তিলোকত্তমার জন্ম হয় তার মাসির বাড়িতে কুন্দপুর গ্রামে। সাধারণত বিয়ের পর মেয়েদের প্রথম সন্তান তার বাবার বাড়িতেই হয়। কিন্তু তিলোকত্তমার মা মঞ্জুলার জন্মের পর তার মা মারা যায়। বড়ো বোনের কাছেই মানুষ হয়েছে মঞ্জুলা। এজন্য তিলোকত্তমার কাছে তার মাসির বাড়িই ছিল তার মামা-বাড়ির মতো। তিলোকত্তমা ছোটো থেকেই শ্যামবর্ণ। দেখতেও সুশ্রী ছিল না। তার পরিবারের সবার চিন্তা ছিল মেয়ে বড়ো হলে কি করে তার বিয়ে দিবে। আমাদের দেশে মধ্যবিত্ত পরিবারের সকল মা-বাবার ক্ষেত্রেই এই চিন্তা কাজ করে। যদি মধ্যবিত্ত পরিবারে রূপবতী কন্যার জন্ম না হয় তাহলে মা-বাবা চিন্তায় পড়ে যান কারণ না থাকে বরপক্ষকে বিয়েতে যৌতুক দেবার মতো টাকা-পয়সা, আবার তারা ইচ্ছে করলেও মেয়েকে যেনতেন একটি ঘরে বিয়ে দিতে পারেন না। সুতরাং বুঝতেই পারছেন পাঠক, তিলোকত্তমার বাবা-মায়ের চিন্তাটা নিরর্থক ছিল না।
ছেলেবেলা থেকেই তিলোকত্তমা লেখাপড়ায় বেশ ভালো ছিল। এক এক করে স্কুল, কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে যখন সে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে অনার্সে ভর্তি হয়ে গেল, তিলোকত্তমার মা-বাবা অনেকটা নিশ্চিন্ত হলেন। কারণ মেয়ে ভালো বিষয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। পড়া শেষ হলে মেয়ে একটা ভালো চাকরি করলে হয়ত আর তার বিয়ের জন্য তাদের তেমন ভাবতে হবে না।
তিলোকত্তমা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই তার বিয়ের প্রস্তাব আসা শুরু হলো।কিন্তু সব ছেলের বাবা-মায়ের দাবি এক জায়গায় গিয়ে আটকে যেত, যেহেতু মেয়ে সুন্দরী না, হোক সে শিক্ষিত। তাহলেও অন্তত মোটা টাকার পণ তো দিতে হবে। তিলোকত্তমা একদিন রাগ করে তার বাবাকে বলেছিল, বাবা তাহলে আমার এত কষ্ট করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কি প্রয়োজন? আমি নিজের পায়ে না দাঁড়ানো পর্যন্ত তোমরা আর আমার বিয়ের চিন্তা করবে না। ইতিমধ্যে তিলোকত্তমা ২য় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা দিচ্ছে। একদিন পরীক্ষা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের অপেক্ষায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে, উদ্দেশ্য ছিল সাহেববাজার যাবে। বাসে ওঠার পর কোনো সিট ফাঁকা না পেয়ে সে দাঁড়িয়েই ছিল। হঠাৎ পাশের সিট থেকে একজন ছেলে নিজের সিটটি তিলোকত্তমার জন্য ছেড়ে দিল। তিলোকত্তমা এর আগে ছেলেটিকে কখনো দেখেনি। তবে ছেলেটি দেখতে খুব সুদর্শন।
এর কয়েকদিনের পর তিলোকত্তমা বিজ্ঞান অনুষদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দেখে সেই ছেলেটি, কিন্তু সেদিনও আর কথা বলা হলো না। সেদিন ছিল ১৩ ফেব্রুয়ারি, একটা অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন আসে। প্রথমেই বসন্তের শুভেচ্ছা জানাল, তারপর বলল, আমি সুমন্ত সেন, তোমার সাথে বাসে প্রথম দেখা হয়েছিল। আর গতকাল আমাদের ফ্যাকাল্টির সামনে দেখা হয়েছিল। তিলোকত্তমার আর বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না, হঠাৎ করেই মানুষের কাছে তার কল্পনায় দেখা মানুষ বাস্তবে দেখলে যে রকম অনুভূতি হয় তিলোকত্তমারও ঠিক সেরকম অবস্থা। এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই দুজনের ফোনে কথা হতো। সুমন্ত তখন মাস্টার্স ফাইনাল পড়ছে। তিলোকত্তমা বহুবার সুমন্তকে বলেছে আমরা কেন এভাবে ফোনে কথা বলছি, আমরা তো সামনাসামনি দেখা করতে পারি। কিন্তু সুমন্ত বাধা দিয়েছে। বলেছে আমি মাস্টার্সে পড়ছি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কয়েকদিন বাদে চলে যাব। আমি চাই না যে আমার বন্ধুরা কেউ এটা জানুক যে আমি কারো প্রেমে পড়েছি। তাহলে সবাই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে। সুমন্তর পারিবারিক অবস্থা ভালো ছিল না, এজন্য ওর জন্য চাকরি পাওয়াটা খুব জরুরি ছিল। একসময় তিলোকত্তমারও স্বপ্ন ছিল বড়ো চাকরি করবে। কিন্তু সুমন্তর সাথে সম্পর্ক হওয়ার পর থেকে তার চাকরি করার কথা আর ভাবতে ইচ্ছা করে না । তার ইচ্ছে সে বিয়ে করে সংসার করবে, সুমন্তর মা বাবার সেবা করবে।
মাস্টার্স শেষ করার কয়েক মাসের মধ্যেই সুমন্ত সিভিল সার্ভিসে এডুকেশন ক্যাডারে চাকরি পেয়ে যায়। তিলোকত্তমার স্বপ্নগুলো তখন ডানা মেলতে শুরু করেছে। আস্তে আস্তে সুমন্তর সাথে তার যোগাযোগ কমতে থাকে। ফোন দিলেও সুমন্ত কল রিসিভ করত না । যদি কোনোদিন রিসিভ করত তখন তিলোকত্তমার সাথে খুব বাজে আচরণ করত। তিলোকত্তমা নীরবে চোখের জল ফেলত। এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে তার পরীক্ষার রেজাল্টও আর ভালো দিকে এগোচ্ছিল না। এভাবেই আরো দুবছর কেটে গেছে। তখন তিলোকত্তমা অনার্স শেষ করেছে। হঠাৎ একদিন তার হলের সামনে দেখতে পেল, সুমন্ত আর সাথে একটি মেয়ে। পরে অবশ্য অন্যদের কাছ থেকে জানতে পারে এই মেয়েটি তাদের পাশের হলের এবং তারই ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্ট, মেয়েটি ২য় বর্ষে পড়ছে। এই মেয়েটির সাথেই দুইবছর ধরে সুমন্তর সম্পর্ক চলছে। এ কথাটি ডিপার্টমেন্টের সবাই জানে। শুধু তিলোকত্তমা জানে না। সামনের মাসেই তাদের বিয়ের দিন ঠিক হয়েছে। এমনকি মেয়েটির বাবা বিয়েতে মোটা টাকাও দিতে রাজি হয়েছে। সেদিন রাতে তিলোকত্তমা সুমন্তকে ফোন করে, জিজ্ঞেস করে কেন তার সাথেই মিথ্যাচার করেছে। সুমন্ত বলে, আমি তো তোমাকে কখনো বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেইনি, আর তুমিই বলো, কী দেখে আমি তোমাকে বিয়ে করব। তুমি তো দেখতে সুন্দর না, তারপর ভালো কোনো চাকরিও পাবে না, আমি একজন বিসিএস কর্মকর্তা হয়ে তোমাকে বিয়ে করা সাজে না।
এরপর আর কোনোদিন তিলোকত্তমা সুমন্তকে ফোন করেনি। তার জীবনে সেই ছেলেবেলা থেকে দেখা স্বপ্নটি বাস্তবে পরিণত হয়েছে। সে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, সে নিজেও বিসিএস কর্মকর্তা। যে কলেজে তার পোস্টিং হয়েছে সেই একই কলেজে সুমন্ত চাকরি করে। এরপর অনেকবার হয়েছে যে সুমন্ত তিলোকত্তমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তিলোকত্তমা তার অতীত ফেলে এসেছে। এখন সে সুখী তার জীবনে। আজ দুবছর হলো তার রিগ্যানের সাথে বিয়ে হয়েছে। এখন আর কেউ তার কুশ্রী রূপের জন্য অবহেলা করে না। তার জীবনেও এখন বসন্তের ছোঁয়া লেগেছে।





Users Today : 7
Views Today : 9
Total views : 175513
