একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন হবে মর্যাদা, নীতিনিষ্ঠা আর গণতন্ত্রের প্রতীক। যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা—সবাই হবে এক, এখানে সিদ্ধান্ত হবে ন্যায়ভিত্তিক, কাজ হয় স্বচ্ছতার সঙ্গে, এবং সকল সমস্যার সমাধান আসবে এখান থেকেই। কিন্তু এখন সে ধারণা কেবলই স্বপ্ন। আজকের বাস্তবতা দেখে মনে হয়, প্রশাসনিক ভবন আসলে এক ধরনের ‘নাট্যগৃহ’, যেখানে দায়িত্ব পালনের নামে অভিনয় চলে, আর মূল চরিত্ররা প্রতিনিয়ত বদলায় কিন্তু চিত্রনাট্য একই থেকে যায়―প্রহসনের।
আমাদের জানা দরকার প্রশাসনিক ভবন কী―একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার মূল কেন্দ্র। শিক্ষার্থীদের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। সেখান থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই নিয়ন্ত্রিত হবে। সেখানে নির্ধারিত হবে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার্থীবান্ধব নীতি-নৈতিকতা,নতুন আইন, নতুন সিদ্ধান্ত এবং তার বাস্তবায়ন। এই ভবনের অন্তর্ভুক্ত উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, রেজিস্ট্রার, কোষাধ্যক্ষ, দপ্তর প্রধান, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা সবাই হবে শিক্ষার্থীদের আশা আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের প্রতীক।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের কাজ কী? বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ঠিক রাখা, কর্মপরিকল্পনা করা, দায়িত্ব বণ্টন, জবাবদিহিতা, শিক্ষার্থীদের শিক্ষার্থীবান্ধব একাডেমিক ক্যালেন্ডার, শিক্ষার্থীদের চাওয়া-পাওয়া গুরুত্ব দেওয়া, ভর্তি নীতিমালা, পরীক্ষার নীতিমালা, শিক্ষক-কর্তকর্তা নিয়োগ, বদলি, ছুটি, প্রমোশন ও প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখাশোনা করা। আবার বাজেট তৈরি, খরচ অনুমোদন, বিল ভেরিফিকেশন, বেতন-ভাতা প্রদান করা।
শিক্ষার্থীদের আবাসন নীতিমালা, বৃত্তি প্রদান, ছাত্রছাত্রীদের অভিযোগের নিষ্পত্তি, সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল, বোর্ড অব গভার্নরস ইত্যাদি কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা।
কিন্তু বাস্তবে আমরা কি পাই? আদৌও কি এরকম প্রশাসনিক ভবন আমরা দেখছি। এরকম প্রশাসনিক ভবন যেন আমাদের কাছে স্বপ্ন। আমিও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন যেন প্রহসন ভবনে রূপ নিয়েছে। এই কথার হাজারো যৌক্তিকতা আছে।
প্রহসন কী? প্রহসন হলো অবাস্তব কিছু করা, নাটক, তামাশা, হাস্যকর কিছু। প্রহসন ভবন বলতে কি আদৌও কোনো ভবন দেশে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে? নেই। এটি রূপক বা ব্যাঙ্গাত্মক অর্থে ব্যবহার হয়। যেখানে চলে দায়িত্বের নামে দায়িত্ব অবহেলা, লোক দেখানো কাজ কাজ করা, ফাঁকি দেওয়া, নাটক, অভিনয়, দায়িত্বহীনতা, কর্তব্য পালনে অনীহা, দুর্নীতি করা, লুট করা, ফটোসেশান, দায় এড়ানো, ভণ্ডামি ইত্যাদি।
বর্তমান সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন প্রহসনের সবচেয়ে পোক্ত মঞ্চ। প্রতিনিয়ত সভা-মিটিং হয়, কিন্তু সমস্যার সমাধান হয় না। যে কোনো ঘটনার তদন্ত কমিটি হয়, কিন্তু রিপোর্ট আসে না। এছাড়াও ক্যাম্পাস ভিত্তিক অনেক সমস্যা, যেমন—বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় বিভাগে সেশনজট, কোনো বিভাগে নেই পর্যাপ্ত গবেষণার সরঞ্জাম বা আধুনিক কোনো কিছু, শিক্ষার্থীদের হলে নেই পর্যাপ্ত আবাসন, আবার অত্যন্ত নিম্নমানের খাবার পরিবেশন , অস্বাস্থ্যকর খাবার, থাকার সমস্যা, বিদ্যুৎ সংযোগের সমস্যা, ইন্টারনেট সমস্যা, নেই কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা, এছাড়া হল অফিসে নেই কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি। ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের নিয়মিত প্রবেশ, চারদিকে জঙ্গলে পরিপূর্ণ, নেই পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, ভাঙ্গা রাস্তা, জলাবদ্ধতা। ক্যাম্পাসের ভাঙা বাসে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত যাতায়াত, লাইব্রেরীতে নেই পর্যাপ্ত পড়াশোনার সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য নেই সরঞ্জাম। শুধু সমস্যা আর সমস্যা। এসব সমস্যা সমাধানের জন্যই প্রশাসনিক ভবনে প্রতিনিয়ত সভা হয় কিন্তু সমাধান কোথায় আর হয় না! এসব সমাধানের নিয়োজিত ব্যক্তি আছে, পর্যাপ্ত বাজেট আছে তবুও সমাধান হয় না। কেন? কারণ ‘চেয়ার’ গুরুত্বপূর্ণ, সমস্যা নয়। এখানেই প্রহসনের মূলতত্ত্ব—দায়িত্ব নয়, দায়িত্বের অভিনয়; নেতৃত্ব নয়, নেতৃত্বের মুখোশ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থী যদি নিরাপত্তার অভাবে ক্যাম্পাসে মারা যায় বা কোনো দূর্ঘটনার শিকার হয় তাহলে সেটি একটি বড়ো ধরনের প্রশাসনিক ব্যর্থতা। এর দ্বায় কে নিবে। এমন ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত তদন্ত, দোষীদের শনাক্তকরণ এবং প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ। কিন্তু বাস্তবে কী দেখা যায়? কিছু ফটোসেশন, শোকবার্তা, তদন্ত কমিটির নাম ঘোষণা—তারপর নিস্তব্ধতা। কোনো জবাবদিহিতা নেই, নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ। এটা কি প্রশাসন, নাকি নাট্যশালার নির্বাক দর্শক?
সম্প্রতি কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এরকম এক দুর্ঘটনা দেখা যায়। একজন শিক্ষার্থীর লাশ হলের পুকুরে ভেসে ওঠে । এ কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। একজন শিক্ষার্থী পরিবার ছেড়ে বাবা-মা ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলো পড়াশোনা করতে, ফিরলো লাশ হয়ে! অথচ এ নিয়ে প্রশাসনের নেই কোনো ভ্রুক্ষেপ। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত এর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের জন্য আন্দোলন করলেও প্রশাসনকে খুঁজে পাওয়া যায় না। ভঙ্গুর প্রশাসন।
আর রাজনীতির কথা না বললেই নয়। বর্তমান প্রতিটি শিক্ষাঙ্গন পরিণত হয়েছে রাজনীতির মঞ্চে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই রাজনীতির সাথে যুক্ত। এই রাজনীতি শেখায় সকল নীতি-নৈতিকতা বর্জন করা, সত্য ঢেকে রাখা, মিথ্যা নিয়ে আসা, অন্যের উপর দোষ চাপানো, দায় চাপানো, অন্যায় করা, অপবাদ দেওয়া, ক্ষমতা দেখানো, সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে খেলা করা, তামাশা করা। যা হিংসাত্মক রাজনীতি। বিশ্ববিদ্যালয় একজন উপাচার্যের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক শৃঙ্খলা ও শিক্ষার পরিবেশ রক্ষা, সেখানে তিনি হয়ে উঠেছেন রাজনৈতিক শক্তির প্রতিনিধি। শিক্ষক নিয়োগ, সিন্ডিকেটে প্রতিনিধিত্ব—সবকিছুতেই চলছে পক্ষপাতিত্ব, দলীয় আনুগত্যের মূল্যায়ন। ‘যোগ্যতা’ যেন এখন যোগ্য লোকের হাতে না, বরং সুবিধাজনক লোকের হাতে ওঠে।
যেখানে উপাচার্য নিজেই নোংরা রাজনীতির সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত সেখানে অন্য শিক্ষক বা কর্মকর্তা বা শিক্ষার্থীদের কথা আর কি বলার আছে?
বর্তমান শিক্ষার্থীদের প্রতি প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি যেন উপনিবেশিক আমলের জমিদারের মতো—তাদের কাজ চুপচাপ নির্দেশ পালন করা, কথা বললেই ‘নিয়ম ভঙ্গ’, ‘শৃঙ্খলা পরিপন্থী’। এই মনোভাব প্রশাসনিক ভবনকে প্রহসনের ভবনে পরিণত করতে বাধ্য করেছে।
বর্তমান বাস্তাবতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ শুধু কাগজে-কলমে। খাতার পাতায়। যেখানে লিখে রাখে সেখানেই ক্লোজ। দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই।
আমরা ভুলেই গেছি বিশ্ববিদ্যালয় কি! বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সংজ্ঞা ভুলেই গেছি! বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থী কেন আসে, ভুলেই গেছি! আমরা এখন জানি বিশ্ববিদ্যালয় হলো দেশের নোংরা রাজনীতির উপযুক্ত স্থান। যেখানে অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি, রাজনীতি সব কিছু হয়, হয় না শুধু জ্ঞান চর্চা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার কথা ছিল জ্ঞান চর্চার প্রধান কেন্দ্র। বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার কথা ছিল একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার কেন্দ্র, মুক্তচিন্তার জাগরণভূমি। অথচ এই স্থানে চলে প্রশাসনের নামে স্বেচ্ছাচার, দায়িত্বহীনতা আর দলবাজি। এভাবে চলতে থাকলে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার ছাড়া আর কি হতে পারে?
মোজাহিদ হোসেন: কলাম লেখক ও শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।





Users Today : 0
Views Today :
Total views : 175444
