জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ইতিহাসখ্যাত ভাষণ ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি আদিবাসী ভাষায় অনূদিত হয়েছে। উদ্দেশ্য একটিই, মায়ের ভাষায় অর্থাৎ মাতৃভাষায় যাতে করে ভাষণটি আস্বাদন করা যায়। আদিবাসী সমাজের প্রবীণদের এবং বিশেষত বীরমুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ শোনার প্রতিক্রিয়া শ্রবণের সুযোগ হয়েছে একাধিকবার। সারাদেশ তখন আন্দোলনের ঢেউয়ে মাতোয়ারা, শহরের শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত থেকে গ্রামের আদিবাসী যুবদের মাঝেও উত্তেজনা বিরাজ করছিল। কী হবে, কী হতে চলেছে, সবাই শেখ সাহেবের দিকে তাকিয়ে আছে; তাঁর তর্জনী কোনদিকে হেলিয়ে পড়ে, সেটির দিকে সবার সতর্ক নজর।
আদিবাসী দু-একটি গ্রামে তখন রেডিও পৌঁছিয়েছে, অধিকাংশ লোকজনই স্থানীয় মাজহী কিংবা মাতব্বরদের কাছ থেকে সর্বশেষ সংবাদগুলো জেনে নিয়েছে। রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত রটে গিয়েছিল ৭ মার্চ শেখ সাহেব স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন! আপামর জনসাধারণের মতোই আদিবাসী নারী-পুরুষেরা শোনার জন্য উদগ্রীব হয়েছিলেন, রেডিও থাকা গ্রামের খোঁজে কেউ কেউ বেরিয়েও পড়েছিলেন। প্রয়াত বীরমুক্তিযোদ্ধা বিশ্বনাথ টুডু জানিয়েছিলেন, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য পার্শ্ববর্তী বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর গ্রাম সগুনা গ্রামে গিয়েছিলেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষার পরও রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ শুনতে না পেয়ে দুরু দুরু মনেই ঘরে ফিরেছিলেন। সত্যিই সেদিন বঙ্গবন্ধুর ভাষণ তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বিরোধিতার কারণে সরাসরি রেডিওতে সম্প্রচার করা সম্ভবপর হয়নি। সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে পরদিন সকাল সাড়ে ৮টায় রেডিও পাকিস্তানে (বর্তমানে রেডিও বাংলাদেশ বেতার) প্রচার হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ। মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে যায় পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। ৭ই মার্চের দিনের ভাষণ সরাসরি শোনার ভাগ্য না হলেও রেকর্ডকৃত ভাষণ শোনার পরও শরীরের রক্তকোণাগুলো শিহরিত হয়েছিল বলেছিলেন বীরমুক্তিযোদ্ধা বিশ্বনাথ টুডু। একই কথা শুনিয়েছিলেন বীরমুক্তিযোদ্ধা সুধীর চন্দ্র মাজহী। বঙ্গবন্ধুর দরাজ গলার ভাষণে আদিবাসীরা মোহিত হয়েছে, হয়েছে আশ্বস্ত; অপরদিকে শত্রুসেনাদের মোকাবেলায় নিজেদেরকে প্রস্তুত করেছে।
১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য হয়েছিলেন আদিবাসী নেতা প্রয়াত সাগরাম মাজহী (হাঁসদা)। বঙ্গবন্ধুর একান্ত আনুকূল্যেই রাজশাহী থেকে মেম্বার অফ লেজেসলেটিভ এসেম্বলীর সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এই আদিবাসী নেতা। বঙ্গবন্ধুর সাথে আদিবাসীদের ভালোবাসার যোগবন্ধন এখান থেকেই, যে কয়বার উত্তরবঙ্গ রাজনৈতিকভাবে পরিদর্শনে গিয়েছেন, খোঁজ নিয়েছেন মাটির মানুষ আদিবাসীদের। আদিবাসীরা বঙ্গবন্ধুকে নিজেদের মানুষ হিসেবেই হৃদয়ে ঠাঁই দিয়েছিলেন, আর সেজন্যেই ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে নিরঙ্কুশভাবে আদিবাসীরা আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়েছিল। এখনো শেখের বেটিকে ভালোবাসে ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায়। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ সন্তান বলেই তো ভালোবাসা অফুরন্ত রয়েছে, আদিবাসীদের বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যতটুকু না ভাবনা রয়েছে; তার চেয়েও বেশি প্রার্থনা রয়েছে তাঁর জন্যে। বঙ্গবন্ধু তাঁর কথায়, আচরণে, পরিকল্পনায়, আদর্শে কিংবা সাধারণ মানুষের সাথে মেশার যে অসম্ভব শক্তি ছিল; সেটিই তাঁকে অমর করে রেখেছে।
৭ মার্চের ভাষণ এতোটাই আদিবাসীদের উজ্জীবিত করেছিল যে, তারা তাদের নিজস্ব অস্ত্র তীর-ধনুক, টাঙ্গি, বর্শা, ফালা নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল যুদ্ধের ময়দানে। তার দুটি প্রমাণ হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নসারথী কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরীর নেতৃত্বে হবিগঞ্জ চা বাগানে তীরন্দাজ বাহিনী গঠন। চা বাগানে কর্মরত আদিবাসী সাঁওতাল, মুণ্ডা, উরাঁও, কোল, ভূমিজ, কুর্মি, উড়িয়া, মাহালী প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠী অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছে। অন্যটি হলো রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও কর্মসূচিতে আদিবাসীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। ২৮ মার্চ পাকিস্তানীদের নির্মূল করার আহ্বানে আদিবাসী নারী-পুরুষ তীর-ধনুক, টাঙ্গি, বর্শা, ফালা নিয়ে সামিল হয়েছিল বীরচিত্তে। পাকিস্তানীদের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র গর্জে উঠেছিল, আদিবাসীরা শহীদ হয়েছেন কিন্তু পিছু হটেননি। কী মন্ত্র ছিল অন্তরে আকাঙ্ক্ষা জেগেছিল, কেন জেগেছিল; একটিই উত্তর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর জাদুকারী আহ্বান, তাঁর প্রতি ভালোবাসার টান, নির্দেশকে শিরোধার্য হিসেবে গ্রহণ করেছে।
মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধারা ৭ মার্চের ভাষণ শুনে নিজেদেরকে উদ্বুদ্ধ করতেন। যে সমস্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি, প্রায় প্রত্যেকেই স্বীকারোক্তি করেছেন, যুদ্ধকালীন একাধিকবার বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ শ্রবণ করেছেন। বঙ্গবন্ধু দেশ ও জাতি এবং জনগোষ্ঠীর জন্যে নিরাপত্তার যে সচেতনতা সেটি সব সময়ই নিখাদ দেশপ্রেমিকের কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এসেছে। বঙ্গবন্ধুকে আদিবাসীরা ভালোবেসে হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান দিয়েছে, বঙ্গবন্ধু শুধু দলের নয়; তিনি বঙ্গভূমি তথা সমগ্র বাংলাদেশের, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষের। সাঁওতালী কবি সামিয়েল মার্ডী ‘শেখ সাহেব’ শিরোনামে কবিতা লিখেছেন সাঁওতালী ভাষায়। কবিতার বঙ্গানুবাদ করেছেন প্রদীপ হেমব্রম, বঙ্গানুবাদটি নিম্নরূপ—
‘৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ
এখনও আমার কানে বাজে।
নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে
বিদ্রোহের বজ্রকণ্ঠ হুঙ্কার দিয়ে উঠত
বাংলার প্রথম রাষ্ট্রপতির মুখে।
দুঃখ বেদনা থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য
একমাত্র শেখ মুজিবেই রুখে দাঁড়াবে
বিশ্বাস করি এখনও।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
এর মতো কেউ ভাষণ দিলে…
অবলীলায় চোখের সামনে ভেসে ওঠে
সেই মহামানব বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি।
এখন পর্যন্ত বিশ্বাস করি
সকল প্রকার সমস্যা সমাধানে
হবে স্বপ্নিল ব্যক্তির আগমন।
আর, সে আর কেউ নয় একমাত্র
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি
জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু
জনসাধারণের জন্য জীবন উৎসর্গকারী
প্রাণ প্রিয় বন্ধু সখা।
বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা’
বির্নিমাণের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে
একনিষ্ঠ সৈনিক হয়ে কাজ করে যাই;
এই অদ্যমতা মনে প্রাণে লালন করি।






Users Today : 13
Views Today : 13
Total views : 177416
