২০২৩ সালের প্রারম্ভে টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ি উপজেলার বাঁশনিয়োগী গ্রামে খ্রিষ্টবিশ্বাসীদের গির্জা নির্মাণে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বাধা সৃষ্টি করেছেন। থানা ও জেলা পর্যায়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে আবেদন নিবেদনের পরও ভিত্তিপ্রস্তর থেকে বুক বরাবর পর্যন্ত গেঁথে তোলা অসমাপ্ত গির্জাঘরটি পরিত্যাক্ত অবস্থায় এখনো পড়ে রয়েছে। এটি অত্যন্ত কষ্টের কথা যে, দেশের মাইক্রোসকপিক সংখ্যালঘু খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের উপাসনালয়টি প্রশাসনের অবহেলা ও উপেক্ষার দরুন অত্র এলাকার খ্রিষ্ট বিশ্বাসীসহ সকলেই মর্মাহত হচ্ছেন। দেশের পবিত্র সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ক. ‘প্রত্যেক নাগরিকের যেকোনো ধর্ম অবলম্বন, পালন বা প্রচারের অধিকার রহিয়াছে; খ. প্রত্যেক ধর্মীয় সম্প্রদায় ও উপ-সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের স্থাপন, রক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অধিকার রহিয়াছে।’ অর্থাৎ ধর্ম পালনের যেমন অধিকার রয়েছে, অনুরূপভাবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গির্জা, মন্দির, মসজিদ, প্যাগোডা, মাজহীথান প্রভৃতি নির্মাণের অধিকার সংবিধান দিয়েছে। জানা যায়, বেশ কয়েক বছরপূর্বে বাংলাদেশ ব্যাপ্টিষ্ট চার্চ ফেলোশীপের ট্রাস্টের অধীনে প্রায় ১৪ শতাংশ জমি গির্জাঘর নির্মাণের জন্য ক্রয় করে। এই গির্জার অধীনে ১২/১৫টি খ্রিষ্টান পরিবার গির্জাঘরের অনুপস্থিতিতে পার্শ্ববর্তী ঘরে উপাসনা করে আসছে। বাঁশনিয়োগী গ্রামের খ্রিষ্টবিশ্বাসীদের প্রশ্ন কেন সরকার, স্থানীয় প্রশাসন গির্জাঘর নির্মাণে গড়িমসি করছে! কেন ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ন করে সংবিধানের পবিত্রতায় কালিমালেপনে দ্বিধান্বিত হচ্ছেন না! সংবাদপত্রে দেখেছি, সরকার গোটা দেশে ৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণ করেছে কয়েক দফায়; সরকারি কোষাগার থেকে বরাদ্দ দিয়ে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের ধর্মীয় জীবনযাপন ও ন্যায়তভাবে কর্মকাণ্ড পরিচালনাতে উৎসাহিত করছে। তাহলে কেন নিজ ধর্ম পরিপালনে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উদ্যোগ নিচ্ছেন না! কেন গির্জার নির্মাণ করে খ্রিষ্টানুসারীদের ধর্মীয় জীবন যাপন করতে সহযোগিতার হাত বাড়াতে কার্পণ্যবোধ করছে! সরকারের দ্বিচারণী ভূমিকা আমাদেরকে হতবাক করেছে!
রাজধানী ঢাকার শেখ ইয়াছিন রোড, পূর্ব মোল্লারটেক (তেঁতুলতলা বেকারী), দক্ষিণখান, ঢাকা ১২৩০-এ পবিত্র বাইবেলের পাতা ছিড়ে ছিড়ে বিক্রি করা হচ্ছে খাবার। কোনো না কোনো ব্যক্তির হাত বদল হয়ে এসেছে বেকারিতে। একজন বেকারির বিক্রেতার যে অক্ষর জ্ঞান নেই, অনুমান করতেও কষ্ট হচ্ছে। এখানে রয়েছে অর্থনৈতিক লেনদেন, দিনের শেষে লাভ-লোকসানের নিখাঁত হিসাব। অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন হলে কেন তিনি একটি ধর্মের ধর্মগ্রন্থ ছিড়ে ছিড়ে খাবার তুলে দিচ্ছেন! এটি নেহাতই বিভ্রম কিংবা এটির পেছনে রয়েছে অপরের ধর্মকে অপদস্ত করার হীন চেষ্টা। সাধারণত ধর্মগ্রন্থগুলোর অবয়ব অন্য গ্রন্থগুলো থেকে ভিন্নতা রয়েছে, সেটাপ-গেটাপ, প্রচ্ছদ ও কালারও বেশ দৃষ্টিনন্দন হয়ে থাকে। একজন নিরক্ষর ব্যক্তিও সহজেই অনুমান করতে পারে, এটি আর ১০টি বইয়ের সাদৃশ্য নয়। তাহলে কী উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়েই বেকারির মালিকটি এহেন কাজ করেছেন! তিনি তো একটি ধর্মের অনুসারীদের হৃদয়ে আঘাত করেছেন, সংক্ষুব্ধ করে তুলেছেন। বাংলাদেশের পেনাল কোড ২৯৫ থেকে ২৯৮ পর্যন্ত বর্ণনায় ধর্ম অবমাননা সংক্রান্ত অপরাধে দণ্ডিত ও জরিমানার উভয় দোষে দোষী হতে পারে। সাম্প্রতিকালে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে, ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন’। বিচারপতি রেজাউল হাসান ও বিচারপতি ফাহমিদা কাদেরের বেঞ্চ সাইবার নিরাপত্তা আইনের একটি মামলায় জামিন আবেদন নিষ্পত্তিতে এ মতামত দেন। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আমিন উদ্দিন মানিক বলেছেন, ‘আদালত পর্যবেক্ষণে সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩ এ কোরআনসহ সব ধর্মগ্রন্থের বিষয়ে কুঁক্তি করলে এই আইনের ধারা জামিন অযোগ্য করাসহ সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড রাখার বিধান করার পরামর্শ দেয়।’ অবশ্য কেউ কেউ জীবন্ত ঈশ্বরের বাক্য পৌঁছানোর মাধ্যমে হিসেবেও বিবেচনা করেছেন। তবে, এটি যে দৃষ্টিকটু ও অবমাননাকর; এটিতে কোনো সন্দেহ নেই।
২০২৪ সালে ইস্টার সানডের দিনে আবারো দেশের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীরা ডিপার্টমেন্ট ও ভাইস চ্যান্সেলার বরাবর আবেদন করেও কোনো লাভ হয়নি। অর্থাৎ অল্প হলেও সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে খ্রিষ্টিয়ান ধর্মের শিক্ষার্থীরা শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল বিশ্ববিদ্যালয় ইস্টার সানডের দিনে ছুটি ঘোষণা করলেও নর্থ-সাউথ এইক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিভাগ সরকারি ও বেসরকারি কলেজে ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ছুটির তালিকায়—পবিত্র রমজান, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিবস ও জাতীয় শিশু দিবস (১৭ মার্চ) শুভ দোলযাত্রা (২৫ মার্চ), স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস (২৬ মার্চ), পুণ্য শুক্রবার (২৯ মার্চ), ইস্টার সানডে (৩১ মার্চ), জুমাতুল বিদা (৫ এপ্রিল), শবে কদর (৭ এপ্রিল), ঈদুল ফিতর (১১ এপ্রিল), বৈসাবি ও পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অনুরূপ সামাজিক উৎসব (১২ এপ্রিল ও ১৫ এপ্রিল), বাংলা নববর্ষ (১৪ এপ্রিল) ও গ্রীষ্মকালীন অবকাশ লক্ষ্যে মার্চ ১০ থেকে ১৮ এপ্রিল ছুটি দেখা যায়। সোনিয়া হাসান, উপ সচিব স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে ঐচ্ছিক ছুটি হিসেবে ইস্টার সানডের তালিকা রয়েছে। অত্যাল্প ধর্মীয় সংখ্যালঘু খ্রিষ্টান ছাত্রছাত্রী এবং অফিস-আদালতে কর্মরত খ্রিষ্টান ভাইবোনদের ছুটির বিষয়ে সোচ্চার দাবি জানিয়ে আসছে ‘বাংলাদেশ খ্রিষ্টিয়ান এসোসিয়েশন’। বিষয়টি উপলব্ধিয় যে, ইস্টার সানডের দিনে ছুটি না থাকায় খ্রিষ্টান ছাত্র-ছাত্রীসহ চাকরিজীবীরা যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও মর্যাদায় দিনটি উদযাপন করতে পারছেন না। পবিত্র সংবিধানে স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোন বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোনো নাগরিককে কোনোরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাইবে না।’ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি তথা পরীক্ষার বিষয়টিও সমানভাবে প্রযোজ্য বলে মনে করি।
২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে সাক্ষাৎ হয়েছিল খ্রিস্টান ধর্মযাজক ফাদার বিদ্যা বর্মনের সাথে। সাক্ষাতের পরই একটি কাগজ তুলে দিলেন, এটি হচ্ছে অভিযোগ পত্র, স্থানীয় সাংসদ মো. দবিরুল ইসলাম (ঠাকুরগাঁও-২) বরাবর লেখা। দেখা যায়, মাননীয় সাংসদ ২৭ জুলাই ২০২৩ সালে গ্রহণকরত স্বাক্ষর করেছেন। বিষয় বর্ণনায় রয়েছে—‘ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গি উপজেলার দোগাছি টালিপাড়ার খৃষ্টান ও হিন্দুদের চাষাবাদের ৭০ বিঘা জমি ও দোগাছি ক্যাথলিক গির্জার সামনে অবৈধভাবে লাল পতাকা টাঙানোর অভিযোগ’। জানা গেছে, ২৪শে জুলাই বিকেলে বালিয়াডাঙ্গি সহকারী কমিশনার (ভূমি) জনাব ফাতেমাতুজ জোহরা পুলিশ বাহিনী নিয়ে বিবাদমান জমিতে লাল পতাকা টাঙিয়ে আসেন। বিবাদীগণের দাবি হচ্ছে, জমিগুলো তাদের পৈত্রিক সম্পত্তি, পুরুষের পর পুরুষ তারা ভোগদখল করে আসছে। বর্তমানে সম্পত্তি নিয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা আদালতে ফৌজদারী ও দেওয়ানী মামলা বিচারাধীন রয়েছে। বিচার নিস্পত্তির পূর্বে কীভাবে স্থানীয় প্রশাসন একপক্ষ নিয়ে জমিতে ঝাপিয়ে পড়েছেন, সেটিই এখন খ্রিস্টিয়ানসহ সংখ্যালঘুদের কাছে বিভ্রমের বিষয়। অপরদিকে ‘ক্যাথলিক গির্জার সামনে লাল পতাকা টাঙাইয়া… এলাকার খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের লোকজন প্রার্থনা করিতে পারতেছি না’। অশেষ চন্দ্র সিংহ, হেমচন্দ্র সিংহ, উলেন বর্মন, প্রফুল্ল চন্দ্র সিংহ এবং ফাদার বিদ্যা বর্মন স্বাক্ষরিত আবেদনের আর্জি হচ্ছে, ‘মানবিক কারণে সংখ্যালঘুদের পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত জমি হইতে লাল পতাকা উত্তোলন, জমিতে চাষাবাদসহ বালিয়াডাঙ্গি উজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জনাব ফাতেমাতুজ জোহরাকে অবিলম্বে বালিয়াডাঙ্গি হতে অপসারণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে আপনার মর্জি হয়’।
২০২৪ সালের প্রথমদিকে জেনেছিলাম, ফাদার বিদ্যা বর্মনকে মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত করে জেলেও যেতে হয়েছে। ৭০ বিঘা জমির মধ্যে ১৪ বিঘা ০৭ কাঠা খ্রিষ্টানুসারীদের, ২৭ বিঘা হিন্দু সম্প্রদায়ের এবং ১৫ বিঘা মুসলিম জনগোষ্ঠীর। ঢাকা মোহাম্মদপুরস্থ ভি/১ নূর জাহান রোডবাসী মো. ফরহাদ বিন সাখাওয়াত, মো. নাভিদবিন সাখাওয়াত, পিতা মৃত. সাখাওয়াত আলী, মাতা—মৃত. ফরদাহ বানু ছোট ছোট সম্পত্তির মালিকদের কাছ থেকে মোট আড়াই বিঘা সম্পত্তি ক্রয় করে নেন। ক্রয়কৃত আড়াই বিঘা সম্পত্তির বলেই বাকী সম্পত্তিগুলো দখলের নীলনক্সা একেঁছেন। আর এটির সাথে যুক্ত হয়েছেন স্থানীয় ভূমি অফিসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা।
প্রশ্ন হচ্ছে—আদালতে মামলা চলাকালীন সময়ে সরকারি কর্মকর্তারা একপেশে আচরণ করতে পারে না? দ্বিতীয়ত—এসি ল্যান্ড ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় কঠোরতার পরিবর্তে অর্থের কাছে নতজানু হয়ে বৈষম্যমূলক মনোভাব রাষ্ট্রের নৈতিক মানদ-কে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। তৃতীয়ত—বালিয়াডাঙ্গির এসি ল্যান্ড বঙ্গবন্ধুর আদর্শ সৈনিক নন, তিনি সাম্প্রদায়িক মনোভাব পোষণ করেন। একজন সরকারি কর্মকর্তা যিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষের প্রদত্ত ট্যাক্স দিয়ে বেতন-ভাতা যোগান হয়ে থাকে; তার এরূপ সাম্প্রদায়িক চেতনা সংবিধান পরিপন্থী। বঙ্গবন্ধু সরকারি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন তারা জনমানুষের সেবক হয়ে সেবা প্রদানে সচেষ্ট হয়। সময়ের প্রেক্ষিতে জাতিরপিতার আদর্শ ক্রমশই বিবর্ণ হতে চলেছে।
বাংলাদেশের রূপকার ও স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধর্মীয় বিভেদকে অপছন্দ করেছেন। তিনি ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন, তেমনি ইসলাম ধর্ম ও মহান আল্লাহর ওপর তার ছিল অসাধ বিশ্বাস ও আস্থা। আবার ধর্ম ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে তার অবস্থান ছিল অত্যন্ত শক্ত ও দৃঢ়। ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ সালের এক ভাষণে বলেছেন, ‘এদেশে কৃষক-শ্রমিক, হিন্দু-মুসলমান সবাই সুখে থাকবে, শান্তিতে থাকবে।’ এটিই আমাদের প্রাণের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষা।






Users Today : 13
Views Today : 13
Total views : 177416
