ত্রিভুবন জয় করার পর যীশু খ্রিষ্ট সশরীরে স্বর্গে উন্নীত হওয়ার পূর্বে শিষ্যদের আদেশ দিয়েছিলেন, ‘তোমরা গিয়া সমুদয় জাতিকে শিষ্য কর; পিতার ও পুত্রের ও পবিত্র আত্মার নামে তাহাদিগকে বাপ্তাইজ কর; …আমিই যুগান্ত পর্যন্ত প্রতিদিন তোমাদের সঙ্গে সঙ্গে আছি।’ যীশুর এই মহান আদেশকে সামনে রেখে দেশে দেশে জাতিগণের মধ্যে পাপ থেকে মুক্তির বাণী, ভালোবাসার বাণী প্রচারিত হয়ে চলেছে। খ্রিষ্ট ধর্ম বর্ণ প্রথায় বিশ্বাস করে না বলেই সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে কূলীন সম্প্রদায়সহ সর্বস্তরের মানুষ একই কাতারে দাঁড়াতে পেরেছে। হাজার হাজার আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর অনেক মানুষ এখন পুরোপুরি যীশু খ্রিষ্টের অনুসারী। বিশ্ব ব্রাহ্মা-ের আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর অন্তর আত্মায় বিশ্বাস স্থাপিত হয়েছে যে, যীশু খ্রিষ্টের গরিবী হালের জন্ম দিয়েই সার্বজনীন হয়েছেন। আমরা যদি প্রভু যীশু খ্রিষ্টের বংশ তালিকার দিকে তাকায়, তাহলে দেখা যাবে যে, চারজন স্ত্রী লোকই ছিলেন পরজাতীয়। তাঁরা হলেন-তামার > কনানীয়; রাহব > কনানীয়; রূত > মোবাবীয়; বাথশিবা > হিত্তীয়।
সকল জাতিগণের মূর্ত প্রতীক
যীশুর জন্মের পরপরই স্বর্গীয় দূতগণের ঘোষণা মাঠের রাখালদের উদ্দেশ্যে ছিল ‘… সেই আনন্দ সমুদয় লোকরই হইবে’ (লূক ২:১০) এবং জন্ম সংবাদের পর দূতগণ গেয়ে উঠেছিল ‘উর্ধ্বলোকে ঈশ্বরের মহিমা, পৃথিবীতে (তাঁহার) প্রীতিপাত্র মনুষ্যদের মধ্যে শান্তি’ (লূক ২:১৪)। এই সংক্ষিপ্ত গীতকে বলা হয় গেন্টারিয়া ইন এক্সেলসিস (অর্থাৎ সর্বোচ্চ ঈশ্বরের গৌরব)। পূর্বদেশের (সম্ভবত চীন দেশ) প-িতরা যিহুদা বংশের লোক ছিলেন না। কারণ প-িতরা বলেছিলেন যে রাজা জন্মিয়েছেন, তিনি কোথায়? তাঁরা যিহুদী হলে অবশ্যই আমাদের রাজা বলতেন। যোসেফ ও মরিয়ম যীশুকে ধর্মধামে নিয়ে গেলে ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি শিমিয়ন বলে উঠেছিল ‘…যাহা তুমি সকল জাতির সম্মুখে প্রস্তুত করিয়াছ, পরজাতিগণের প্রতি প্রকাশিত হইবার জ্যোতি ও তোমার প্রজা ইস্রায়েলের গৌরব।’ প্রভু যীশু খ্রিষ্টের বাপ্তাইজ পূর্বে যোহন ভাববাদী মরু প্রান্তরে ঘোষণা করে চলেছিলেন, সমস্ত মর্ত্য ঈশ্বরের পরিত্রাণ দেখিবে (লূক ৩:৫)। যীশু সম্পর্কে পবিত্র কোরআন-এর সূরা ২১ আম্বিয়া ৯১ তে বলা হয়েছে ‘এবং স্মরণ কর সেই নারীকে, যে নিজ সতীত্বকে রক্ষা করিয়াছিল, অতঃপর তাহার মধ্যে আমি আমার রূহ ফুঁকিয়া দিয়াছিলাম এবং তাহাকে ও তাহার পুত্রকে করিয়াছিলাম বিশ্ববাসীর জন্য এক নির্দশন।’ পঞ্চাশত্তমীর দিনে বিভিন্ন ভাষায় কথা বলার শক্তি এবং ১২টি জাতিকে সত্য কথা শুনিবার সুযোগ দিয়েছিলেন (প্রেরত ২:৫-১৩)। এখন পৃথিবীর কয়েক হাজার আদিবাসীদের ভাষায় পবিত্র বাইবেলে অনূদিত হয়ে প্রভু যীশু খ্রিষ্টকে জানতে পেরেছে; গ্রহণ করেছে মুক্তিদাতারূপে। খ্রিষ্টধর্ম ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষার সংরক্ষণ, প্রসার এবং প্রচারের ক্ষেত্রে এক অন্যন্য অবদান রেখে চলেছে।
সার্বজনীন হিসেবে ভবিষ্যৎ বাণী
পৃথিবীর বিভিন্ন জাতিগণ যীশুর অনুগামী হবে এই বিষয়ে অনেক ভবিষ্যৎ বাণী করা হয়েছে। যীশু জন্মের কয়েকশত পূর্বে যিশাইয় ভাববাদী যীশু সম্পর্কে ভাববাণী করেছিলেন, ‘দেখ আমার দাস, তিনি আমার মনোনীত, আমার প্রিয়, আমার প্রাণ তাঁহাতে প্রীত, আমি তাঁহার উপরে আপন আত্মাকে স্থাপন করিব, আর তিনি জাতিগণের কাছে ন্যায়বিচার প্রচার করিবেন।’ এছাড়া অন্যত্র জায়গায় বলা হয়েছে, ‘… যেহেতু আমার গৃহ সর্বজাতির প্রার্থনা গৃহ বলিয়া আখ্যায়িত হইবে’ (যিশাইয় ৫৬:৭)। ‘আর জাতিগণ তোমার দীপ্তির কাছে আগমণ করবে, রাজগণ তোমার অনুণোদয়ের আলো কাছে আসবে (যিশাইয় ৬০:৩), জাতিগণ ঈশ্বরের আশির্বাদের আকাক্সক্ষা করবে (যিশাইয় ৫৫;৫), সমস্ত জাতিগণ তাহার দিকে স্রোতের ন্যায় প্রবাহিত হইবে (যিশাইয় ২:৩)। ‘পৃথিবীর প্রান্তস্থিত সকলে স্মরণ করিয়া সদাপ্রভুর প্রতি ফিরিবে; জাতিগণের সমস্ত গোষ্ঠী তোমার সম্মুখে প্রণিপাত করিবে (গীত ২২:২৭)। তোমাতে ভূম-লের যাবতীয় গোষ্ঠী আশির্বাদপ্রাপ্ত হইবে (আদি ১২:৩)। আর আমি সর্বজাতিকে কম্পাণ্বিত করিব এবং সর্বজাতির মনোরঞ্জন বস্তু আসিবে, আর আমি এই গৃহ প্রতাপে পরিপূর্ণ করিব, ইহা বাহিনীগণের সদাপ্রভু বলেন (হগয় ২:৭)।
পরজাতীয়দের কাছে যীশুর কাজ
শয়তানের চাতুরী পরীক্ষার পর প্রকাশ্যে পরজাতীয়দের মধ্যে সেবাকাজ আরম্ভ করেন (মথি ৪:১৫-২৫)। যীশু ৪০০০ (চার হাজার) পরজাতীয়কে (সোর/সীদনের লোক) খাওয়ালেন (মথি ১৫:২৯-৩৯)। পরজাতীয়দের কাছে সাক্ষ্য দেবার জন্য শিষ্যদের প্রস্তুত করেন। মথি ১০ঃ১৮ পদে বলা হয়েছে ‘এমন কি, আমার জন্য তোমরা দেশাধ্যক্ষ ও রাজাদের সম্মুখে, তাহাদের ও পরজাতিগণের কাছে সাক্ষ্য দিবার জন্য, নীত হইবে।’ দেশাধ্যক্ষ বলতে সে প্রদেশে রোমান তত্ত্বাবধায়করা; এর তিনটি-স্তর প্রপ্রেইটরস, প্রোকনসুল ও প্রকিউরেটরস। রাজা বলতে রোমের সামস্ত রাজকুমাররা, কিন্তু নীতিগতভাবে বিশ্বজনীন অত্যাচার নির্দেশনা দিতে প্রাচ্যের অন্যান্য শাসক ও পার্থিব শাসকদেরকেও বুঝায়। প্রেরিত ১:৮ পদে ‘পবিত্র আত্মা তোমাদের উপর আসিলে তোমরা শক্তিপ্রাপ্ত হইবে; আর তোমরা যিরূশালেমে, সমুদয় যিহুদিয়া ও শমরিয়া দেশে এবং পৃথিবীর প্রান্ত পর্যন্ত আমার সাক্ষী হইবে। যিরূশালেমকে স্থানীয়রূপে, যিহুদিয়াকে প্রাদেশিকরূপে, শমরিয়াকে সাংস্কৃতিক ও জাতিগত সীমানা ছাড়িয়ে এবং পৃথিবীর প্রান্ত পর্যন্ত সকল জাতির নিকট টিকা কারকগণ বুঝিয়েছেন।
যীশু শিষ্যদের শিক্ষা দিয়েছিলেন শত্রুদিগকে ক্ষমা করিতে। শত্রুরও কোনো জাত পরিচয় নেই। রোমীয় শতপতি যীশুকে অনুরোধ করেছিল, রোমীয় শতপতির অনুরোধে যীশু বলেছিলেন ইস্রায়েলের মধ্যে কাহারও এত বড় বিশ্বাস দেখতে পাই নাই (মথি ৮:১০)। কাননীয় স্ত্রী লোক (মথি ১৫: ২৮)। প্রত্যাখ্যাত দায়ূদের পুত্র হিসেবে খ্রিষ্ট একজন ফৈনীকীয় স্ত্রীলোকের সেবা করেন সে ইস্রায়েলীয় ছিল না। দু’টি প্রধান সমুদ্র বন্দরের দরুন ফৈনীকিয়াকে ‘সোর ও সীদন এলাকা’ বলা হয়ে থাকে। এখানে ‘কুকুর’ বলতে অযিহুদীদেরকে বলা হয়েছে, কারণ যিহুদীদের মতো আত্মিক সুযোগ ছেলেমেয়েদের খাবার তাদের ছিল না। যখন এই কাননীয় স্ত্রীলোক যীশুকে ‘প্রভু’ বলে ডাকল এবং তাঁর প্রতি নম্রতাপূর্ণ বিশ্বাস প্রকাশ করল; তখন তার অনুরোধ অনুসারে যীশু কাজ করেছিলেন। এই ঘটনা ছিল ভবিষ্যতের একটা ছবি, যখন অযিহুদীরা পাপ থেকে উদ্ধার পাবে। ‘এইজন্য আমি তোমাদিগকে কহিতেছি, তোমাদের নিকট হইতে ঈশ্বরের রাজ্য কাড়িয়া লওয়া যাইবে, এবং এমন এক জাতিকে দেওয়া হইবে যে জাতি তাহার ফল দিবে।
অর্থাৎ মনোনীত জাতির নিকট থেকে সার্বজনীন করা হয়েছে (মথি ২১:৪৩)। ‘কিন্তু প্রত্যেক জাতির মধ্যে যে কেহ তাঁহাকে ভয় করে ও ধর্মাচরণ করে, সে তাঁহার গ্রাহ্য হয় (প্রেরিত ১০:৩৫)। সকল জাতির লোকবৃন্দ হইতে শিষ্য করা হবে (মথি ২৪:১৪)। যীশু অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমার আরও মেষ আছে, সে সকল এ খোঁয়াড়ের নয়; তাহাদিগকেও আমার আনিতে হইবে এবং তাহারা আমার রব শুনিবে, তাহাতে একপাল ও এক পালক হইবে’ (যোহন ১০:১৬)। যীশুর রক্তের গুণে ইস্রায়েল ছাড়াও অন্য জাতিরা অন্তর্ভূক্ত হয়েছে (ইফিষীয় ২ঃ ১১-২২)। প্রভু যীশু এখানে জানিয়ে গেছেন যে, তিনি নিজেই সৌলকে ইহুদী অনিহুদী সকলেরই কাছে তাঁর বাণীদূতরূপে মনোনীত করেছেন। আর এও তিনি আগে থেকে স্পষ্টই বলেছেন যে, বাণীদূতের দায়িত্ব পালনের ফলে সৌলকে বহু দুঃখ কষ্ট ভোগ করতেই হবে (প্রেরিত ৯:১৫)।
জাতিগণের জন্য ঈশ্বরের প্রেম
মনোনীত জাতি না হয়েও বহুজাতিগণ যিহোবাতে বিশ্বাস করতেন, তাদের মধ্যে যিথ্রো, নবুখদনিৎসর, রূত, রাহব, নীনবীয় লোকেরা, সারিফাতের বিধাব, নামানসহ অনেকে। জাতিগণের সম্মুখে ঈশ্বরের সন্তানদিগের সাক্ষ্য আমরা পবিত্র বাইবেলে দেখতে পাই। যেমন যোষেফ-মিশরীয়গণের নিকট, নয়মী-মোয়াবীয়গণের নিকট, মোশী- মিদিয়োন নিবাসীগণের নিকট, শলোমন-আরবীয়দের নিকট, ইশীশায়- সিরিয়া নিবাসীগণের (অরামীয়) নিকট, দায়ূদ-পলেষ্টীয়দের, এলিয়-ফৈনীকিয়াদের নিকট, দানিয়েল-বাবিলনিবাসী, যোনা-নীনবীয়দের নিকট।
স্বর্গ হবে সর্বজাতির মিলনকেন্দ্র
স্বর্গে স্থান পাবে প্রত্যেক জাতির মানুষ, ‘তুমি ঐ পুস্তক গ্রহণ করিবার ও তাহার মুদ্রা খুলিবার যোগ্য; কেননা তুমি হত হইয়াছ, এবং আপনার রক্ত দ্বারা সমুদয় বংশ ও ভাষা ও জাতি ও লোকবৃন্দ হইতে ঈশ্বরের নিমিত্ত লোকদিগকে ক্রয় করিয়াছ (প্রকাশিত ৫:৯)। আর তাঁহাকে কর্তৃত্ব, মহিমা ও রাজত্ব দত্ত হইল; লোকবৃন্দ, জাতি ও ভাষাবাদীকে তাঁহার সেবা করিতে হইবে; তাহার কর্তৃত্ব অনন্তকালীন কর্তৃত্ব, তাহা লোপ পাইবে না, এবং তাঁহার রাজ্য বিনষ্ট হইবে না (দানিয়েল ৭:১৪)। আর আমি তোমাদিগকে বলিতেছি অনেকে পূর্ব ও পশ্চিম হইতে আসিবে এবং অব্রাহাম, ইসহাক ও যাকোবের সহিত স্বর্গরাজ্যে একত্র বসিবে (মথি ৮:১১)।
পরজাতি বলতে ঈশ্বরের মনোনীত জাতিগোষ্ঠী ছাড়া পৃথিবীর হাজার হাজার আদিবাসী জনগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়েছে। যীশু হলেন ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যের মধ্যস্থকারী, তিনি মানব জাতির মুখপত্র, শান্তিরাজ।





Users Today : 128
Views Today : 166
Total views : 182014
