১.
২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে ২২ মার্চ দুর্বৃত্তদের অস্ত্রের আঘাতে মর্মান্তিকভাবে মৃত্যু হয় বীরমুক্তিযোদ্ধা ধর্মান্তরিত হোসেন আলী। কুড়িগ্রামের খ্রিষ্ট বিশ্বাসী প্রয়াত রেভা. ফোরকান আল-মসীহ কর্তৃক জেনেছিলেন প্রভু যিশু খ্রিষ্ট সম্পর্কে। প্রভু যিশুর জীবনাচরণ, শিক্ষা, ভালোবাসা, ক্ষমা ও স্বর্গে গমনের পথ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছিলেন। হোসেন আলী একজন খ্রিষ্টভক্ত হিসেবে নিজেকে পরিচিত করেন এবং সেইভাবেই জীবন যাপন করতেন। মৃত্যুর পূর্বে তাঁর সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল মিরপুর ঢাকাতে। প্রভু যিশুর একনিষ্ঠ সৈনিক হিসেবে নিজেকে আত্মপ্রকাশ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। সেদিন প্রাতঃ ভ্রমণে বের হওয়া হোসেন আলীকে দুর্বৃত্তরা মোটর সাইকেল যোগে এসে কুপিয়ে হত্যা করে এবং নিশ্চিন্তে চলেও যান। এ ঘটনায় একটি হত্যা ও একটি বিস্ফোরক আইনে মামলা করা হয়। পরবর্তীকালে ওই বছরের ৭ নভেম্বর কুড়িগ্রাম সদর থানা পুলিশ ১০ জেএমবি সদস্যকে আসামি করে কুড়িগ্রাম মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে অভিযোগ পত্র দাখিল করা হয়। দীর্ঘ ৬ বছর পর বিগত ২২ জুন, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দে কুড়িগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ মো. আব্দুল মান্নান আসামিদের রায় পড়ে শোনান। পি. পি. আব্রাহাম লিংকন জানান, ‘রায়ে হত্যার দায়ে ছয় আসামিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এছাড়া একই আদালত বিস্ফোরক আইনের ৩ ধারায় জাহাঙ্গীর ওরফে রাজিব গান্ধী, রিয়াজুল ইসলাম মেহেদী ও গোলাম রব্বানীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা; অনাদায়ে এক বছরের জেল এবং একই আইনের ৪ ধারায় ওই তিন আসামিকে ২০ বছর কারাদণ্ড ও ২৫ হাজার টাকা জরিমানা; অনাদায়ে ৬ মাসের কারাবাসের আদেশ দেয়।’ দণ্ডিতরা হলেন জাহাঙ্গীর ওরফে রাজিব ওরফে রাজিব গান্ধী, রিয়াজুল ইসলাম মেহেনী, গোলাম রব্বানী, হাসান ফিরোজ ওরফে মোখলেছ মাহবুব হাসান মিলন ওরফে হাসান ওরফে মিলন ও আবু নাসির ওরফে রুবেল। রায় ঘোষণার সময় রিয়াজুল ইসলাম মেহেদী ছাড়া বাকিরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন। খ্রিষ্ট বিশ্বাসী হোসেন আলীর বিচার নিষ্পত্তি আমাদেরকে আশান্বিত করে করেছে, অপরদিকে তাঁর নিকটজনদের প্রতি মুহুর্মুহু হুমকি উদ্বিগ্ন ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তার পরিবার এবং খ্রিষ্টিয় সমাজ।

২.
জুলাই ৮ তারিখ সন্ধ্যায় কথা হচ্ছিল পাষ্টর তিমথী বাড়ৈর সাথে। রুদ্ধ কণ্ঠস্বরেই জানাচ্ছিলেন ঘটে যাওয়া একটি কালো অধ্যায়। বিগত ৫ জুলাই, ২০২২ খ্রি. গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া বাগদা বাজারে পাষ্টর তিমথী বাড়ৈ পূর্ব নির্ধারিত ব্যক্তি বাজারের দোকানদার মোর্শেদের সাথে প্রভু যিশুর বিষয়ে আলাপের লক্ষ্যে উপস্থিত হলে দোকানদার মোর্শেদ স্থানীয় দু’জন মসজিদের ইমাম সাহেবকে বিষয়টি অবগত করেন। অবশ্য ইতিপূর্বে ১ জুলাই শুক্রবার তিনি দোকানদার মোর্শেদ ও স্থানীয় প্রাক্তন ইউপি পরিষদ সদস্যের উপস্থিতিতে প্রভু যিশুর ভালোবাসা ও তাঁর কাছে যাবার পথ সম্পর্কে ওয়া কিবহাল করেছিলেন। সেদিন বাজারের দোকানদার মোর্শেদের দোকানে উপস্থিত হবার সাথে সাথে লোকজন জড়ো হতে থাকে। অতঃপর ইমাম সাহেব আসার পরই কথা বলার সুযোগ না দিয়েই পাষ্টর তিমথী বাড়ৈকে স্যান্ডেল খুলে উত্তম-মধ্যম দিতে শুরু করেন। ইমাম সাহেবের দেখাদেখি উৎসুক জনতা কর্তৃকও চরমভাবে শারীরিকভাবে হেনস্তা ও অপদস্তের শিকার হন। ইমাম সাহেবের উপস্থিতিতেই জুতার মালা তৈরি করে পাষ্টর তিমথী বাড়ৈর গলায় পরিয়ে দেওয়া হয়। পার্শ্ববর্তী গ্রামের বাসিন্দা পাষ্টর তিমথী বাড়ৈর গলায় জুতার মালা পরানো যেন তাদের বিজয় কিন্তু মানবতার যে অপমৃত্যু হলো; সেটির দিকে কারো কোনো খেয়াল ছিল না। সেই জায়গায় অপর একজন খ্রিষ্ট বিশ্বাসী বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছিলেন, তিনি অত্র এলাকার পালক প্রধানকে অবহিত করলে দ্রুততার সাথে স্থানীয় থানাকে অবহিত করা হয়। পুলিশ এসে পাষ্টর তিমথীকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। থানাতে মুচলেকাতে লিখতে হয়েছে ভিন্ন কথা যা পাষ্টর তিমথী বাড়ৈ মেনে নিতে পারেননি। সত্যিই কেন তাকে এমন অপমানিত হতে হলো? একজন ব্যক্তি যদি ধর্ম কথা শ্রবণে অপারগতা প্রকাশ করে, সেক্ষেত্রে কেউ-ই তাকে শোনাতে পারে না; কিন্তু আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে এরূপ সাম্প্রদায়িকতা, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তাহলে তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। দোকানদার মোর্শেদ তো সোজাসাপটা বলতে পারতেন, আমাকে প্রভু যিশু সম্পর্কে না বললেই খুশি হবো! নিশ্চয়ই পাষ্টর তিমথী বাড়ৈ জোরপূর্বক বলার সাহস রাখেন না! এটি নিঃসন্দেহে একটি চক্রান্ত এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের জন্য স্থানীয় ব্যক্তিবর্গরাই দোষী। বর্তমানে পাষ্টর তিমথী বাড়ৈ ও তার পরিবার বেশ আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। আমরা দোষী ব্যক্তিদের স্যবস্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি করি।

৩.
গ্রামীণ ডাক্তার (পল্লী চিকিৎসক) ডা. ফজল সরকার ফিলিপ ও তার পরিবার বিগত ৩ জুন, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দের সকাল ৮ ঘটিকায় স্থানীয় মো. হাসেম আলী তার দলবল নিয়ে খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী ডা. ফজল সরকার ফিলিপের বাড়িতে হামলা চালায়। ঘটনাটি ঘটেছে, কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলায়। ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী ডা. ফজল সরকার ফিলিপ ও তার পরিবারে দেশীয় লাঠি-সোঠা এবং অন্যান্য অস্ত্রাধি নিয়ে হামলায় পরিবারের সদস্যগণ সেলিম সরকার, সুমি সরকার, লাবণী সরকার, শিল্পী সরকার, ইমরান আলী, রফিকুল ইসলাম গুরুত্বর আহত হয়ে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। জানা যায়, খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী ফজল সরকার ফিলিপের বাড়ি ও জমি দীর্ঘদিন থেকে দখলের পাঁয়তারা করে আসছিল মো. হাসেম আলী। কিন্তু কেন, এই কেন কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। এ বিষয়টি নিয়ে ভুরুঙ্গামারী থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রশ্ন করা হলে জানান, ‘আমরা ভিকটিমের কাছ থেকে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি জেনেছি কিন্তু লিখিত অভিযোগ না পাওয়া পর্যন্ত ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং কোনো ধরনের সহায়তা করতে পারছি না।’ ডা. ফিলিপ বলেছেন, পরিবারের সকলেই চিকিৎসাধীন থাকায় পরিবারের পক্ষে কেউ-ই থানায় উপস্থিত হয়ে অভিযোগপত্র দাখিল করতে পারে নাই। বরং বিবাদীর পক্ষ থেকে সুবিধাদি নিয়েছেন বলে পুলিশ প্রশাসন পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছেন, এমনই মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি প্রশাসনের সহায়তা চেয়েছে, সেক্ষেত্রে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা কীভাবে নিশ্চিন্তে বসে আছেন সেটি বোধগম্য নয়! তাহলে কী প্রশাসনের মধ্যেও দৃষ্টিভঙ্গির দৈন্যতা রয়েছে, রয়েছে বৈষম্যের সূক্ষ্ম রেখাপাত! প্রশাসনের এহেন নিরবতা ও পক্ষপাতমূলক আচরণ সমগ্র খ্রিষ্ট সমাজকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
৪.
জেবান আলী, শেরপুর, দৌলতপুর, কুষ্টিয়ার একজন খ্রিষ্ট বিশ্বাসী। স্থানীয় চার্চ দ্বারা প্রভু যিশুকে মুক্তিদাতা ও উদ্ধারকর্তা হিসেবে গ্রহণ ও স্বীকার করে। বিগত ৬ জুন, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের বিতর্কিত রাজনৈতিক নেত্রী নুপুর শর্মার বিষয়ে ফেসবুকে লাইক করলে এ দিনে স্থানীয় মুসল্লিরা সদলবলে জেবান আলীর পরিবার, ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে। আমাদের কথা হচ্ছে, একজন ব্যক্তি তার স্বীয় কর্মকাণ্ডের জন্য শাস্তি, জেল জরিমানা হতে পারে কিন্তু তার পরিবার-পরিজন, আবাসস্থল এবং এটিকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতির যে অবনতি ঘটে থাকে; সেটি কখনোই কাম্য হতে পারে না। দেশের আইন-কানুন অনুযায়ী নিশ্চয়ই তার দৃষ্টান্তমূলক বিচার হবে; তাহলে আমরা কেন আইনকে নিজের হাতে তুলে নিচ্ছি! এদিকটিই খ্রিষ্ট বিশ্বাসীদেরকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। আমরা মনে করি, শত-সহস্র বছরের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের যে বন্ধন রয়েছে; সেখানে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা যেন ফিকে হয়ে যেতে বসেছে। এ জাতীয় অনেক ঘটনা সম্প্রতিককালে ঘটে চলেছে এবং খ্রিষ্টানুসারীদের কাছে যেন অশনী সংকেত হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।
আমরা প্রায়শই অবলোকন করছি, ধর্মীয় সৌহার্দ্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হচ্ছে এবং এক শ্রেণীর লোকেরা ঘোলা পানিতে মৎস্য শিকারে খুবই সিদ্ধহস্ত। মানুষ মাত্রই ভুল করে থাকে, আমরা কেউ-ই স্বর্গীয় দূত না যে, ভুল থাকবে না। ভুল-ভ্রান্তি আছে বলেই সংশোধনের সুযোগ আছে, দেশে আইন-কানুন আছে, বিচারালয় আছে; কিন্তু যখন আমরা নিজেরাই আইন হাতে তুলে নিই, সেখানেই, ধর্মের, মানবতার মৃত্যু ঘটে। জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু পবিত্র সংবিধান প্রণয়নের প্রাক্কালে স্পষ্টই ঘোষণা করেছেন, ‘…মুসলমানরা তাদের ধর্ম পালন করবে, তাদের বাধা দেওয়ার ক্ষমতা এই রাষ্ট্রে কারো নাই। হিন্দুরা তাদের ধর্ম পালন করবে, কারো বাধা দেওয়ার ক্ষমতা নাই। বৌদ্ধরা তাদের ধর্ম পালন করবে, খৃষ্টানরা তাদের ধর্ম করবে, তাদের কেউ বাধা দিতে পারবে না। আমাদের শুধু আপত্তি হলো এই যে, ধর্মকে কেউ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না।’
২০২২ খ্রিষ্টাব্দে জুন পর্যন্ত প্রায় ডজন খানেক খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারীদের ওপর নির্যাতন, অত্যাচার, হামলা, মামলা-মোকাদ্দমা ইত্যাদি ঘটেই চলেছে। ক্রমশই ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে বিশেষত খ্রিষ্টিয়ান জনগোষ্ঠী এবং সচেতন দেশবাসীও ধর্মীয় উগ্রবাদিতার বিষয়ে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করে চলেছেন। এখনই অস্থিতিশীল পরিবেশকে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতিমূলক ক্ষেত্রে পরিণত করতে ব্যর্থ হলে আকাশ-বাতাস বিষবাস্পে পরিণত হবে; পুরো দেশকে এটির দায়ভার নিতে হবে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষপাদের কবি শেখ ফজলুল করিম (১৮৮২-১৯৩৬) এর কালজয়ী কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে এই দর্শন—
‘কোথায় স্বর্গ? কোথায় নরক? কে বলে তা বহুদূর?
মানুষেরি মাঝে স্বর্গ নরক— মানুষেতে সুরাসুর।
রিপুর তাড়নে যখন মোদের বিবেক পায় গো লয়,
আত্মগ্লানির নরক অনলে তখনই পুড়িতে হয়।
প্রীতি-প্রেমের পুণ্য বাঁধনে মিলি যবে পরস্পরে
স্বর্গ আসিয়া দাঁড়ায় তখন আমাদেরি কুঁড়ে ঘরে।’
মিথুশিলাক মুরমু : গবেষক ও লেখক।





Users Today : 67
Views Today : 68
Total views : 177471
