শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড এবং শিক্ষক সেই জাতির বিবেক ও নির্মাতা। এ বহুলপ্রচারিত কথাটির বাস্তব চিত্র আজ অনেকটাই উল্টো। বিশেষত উচ্চশিক্ষার দুর্গসম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যখন শিক্ষকদের মুখে রাজনীতি, হাতে দলীয় ব্যানার, মাথায় গোষ্ঠীস্বার্থের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং চিন্তা চেতনা নিজের দলকেন্দ্রীক, তখন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এক অনিশ্চয়তার ও অন্ধকার পথে ঠেলে দেওয়া হয়, যেখানে শিক্ষার্থীরা দিশেহারা হয়ে পরে।
শিক্ষক হলেন একজন আলোকবর্তিকা, যিনি অজানার অন্ধকার দূর করে আলো দেখান, আত্মবিশ্বাস জাগান এবং একজন মানুষের চিন্তা, চরিত্র ও ভবিষ্যৎ নির্মাণে মৌলিক ভূমিকা পালন করেন। শিক্ষকের মূল মঞ্চ ও দায়িত্ব হওয়া উচিত শ্রেণিকক্ষ, জ্ঞান বিতরণের পীঠস্থান। তাঁদের দায়িত্ব হলো গবেষণা, পাঠদান ও নীতিনির্ধারণে মুক্তচিন্তার বিস্তার। কিন্তু শিক্ষকতা পেশার মাহাত্ম্য, শ্রেণিকক্ষের পবিত্রতা এবং শিক্ষার সার্বজনীন আদর্শ ক্রমাগতই হারিয়ে যাচ্ছে যখন শিক্ষকগণ রাজনীতির জটিল জালে জড়িয়ে পড়েন। আজ অনেক শিক্ষকই রাজনৈতিক দলের সভা, সমাবেশ, মিছিল আর দলীয় কোন্দলে অধিক সক্রিয়। এই রাজনৈতিক সক্রিয়তার সরাসরি শিকার হয় শিক্ষার পরিবেশ, পাঠদান ব্যাহত হয়, ক্লাস বাতিল হয়, পরীক্ষার ফলাফল বিলম্বিত হয়। শিক্ষার্থীদের মূল্যবান শিক্ষাসময় নষ্ট হয় রাজনৈতিক কর্মসূচির বলি হয়ে। শিক্ষক যখন দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেন, তখন ছাত্র—ছাত্রীদের শিক্ষার অধিকার অনিবার্যভাবে পিছিয়ে পড়ে, নির্বাসিত হয় জ্ঞানের আলো।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা সমাজের আলোকবর্তিকা হওয়ার কথা, কিন্তু যখন তাঁরা দলীয় পরিচয়কে পেশাগত পরিচয়ের উপরে স্থান দেন, তখন গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। দলীয় রাজনীতির রোষানলে শিক্ষকসমাজ যখন বিভক্ত, তখন সিলেবাস শেষ হওয়া, নিয়মিত ক্লাস নেওয়া কিংবা গবেষণার মান উন্নয়নের চেয়ে বরং বিভাগ ভাগাভাগি, প্রশাসনিক পদ-পদবি ভাগাভাগি বেশি গুরুত্ব পায়।
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার বদলে শিক্ষকদের একাংশ নিজেদের ক্ষমতা ও আধিপত্য বিস্তারে ব্যস্ত। একের পর এক শিক্ষক হত্যাকাণ্ড, বিভাগীয় কোন্দল, শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিত শিক্ষক, মেধাবীদের পেছনে ফেলে দলীয় লোকের নিয়োগ―সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এক অদৃশ্য অথচ ভয়ানক রোগ: শিক্ষক রাজনীতি। এমন এক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যেখানে যোগ্যতা নয়, বরং দলীয় আনুগত্যই পদোন্নতির মূল মাপকাঠি। আর এইসবের ভুক্তভোগী হয় শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে সেই শিক্ষার্থী, যে গ্রাম থেকে শহরে এসে একটি ভালো ভবিষ্যতের আশায় ভর্তি হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখে―তার শিক্ষকদের একটি বড়ো অংশ ব্যস্ত দলীয় নেতাদের আশীর্বাদ পেতে, আর যিনি ক্লাস নেনও, তিনিও রাজনীতি নিয়ে বিভক্ত মন নিয়ে ক্লাসে আসেন। শিক্ষকদের রাজনীতিকরণের প্রভাব জাতির ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। একটি অদক্ষ, পক্ষপাতদুষ্ট ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত শিক্ষাব্যবস্থা সৃষ্টি করে এমন প্রজন্ম, যারা জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে, সংকীর্ণ দলীয় মনোভাবাপন্ন এবং জাতীয় ঐক্য ও উন্নতির চেয়ে দলীয় স্বার্থকেই বড়ো করে দেখে। এর ফলে সমাজে সৃষ্টি হয় অস্থিরতা, অনৈক্য এবং নৈতিক অবক্ষয়।
বর্তমান আমরা এমন এক অবস্থায় আছি, যেখানে শিক্ষক হয়ে ওঠেন ছাত্রসংগঠনের ছায়া নেতা, কিংবা উপাচার্য বা উপ-উপাচার্য হয়ে যান ক্ষমতাসীন দলের ‘কোটা পূরণের অংশ’। সেখানে ‘আলোকিত মানুষ গড়া’র যে শপথ ছিল, তা যেন কেবল সনদ আর সমাবর্তনের মঞ্চেই সীমাবদ্ধ।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আজ শিক্ষক রাজনীতি মানেই ‘সিন্ডিকেট রাজনীতি’, ‘প্যানেলভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ’, ‘উপাচার্য নিয়োগে তদবির’, কিংবা ‘শিক্ষার্থী হয়রানিতে দলীয় প্রতিশোধ’ যেমন―অন্য মতাদর্শের শিক্ষার্থীদের পরিক্ষার খাতায় মার্ক কম দেওয়া, অন্যের থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য করা, বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা ইত্যাদি। রাজনৈতিক আনুগত্য প্রায়শই যোগ্যতা ও ন্যায়বিচারের উপর প্রাধান্য পেতে শুরু করে। শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, এমনকি প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রভাব ফেললে, মেধাবীরা পিছিয়ে পড়ে, আর রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্তরা এগিয়ে যায়। এর ফলে শিক্ষার মান ভয়াবহভাবে ক্ষুণ্ন হয়। শিক্ষক যখন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পাঠদান করেন বা পাঠ্যক্রমকে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার হাতিয়ার বানান, তখন শিক্ষার উদ্দেশ্য―যুক্তিবাদিতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ―সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হয়। শিক্ষার্থীরা পক্ষপাতদুষ্ট তথ্য পায়, মুক্তচিন্তার পরিবর্তে শেখে একদেশদর্শিতা।
দলীয় বৃত্তে আবদ্ধ হয়ে নয়, বরং দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে শিক্ষকদের ফেরত আসতে হবে শিক্ষার মঞ্চে।
শিক্ষক সমাজ জাতির বিবেক ও নির্মাতা। তাদের হাতেই গড়ে ওঠে আগামীর বাংলাদেশ। কিন্তু যখন এই হাতগুলো রাজনৈতিক পতাকা বহনে ব্যস্ত হয়, তখনই জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের মূল উপকরণ শিক্ষা নির্বাসনে চলে যায়। শিক্ষকদের রাজনীতির মঞ্চ থেকে সরে এসে আবারও শ্রেণিকক্ষের কেন্দ্রে ফিরে আসতে হবে। কারণ, যেখানে শিক্ষক শুধু শিক্ষক, সেখানেই জ্ঞানের আলো উজ্জ্বল, সেখানেই শিক্ষা তার সত্যিকারের ঠিকানায় থাকে। শিক্ষাকে নির্বাসন থেকে মুক্তি দিতে হবে―এটাই এখন সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার। নইলে দেশ অবলীলায় ধ্বংসের পথে যাবে।
মোজাহিদ হোসেন: কলাম লেখক ও শিক্ষার্থী―ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।





Users Today : 0
Views Today :
Total views : 175444
