করোনাভাইরাস মহামারির পর গত বছরের মার্চের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।প্রায় ১৭ মাস বন্ধ থাকার পর ১২ সেপ্টেম্বর হতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খুলেছে। দেশে বর্তমানে করোনা সংক্রমণের হার কিছুটা কমতির দিকে হলেও খুব আশাব্যঞ্জক বা আমরা কারোনা সংক্রমণ থেকে পরিত্রাণ পেয়েছি এমনটা না। এখনও দেশের বৃহৎ অংশ টিকার আওতায় আসেনি-এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত অনেক সাহসী হলেও এটা অব্যাহত রাখতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কী পরিকল্পনা, জনস্বাস্থ্যবিদ, শিক্ষক, অভিভাবক,সাংবাদিকদের মতামতের ভিত্তিতে এবারের সংখ্যার প্রচ্ছদ প্রতিবেদন।
পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিভিন্ন শ্রেণীর জন্য স্কুলের সময় এবং দিনের সংখ্যা পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে
ডা. দীপু মনি, শিক্ষামন্ত্রী।

আগস্টের শেষ দিকে সংক্রমণের হার কমে যাওয়াতে ১২ সেপ্টেম্বর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত বহাল থাকছে। সেদিন থেকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিকসহ সকল ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শ্রেণীকক্ষে পাঠদান শুরু করবে।তবে এক্ষেত্রে কিছুসরকারি নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। যেহেতুপ্রায় ১৭ মাস পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলছে, তাই খোলার জন্য সার্বিক প্রস্তুতির দরকার রয়েছে। একই সঙ্গে নতুন পরিস্থিতিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখতে সচেতনতা সৃষ্টির বিষয়েও গুরুত দেয়া হচ্ছে।
সরকার প্রতিদিনের সংক্রমণ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিভিন্ন শ্রেণির জন্য স্কুলের সময় এবং দিনের সংখ্যা পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে। যদি সংক্রমণ বেড়ে যায়, প্রয়োজন হলে আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে খোলা রাখা যায় সেজন্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মচারী,কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অভিভাবকদের সম্পৃক্ততার ওপরও গুরুত্ব দেয়া হবে। গণমাধ্যমসহ সামাজিক মাধ্যমে স্বাস্থ্যবিধি মানার জন্য আরো সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
যখন সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর আগে অভিভাবকরা যেন সন্তানের রোগের কোনো উপসর্গ আছে কিনা বা বাড়িতে কেউ অসুস্থ আছেন কিনা, তার দিকে নজর রাখেন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার ব্যাপারে আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি আছে। এমনকি স্কুল খুলে দেওয়ার পরে দৈনিক বাধ্যতামূলক প্রতিবেদন পাঠানোর বিষয় আছে। এটা এজন্য যে, সংশ্লিষ্ট সবাই যেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন।
অধিকাংশ শিক্ষক-কর্মচারী ইতিমধ্যে টিকা নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ইতিপূর্বে বলেছেন ১৮ বছরের বেশি বয়সীরা টিকা পাবেন। এখন ১২ বছরের বেশি বয়সীদেরও টিকা দেওয়ার কাজ শুরু করতে বলেছেন। সব টিকা ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের দেওয়া যায় না। যেগুলো দেওয়া যায়, সেগুলো সরকার নিয়ে আসছে। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা হচ্ছে। আমরা সেগুলো পর্যায়ক্রমে দেব।
করোনাভাইরাসের কারণে দেড় বছরের বেশি সময় শ্রেণীকক্ষে পাঠদান বন্ধ থাকলেও এসময় অনলাইনে ক্লাস চালু করা হয়েছিল। তবে সমালোচকরা বলছেন, সরকারের সেই উদ্যোগ খুব একটা সফলতা পায়নি। এই পরিপ্রেক্ষিতে অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার বারবার দাবি জানানো হচ্ছিল সাম্প্রতিক সময়ে। এ পর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার বিষয়ে সরকারি বিভিন্ন নির্দেশনা মেনে চলার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটিও বেশ কিছু সুপারিশ করেছে।
সরকারিযেসব নির্দেশনা মেনে চলতে হবে
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরু করলেও সেখানে বেশ কিছু নিয়ম-কানুন এবং নির্দেশনা মেনে চলতে হবে:
●শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে হবে।
●স্কুলে স্যানিটাইজ করার ব্যবস্থা রাখতে হবে। স্কুলে যেতে হলে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক
●চলতি বছর এবং সামনের বছর যারা এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষা দেবে, তাদের প্রতিদিনই ক্লাস নেয়া হবে।
●প্রাথমিক স্কুলে পঞ্চম শ্রেণির ক্লাসও চলবে প্রতিদিন।
●প্রাথমিক স্কুলে প্রথম হতে চতুর্থ শ্রেণি এবং হাইস্কুলে ষষ্ঠ হতে অষ্টম শ্রেণির ক্লাস চলবে সপ্তাহে একদিন করে।
●স্কুলে কোনো অ্যাসেম্বলি হবে না। খেলাধুলা হবে স্বল্প পরিসরে। লাইন বেঁধে ক্লাসে ঢুকতে হবে এবং বেরুতে হবে।
●শুরুতে দিনে ৪ হতে ৫ ঘণ্টা করে ক্লাস নেয়া হবে। পরে সময় আরও বাড়ানো হবে।
●বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের সিন্ডিকেটের সভা করে খোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সুপারিশ
যেসব শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী টিকা নেননি, তাদের দ্রুত টিকা নিতে হবে; প্রতিদিন সবাইকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আনা যাবে না; এখন কেবল এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা ছয় দিন ক্লাস করবেন, আর বাকিরা সপ্তাহে সর্বোচ্চ দুই দিন ক্লাসে যাবে। শ্রেণিকক্ষে বসার আকার আগের চেয়ে ছোটো হবে। বসানোর ক্ষেত্রে শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনাকুনি সিস্টেমে বসাতে হবে। প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ আলাদা থাকবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো জটলা করা যাবে না। স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে। ওয়াশরুম পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। ৫ বছরের ওপরের বয়সীরা মাস্ক পরবেন। আর তা তদারকি করবেন শিক্ষকরা। স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন সংক্রান্ত দিকগুলো নিয়মিত তদারকি করতে হবে।
সব শিক্ষার্থীর শিক্ষা এবং শিক্ষক, কর্মচারী ও সমাজের মঙ্গল এবং স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হবে। তাদের সব ধরনের ঝুঁকি কমাতে যথাযথ ব্যবস্থাপনা দরকার। স্কুল বন্ধ থাকার কারণে শিক্ষার্থীরা যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং তাদের যে মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা কমানোর যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এলাকায় কোভিড-১৯-এর পরবর্তী সংক্রমণ রোধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।
কেন্দ্রীয়ভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত, মানসম্পন্ন ও সঠিক মাপের মাস্কের ব্যবস্থা ও বিতরণ করতে হবে। একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্যবিষয়ক অন্যান্য পদক্ষেপ, যেমন হাত পরিষ্কার রাখা (হাত ধোয়া বা হাত জীবাণুমুক্তকরণ স্টেশন স্থাপন) ও সাধারণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মেনে চলার ব্যবস্থা রাখতে হবে। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরামর্শ অনুযায়ী যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) প্রস্তুত করা দরকার।
স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কমপক্ষে ৮০ শতাংশ শিক্ষক-কর্মচারীর কোভিড-১৯-এর টিকা নেওয়া থাকতে হবে। তাঁরা দ্বিতীয় ডোজের ১৪ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে পারবেন। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে প্রথম ডোজের ১৪ দিন পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগদানের অনুমতি প্রদান করা যেতে পারে। উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ১৮ বছরের বেশি বয়সী শিক্ষার্থীদের দ্রুত টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
শ্রেণিকক্ষে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সমাগম নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য নির্দিষ্ট ক্লাস কোনটি সপ্তাহের কোন দিন হবে, তা বিভক্ত করে দেওয়া যেতে পারে। যেমন প্রথম দিকে পরীক্ষার্থীদের ক্লাস প্রতিদিন খোলা রাখা ছাড়া বাকি সব ক্লাস সপ্তাহের এক বা দুই দিন খোলা রাখা যেতে পারে। এতে একটি নির্দিষ্ট দিনে যে ক্লাসটি খোলা থাকবে, তার শিক্ষার্থীরা অন্য খালি শ্রেণিকক্ষগুলো ব্যবহার করে তাতে নির্দিষ্ট দূরত্ব মেনে বসতে পারবে। প্রাতঃসমাবেশ (অ্যাসেম্বলি) বন্ধ রাখতে হবে। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরামর্শ অনুযায়ী যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) প্রস্তুত করা দরকার।
প্রথম দিকে কম সময়ের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলা রাখার পরামর্শ দিয়েছে কমিটি, যাতে খাবার গ্রহণের জন্য মাস্ক খোলার প্রয়োজন না হয়।
আবাসিক সুবিধাসংবলিত স্কুল, মাদ্রাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কিছু পরামর্শ দিয়েছে। এর মধ্যে আছে সমাবেশ-স্থানগুলো (ক্যাফেটেরিয়া, ডাইনিং, টিভি/স্পোর্টস রুম, ইত্যাদি) বন্ধ রাখা, রান্নাঘর থেকে রুমগুলোয় সরাসরি খাবার সরবরাহের ব্যবস্থা রাখা ও একাধিক শিক্ষার্থী একই বিছানা ব্যবহার না করা। মাদ্রাসায় একসঙ্গে নামাজ, সমাবেশ ইত্যাদির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অন্য কর্মচারীদের মধ্যে সংক্রমণ পর্যবেক্ষণ এবং দৈনিক রিপোর্ট করার ব্যবস্থা করতে হবে। যেসব জেলায় সংক্রমণের হার বেশি, যেমন শনাক্তের হার ২০ শতাংশের বেশি, সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা।
প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালুর পর করোনা প্রতিরোধে সরকারি নির্দেশনা শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে
রাজন ভট্টাচার্য, সাংবাদিক ও অভিভাবক।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালুর মধ্য দিয়ে অনেক দিন পর শিশুরা আলোর মুখ দেখবে। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে। তাই নিজেদের মধ্যে এক অন্যরকম অনুভূতি কাজ করছে। এটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আলাদা একটা বৈশিষ্ট্য তো রয়েছেই। স্কুলে গিয়ে পছন্দমতো আসনে বসা, কলম-খাতা আর কালির আনুষ্ঠানিক ব্যবহার, শিক্ষকদের নজরদারি, পড়ানো, টিফিনে ছুটে চলা সব মিলিয়ে বাড়তি উৎসাহের শেষ নেই। কিন্তু এরকম পরিবেশ সবার জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। এজন্য প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালুর পর করোনা প্রতিরোধে সরকারি নির্দেশনা শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
সবার আগে জরুরি স্কুলের ভেতরে বহিরাগত প্রবেশ বন্ধ করা। সবার মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করার বিকল্প নেই। মাস্ক ছাড়া শিশু, শিক্ষকদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করতে দেয়া যাবে না। তিন ফুট দূরত্বে বাসার ব্যবস্থা করা, সামাজিক সব রকমের দূরত্ব মেনে চলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাপমাত্রা মাপার যন্ত্র, জীবাণুনাশক ট্যানেল স্থাপন করতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়। তবে স্কুলের বারান্দা বা গেটে স্যানিটাইজার মেশিনও বসানো যেতে পারে।
সর্বোপরি শিশুদের অবাধ মেলামেশা বন্ধ করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনে শিক্ষকদের কঠোর হতে হলে অভিভাবকদের তা মেনে নিতে হবে। অভিভাবকদেরও এ বিষয়গুলো সন্তানদের বুঝিয়ে স্কুলে পাঠানো দরকার। অর্থাৎ করোনা সংক্রমণ রোধে শিক্ষক ও অভিভবকদের দায় সমান। স্কুল চলাকালীন শিক্ষার্থীদের বাইরে বের হওয়া বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে স্কুল ব্যাগে বাড়ি থেকে টিফিন বক্সে খাবার ও পানি দিতে পারলে সবচেয়ে ভালো। এ কাজগুলো যদি যথাযথভাবে পালন সম্ভব না হয়, তবে কিন্তু করোনা বসে থাকবে না। আবারো মাথা তুলে দাঁড়াবে। সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়বে। এবার শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বাড়লে কিন্তু পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। পরিস্থিতি সামাল দেয়া না গেলে সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপও বৃদ্ধি পাবে। তাই আগে থেকেই সংশ্লিষ্ট সব মহলকেই সর্বোচ্চ সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই।
দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিশুদের মানসিক ও শারীরিক যেমন বিরূপ প্রভাব পড়েছে তেমনি অনেক শিশু বিপথে গেছে। আবার শ্রমজীবীসহ ঝরেপড়া শিশুর সংখ্যা নেহাত কম হবে না। এসব শিশুকে স্কুলমুখী করতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। এ সুযোগে সমাজের একশ্রেণির অভিভাবক দায় ঘোচাতে কন্যাশিশুদের অল্প বয়সে বিয়ে দিয়েছেন। অল্প বয়সে এসব মেয়ে শিশুরা মাও হয়েছে, যা সমাজের জন্য ভালো কোনো উদাহরণ হতে পারে না।সব মিলিয়ে ঝরেপড়া শিশুদের একটি বড়ো অংশকে যেকোনো মূল্যে স্কুলে ফেরাতে হবে। এজন্য সরকারের আলাদা নজর দেয়া প্রয়োজন। যদি এ অংশের পুরোটাই স্কুলের বাইরে থেকে যায় তবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য এটি বড়ো রকমের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
জনস্বাস্থ্য ও টিকা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে
অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লা
সভাপতি, করোনা বিষয়ক জাতিয় কারিগরী কমিটি
দেশের বিদ্যমান সংক্রমণ এবং টিকাদান পরিস্থিতির পাশাপাশি স্কুল খোলা সংক্রান্ত বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে আমরা সরকারের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্মত হয়েছি। কিছু দিক অবশ্যই প্রতিপালন করতে হবে। বিশেষ করে জনস্বাস্থ্য ও টিকা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান
ভিসি, ঢাবি
স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আগামী ১২ সেপ্টেম্বর থেকে খুলে দেওয়া হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আগামী অক্টোবরে খুলবে।আমরা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী ইতিমধ্যে পরিকল্পিত রোডম্যাপ নিয়েছি। ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ শেষে আমরা সেগুলো পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবো, অক্টোবরে কখন, কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয় খোলা যায়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টিকাদান কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা
শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারীদের টিকা নেওয়া বাকি, তাদের টিকাদানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে টিকাদান কেন্দ্র খোলার চিন্তা করা হচ্ছে।প্রয়োজনে সব জেলায় এক বা একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শুধু শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারীদের জন্য টিকাদান কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।
নেহাল আহমেদ, চেয়ারম্যান,ঢাকা শিক্ষা বোর্ড
শিক্ষামন্ত্রী যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার কথা ঘোষণা দিয়েছেন তার অনেক আগে থেকেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে সব প্রস্তুতি নেওয়া রয়েছে। ইতিমধ্যে একটা বড়ো অংশ আমাদের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের করোনার ভ্যাকসিন (প্রথম ডোজ) নেওয়া হয়েছে, বাকিরাও নিচ্ছেন।
সবচেয়ে উত্তম হবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য উভয়ের সমন্বয়
গোপাল অধিকারী, লেখক, সাংবাদিক
করোনার এই সংকটকালীন চর কিংবা হাওর অঞ্চলে শিক্ষার্থী ঝরে পড়বে আশঙ্কাজনক হারে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের অভিভাবকদের মধ্যে একদিকে যেমন রয়েছে সচেতনতার অভাব, অন্যদিকে রয়েছে আর্থিক অসঙ্গতি। করোনাকালের এই দুর্যোগে পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য তারা সন্তানদের কাজে পাঠিয়ে বাড়তি আয়ের চেষ্টা করবেন-এটাই স্বাভাবিক। তাদের মতে, যুব সমাজের একটি অংশ শিক্ষা, প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন তৎপরতায় সক্রিয় আছে। অন্য একটি অংশ রয়েছে বিচ্ছিন্ন অবস্থায়। কেউ মাদকে যুক্ত, কেউ অবসাদে ভুগছে। আর এই বাস্তবতাই বলে দিচ্ছে-শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার শঙ্কাই বেশি। এর থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কীভাবে তাদের সক্রিয় করা যায়, তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। এই কারণ বিশ্লেষণ করলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা যুক্তিযুক্ত। তবে সবচেয়ে উত্তম হবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য উভয়ের সমন্বয়।
স্কুল বন্ধ থাকার কারণে শিক্ষার্থীরা যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে বিশেষ করে গ্রাম পর্যায়ে সেটা ব্যাপকতর। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুললে সামগ্রিক প্রচেষ্টায় এই ক্ষতি ধীরে ধীরে কমে আসবে। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের যে মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা কমানোর যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষার্থী, শিক্ষকসহ অন্যান্য জনবলের সমস্যাসহ নানামুখী সীমাবদ্ধতার কারণে স্বাস্থ্যবিধি মানা এবং অন্য পরিকল্পনাগুলো ঠিকমতো বাস্তবায়ন করা যাবে কি না, তা-ই বড়ো চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ উত্তরণে সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয় খোলার এই সময়টাতেসংক্রমণ প্রতিরোধে কঠোরভাবে জোর দিতে হবে। প্রাক্-স্কুল, প্রাথমিক স্কুল, মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বয়স ও আচরণে পার্থক্য আছে। সর্বজনীন ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রত্যেকের জন্য পৃথক পৃথক বিধিবিধান করতে হবে। যা-ই করা হোক না কেন, তা শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন ঘন করলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়বে। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার এই সাহসী সিদ্ধান্তকে সফল করতে সকলে শুধু সরকার নয় শিক্ষক মণ্ডলী, অভিভাবক সকলকে সমানভাবে এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষার্থীরা আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে আবার পড়াশুনায় ব্যস্ত হয়ে উঠছে, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলায় মেতে উঠছে এই সুন্দর দৃশ্য তো সবারই কাম্য।
তথ্যসূত্র : গণমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটে প্রকাশিত তথ্য।
নাজিম উদদীন, বিশেষ প্রতিবেদক।





Users Today : 20
Views Today : 24
Total views : 177909
