ্রহের সম্মানে এক বিশেষ উৎসব। এই উৎসব শীতের মাঝামাঝি সময়ে ২৫ ডিসেম্বর এর দিকে পালিত হতো। তখন রোম সাম্রাজ্যে সবকিছু বন্ধ থাকত কয়েক দিন। ধনী-গরিব ছোট-বড় সবাই ভেদাভেদ ভুলে যেত। সে সময় অবশ্য যীশুর অনুসারীরা এ উৎসবকে বিধর্মী উৎসব বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তখন ২৫ মার্চকে মহান দিন হিসেবে ঠিক করা হতো। যে দিন স্বর্গ ও মর্তের স্রষ্টা সর্বশক্তিমান ঈশ্বর তার মহাদূত গ্যাব্রিয়েলকে কুমারী মরিয়মের কাছে পাঠিয়ে এই সংবাদ দেন যে, ঈশ্বরের ইচ্ছায় ও অলৌকিক ক্ষমতায় কুমারী মরিয়ম গর্ভবতী হবেন এবং ঈশ্বরের পুত্রকে গর্ভে ধারণ করবেন। তার নাম রাখা হবে যীশু। কুমারী মরিয়ম গর্ভবতী হওয়ার নয় মাস হিসাবে ২৫ ডিসেম্বর যীশুর জন্মদিন। ৩৩৬ খ্রীষ্টাব্দ থেকে রোমান বর্ষপঞ্জিতে ২৫ ডিসেম্বরকে বড়দিন হিসেবে উৎযাপনের নির্দেশনা দেয়া হয় বলে জানা যায়। রোমান সাম্রাজ্যে খ্রীষ্ট ধর্ম রাষ্ট্র ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করলে দিনে দিনে বড়দিন প্রাণ পেতে শুরু করে। দিন ও তারিখের মতভেদ থাকলেও যীশু খ্রীষ্টের মাহাত্ম্য স্বমহিমায় উজ্জ্বল।
যীশু যে প্রেমের বাণী, মানবতার বাণী উচ্চারণ করেছিলেন তা আজো মানুষের চলার পথের দিশারী হয়ে কাজ করছে। ক্ষমাই ছিল যীশুর মূল প্রেমের বাণী।
মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তেও যীশু বলেছিলেন, পিতা ওরা জানে না ওরা কি করছে, ওরা অবুঝ ও অজ্ঞান। তুমি ওদের ক্ষমা করে দাও। যীশু বলেছিলেন, তোমার প্রতিবেশীর জন্য তাই কামনা কর, যা তুমি নিজের জন্য চাও। তিনি বলতেন, সবাইকে ক্ষমা কর। তিনি বলতেন, যতক্ষণ সবাইকে তুমি ক্ষমা করবে না ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি স্বর্গে প্রবেশ করবে না। ঈশ্বর তাকেই ক্ষমা করেন, যে সবাইকে ক্ষমা করে। তাই শুভ বড়দিন শুধুমাত্র যীশুর জন্মদিন নয় এটি পরস্পরকে ক্ষমা করার এক মহেন্দ্র ক্ষণ।
মুক্তিদাতা যীশুর
জন্মদিন উদযাপন মানে আগের ভুলগুলো শুধরে জীবনকে নতুনভাবে সাজানো।
তাছাড়া বিশ্বের কোটি কোটি খ্রীষ্টান ২৫ ডিসেম্বর বিশ্বাসভরা অন্তরে গভীর আশা ও আনন্দ নিয়ে ক্রিসমাস অর্থাৎ বড়দিন উদ্যাপন করে। প্রভু যীশু শিক্ষা দেন, ঈশ্বর আমাদের সবাইকে ভালোবাসেন। সূর্যের আলো ও বৃষ্টির ধারা যেমন সবার ওপর ঝরে পড়ে, ঠিক তেমনি ঈশ্বরের ভালোবাসা সবার জন্য উন্মুক্ত ও অবারিত। আমরা যেন একে অন্যকে ভালোবাসি, পরস্পরকে ক্ষমা করি এবং অন্যের সেবা করি। প্রতিবেশী ভাই-বোনদের, বিশেষ করে অন্নহীন, বস্ত্রহীন, অসায় ও গরিব-দুঃখী মানুষের যখন আমরা সেবা করি, তখন তিনি (ঈশ্বর) সেবা গ্রহণ করেন। তিনি শিক্ষা দেন, আমরা যাতে পাপকে ঘৃণা করি, পাপীকে নয়। তিনি বাণী প্রচারের মধ্য দিয়ে এ জগতে যে ঐশিরাজ্যের সূচনা করেছিলেন, তার প্রধান মূল্যবোধগুলো হলো—ন্যায্যতা, শান্তি ও পবিত্রাত্মায় নির্মল আনন্দ।
যীশুর জন্মদিন যেন প্রত্যেক খ্রীষ্টানের জন্মদিন। এদিন খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বীরা নিজের এবং সবার মুক্তি কামনা করে।
জেমস আব্দুর রহিম রানা : জেষ্ঠ্য গণমাধ্যমকর্মী ও খ্রীষ্টিয় ধর্মতত্ত্ব গবেষক।





Users Today : 23
Views Today : 25
Total views : 180724
