সম্প্রতি ঐতিহাসিক নাচোল বিদ্রোহের কেন্দ্রীয় চরিত্র কমরেড ইলা মিত্রের সংগ্রহশালা পরিদর্শনে গমন করি। এটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমনুরা থেকে সর্বসাকুল্যে ১০/১২ কিলোমিটার দূরত্ব হতে পারে, আমনুরা রেলওয়ে জংশন থেকে নেজামপুর হয়ে কিছুদূর গ্রামীণ পিচঢালা রাস্তায় যেতে হয়। অতঃপর শুরু হয় ইটের সলিং রাস্তা, এই রাস্তায় শেষান্তে এঁটেল কাঁচামাটির রাস্তা। মাটির রাস্তাটিই নিয়ে যাবে সংগ্রহশালার কাছে। গ্রাম থেকে দূরবর্তী একটি ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে দ্বিতল ভবন ও ছোট্ট ঘরের সংগ্রহশালাটিও।
বিগত ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সালে নাচোল থানার রাওতাড়া গ্রামে মাটি দিয়ে নির্মিত সংগ্রহশালাটির উদ্বোধন করা হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ২৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ের সংগ্রহশালাটি নিজ চোখে দেখার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সফরসঙ্গী প্রদীপ হেমব্রমকে হাজির হয়েছিলাম। অত্যন্ত উৎসুক ও আগ্রহ নিয়ে প্রতিটি কক্ষ তন্ন তন্ন করে পর্যবেক্ষণ করেছি, ইলামিত্রের ব্যবহৃত জিনিসপত্র, ঐতিহাসিক ছবি সম্বলিত ফ্রেম, সহযোদ্ধা আদিবাসী সাঁওতালদের তীর-ধনুক এবং তাঁর ওপর রচিত কিছু বইপুস্তকও দৃষ্টিগোচর হয়েছে। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, ইলা মিত্র এবং সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক ছিল, সেটির কোনো চিহ্ন আমার চোখে পড়ে নাই। দ্বিতল ভবনের পাশে ছাউনি দিয়ে একরুমের সংগ্রহশালাতে আদিবাসী সাঁওতালদের কয়েকটি তীর ও ধনুক ছাড়া আর কিছুই ছিল না। উৎসাহী হয়ে সংগ্রহশালার তত্ত্বাবধায়ককে জিজ্ঞেস করেছিলাম―আদিবাসী সাঁওতালদের আর কোনো কিছুই রাখা হয় নাই কেন? তার সোজাসাপটা উত্তর―‘‘ কর্তৃপক্ষ যা দিয়েছেন, এগুলোই দেখভালের দায়িত্ব পেয়েছি।’’ তত্ত্বাবধায়ক তরুণটি জানাচ্ছিলেন, নাচোল বিদ্রোহের প্রাক্কালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল থানার চণ্ডীপুর, কেন্দুয়া, কুসবাডাঙ্গা রাওতাড়া, ধরমপুর ও ঘাসুড়া এলাকাটি ছিল সাঁওতালসহ আদিবাসীদের আখড়া। বর্তমানে কোনো গ্রামে দু-একটি আদিবাসী পরিবার রয়েছে, আবার কোথাও গ্রামশূদ্ধ বিতাড়িত হয়েছে। নাচোল বিদ্রোহের পরবর্তীকালে সাঁওতালসহ আদিবাসীদের ওপর যে বর্বরোচিত অত্যাচার-নির্যাতন নেমে এসেছিল, তা অনালোচিতই থেকে গেছে। পঞ্চাশের দশকের আগে নাচোল এলাকায় ৬০ শতাংশ আদিবাসীদের উপস্থিতি লক্ষণীয়, কালের বিবর্তনে বর্তমানে ৬ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।

সংগ্রহশালাটির প্রবেশ পথে জেলা পরিষদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সৌজন্যে কমরেড ইলা মিত্রের সংক্ষিপ্ত জীবনী ফলক চোখে পড়ে। ইলা মিত্রের শিক্ষা জীবন, পারিবারিক জীবন, রাজনৈতিক জীবন এই ত্রিমুখী জীবনের এক লাইনেই সাঁওতালদের কথাটি স্থান পেয়েছে। প্রস্তুরফলকে লেখা আছে, ‘ ‘ ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে তেভাগা আন্দোলনে নেতৃত্ব দান করেন ইলা মিত্র। ১৯৫০ সালের ৭ই জানুয়ারি আদিবাসী সাঁওতাল ও বর্গাচাষীদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ বাঁধে।’ ’ অবশ্য নাচোল উপজেলার ওয়েবসাইটে দেখা যায়, ‘এই সময় বর্তমান বাংলাদেশে (সাবেক পূর্ব পাকিস্তান) কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়। সরকারের দমন পীড়ন নীতির কারণে কমিউনিস্ট ও কৃষক আন্দোলনের নেতারা আত্মগোপন করেন। ইলা মিত্র এবং রমেন্দ্র মিত্রও নাচোলের চণ্ডীপুর গ্রামে আত্মগোপন করেন। এই গ্রাম ছিল সাঁওতাল নেতা ও প্রথম সাঁওতাল কমিউনিস্ট মাতলা মাঝির বাড়ি। …নাচোলের কৃষকরাই ছিল আন্দোলনের পুরোভাগে। এই আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিল সাঁওতালরা।’ আদিবাসী সাঁওতাল নারী-পুরুষদের উদ্বুদ্ধ করতে ইলা মিত্র শিখেছিলেন সাঁওতালী ভাষা, ভাঙা ভাঙা সাঁওতালী ভাষায় কথা বলেই সাঁওতাল নারী-পুরুষদের চেতনাকে শাণিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সাঁওতালদের গ্রামে দিনের পর দিন কাটিয়েছেন, খেয়েছেন এবং অবস্থান করেছেন। সাঁওতালরা ইলা মিত্রের ভালোবাসার প্রতিদান দিয়েছেন রাণী মা উপাধিতে ভূষিত করে। শেখ রফিক সম্পাদিত ‘ইলা মিত্রের জবানবন্দি’র ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন, ‘ ‘ নাচোলের রাণী মা; তেভাগা আন্দোলনের লড়াকু বিপ্লবী, সাঁওতালদের একান্ত আপনজন। তিনি গরিব-দুঃখী সাঁওতাল কৃষকদেরকে জোতদার, জমিদার ও মহাজনদের শাসন-শোষণ ও অত্যাচার থেকে মুক্ত করার জন্য ইস্পাতদৃঢ় সংকল্প নিয়ে লড়াই করেছেন। সাঁওতালদের কাছে ইলা মিত্র ছিলেন মায়ের মতো, তাই তারা তাঁকে রাণী মা বলে ডাকতেন।’ ’
তেভাগা আন্দোলনের ঢেউ এক সময় নাচোলকেও প্রভাবিত করেছিল। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে ইলা মিত্রের নেতৃত্বে হাজার হাজার ভূমিহীন কৃষক সংগঠিত হয়। আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে জোতদার, মহাজনদের দল। ওই বছর কৃষকের ধান জোতদারদের না দিয়ে সরাসরি কৃষক সমিতির উঠোনে তোলা হয়। ফলে সংঘর্ষ বাঁধে। নাচোলে সাঁওতাল ও ভূমিহীদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে এক শক্তিশালী তীরন্দাজ ও লাঠিয়াল বাহিনী। এই বাহিনীর প্রধান ছিলেন মাতলা মাঝি। পরিস্থিতি অবনতি হতে থাকলে ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দের ৫ জানুয়ারি পুলিশ বাহিনী চণ্ডীপুর গ্রামে আসে। গ্রামবাসী সংগঠিত হয়ে পুলিশ বাহিনীকে পাল্টা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করতে থাকে। বিক্ষোভের এক পর্যায়ে উত্তেজিত গ্রামবাসী ওই পুলিশ কর্মকর্তা ও পাঁচজন পুলিশ কনস্টেবলকে হত্যা করে। এই ঘটনার দুদিন পর ৭ জানুয়ারি শুরু হলো পুলিশের প্রতিরোধ। ইলা মিত্র ৭ জানুয়ারি সাঁওতাল নারী বেশ ধারণ করে ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করেন, পথিমধ্যে রহনপুর রেলস্টেশনে ধরা পড়েন। এরপর ইলা মিত্র, রমেন্দ্র মিত্র ও মাতলা মাঝিকে প্রধান আসামী করে এবং শতাধিক সাঁওতাল কৃষকের বিরুদ্ধে পুলিশ হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি রাজশাহী কোর্টে উঠে। এটাই কুখ্যাত ‘নাচোল হত্যা মামলা’।
ইলা মিত্রের সংগ্রহশালাতে ইলা মিত্রের ঐতিহাসিক ছবিগুলো স্থান পেয়েছে, রয়েছে তাকে নিয়ে প্রকাশিত তৎকালীন পত্র-পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ। কোথাও কোনো জায়গাতে সাঁওতালদের নাম উচ্চারিত হয় নাই। প্রদর্শিত হয় নাই, পুরো সংগ্রহশালাতে একমাত্র তীর-ধনুক ছাড়া কোথাও আর সাঁওতালসহ আদিবাসীদের অধিকার লড়ায়ে ব্যবহৃত জিনিসপত্র! কি দুর্ভাগ্য আমাদের অধিকার আদায়ের ইতিহাস, সত্যকে অস্বীকার করে জাতি কৃতার্থ হতে পারে না। যুগ-যুগান্তে ন্যায্যতার আন্দোলন, বিদ্রোহসমূহ নতুন প্রজন্মদের জ্ঞানের শিখাকে প্রজ্জ্বলিত করে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের কাছে সবিনয় অনুরোধ, অতি সত্ত্বর ইলা মিত্র সংগ্রহশালাতে বিদ্রোহে সাঁওতালসহ আদিবাসীদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র এবং স্মৃতিফলক সংস্কার করে সঠিক ও তথ্যপূর্ণ ইতিহাস উপস্থাপন করুন।
মিথুশিলাক মুরমু : আদিবাসী গবেষক ও লেখক।





Users Today : 21
Views Today : 27
Total views : 175439
