আজ থেকে পাঁচ বছর পূর্বে (২৭ নভেম্বর, ২০১৫ খ্রি) জাতীয় দৈনিক ‘প্রথম আলো’র চতুর্থ পৃষ্ঠায় একটি শিরোনাম ছিল ‘দিনাজপুরে হুমকি দিয়ে পরে ক্ষমা প্রার্থনা—রংপুরের ৯টি চার্চসহ ও ১০টি প্রতিষ্ঠানকে হুমকি’। রংপুরের চার্চের তালিকায় পাষ্টর লাভলু এস লেবীয় ও ‘ইম্মানূয়েল চার্চ অব বাংলাদেশ’র নাম উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রত্যেকের মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তায় সে সময় দফায় দফায় হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। বোধ করি, অপরাধ হচ্ছে যিশু খ্রিষ্টকে অনুসরণ করা, খ্রিষ্টকে অনুসরণের জন্যে খ্রিষ্টান নামধারণ; এটি বৃহত্তর প্রতিবেশী কিংবা নিকটজনেরা আকাক্সক্ষা করে না। সত্যিই সেইবার প্রশাসনের দ্রুততর প্রত্যক্ষ উদ্যোগ, দক্ষতা ও সহযোগিতার বাড়ানো হাত সর্বমহলে প্রশংসা দাবিদার রাখে।

বিগত ১০ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে দশটার দিকে চিহ্নিত সন্ত্রাসী ব্যক্তিবর্গ আকস্মিকভাবে ‘ইম্মানূয়েল চার্চ অব বাংলাদেশ’-এর গির্জাঘর আক্রমণ করে। গির্জাঘরের দরজা ভেঙে খ্রিষ্টবিশ্বাসীদের জন্য রাখা চেয়ার, কার্পেট ইত্যাদি নিয়ে যায়। ক্ষুব্ধ সন্ত্রাসীরা যাওয়ার পূর্বে গির্জাঘরের টিন ও সাইনবোর্ড তছনছ করে বীরদর্পে রাতের অন্ধকারে বিলিন হয়ে যায়। গির্জাঘর আক্রান্তের খবর শোনার পরই পাষ্টর লাভলু এস লেবীয় দৌড়ে আসেন এবং হতভম্ব হয়ে যান। স্রষ্টার সৃষ্টির মানুষ কীভাবে স্রষ্টার উদ্দেশ্যে উপাসনার জন্যে নির্মিত গির্জাঘর আক্রমণ, লুট ও অপবিত্র করতে পারে! পরের দিনই ১১ ফেব্রুয়ারি ‘ইম্মানূয়েল চার্চ অব বাংলাদেশ’-এর পাষ্টর লাভলু এস লেবীয় স্থানীয় থানা আদিতমারীতে অভিযোগ দায়েরের লক্ষ্যে উপস্থিত হোন। থানার দায়িত্বরত কর্মকর্তা ইনিয়ে-বিনিয়ে নানা অজুহাতে অভিযোগ গ্রহণে অস্বীকার এবং তাকে দীর্ঘ সময় থানায় বসিয়ে রাখা হয়। নিরাপত্তাহনীতায় পাষ্টর বিভিন্ন শুভাকাঙ্ক্ষীদের সাথে যোগাযোগ করেন এবং ১৪ ফেব্রুয়ারি পুলিশ সুপারের বরাবরে আবেদন করেন। পাষ্টর লাভলু এস লেবীয় তার লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, “আমি মি. লাভলু এস লেবীয় (৩২), পাষ্টর, ইম্মানূয়েল চার্চ অব বাংলাদেশ, পিতা—খবির উদ্দিন, সাং—দৈলজোড় মাষ্টারপাড়া, ৫ নং সাপ্টিবাড়ি ইউনিয়ন, ওয়ার্ড নং ০৪, থানা—আদিতমারী, জেলা- লালমনিরহাট। এই মর্মে অভিযোগ করিতেছি যে, পশ্চিম দৈলজোড় মাষ্টারপাড়ায় আমাদের ইম্মানূয়েল চার্চ অফ বাংলাদেশ নামক একটি চার্চ/প্রতিষ্ঠান আছে। বিবাদী ১। মো. সাহিদুল ইসলাম (৪৫), পিতা—মৃত আহেদ আলী, সাং—চন্দনপাট কালিস্থান বাজার ২। মো. সহিদুল ইসলাম (৪৬), পিতা মৃত আবু তালেব, সাং—পূর্ব ভেলাবাড়ি উভয় থানা আদিতমারী, জেলা লালমনিরহাটদ্বয়সহ অজ্ঞাতনামা ৪ জন ২টি মোটর সাইকেল যোগে ইং ১০/০২/২০২১ তাং রাত্রী আনুমান ১০:৩০ ঘটিকার সময় আমাদের উক্ত প্রতিষ্ঠানে অনাধিকার প্রবেশ করিয়া প্রতিষ্ঠানের সাইন বোর্ডে ধারালো অস্ত্র দিয়া আঘাত করিয়া দ্বিখণ্ডিত করে এবং ইট পাথর দিয়ে ঢিল মারিতে থাকে। একপর্যায়ে বিবাদীগণ প্রতিষ্ঠানের তালা ভাঙ্গিয়া ভিতরে প্রবেশ করিয়া ৩০টি আরএফএল চেয়ার মূল্য ১২,০০০/= টাকা ও মেঝেতে বিছানো ২টি ত্রিপল মূল্য ২০০০/= টাকা লইয়া চলিয়া যাওয়ার সময় সাক্ষী ১। বাবুল মিয়া (৩০), পিতা—খবির উদ্দিন, ২। মো. এনামুল হক বসুনিয়া (৪০), পিতা মো. আ. সোবহান বসুনিয়া, ৩। মো. তবার উদ্দিন (৫০), পিতা মৃত রহিমুদ্দিন সর্ব সাং পশ্চিম দৈলজোড় মাষ্টারপাড়া ৫নং সাপ্টিবাড়ি ইউনিয়ন ওয়ার্ড নং ০৪ থানা আদিতমারী জেলা লালমনিরহাটগণ আগাইয়া আসিয়া ঘটনা দেখে। আমি সাক্ষীদের মাধ্যমে সংবাদ পাইয়া প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ঘটনা দেখি ও শুনি। আমি ঘটনার পর ইং ১১/০২/২০২১ তাং উক্ত বিষয়ে অফিসার ইনচার্জ আদিতামারী থানা বরাবরে লিখিত অভিযোগ করিলে থানা কর্তৃপক্ষ আমার অভিযোগের বিষয়ে যথাযথভাবে তদন্ত না করিয়া স্থানীয় লোকজন দ্বারা প্রভাবিত হইয়া আমার প্রকৃত ঘটনা আড়াল করিয়া ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে। ইহাতে আমরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ন্যায় বিচার হইতে বঞ্চিত হইতেছি। ঘটনার সহিত জড়িত দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন।’ ইতিপূর্বে স্থানীয় থানা আদিতমারী নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে। পাষ্টর লাভলু ১৩ ফেব্রুয়ারি অফিসার ইনচার্জ, কোতয়ালী থানা আরপিএমপি, রংপুর বরাবরে সাধারণ ডায়েরী করেন, যার জিডি নং ১০৮৭; তাং ১৩/০২/২০২১ ইং। পাষ্টর লাভলু এস লেবীয়-এর স্বাক্ষরিত ডায়েরিতে তিনি পুনর্বার উল্লেখ করেন, ‘বিনীত নিবেদন এই যে, আমি মি. লাভলু সাদিক লেবীয়, পাষ্টর ইম্মানুয়েল চার্চ অফ বাংলাদেশ, পিতা—খবির উদ্দিন, সাং—পূর্ব খাসবাগ, থানা—কতোয়ালী আর পিএমপি, রংপুর। থানায় আসিয়া এই মর্মে জানাইতেছি যে, বিবাদী ১। মো. সাহিদুল ইসলাম (৪৫), পিতা—মৃত আহেদ আলী, সাং —চন্দনপটি কালিস্থান বাজার, মোবাইল ফোন নং—০১৭৪০৫৬৩২৪৩; ২। মো. সহিদুল ইসলাম (৪৬), পিতা—মৃত আবু তালেব, সাং—পূর্ব ভেলাবাড়ি উভয় থানা আদিতমারী, জেলা—লালমনিরহাটদ্বয়ের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে একটি অভিযোগ করি। ফলে বিবাদীদ্বয় আরো ক্ষিপ্ত হইয়া উঠে। এরই জের ধরিয়া ইং ১৪/০২/২০২১ তাং বিকাল আনুমান ৪ ঘটিকায় সময় বাসায় অবস্থান কালে উল্লেখিত বিবাদীদ্বয় মোবাইল ফোন নং ০১৭৪০৫৬৩২৪৩ থেকে আমার ব্যবহৃত ফোন নং ০১৭২৮৮৬১২২৯ তে ফোন করিয়া আমাকে অভিযোগ প্রত্যাহার করিয়া লওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। আমি অস্বীকার করিলে বিবাদীয়দ্বয় আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ আমি আমার কর্মস্থলে গেলে আমাকে লোকজন লেলিয়ে দিয়া মারপিট খুন জখম করিবে, মিথ্যা মামলায় জড়াইয়া হয়রানি করিবে, আমাকে শান্তিতে থাকিতে দিবে না, খ্রিষ্টান মিশনারীকে প্রাণে মারিয়া দিলে তাহার কিছুই করিতে পারিবেনা মর্মে বিভিন্ন প্রকার ভয়ভীতি হুমকি প্রদান করে। ইহাতে আমার সন্দেহ হয় যে, বিবাদীদ্বয় অদুর ভবিষ্যতে আমার চরম ক্ষতি করিতে পারে। বিষয়টি ভবিষ্যতের জন্য ডায়রিভুক্ত করিতে ইচ্ছুক।’
ঘটনার বিশ্লেষণে আমরা যেটি বুঝতে পেরেছি, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ঘটনাটিকে সাধারণ ও অন্যখাতে প্রবাহিতের চেষ্টা করছেন। অথবা পাষ্টর লাভলু এস লেবীয়কে গির্জা পরিচালনার দায়িত্ব থেকে সরে আসার নোটিশ দিতে চাইছে। বাতাসে গন্ধে ভেসে এসেছে, স্থানীয় প্রশাসন পাষ্টর লাভলুকে প্রচ্ছন্নভাবে যেমন অসহযোগিতা করেছে, অনুরূপভাবে সমঝোতাতে উৎসাহিত করেছে। অন্যায়কে অন্যায় বলতে না পারার যে অপসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, সেটি ক্রমশই মহীরুহে পরিণত হচ্ছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি প্রশাসনের এহেন মনোভাব, দৃষ্টিভঙ্গি আমাদেরকে নির্বাক করে তোলে।
আমার দেশের পেনাল কোডের ২৯৫-এর শিরোনাম রয়েছে—‘কোনো শ্রেণীর লোকের ধর্মের অবমাননার উদ্দেশ্যে কোনো উপাসনার স্থান বা পবিত্র বস্তু ধ্বংস, নষ্ট বা অপবিত্র কর’। আইনের বর্ণনায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি যদি কোনো উপাসনা স্থান বিনষ্ট করে, ক্ষতিগ্রস্ত করে বা অপবিত্র করে অথবা জনসাধারণের কোনো শ্রেণী দ্বারা পবিত্র বলে গণ্য কোনো বস্তু বিনষ্ট করে, ক্ষতিগ্রস্ত করে বা অপবিত্র করে এবং জনসাধারণের কোনো শ্রেণীর ধর্মকে অপদস্থ করার মানসেই তা করে অথবা অনুরূপ বিনষ্টকরণ, ক্ষতিসাধন বা অপবিত্রকরণকে এক শ্রেণীর জনসাধারণ তাদের ধর্মের প্রতি অবমাননা বলে বিবেচিত করবে জানা সত্ত্বেও তা করে, তবে সে ব্যক্তি দুই বৎসর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে অথবা অর্থ দণ্ডে, অথবা উভয়বিদ দণ্ডেই দণ্ডিত হবে।’
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সোনার বাংলা গড়ে তোলার যে চেতনা বঙ্গবন্ধু জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সবার হৃদয়ে বীজ রোপণ করেছিলেন, তা যেন বিঘ্নের পর বিঘ্নে বিবর্ণ না হয়ে পড়ে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ শ্লোগানকে সার্বজনীন করে তোলার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন; সেখানে প্রশাসনের অসহযোগিতা সত্যিই অনাকাঙ্ক্ষিত। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনত্তোর বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের প্রাক্কালে ঘোষণা করেছিলেন, ‘…মুসলমানেরা তাদের ধর্ম পালন করবে, তাদের বাধা দেওয়ার ক্ষমতা এই রাষ্ট্রে কারো নাই। হিন্দুরা তাদের ধর্ম পালন করবে, কারো বাধা দেওয়ার ক্ষমতা নাই। বৌদ্ধরা তাদের ধর্ম পালন করবে, খৃষ্টানরা তাদের ধর্ম করবে তাদের কেউ বাধা দিতে পারবে না। …আমি বলব সাড়ে সাত কোটি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে যদি গুটি কয়েক লোকের অধিকার হরণ করতে হয়, তা করতেই হবে।’ সোনার বাংলার আকাশ-বাতাস, মাটি-পানি এবং ধর্ম-সংস্কৃতি লালন ও চর্চার মধ্যে দিয়েই আমরা মানুষ খাঁটি সোনাতে রূপান্তরিত হবো। স্বপ্ন বাস্তবায়নে বাধাগুলোকে উপড়ে ফেলা, অপসারণ করতে এখনই উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যিক।
মিথুশিলাক মুরমু : গবেষক ও কলামিস্ট।





Users Today : 8
Views Today : 8
Total views : 180707
