আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার দলের সভাপতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির সম্মুখে উত্থাপন করেছেন। গণতান্ত্রিক রাজনৈতি দলসমূহ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঠে বিজয়-বিজিতের সমরে নেমে পড়েছে। বহু আকাঙ্ক্ষিত নির্বাচনে এবারই প্রথম আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী ছাড়াও নিজ দল থেকেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ দান করেছে। এতে দলীয় প্রার্থীদের জনসম্পৃক্তের মানদণ্ড যেমন যাচাই হচ্ছে, অপরদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরও মুজিব সৈনিক হিসেবে কষ্টিপাথরে নিজেদেরকে প্রমাণ করার সুযোগ অবশ্যই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার পর দু-একটি নির্বাচনী এলাকায় ঘোরাঘুরি এবং আদিবাসী নেতৃবৃন্দের সাথে এ প্রসঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছি। ‘উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরাম’র কেন্দ্রীয় নেতা হিংগু মুরমু দলীয় প্রতীক ও দলের সর্বোচ্চ নেতা কর্তৃক সম্মতিতে প্রার্থীতার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আদিবাসী জনগোষ্ঠী উভয় সঙ্কটে পড়েছে এবং আশঙ্কা করছেন নির্বাচনকালীন এবং নির্বাচনোত্তর হামলা, শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার-নির্যাতন এবং উচ্ছেদের মতো নিরব হুমকি। ধরুন—কোনো এক সময় নৌকা প্রতীক নিয়েই কয়েকবার জাতীয় সাংসদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, এবার তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী। অপরদিকে একই আসনে ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয়ভাবে নৌকা প্রতীকে তরুণ ও উদীয়মান নেতাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। প্রেক্ষাপট অবশ্যই বিচার্য, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু আদিবাসীদেরকে প্রার্থী পছন্দ করার অবাধ সুযোগ দেওয়া না হলে; ভোট দিলেও বিপদ আর না দিলেও মুসকিল। এরূপ পরিস্থিতিতেই আড়ালে-আবডালে হুমকি-ধামকি এবং নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি অগ্রগণ্য।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শ্লোগান হচ্ছে—‘ডিজিটাল থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ’। স্মার্ট বলতে—যারা নিজেদের অতীত থেকে বর্তমান, বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের চিন্তা করে নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করতে পারে কিংবা নিজে নিজেই প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সামর্থ্য। ইতোমধ্যেই আওয়ামী লীগ ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনী ইশতেহারের ৩.২ ছ. ‘সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতা’ শিরোনামে উল্লেখ করেছে—‘আওয়ামী লীগ সন্ত্রাস দমন, সকল নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রাষ্ট্র পরিচালনায় সংবিধানের প্রাধান্য, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সন্ত্রাসমুক্ত সমাজগঠন সুনিশ্চিত করা হবে। বাংলাদেশ সকল ধর্ম, বর্ণ এবং পেশার মানুষের আবাসভূমি। অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ আমাদের কাম্য।’ আদিবাসীরা সর্বদা অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করে কিন্তু কখনো কখনো সাম্প্রদায়িকতার শিকার হয়ে থাকে। পবিত্র সংবিধান কিংবা ইশতেহারে আইনের শাসন ও সাম্যতার কথা থাকলেও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারের ঔদাসিন্যতা লক্ষণীয়। আদিবাসীরা অসাম্প্রদায়িক চেতনা থেকেই দেশের প্রতিটি দূর্যোগ-দূর্বিপাকে, আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষের রক্ত গঙ্গায় সম্মিলন ঘটেছে; ৩০ লক্ষ শহীদ ও ৩ লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-আদিবাসী-অন্ত্যজ শ্রেণীর নিরাপদ আবাসভূমি। নিরাপদ নিশ্চিত করতেই সরকারের স্মার্ট উদ্যোগ প্রত্যাশিত। স্মার্ট নাগরিক হিসেবে আদিবাসীদের চেতনাকে উৎসারিত করা আবশ্যিক যেন দেশ ও দশের, জাতি ও রাষ্ট্রের কল্যাণে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়।
বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার পূর্বোক্ত নির্বাচনেও ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু’র অংশে অনেক প্রতিশ্রুতি ও প্রতিজ্ঞা লিপিবদ্ধ করেছিলেন। ২০২৪ সালে পুর্নবার উল্লেখ করেছেন ‘সংবিধানের আলোকে সকলের অধিকার সুরক্ষায় উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় সংসদে অর্পিত সম্পত্তি আইন সংশোধন করা হয়েছে এবং অর্পিত সম্পত্তি সংশ্লিষ্ট সমস্যা নিস্পত্তির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইন প্রয়োগে বাধা দূর করা হবে। সংখ্যালঘুদের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন এবং সংখ্যালঘু বিশেষ সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা হবে। আওয়ামী লীগ ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও অনগ্রসর সম্প্রদায়ের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আবশ্যক পদক্ষেপ নেওয়া অব্যাহত রাখবে।’ ২০১৮ সালের নির্বাচনের পরবর্তীকালে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-আদিবাসী-অন্ত্যজ শ্রেণীকে উপরোক্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রাজপথে দাঁড়াতে দেখা গেছে। সরকার প্রধানের দৃষ্টি আকর্ষণে মানববন্ধন, অবস্থান ধর্মঘট, লং মার্চ করেছেন; অতঃপরও আজ পর্যন্ত ঠাঁই হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, সংখ্যালঘু বিশেষ সুরক্ষা আইন। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা উদ্বিগ্নতা থেকেই আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন। আদিবাসীরা সরলভাবেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে লালন করে চলেছেন, জাতিরজনকের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলকে সমর্থন ও পক্ষাবলম্বন করে আসছে। রাজনৈতিক উত্থান-পতনেও অনড়তা রয়েছে কিন্তু দলের কর্ণধারদের প্রতিশ্রুতি, প্রতিজ্ঞা আস্থার জায়গাকে ক্ষীণ করে তুলছে। মনে করি, সত্যিকার অর্থেই যদি সরকার কমিশন, আইনগুলো প্রণয়নে আগ্রহী হোন; তাহলে নির্বাচনী অঙ্গিকার পূরণে গড়িমসি করবেন না। আদিবাসীদের বিশ্বাসের জায়গাটাকে শূন্যে পরিণত করবেন না।
উত্তরবঙ্গ অথবা পাহাড়ের আদিবাসীদের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় অধিকারগুলো স্থানভেদে ভিন্নতা রয়েছে; কিন্তু পাহাড়ের আদিবাসীদের কথা বলার সুযোগ রয়েছে। এবারও ৩জন পাহাড়ি আদিবাসীকে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিয়েছে। অতঃপরও ২০২৩ সালে ২৪০টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, এতে দেড় হাজারের বেশি পাহাড়ি মানুষ নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর অদ্যাবধি ২৫টি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে বলে অত্র এলাকার আদিবাসীরা দাবি করে আসছেন। অবশিষ্ট ৪৭টি ধারা সম্পূর্ণভাবে অবাস্তবায়িত অবস্থায় নয় তো আংশিক বাস্তবায়িত করে অর্থব অবস্থায় রেখে দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রদায়িকতা বিপরীত শব্দ হচ্ছে অসাম্প্রদায়িকতা; অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতিফলন ঘটে থাকে পরিকল্পনায়, কাজে এবং জনসাধারণের সুফলভোগে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন উল্লেখ সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ পেত।
আগামী ৭ তারিখ অনুষ্ঠিত হতে চলেছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। উৎসবমুখর পরিবেশে অর্থাৎ উৎসবে থাকবে প্রার্থীকে পছন্দ ও ভোট দেওয়ার আনন্দ; থাকবে না কোনো শঙ্কা ও ভয়ভীতি। ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’ এটি নিশ্চিত হলেই উৎসবমুখর পরিবেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুসম্পন্ন হবে।






Users Today : 13
Views Today : 13
Total views : 177416
