জ্বালাতে তো ইচ্ছে করে কিন্তু মনের যে বাতি, তার তেলের নীচে তলানী পরে গেছে, আর পলতায় ধরেছে ময়লা। দুই একটা দিয়াশলাইয়ের কাঠি আগুন ধরানোর কাজে রত হলেও, আগুনের স্থায়িত্ব খুবই কম। সেই আগুন আর আলো দেয় না আমাদের জীবনে, কেননা ময়লা পলতে, তার আলো বেশিক্ষণ ধরে রাখে না। আমাদের হাক্কী মাহমুল হক ভাই, তার ভেতরের সেই আগুনের ভেতর থেকে, আলো আর তাপ দুটোই আমাদের দিতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই।
আমি আমার একটা নাটকের একটা চরিত্রে শিক্ষকের মুখ দিয়ে সেখানকার নেতাকে বলিয়েছিলাম, আমি জানি স্যার, লেখাপড়া না জানলেও নেতা হওয়া যায়। চেয়ারম্যান হওয়া যায়। ভালো করে রিডিং পড়তে না পারলেও, এমপি হয়ে সংসদে যাওয়া যায় কিন্তু ভালো ডাক্তার, ভালো ইঞ্জিনিয়ার, ভালো শিক্ষক বা ভালো অফিসার হতে গেলে, অবশ্যই সু-শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া ছাড়া তা হওয়া যায় না। তবে কবি সাহিত্যিক শিল্পী তো ঈশ্বরের মহা দান। ইচ্ছে করলেও কি সেই প্রতিভা সবাই অর্জন করতে পারে?

অবক্ষয়ের সমাজে ক্ষয় রোধ করার মানুষ আজ খুবই কম। সবাই নিজের নিজের স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত। শুধু লেখকরাই তাদের নিজের কাজের পাশে, সমাজ নিয়ে, দেশ নিয়ে, দেশের মানুষের সুবিধা-অসুবিধা তথা পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য, তার চেতনার ফসলকে কালির অক্ষরে সাদা কাগজে লিখে রেখে যায়। মূল্যায়নের আশা তারা কখনো করে না। পাগলের মতো ঘুরে বেড়ানো এই মানুষগুলোর বেলায়ও ঠিক তাই।
আজ আমরা নিজেকে ক্ষুদ্র পরিসরে আটকে ফেলেছি। বিশাল সৃষ্টি জগৎ সম্মন্ধে কি করে জানবো। হারিয়ে যাওয়া মানুষ গুলোকে আমরা আর খুজি না। নষ্ট হয়ে যাওয়া মানুষ গুলোকে আমরা সেখান থেকে উদ্ধারের জন্য চেষ্টা করি না। পাশের কোনো ক্ষুধার্ত মানুষকে একটা রুটি দিয়েও সাহায্য করি না। আর আজ আমরাই হতে চাই অন্যের পথ প্রদর্শক। আমাদের ঈশ্বরদীর সন্তান ভবঘুরে মজিবরের লেখা, যার প্রকাশিত প্রায় ৬০ টার মতো বই। আমরা তাকে চিনি না। তার চেতনাকে শ্রদ্ধা করি না। আমরা তাকে আমাদের কৃতি সন্তান হিসেবে দেখি না বা দেখার প্রয়োজন মনে করি না। আমরা রাজনৈতিক দলের নেতাদের দেখি কৃতি সন্তান হিসেবে। শুদ্ধ চেতনা বোধের আজ বড়োই অভাব, তাই তো কবি, লেখক, শিল্পী, সহ সমাজের মানুষ নিয়ে যারা ভাবে, তাদের মূল্যায়নের বালাই নেই।
মানুষের মনের নিঃস্বার্থ, সুন্দর, মানবিক অনুভূতি, যা কখনো মলিন হয় না। সারা জীবনই তা অক্ষয় ও অমর হয়ে বেঁচে থাকে। আর সেটাই আমার কাছে সত্য, সুন্দর ও দামি বলে মনে হয়। আমরা সেটাই ভুলে নিজেকে অশুদ্ধ চেতনায় আটকে দেই। আমরা যা করি তার প্রতিফলন তো আমাদেরও পেতেই হবে। ভালোবাসা হৃদয়ে নিয়ে শুধু সামনের দিকে পথ চলতে শিখতে হবে। যে যেখানে আছি, যে কাজেই আছি, একটু ডাইনে, একটু বামে, একটু সামনে তাকাতে চেষ্টা করি, এই ভালোবাসার দৃষ্টি নিয়ে। আমাদের মনে রাখা দরকার যে আমি পাল্টলেই পৃথিবীও পাল্টাবে।
নিজের উপর বিশ্বাস রাখাটাই আজ বড়োই কঠিন কাজ হয়ে গেছে। কবি ওমর খৈয়াম তার একটা বিখ্যাত কবিতায় বলেছেন, ‘‘নগদ যা পাও হাত পেতে নাও, বাকির খাতায় শূন্য থাক; দূরের বাদ্য শুনে কি লাভ, মাঝখানে যে বেজায় ফাঁক’’। আজ সত্যিই আমরা সবাই নগদেই বিশ্বাসী হয়ে গেছি কিন্তু কোনো কবি লেখক শিল্পী কখনো নগদে বিশ্বাসী নয়। অনেক নেতাও আছে যারা কখনো নগদে বিশ্বাসী ছিলেন না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বলেছিলেন, আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না, মানুষের অধিকার চাই। সেই চেতনার বালাই কি তাদের দলের কারো মধ্যে এক তিল পরিমাণও আছে। এখন কেন যেন আমার মনে হচ্ছে, এখনকার চাওয়া পাওয়াটা সম্পূর্ণ উল্টো হয়ে গেছে। মনে করলে এমন হতে পারে যে, আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই, জনগণের অধিকার চাই না। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চাই। সাধারণ জনগণের কথা আজ আর ভাবে না কোনো নেতাই। সেই সময়ের চাওয়া, আর এই সময়ের চাওয়ার মধ্যে আজ বেজায় ফাঁক। কতই না মানবিকতার দূরত্ব তৈরি হয়েছে আমাদের মধ্যে।
আমাদের মনে রাখা দরকার যে, আসল সত্য, আসল প্রতিভা, কোনো দিনই চাপা থকবে না। কেউই ভুলের ঊর্দ্ধে নয়।। এখন আমারা নিজেদের পছন্দের জীবনযাপন করতে পূর্বের সব কছিুই ভুলে যাই। ইতিহাস ভুলে যাই। কতো কিছুরই না দোহাই দেই। আর এগুলোর জন্যেই আজ আমাদের বিশ্বাস, নিশ্চয়তা, ভালোবাসা, মমত্ব বোধ, প্রতিজ্ঞা, আশীর্বাদ, আমাদের হৃদয়ে আর কাজ করে না। মনে রাখা দরকার যে, লবণ ভালো জিনিস কিন্তু লবণের স্বাদ যদি নষ্ট হয়ে যায়, তবে তা কেমন করে নোনতা করা যায়। ১২ টা লবণের সমন্বয়ে যেমন এই দেহটা সুস্থ থাকে ঠিক তেনই নিজেকে লবনের মতো তৈরি করতে না পারলে, তার স্বাদ কোনোদিনই কেউ পাবে না।
তাই আসুন আমরা যার যার জায়গা থেকেই সৎ ও আদর্শবান মানুষ হয়ে, সোনার বাংলাকে সুশিক্ষিত, সুন্দর ও মানবিক বাংলাদেশ হিসেবে পৃথিবীতে পরিচিত করতে সাহায্য করি। যে কাজটি আমাদের হাক্কি মাহমুল হক ভাই অনেক দিন আগে থেকেই করে যাচ্ছেন তার লেখনির মাঝে। এক বিশ্ব, ভিসা মুক্ত বিশ্ব এবং বিশ্বের সকল মানুষের জন্য বাধাহীন চলার নিশ্চয়তার জন্য তার লেখনির যুদ্ধ চলছেই। আমি আবার তার সাথে একাত্বতা প্রকাশ করে সেলুট জানাই। আমি খুবই আনন্দিত হয়েছিলাম সেদিন, যেদিন ঈশ্বরদীর সুনামধন্য সাংস্কিৃতিক প্রতিষ্ঠান “সুরের ভুবন ” কিছুদিন আগে এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে, এক বিশ্ব ভিসা মুক্ত বিশ্বের অগ্রপথিক হাক্কি মাহমুল হককে, তার এই কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ, অনেক গুণী মানুষদের সম্মুখে সম্মাননা স্মারক ক্রেস্ট তুলে দেন। আমি ধন্যবাদ জানাই সুরের ভুবনের সকল অয়োজকদের। এভাবেই সকল গুণী মানুষ বেঁচে থাকতেই তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দেখে যাক এবং সুরের ভুবন আরো নতুন নতুন গুণী মানুষদের খুঁজে বের করে সম্মানিত করুক এই কামনা করি।






Users Today : 18
Views Today : 20
Total views : 175464
