১৯৪৭ সালের ১৪ এবং ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ সরকার ভারত স্বাধীনতা আইনের ভিত্তিতে অবিভক্ত ভারতকে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রে বিভক্ত করে। এই বিভাজনের মূলে ছিল মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহর ‘দ্বি-জাতি তত্ত্ব’। এই তত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান এবং হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয় ভারত। নবগঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তান ১২শ’ মাইল দূরে অবস্থিত দুটি প্রদেশের সমন্বয়ে গঠিত হয়—পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) ও পশ্চিম পাকিস্তান। ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে বিপুল পার্থক্য এ দুটি অংশের মধ্যে শুধু মিল ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মে। কিন্তু ১৯৪০ সালে শেরে বাংলা একে ফজলুল হক কর্তৃক সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের জন্যে একাধিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে প্রস্তাব লাহোরে গৃহীত হয়েছিল নানা কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি। লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে স্বাধীকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রয়োজন হতো না বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় নানাভাবে বঞ্চিত হতে থাকে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের আগ পর্যন্ত দীর্ঘ ২৩ বছর ছিল পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ ও বঞ্চনার এক হতাশার ইতিহাস। সেসময় এবং পূর্ববর্তী কালের ব্রিটিশ ঔপনিবেশ শাসনের ভারতের অন্তর্র্ভুক্ত অবিভক্ত বাংলার সমাজ বিকাশের বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। তখন ভারত সম্রাজ্য রক্ষার প্রয়োজনে প্রবর্তিত ঔপনিবেশিক অর্থনীতি, ভূমি-ব্যবস্থা, শিক্ষা, বাণিজ্য, শিল্প ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়-সংক্রান্ত ব্রিটিশ নীতি ও কর্মকান্ডের কারণে ভারতের সঙ্গে সাবেক বাংলার সমাজ ব্যবস্থারও মৌলিক পরিবর্তন ও রূপান্তর ঘটে।
১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কয়েক মাসের মধ্যেই বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে ১৯৪৮ সালের প্রথমদিকে ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়, যা চূড়ান্তরূপ লাভ করে ১৯৫২ সালে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৫৪‘র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬৬’র ছয়দফা আন্দোলন, ৬৯’র গণ-অভ্যুত্থান, ৭০’র নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক উজ্জ্বলতম অধ্যায়। ভাষা আন্দোলন বাংলার মানুষকে মুসলিম লীগের তৎকালীন কর্মকাণ্ড। বিশেষ করে ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ও দ্বিজাতি তাত্ত্বিক জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার সুযোগ করে দেয়। বাঙালিরা ভালোভাবেই বুঝতে সক্ষম হয় যে, পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ তাদেরকে শোষণের গোলকধাঁধা থেকে বের হতে দেবে না। তারা একে একে বাংলার মানুষকে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রভৃতি ক্ষেত্রে শোষণের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করবে। যার প্রথম পর্যায় ছিল বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা করার প্রস্তাব।
ফলে বাঙালিদের আন্দোলন করা ব্যতীত আর কোনো উপায় ছিল না। বাংলা ভাষার প্রশ্নে সকল পেশাজীবী মানুষ একই পতাকার ছায়ায় আশ্রয় নেয় এবং আন্দোলন করেই তাদের দাবি প্রতিষ্ঠা করে। এই আত্মজাগরণ ও জাতীয়তাবোধই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক প্রেরণা যুগিয়েছিল। তাই ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। ভাষাকে কেন্দ্র করে ১৯৪৮ সালের প্রথমদিকে ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। ১৯৫১ সালে পাকিস্তানের প্রথম আদমশুমারীতে দেখা যায় যে, মোট জনসংখ্যার ৫৪.৬০% লোকের মাতৃভাষা বাংলা। সুতরাং বাংলাই যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা সেখানে বাংলাকে বাদ দিয়ে ৭.২% মানুষের উর্দু ভাষাকে বাঙালিদের উপর চাপিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত বাঙালি মেনে নিতে পারেনি। ফলে শুরু হয় আন্দোলন যা চূড়ান্তরূপ লাভ করে ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে। এই দিন ভাষা সংগ্রামীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করলে পুলিশ গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে আবদুস সালাম, আবুল বরকত, রফিক উদ্দিন, আবদুল জব্বার ঘটনাস্থলেই নিহত হন। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকচক্রের বিরুদ্ধে এটি ছিল বাঙালিদের প্রথম বিদ্রোহ।
পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৫৪ সালের নির্বাচন ও যুক্তফ্রন্ট গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই নির্বাচনে মুসলিম লীগ ও পশ্চিম পাকিস্তান বিরোধী সমমনা দলগুলোর সমন্বয়ে যুক্তফ্রন্ট নামে একটি রাজনৈতিক জোট গড়ে ওঠে এবং তারা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। এই নির্বাচনকে বলা হয় মুসলিম লীগ তথা পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘ব্যালট বিপ্লব’। পাকিস্তানিদের নানাধরণের ষড়যন্ত্র ও অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের ফলে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করেও ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি। এই নির্বাচনের মধ্যদিয়ে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে মুসলিমলীগকে ব্যালটের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যান করে।
এরপর ঐতিহাসিক ছয় দফা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ছয় দফা দাবি ছিল পাকিস্তানের কেন্দ্রিয় সরকার কর্তৃক দীর্ঘকাল ধরে পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। ১৯৬৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা হওয়ার সাথে সাথে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায় এবং জনগণ ব্যাপকভাবে এটিকে সমর্থন জানায়। তারা ঐতিহাসিক ছয় দফাকে মুক্তির মহাসনদ বলে আখ্যায়িত করে। কিন্তু পাকিস্তান সরকার এটিকে রাষ্ট্রদ্রোহী তৎপরতা বলে অপপ্রচার চালায়। ১৯৬৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করলে সাথে সাথে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায় এবং জনগণ ব্যাপকভাবে এটিকে সমর্থন জানায়। পূর্ব বাংলার ছয়দফা কেন্দ্রিক এই আন্দোলনকে দমন করার জন্যে স্বৈরাচার আইয়ুব খান ১৯৬৮ সালে ছয় দফার রূপকার শেখ মুজিবসহ ৩৫ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করেন যা ইতিহাসে আগরতরা মামলা নামে পরিচিত। মামলার বিচার চলাকালে পূর্ব বাংলার মানুষ শেখ মুজিবের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারের জন্য আন্দোলনের ডাক দেন। এই আন্দোলনই এক সময় গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। আইয়ুব সরকার মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য হন এবং বঙ্গবন্ধুসহ সকল রাজবন্দিদের নিঃশর্ত মুক্তি দেন।
১৯৭০ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক। এই নির্বাচনের জন্য ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালের ৩০ মার্চ আইনগত কাঠামো আদেশ জারি করেন এবং পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের একজন বাঙালি বিচারকের নেতৃত্বে একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করেন। এই নির্বাচনে ২৪টি রাজনৈতিক দল অংশ গ্রহণ করে। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নৌকা প্রতীক নিয়ে ছয় দফার পক্ষে প্রচারে নামেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।
আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের বেশিরভাগ অংশে ১৯৭০-৭১ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে এবং পাকিস্তান সরকার সাংবিধানিক প্রশ্নে আওয়ামী লীগের সাথে আলোচনা শুরু করে জাতীয় অধিবেশনের তারিখ নির্ধরণ করেন। তবে ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ পাকিস্তানি রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে দেন, যা পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক বিক্ষোভের সূচনা করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতত্বে স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে ছাত্র, শিক্ষক, জনতা এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ পাকিস্তানি সরকারে বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকবর্গ নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করলে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। আন্দোলনকারী ছাত্রনেতারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অবিলম্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার দাবি করুন, কিন্তু বঙ্গবন্ধু এই দাবীতে সম্মত হতে ধৈর্য ধারণের কথা বলেন। তিনি ৭ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য একটি জনসভায় তার পরবর্তী পদক্ষেপ ঘোষণা করবেন বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
৩রা মার্চ ছাত্রনেতা শাহজাহান সিরাজ স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াসের নির্দেশে পল্টন ময়দানে এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সামনে স্বাধীনতার ইস্তেহার পাঠ করেন। ৭ মার্চ তারিখে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটি বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর চলমান স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রসরতা সম্পর্কে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করেন। আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পরবর্তিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ৭ই মার্চের ভাষণে, পাকিস্তানি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে প্রস্তুত থাকার জন্য আহ্বান জানান। তিনি সরাসরি স্বাধীনতার কথা উল্লেখ না করেও কৌশলে পরোক্ষভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা করেন “…তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে, …আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল। মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেবো, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়াবো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম” কিন্তু বঙ্গবন্ধু সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি, কারণ তখনও আলোচনা চলছিল, তারপরও তিনি তার ভাষণে সর্বাত্মক যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত থাকার জন্য আহ্বান জানান। তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণকে স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল চাবিকাঠি বলে মনে করা হয়। বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতির স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকনির্দেশনা। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা পূর্ব ভাষণগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ ভাষণ ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চে প্রদত্ত ভাষণ। এই ভাষণের মাধমে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির প্রতি স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেন।
বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলন ছিল বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিরল ও নজিরবিহীন ঘটনা। মহাত্মা গান্ধী ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন করলেও তা সফল হয়নি। কিন্তু ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসহযোগ আন্দোলন কেবল সফলই হয়নি; এ অসহযোগ আন্দোলনের পথ ধরেই বাঙালিরা স্বাধীনতা সংগ্রামের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। বিশ্বের তাবৎ রাজনৈতিক আন্দোলন বা স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পেশীশক্তি বা অস্ত্রের জোরে সমরনায়কদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের ঘটনা ইতিহাসের পাতায় তেমন কোনো উল্লেখ্য বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়নি। বরং তা হয়েছে রাজনৈতিকভাবেও বিপ্লব, সশস্ত্র অভ্যুত্থান, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ইত্যাদির মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের মাধ্যমে। বাস্তিল কারাগারের পতন ও ফরাসী বিপ্লব, রুশ বিপ্লব ও লেলিনের ক্ষমতায় অধিরোহণ, চীনে গণমানুষকে সঙ্গে নিয়ে মাও সে তুংয়ের লং মার্চের মাধ্যমে গণমানুষের শাসন প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি বিষয়ক রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনের কথা শিক্ষিত সচেতন মানুষের অবিদিত নয়। কিন্তু ‘তবু বলতে হয়, বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলন সারা দুনিয়ায় এক নজিরবিহীন ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। কারণ এই আন্দোলন শুধু আমাদের সফল মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ও পটভূমিও তৈরি করেনি এবং সেই আন্দোলন কালেই কার্যত বাঙালিরা কয়েকদিনের জন্য হলেও পাকিস্তানের রাষ্ট্র ক্ষমতা চালিয়েছিল। সেদিন পাকিস্তানের প্রেডিডেন্ট ইয়াহিয়া খান স্বয়ং ঢাকায় উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও এতদাঞ্চলের গোটা প্রশাসনিক কার্যক্রম চলছিল একটি মাত্র মানুষের আঙুলের নির্দেশে। আর সেই মানুষটি হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রকৃতপক্ষে তখন পাকিস্তান সরকারকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে পূর্ব পাকিস্তানে পরিচালিত হয়েছিল একটা সমান্তরাল সরকার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতের আঙুলের ইশারায়ই পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে গোপনের পূর্বপাকিস্তানে অস্ত্রের মজুদ বাড়াতে থাকে। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়লে জনযুদ্ধের আদলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এর মাধ্যমেই মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা ঘটে। পঁচিশে মার্চের কালরাতে পাকিস্তানী সামরিক জান্তা ঢাকায় অজস্র সাধারণ নাগরিক, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, পুলিশ হত্যা করে।
২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক সামরিক অভিযান শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয় এবং অন্যান্য রাজনৈতিক নেতারা সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য আত্মগোপনে চলে যান। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হাতে গ্রেফতারে আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাক্ষরিত স্বাধীনতা ঘোষণার একটি নোট প্রেরণ করেন যা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র হিসেবে বাংলাদেশের সংবিধানের সন্নিবেশিত রয়েছে। বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণার এই নোটটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস এর বেতার ট্রান্সমিটার দ্বারা প্রচারিত হয়। ২৬ মার্চ ১৯৭১ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে আবুল কাশেম সন্দ্বীপ এরপর চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা হান্নান সাহেব বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন। পরে মেজর জিয়াউর রহমান ওই বেতার কেন্দ্র থেকেই বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন। পরিকল্পিত গণহত্যার মুখে সারাদেশে শুরু হয়ে যায় প্রতিরোধযুদ্ধ; জীবন বাঁচাতে প্রায় ১ কোটি মানুষ পার্শ্ববর্তী ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে।
১০ এপ্রিল ১৯৭০ এর নির্বাচনের নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম সরকার। এই সরকার দেশের স্বাধীনতার ঘোষণা জারি করে, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে সংবিধান প্রণয়ন করে এবং মৌলিক নীতিমালা হিসাবে সমতা, মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের নীতি প্রতিষ্ঠা করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবর্তমানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা হয় সৈয়দ নজরুল ইসলামকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন তাজউদ্দিন আহমদ এবং মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি ছিলেন এম এ জি ওসমানী। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন মুহাম্মদ মনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামান। নবনির্মিত বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের সদস্যগণ এবং পাকিস্তানের সিভিল সার্ভিসের স্বপক্ষত্যাগী সদস্যদের সমন্বযয়ে এই সরকার গঠিত হয়। এই সরকারে আবু সাঈদ চৌধুরী, হুমায়ুুন রশিদ চৌধুরী এবং রেহমান সোবহান এর নেতৃত্বে এটি একটি সুদক্ষ কূটনৈতিক সংগঠনও ছিল। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী এগারোটি সেক্টর কমান্ডারের মধ্যে বিভক্ত ছিল; যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশারফ, কে.এম. শফিউল্লাহ প্রমুখ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য ভারত আন্তরিকভাবে সকল ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা প্রদান করে। নির্বাসিত এই সরকারের রাজধানী ছিল কলকাতা।
পূর্ব পাকিস্তানের অসহায় নিরস্ত্র মানুষের প্রতি ভারত সহানুভূতিশীল ছিল এবং ১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশিদের পক্ষে যুদ্ধ অংশগ্রহণ করে। এর ফলে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দুই সপ্তাহের একটি সংক্ষিপ্ত এবং ব্যাপক বিধ্বংসী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ.এ.কে. নিয়াজী এবং পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত পাকিস্তানি সেনাধ্যক্ষগণ ভারত ও বাংলাদেশের মিত্রবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করে। আত্মসমর্পণকালে শুধুমাত্র কয়েকটি দেশ নতুন রাষ্ট্রকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদান করেছিল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর নির্বিচারে গণহত্যা চালালে অদম্য বাঙালি জাতি গণহত্যার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ২৫ মার্চ গণহত্যার মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যে যুদ্ধের সূচনা করেছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ২৭৬ দিন পর ৯৩ হাজার সৈন্যসহ রেসকোর্স ময়দানে তাদের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে নয়মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে।
মাহবুবুল আলম : কবি-কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও গবেষক।





Users Today : 145
Views Today : 152
Total views : 177555
