ফেলে আসা বছর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ঘটে যাওয়া কয়েকটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা চলতি বছরকে নিদারুণ প্রভাবিত করবে। ৯ ডিসেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর-১১ দিনে বাংলাদেশকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি ঘোষণা অথবা সিদ্ধান্ত মনে হচ্ছে এক অশনি সংকেত। বাংলাদেশ থেকে আট হাজার মাইল দূরে অতলান্তিক সমুদ্র পেরিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিধর দেশের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশের জন্য অশনির ভীমনাদ ধ্বনিত হলো।
তাই দেখছি, ডিসেম্বর ৯ থেকে ১০ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ‘গণতন্ত্রের শীর্ষ সম্মেলন’- এ ১১১টি দেশের মাঝে বাংলাদেশের ঠাঁই মেলেনি। অবাক হয়ে দেখলাম উপমহাদেশের পাকিস্তান, ভারত, নেপাল আমন্ত্রিত হয়েছে-কিন্তু বাংলাদেশ নয়। এই সম্মেলনের সমাপ্তি ঘণ্টা বাজার আগেই ১০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় র্যাবের বর্তমান ও সাবেক সাত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। এর মাত্র দশ দিন পর ২০ ডিসেম্বর অভিজিৎ হত্যাকা- বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধের ইঙ্গিত দিয়ে ওই হত্যাকা-ে পলাতক আসামীদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করেছে। যদিও বিচারটি শেষ করে বাংলাদেশ রায় দিয়েছে দশ মাস চার দিন আগে।
ডিসেম্বরে ঘটে যাওয়া এসব কাহিনীর ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালের নববর্ষের নগ্ন প্রশ্ন হলো-যুক্তরাষ্ট্র কি কোনো কারণে বাংলাদেশের ওপর রুষ্ট হয়েছে? মানবাধিকার লঙ্ঘন কি একটি কারণ? পৃথিবীর অনেক দেশেই মানবাধিকারের খেলাপ এক মামুলি ব্যাপার। ওই দেশগুলো কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের তীক্ষè রাডারের দৃষ্টিকোণ থেকে নিরাপদে রয়েছে। বাংলাদেশের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিমাতাসুলভ আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটল ডিসেম্বর সারপ্রাইজে। তারা বাংলাদেশকে উত্তর কোরিয়ার কাতারে রাখতে চাইছে। যে উত্তর কোরিয়া হলো বর্তমানে-যুক্তরাষ্ট্রের ভাষায় ‘ভীষণ দুশমন’। আরও দু’টি দেশ রাশিয়া এবং চীনের পর্যায়ভুক্ত করা হয়েছে বাংলাদেশকে। এ দুইটি দেশও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিন্দ্বদ্বী, অনেক সময় শত্রুর পর্যায়ে চলে যায়। এ দুইটি দেশই বর্তমানে ‘ডিজিটাল লৌহ যবনিকা’য় যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে নেতৃত্বের স্থান নিয়েছে।
গত দু’ দশক ধরে ডিজিটাল বিশ্বের আধিপত্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে বিপুল প্রতিযোগিতা চলছে। প্রতিযোগিতার দৌড়ে এ পর্যন্ত এগিয়ে রয়েছে চীন। যদিও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে উভয় দেশ পরস্পরের প্রতি নির্ভরশীল। বিশেষ করে অগ্রবর্তী টেলিযোগাযোগের মুখ্য উপাদান ‘ফাইভ-জি’ প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত কম্পিউটারের ব্রেইন বলে পরিচিত মাইক্রোপ্রসেসর অথবা ‘চিপ’ নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষতা প্রশ্নাতীত। অপরদিকে, চীন এগিয়ে আছে ‘ফাইভ-জি’ নকশা ও যন্ত্রাংশ তৈরিতে। এছাড়া রয়েছে ছোটো ছোটো প্রস্তুতকারী যারা যন্ত্রাংশের কোনও কোনও অংশ তৈরি করছে। ‘বিশ্বায়িত মহা-পল্লীতে’ সহযোগিতা ও সহমর্মিতাই হোল সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। কিন্তু বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘বাসনা’। ১৯৫০ সালে বার্ট্রান্ড রাসেল তার নোবেল পুরস্কার গ্রহণের উৎসবে বলেছিলেন-‘বাসনা অথবা ফবংরৎবং’ হলো মানবজাতির সব ক্রিয়াকা-ের মূলমন্ত্র। তিনি চিহ্নিত করেছিলেন, বাসনার বিশেষ চারটি প্রকাশ-অধিগ্রহণশীলতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অহংকার এবং ক্ষমতা-প্রেম। ‘বিশ্বায়িত মহাপল্লী’ তে সহযোগিতার কর্মকা-ে যখন প্রযুক্তি এগিয়ে যাচ্ছিল দ্রুতগতিতে, সেথায় ‘ বাসনা’র ওপরোক্ত চারটি উপাদান রূপান্তরিত হলো বিষধর চারটি কামনার ভুজঙ্গে।
চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বন্ধু উন্নত দেশগুলোর অভিযোগ এলো প্রযুক্তি চুরির। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে অন্য দেশের উপর গুপ্তচরবৃত্তির অপবাদ এলো। চীনের টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তির ‘গডজিলা’ কোম্পানি হুয়াওয়ের চিফ ফিনান্সিয়াল অফিসার মেঙ ওয়ানঝাউকে গ্রেপ্তার করা হলো কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে ২০১৮ সালের পয়লা ডিসেম্বরে। তার অপরাধ হলো-তিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটিয়ে ইরানের টেলিযোগাযোগ সংস্থাগুলোকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছেন। গৃহবন্দি অবস্থা থেকে তিনি শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি লাভ করেছেন দীর্ঘ দু’বছর নয় মাস পরে ২০২১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর। পৃথিবীর টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তিতে বর্তমানে সবচেয়ে অগ্রগামী ও ক্ষমতাধর কোম্পানি ‘হুয়াওয়ে’র প্রতিষ্ঠাতা চায়নিজ বিলিয়নিয়ার রেন ওয়ানঝাউ হলেন মেঙ ওয়ানঝাউর পিতা।
কয়েক বছর ধরে ‘হুয়াওয়ে’ র আধুনিক ফাইভ-জি প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ও নকশা যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রধান টেলিযোগাযোগ কোম্পানিগুলো সীমিত আকারে ব্যবহার শুরু করেছিল। কিন্তু সম্প্রতি এগুলো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দুশ্চিন্তা হলো যুক্তরাষ্ট্রে স্থাপিত ‘হুয়াওয়ে’র ‘ফাইভ-জি’ প্রযুক্তির ক্ষমতা রয়েছে গুপ্তচরবৃত্তির। যুক্তরাষ্ট্রের মতামত অনুযায়ী, চীন এই প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে ইচ্ছে হলে যুক্তরাষ্ট্র এবং ধনী বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর টেলিযোগাযোগ, বৈদ্যুতিক পাওয়ার গ্রিড, সড়ক পরিবহন, বিমান, ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ সব কিছু অকেজো করে দিতে পারে। অতএব, সাধু সাবধান। তাই এখনই সময় থাকতে এই প্রযুক্তিকে নিষিদ্ধ করতে হবে যুক্তরাষ্ট্রে এবং তার বন্ধু রাষ্ট্রগুলোতে। ইতিমধ্যে সময় গড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ তার বন্ধু দেশগুলোতে ‘হুয়াওয়ে’ এর ‘ফাইভ-জি’ প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়েছে। কিছুদিন হলো যুক্তরাষ্ট্র এই চায়নিজ কোম্পানিটিকে নিষিদ্ধ করেছে। তারপর শুরু হলো বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর উপর প্রবল চাপ।
যুক্তরাজ্য থেকে জার্মানি পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পরাক্রমশালী ধনী দেশগুলো ‘হুয়াওয়ে’র সাথে চুক্তি করে ফেলেছিল। তাদের ইচ্ছে ছিল এই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা অর্থনৈতিক ও কারিগরি উন্নয়নের জোয়ার গড়ে তুলবে তাদের নাগরিকদের মঙ্গলের উদ্দেশ্যে। প্রথম এই দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের চাপকে অগ্রাহ্য করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কাজ হয়নি। একে একে তারা হুয়াওয়েকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করছে। যুক্তরাজ্য, জাপান, হল্যান্ড, এবং অস্ট্রেলিয়া নিষিদ্ধ ঘোষণার তালিকায় নাম লিখেছে। কানাডা, জার্মানি, এবং নিউজিল্যান্ড বিবেচনা করছে। নিষিদ্ধের তালিকা পরিবর্তনশীল এবং প্রতি মুহূর্তে নিষিদ্ধের তালিকা বেড়ে যাচ্ছে।
অতএব এই প্রযুক্তি নিয়ে সংঘাত অচিরেই শেষ হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে মনে হচ্ছে না। ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তি-সংঘাত গোটা বিশ্বকে দুইটি প্রতিন্দ্বদ্বী ক্যাম্পে বিভক্ত করার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কিছু চিন্তাবিদরা এর নামকরণ করেছেন ‘Digital Iron Curtain’। বাংলায় বলা যেতে পারে ‘ডিজিটাল লৌহ যবনিকা’। গত শতাব্দীর স্নায়ুযুদ্ধে পরিচিত ছিল ‘Iron Curtain’ অথবা ‘লৌহ যবনিকা’।
এমনই এক জটিল পটভূমিতে গত ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশের টেলিটক চীনের ‘হুয়াওয়ে’র সহায়তায় সীমিত আকারে ‘ফাইভ-জি’ প্রযুক্তি সংযোগ শুরু করেছে। এই কাজের জন্য সকলের সাধুবাদ কাম্য। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটবে টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তির সবচেয়ে নমিত স্তরে। জনগণের জন্য গড়ে উঠবে অপার প্রযুক্তি ও সম্ভাবনা। কিন্তু উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীনের সাথে বাংলাদেশের সংযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ঔপনিবেশিক ও ধনী বন্ধু দেশগুলো চীনের রাষ্ট্রপ্রধান’শি জিনপিং’র স্বপ্নময় প্রকল্প ‘ Belt and Road Initiative (BRI)’ এর তীব্র বিরোধিতা করছে। প্রাচীন চীনের সিল্ক রোডের অনুকরণে এই প্রকল্পের দুটি অংশ: নিউ সিল্ক রোড এবং মেরিন সিল্ক রোড। রাস্তাঘাটের সাথে টেলিযোগাযোগ এবং মানুষের অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর এ হবে এক মহাযজ্ঞ। পৃথিবীর ১৩৯টি দেশ এই মহা প্রকল্পকে সমর্থন দিয়েছে। এটা সার্থক হলে পৃথিবীর সাধারণ মানুষসহ সকলের উন্নতি হবে শনৈ শনৈ। কিন্তু বার্ট্রান্ড রাসেল বর্ণিত বাসনার চারটি উপাদানের একটি ‘ক্ষমতা-প্রেম’ এক্ষেত্রে বিবর্তিত হয়েছে এক ভয়ংকর অজগর ভুজঙ্গে। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তথাকথিত উন্নত রাষ্ট্রগুলো জোটবদ্ধ হচ্ছে বি আর আই (BRI) এর বিপক্ষে।
দক্ষিণ চীন সাগর এবং তাইওয়ান প্রণালীতে চীনের খবরদারি ও সামরিক মহড়া বিবাদের সূত্রপাত করেছে চীনের প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে। সঙ্গে যোগ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার বন্ধুরা। কোণঠাসা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ভারত, জাপান, ও অস্ট্রেলিয়ার সাথে সম্প্রতি গঠন করেছে ‘চতুর্ভুজীয় নিরাপত্তা সংলাপ’। ‘এক্সারসাইজ মালাবার’ নামে চলছে সামরিক মহড়া। ঔপনিবেশিক যুগে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটেন ও রুশ সাম্রাজ্যের রাজ্য বিস্তারের দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বকে নাম দেয়া হয়েছিল ‘গ্রেট গেইম’। মনে হচ্ছে বর্তমানে আবার সেই মৃতপ্রায় ‘গ্রেট গেইম’ উজ্জীবিত হয়েছে। চতুর্ভুজীয় নিরাপত্তা সংলাপকে চীন নাম নামকরণ করেছে ‘এশিয়ান ন্যাটো’।
বর্তমানের অস্থির ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য এলো যুক্তরাষ্ট্রের ডিসেম্বর ‘সারপ্রাইজ’। ‘হুয়াওয়ে’ এর ‘ফাইভ-জি’ প্রযুক্তির সাথে বাংলাদেশের গাঁটছড়া বাঁধা ‘ডিসেম্বর সারপ্রাইজ’র মূল কারণ-এটা বিশ্লেষণ যোগ্য। তবে অশনির ভীমনাদ সংকেত অবহেলার বিষয় নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে উন্মত্ত জলপ্রবাহ। বাংলাদেশের উন্নতির বজরাটিকে সাবধানে চালাতে হবে হোমারের দক্ষ নাবিক ও ট্রয় যুদ্ধের নায়ক অডিসিয়াসের মতো। একদিকে রয়েছে ভয়ঙ্কর দৈত্য ‘শিলা’ অন্যদিকে বজরা ভক্ষণকারী ঘূর্ণিজল ‘ক্যারিবডিস’।
এমনি জটিল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের করণীয় কী রয়েছে? ঝুঁকি ও পুরস্কারের বিশ্লেষণ করতে হবে। নতুন করে চিন্তা করতে হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ইউরোপের দুইটি যুদ্ধংদেহী ক্যাম্পে বিভক্ত হওয়ার আগে ভবিষ্যদ্বাণীর মতো রচিত টি এস ইলিয়টের-‘What the Thunder Said’। আমাদের আশা, ক্রম বর্ধমান ডিজিটাল স্তর ভঙ্গ অথবা ফাটল রহিত করবে বৃহৎ শক্তিগুলো। এই কবিতাটির শেষের দিকে রয়েছে উপনিষদের তিনটি শব্দ-দাত্তা, দয়াধম, এবং দামিয়াতা অর্থাৎ দান, উদারতা, এবং আত্মসংযম। শেষ লাইন হলো-শান্তি শান্তি শান্তি। এই অমৃত বাণী অনুসরণ করলে হয়ত আরেকটা বিশ্বযুদ্ধ নাও ঘটতে পারত।
মোস্তফা সারওয়ার : বিশ্ববিদ্যালয়েল শিক্ষক ও কলামিস্ট।





Users Today : 187
Views Today : 203
Total views : 177606
