বিগত ২৩ নভেম্বর, ২০২৪ সালে রাজশাহী বিভাগীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি ও পাহাড়িয়া পরিষদের যৌথ আয়োজনে পাহাড়িয়া জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষার কি বোর্ড উদ্বোধন করা হয়েছিল। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার দেওয়ার মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর। তিনি তার বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক তৈরি করতে ভাষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একমাত্র ভাষার কারণেই মানুষ অন্যান্য জীবনের থেকে বিশেষ স্বীকৃতি পেয়েছে। তাই ভাষা টেকনোলজি ও প্রকৃতির সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করেছে। এ ক্ষেত্রে যে জাতি যত বেশি ভাষা জানবে, সেই জাতি তত বেশি তথ্য ও জ্ঞানে সমৃদ্ধ হবে। আজ থেকে পাহাড়িয়া ভাষাটি দক্ষিণ এশিয়ার নবীনতম ভাষা হিসেবে ডিজিটাল যুুগে প্রবেশ করল। এরমধ্য দিয়ে পাহাড়িয়া মাতৃভাষার কি বোর্ডটি বিশ্বে ২৯৫তম কি বোর্ড হিসেবে স্বীকৃতি পেল। বিশ্বে ভবিষ্যৎ তরুণ প্রজন্মকে পাহাড়িয়া ভাষার সঙ্গে পরিচিত করতে এই কি বোর্ড সহযোগিতা করবে।’ কয়েক মাস যেতে না যেতেই আদিবাসী পাহাড়িয়ারা এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। মানুষ যদি বেঁচে না থাকে, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে; তাহলে ভাষা কীভাবে চর্চিত হবে? ভাষার সাথে মানুষের সম্পর্ক বিদ্যমান, একমাত্র মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে বেঁচে থাকলে ভাষার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। উদ্বোধিত হওয়া জায়গা থেকে মাত্র ১ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী আদিবাসী পাহাড়িয়ারা আজ চরমভাবে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছেন। ক্ষমতা ও প্রভাবশালীদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ দাপটে অসহায়, নিরূপায় হয়ে পড়েছে আদিবাসী পাহাড়িয়ারা।
খোদ রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ডের মোল্লাপাড়াতে ৫৩ বছর ধরে ১৬ কাঠা জমির ওপর আদিবাসী পাড়ায় বসবাস করছেন পাহাড়িয়ারা। প্রথমদিকে ৬টি পরিবার থাকলেও প্রজন্ম বেড়ে বর্তমানে ১৬ পরিবারে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে। এই অবস্থায় ভিটে থেকে উচ্ছেদের চূড়ান্ত নোটিশ দিয়েছেন স্থানীয় ক্ষমতাশালী ব্যক্তি সাজ্জাদ আলী। পার্শ্ববর্তী হড়গ্রামের বাসিন্দা সাজ্জাদ আলীর দাবি তিনি ১৯৯৪ সালে জমিটি কিনেছেন। আদিবাসীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর পরিবার ভারতে আশ্রিত হয়েছিল। ৯ মাস পর মুক্ত ও স্বাধীন দেশে প্রত্যাবর্তিত হলেও বসতভিটাতে স্থান হয়নি। অতঃপর ইন্দ্র ধুপি নামের এক হিন্দু ব্যক্তি তার ১৬ কাঠা জমিতে ছয়টি পরিবারকে বসবাস করতে সুযোগ প্রদান করেন। আশ্রয়দাতা মালিক ইন্দ্র ধুপি অনেক আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন। সময় ও সুযোগ বুঝে এখন সাজ্জাত আলী দাবি করছেন, জমির মালিক ইন্দ্র ধুপির মৃত্যুর আগে এই জমি তার কাছে বিক্রি করে গিয়েছেন। সিটি কর্পোরেশন একটি নলকূপ ও দুটি পাকা শৌচাগার নির্মাণ করে দিয়েছে। আদিবাসীরা জানান, বছর দুয়েক আগে সাজ্জাদ আলী তাদের বাড়ি ছাড়তে বললে তৎকালীন ওয়ার্ড কাউন্সিলর জনাব নজরুল ইসলাম দু-পক্ষকে নিয়ে সালিশে বসেছিলেন। সেদিন সাজ্জাদ আলী কাগজ-পত্র পর্যালোচনা করে কাউন্সিলর বলেছিলেন, এই দলিল জাল। তখন কৌশলে কাউন্সিলরের কার্যালয় থেকে সটকে পড়েন সাজ্জাদ আলী। অতঃপর তাদের আর উচ্ছেদের চেষ্টা করা হয়নি। বিগত বছর ৫ আগষ্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটলে ৮ আগস্ট সাজ্জাদ আলী সদলবলে আদিবাসী পল্লীতে এসে হানা দেয় এবং জায়গা ছেড়ে দেবার হুংকার দিয়ে যান। ঐক্যবদ্ধ আদিবাসী পাহাড়িয়ারা বাড়ি ছাড়তে না চাইলে তিনি এক পর্যায়ে টাকা দেওয়ারও প্রস্তাব দেন।
পূর্বের কথানুযায়ী, বিগত ৫ই সেপ্টেম্বর ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদিত হওয়া ১৬টি পরিবারকে শেষমেষ খাসি খাওয়ানোর কথা জানিয়েছিলেন সাজ্জাদ আলী। ৫ই সেপ্টেম্বর শুক্রবার ভোজের পর তাদের বাড়ি ছাড়ার জন্য রবিবার (সেপ্টেম্বর ৭) পর্যন্ত সময় বর্ধিত করে দিয়েছিলেন। সাজ্জাদ আলীর হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের পর ছয়টা পরিবার ছিল, ওই ছয় পরিবার ধরে ৫ লাখ টাকা করে দেবেন। পরিবারের ছেলেরা টাকা ভাগ করে নেবেন। পরে অবশ্য ছয় বাড়ির প্রত্যেককে ছয় লাখ টাকা করে দিতে চেয়েছেন তিনি। সর্বশেষ জানা যায়, কয়েকজনকে নগদ অর্থ বুঝে দেওয়া হয়েছে। বাড়ি ছাড়তে প্রথমে তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছিল। এরপর ১৫ দিন, ৭ দিন ও ১০ দিন করে সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মাসখানেক আগে টাকাও দেওয়া হয়েছে। সবশেষে ১০ দিনের সময় শেষ হবে শুক্রবার ৫ সেপ্টেম্বর। সেদিন খাসি কেটে খাওয়ানো হবে। এরপর রবিবারের মধ্যে তাদের এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হবে। ইতিপূর্বে অবশ্য মুরগী মাংস দিয়ে ভোজ আয়োজনের আকাক্সক্ষা প্রকাশ করেছিলেন গ্রামবাসী। অর্থাৎ খাসির মাংস দিয়ে ভূরিভোজের আয়োজন করে জায়গা ছেড়ে দেবার সব রকম নক্সা প্রণীত হয়েছিল। ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক দলের পরিচিত ব্যক্তি সাজ্জাদের চাপে প্রাণের ভয়ে ৩টি পরিবার অন্যত্র চলে গিয়েছেন। বিষয়টি সংবাদপত্রের এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানের নজরে এলে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন হস্তক্ষেপ করে। জমির মালিকানা নিয়ে ফয়সলা না হওয়া পর্যন্ত ১৩টি আদিবাসী পাহাড়িয়া পরিবার সেখানেই থাকবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। আপনারা কেন থানায় যাননি এমন প্রশ্নের উত্তরে মিল্কি বিশ্বাস পুলিশের কাছে বলেন, ‘সাজ্জাদ আলী বলেছেন যে তোমরা যদি বাড়াবাড়ি করো, যেটুকু টাকা দিচ্ছি, সেটাও দিব না। এটার জন্য আমরা কোনো জায়গাতে যেতে পারলাম না। আমরা টাকা নিতে বাধ্য হলাম।’
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—আদিবাসী পাড়ার জমিটি যদি সাজ্জাদ আলী ১৯৯৪ সালে ক্রয় করে থাকে, তাহলে নিশ্চয় তার দলিল দস্তাবেজ থাকবে! কাউন্সিলর অফিসে কাগজ-পত্র খোলা চোখে দেখার পর জাল দলিল হিসেবে আখ্যায়িত হলে সাজ্জাদ আলী উদ্বিগ্ন হয়ে নিরবে স্থান ত্যাগ করেছিলেন। এটি সহজেই অনুমিত হয় যে, কাগজপত্রের দূর্বলতা থাকলে হৃদয়ের উদ্বিগ্নতা বাড়ে, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে পিছুপা হয়ে থাকে; আদিবাসী পাড়ার ক্ষেত্রে সেটিই অবলোকন করেছি। স্থানীয় কাউন্সিলরের অফিসে কিংবা আদালতের মধ্যে দিয়েও ক্রয়কৃত জায়গাটিতে অধিকার প্রতিষ্ঠায় সাজ্জাদকে লড়তে দেখিনি। তাহলে নিশ্চয়ই এখানে কোনো না কোনো গূঢ় রহস্য লুকায়িত রয়েছে!
দ্বিতীয়ত—সাজ্জাদ আলী আদিবাসী পাড়ার পাহাড়িয়াদের কেন ও কোন শর্তে অর্থ দিতে সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন! সাজ্জাদ আলীর তথ্যানুযায়ী, আদিবাসী পাহাড়িয়ারা তার হাত থেকে অর্থ গ্রহণ করেছে। সত্যিকার অর্থেই যদি সাজ্জাদ আলী ১৬ কাঠা জমির লিগ্যাল স্বত্ত্বাধিকারী হয়ে থাকে, তাহলে কেন কোন স্বার্থে আরো কয়েক লক্ষাধিক টাকা দিয়ে জায়গাটি ছেড়ে দিতে বাধ্য করছিলেন? এটি সন্দেহজনক এবং অবিশশ্বাস্য। কেন বল প্রয়োগের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছেন? নিঃসন্দেহে সাজ্জাদ আলী ঘোলা পানিতে মৎস্য শিকার করতে আকাঙ্খী হয়েছিলেন।
তৃতীয়ত—খাসি মেরে ভূরিভোজের আয়োজন করে বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা কী সত্যিই আদিবাসী পাহাড়িয়ারা চেয়েছিলেন? যে জায়গায় দশকের পর দশক বসবাস করেছেন, তিনটি প্রজন্ম থেকেছেন; সে জায়গাটির মায়া বড়োই কষ্টের। কোনোকালেই শ্রবণ করি নাই যে, আদিবাসীদের স্থানচ্যুত করতে উৎসব হয়েছে, খাওয়া-দাওয়া আয়োজিত হয়েছে; সাজ্জাদ আলী আদিবাসীদের খাওয়ানোর মধ্যে দিয়ে কী দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চেয়েছেন! এটি ঠিক যে, আদিবাসীদের মুখ বন্ধ করে প্রলয়ও বন্ধ করতে চেয়েছেন!
চতুর্থত—আদিবাসী পাড়ার ১৬ কাঠা জমির মূল্য এখন কয়েক কোটি টাকা। নীলনক্সা প্রণয়নকারী সাজ্জাদ আলী প্রমোদ গুণেছেন, কয়েক লক্ষাধিক টাকা দিয়ে যদি কোটি টাকার জায়গা দখল করা যায়; তাহলে মন্দ কী? সত্যিই আদিবাসীদের ছলে-বলে কৌশলে অর্থ গ্রহণে সম্মত করিয়েছেন। আদিবাসীরা যদি নিরবে স্থান ত্যাগ করে, তাহলে সেটি হবে সাজ্জাদের জন্য বাড়তি পাওনা। সবকিছুই সুন্দরভাবে এগুচ্ছিল, হঠাৎ করেই শ্রাবণের বাতাস ওলটপালট করে দিয়েছে। মিডিয়া থেকে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান, আদিবাসী সংগঠনের প্রতিবাদ এবং স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ। প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হলেই ভূরিভোজের রহস্যও উন্মোচিত হবে।
পঞ্চমত—আদিবাসীরা সহজ-সরল এবং ঝামেলামুক্ত জীবন অতিক্রান্ত করতে আগ্রহী হোন। পাহাড়িয়ারা দেখেছেন, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে সাথে অনেক জায়গায় আদিবাসীরা নিগৃহীত, অত্যাচারিত এবং উচ্ছেদের শিকার হয়েছেন; আইনের কোনো শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ক্ষমতাশালীদের সাথে প্রতিযোগিতায় আদিবাসীরা টেকেন না; আর সেজন্যই ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়ে গ্রামের বিশনি বিশ্বাস বলেছেন, ‘জন্ম জায়গা ছেড়ে কেউ চলে যেতে চায়? কেহু তো চাই না’। আদিবাসী পাহাড়িয়াদেরকে আদিবাসী পাড়া ছাড়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র!
রাজনৈতিক পেশী শক্তির অধিকারী সাজ্জাদ আলীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন আদিবাসীদের জায়গাটি করায়ত্ব করার, যার জন্যে আদিবাসীদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছেন। আদিবাসীরা এদেশের নাগরিক, নাগরিক হিসেবে অবশ্যই ন্যায্যতা প্রাপ্তির প্রত্যাশা করতে পারেন। অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের কাছে আমাদের নিবেদন, বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে থাকা আদিবাসী পাহাড়িয়াদের রক্ষার্থে উদ্যোগ গ্রহণ করুন। গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি ফুলমণি বিশ্বাস বলেছেন, ‘কোথায় যাব? আমরা তো এখুন আন্ধার ঘরে হাইতড়্যাই তো পাছি না। আন্ধার ঘরে মানুষ কিছু পায় কি না? ওই রকম আমরাও কিছু খুঁইজে পাছি না’? অশিতীপর ফুলমণি যেন সত্যিটা জেনে যান, অন্ধকারে থেকে অনিশ্চিত জীবনের সমাপ্তি হোক নিরন্তর শান্তি ও নিশ্চিন্তে।
[মতামতের উল্লেখ্য ঘটনা, তথ্য, তথ্য-উপাত্তের প্রামাণ্যের দায়-দায়িত্ব একান্তই লেখকের।]






Users Today : 24
Views Today : 34
Total views : 175538
