বাংলাদেশ প্রথম যখন চীন থেকে দুটি ‘মিং’ শ্রেণির সাবমেরিন ক্রয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ঠিক তখন ভারত প্রতিবাদ জানিয়েছিল। ভারতের বক্তব্য ছিল বাংলাদেশের নৌ নিরাপত্তার জন্য সাবমেরিনের কোনো প্রয়োজন নেই। এর বিরুদ্ধে ভারতের বিভিন্ন প্রত্রিকায় একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ার দিকে মনোযোগ দিয়েছিলেন। সে কারণে নৌবাহিনীতে নানা শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ, উপক‚লরক্ষী বিমান, উপক‚লরক্ষী হেলিকপ্টার ক্রয় করা হয়। সেই সাথে সেনাবাহিনী ও বিমান বাহিনীকেও শক্তিশালী করা হয়। একটি দেশের নৌবাহিনীর অন্যতম শক্তি হয় সাবমেরিন। পৃথিবীর হাতে গোনা ১০-১২টি দেশের নৌবাহিনীর কাছে সাবমেরিন রয়েছে, এর মধ্যে অন্যতম হলো বাংলাদেশ। প্রতিবেশী মিয়ানমার, যারা কোনোদিনই বাংলাদেশের বন্ধুত্বের মর্যাদা দিতে পারেনি তারা প্রথম থেকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে সাবমেরিনের উপস্থিতি মানতে পারেনি, তাই তারা রাশিয়ার কাছ থেকে সাবমেরিন ক্রয় করতে চেয়েছিল। কিন্তু রাশিয়ার সাবমেরিনের দাম অনেক বেশি হওয়াতে মিয়ানমার রাশিয়া থেকে সাবমেরিন ক্রয় করতে পারেনি। নিতান্ত বাধ্য হয়ে ভারত থেকে প্রথমে সাবমেরিনকে ধ্বংস করা যায়, ‘শ্রেয়া’ শ্রেণির কয়েকশত টর্পেডো ক্রয় করে। এই টর্পেডোর কাজ হচ্ছে অতি গোপনে প্রতিপক্ষের সাবমেরিনকে ধ্বংস করে দেয়া। পাঠক লক্ষ্য করবেন, ভারত প্রথম থেকেই আমাদের নৌবাহিনীতে সাবমেরিনের উপস্থিতিকে মেনে নিতে পারেনি, তারপর এই সাবমেরিনকে ধ্বংস করার জন্য মিয়ানমারের নৌবাহিনীর কাছে শ্রেয়া টর্পেডো বিক্রি করেছে। শুধু তাই নয় অতি সম্প্রতি ভারত তার নৌবাহিনী থেকে ব্যবহৃত রাশিয়ার তৈরি একটি কিলোক্লাস সাবমেরিন মিয়ানমারের কাছে বিক্রি করেছে। শুধু তাই নয় এই সাবমেরিন পরিচালনা করার জন্য মিয়ানমারের নৌবাহিনীর সাবমেরিনারদের প্রশিক্ষণও দিচ্ছে। এতেই প্রমাণিত হয়ে যায় আমাদের পরম মিত্র ভারত আমাদের কেমন মিত্র? মিয়ানমার ইতিমধ্যে ইসরাইলের সাথে এক চুক্তির আওতায় দুটি ফ্রিগেট লাভ করেছে। মিয়ানমার নৌবাহিনী ও সেনাবাহিনীকে ইসরাইলী সামরিক বিশেষজ্ঞরা প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। রাশিয়া ইতিমধ্যে মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াংগুনে একটি সামরিক অফিস খুলেছে। রাশিয়া মিয়ানমারকে নতুন করে ২০টি মিগ-২৯ জঙ্গি বিমান সরবরাহ করেছে। এছাড়া সর্বাধুনিক প্রযুক্তির মিগ-৩৫ অথবা এসইউ-৩৫ জঙ্গি বিমান বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে। চীন মিয়ানমারের কাছে শতশত কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করেছে। বাংলাদেশ সীমান্ত অঞ্চল সংলগ্ন মিয়ানমার বিমানবাহিনী শক্তিশালী রাডার বসিয়েছে। বাংলাদেশের যেকোনো অঞ্চল থেকে আমাদের জঙ্গিবিমান মিয়ানমারের আকাশ সীমায় প্রবেশ করার সাথে সাথে মিয়ানমারের সেই রাডার আমাদের জঙ্গিবিমানকে শনাক্ত করে আকাশ পথেই ভ‚মি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য মিসাইল দিয়ে ধ্বংস করে দিতে পারবে। আমাদের ৩টি বন্ধুদেশ ভারত, চীন ও রাশিয়া মিয়ানমারকে একটি শক্তিশালী স্বশস্ত্রবাহিনী গড়ার দিকে মনোযোগ দিয়েছে। যাতে করে বাংলাদেশকে চাপের মধ্যে রাখা যায়। এখন থেকে যদি আমাদের শক্তিশালী একটি নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও সেনাবাহিনী তৈরি করার দিকে মনোযোগ কমে আসে তাহলে আমরা ভবিষ্যতে মিয়ানমারের মুখোমুখি হতে পারব না। কিন্তু স্বস্তির বিষয় এটাই যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের তিন বাহিনীকে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র দিয়ে সুসজ্জিত করছেন। যার ফলে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মনোবল হাজারগুণ বেড়ে গেছে। তারা জানেন আমাদের ওপর হামলা হলে আমরা উপযুক্ত জবাব দিতে সক্ষম। বাংলাদেশের যে বিশাল জলসীমা রয়েছে তাকে রক্ষা করতে হলে আমাদের নৌবাহিনীতে কয়েকটি আক্রমণাত্বক হান্টারকিলার সাবমেরিন, সাবমেরিন বিধ্বংসী হেলিকপ্টার, মিসাইল সজ্জিত ফ্রিগেট, মিসাইল সজ্জিত কর্ভেট, উপক‚লরক্ষী বিমান, উপক‚লরক্ষী গোয়েন্দা বিমান সংযোজন করতে হবে। এছাড়া বঙ্গোপসাগরে তেল, গ্যাসসহ যে বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে সেখানে নৌবাহিনীর টহল অনেকগুণ বাড়িয়ে দিতে হবে, যেন ঐসকল বন্ধুদেশগুলো কুদৃষ্টি না দিতে পারে। সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যদের মনে রাখা উচিত এদেশের ১৬ কোটি দেশপ্রেমিক বাঙালীও আছে তাদের সাথে, যারা হাসতে হাসতে দেশের জন্য নিজের জীবনটিও কুরবানী দিয়ে দিবেন, যেমনটি তারা ১৯৭১ সালে হানাদার পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে দিয়েছিলেন।
সৈয়দ রশিদ আলম : নিরাপত্তা বিশ্লেষক।





Users Today : 99
Views Today : 108
Total views : 177359
