ইতিহাসের পরিক্রমায় প্রতি বছরই আমাদের মার্চ মাসকে স্মরণ করতে হয়। এই মার্চ মাস অনেকের মতো আমার জীবনে অনেক ঘটনা জড়িয়ে আছে। ইন্টারমেডিয়েট পাশ করার পর সবে মাত্র ই. পি. ইউ. ই. টি. (ইস্ট পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি ইঞ্জিনিয়ার এন্ড টেকনোলজি) বর্তমানে যা বুয়েট নামে প্রসিদ্ধ, ভর্তি হয়ে ক্লাস শুরুর অপেক্ষায় ছিলাম। ’৬৯ গণ আন্দোলনের পর থেকে দেশে আর কোনো শান্তি ফিরে আসেনি, মিছিল মিটিং ও হরতালের মধ্যে দিনগুলো কেটেছে। খবরা-খবর নেওয়ার জন্য ইউনিভার্সিটি এলাকাতেই আমরা বেশিরভাগ সময় পড়ে থাকতাম। আমাদের ব্যাচে বেশিরভাগই তখন ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি হয়েছিল। অন্দোলনের তোড়ে আমাদের পুরান ঢাকার বন্ধুরা ও যারা আমরা একাসাথে স্কুলে (সেন্ট গ্রেগোরিস) পড়াশোনা করেছিলাম, তাদের সাথে আমাদের যোগাযোগ ছিল। দিনের বেলা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর, সন্ধে বেলা আমরা স্কুলের মাঠে একত্রিত হতাম। যারা ঢাকা কলেজ থেকে পাশ করেছিল তারা বেশিরভাগই ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিল। একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে দিনগুলো যাচ্ছিল। মেডিক্যাল কলেজে যে কত ক্লাস করেছি তারই ইয়াত্তা নেই। কেবলমাত্র কানিং হামের বই নিয়ে ডি সেকশন রুমে যেতাম না, কারণ ওখানে গেলেই টিচারদের কাছে ধরা পরার ভয় ও মৃত মানুষের হাত পা নিয়ে নাড়াচাড়া আমার জন্য ছিল একান্তই অস্বস্তিকর। একদিন তো ধরা খেয়ে গেলাম, টিচার বললেন এতই যখন শখ তখন ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে এখানে এসে ভর্তি হয়ে যাও না কেন! কোনো কিছু মিস না করলেও ক্যান্টিনের সিঙারার স্বাদ আজও ভুলিনি। দিনের এক নির্দিষ্ট সময়ে যখন আমরা বিভিন্ন নতুন নতুন স্লোগান তৈরি ও অনুশীলনের জন্য ব্যস্ত থাকতাম তখন মধুর ক্যান্টিনই ছিল একমাত্র ঠেক (আড্ডার কেন্দ্র)।
এমনিভাবেই চলছিল উত্তপ্ত ও উদ্বেগে ভরা শঙ্কায় পরিপূর্ণ দিনগুলো। খবরের কাগজ তো ছিলইÑসারাদেশে এত বেশি দাঙ্গা-আন্দোলন খবর সৃষ্টি হত যে সবগুলো কাগজে সব খবর বের হত এমন নয়। আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধবের মাধ্যমে অনেক খবর ফেরি হত, সেই খবরগুলো আমাদের কাছে সত্ত্বর চলে আসত, এই সমস্ত খবর আমদের স্বাধীনতার চেতনাকে উস্কে দিত। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও প্রাচীনদের মনোভাব আমরা যতটা না বুঝতে পারতাম তাদের নীরবতা আমাদের আরো বেশি ব্যথিত করত। চলমান ঘটনাবলী নিয়ে আমরা কী ভাবছি বা না ভাবছি সেই বিষয়েও তাদের চিন্তার অবকাশ ছিল না। রাজনীতিতে যা ঘটছিল প্রতিদিন তার পক্ষে সাফাই গাইবার কারো কোনো মুখ ছিল না। দুই-একজন বন্ধু তাদের বাপ-চাচাদের নিয়ে এমনই সংঘাতে নেমেছিল যে সেই সব অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের ঘাটাতে আর সাহস করেনি। আমরা সচেতন যুবেকারা মোটামুটি সবাই পাকিস্তান বিরোধী মনোভাবে জড়িয়ে পড়ি। এমত অবস্থায় আমরা যখন সকলই সন্দেহের দোলায় দুলছিলাম, পাকিস্তানীরা কি সত্যি নির্বাচনী ফল অনুসারে বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করবে কিনা? কিংবা ক্ষমতা ভাগাভাগির জন্য কোনো একটি নতুন কৌশল বের করবে। দিন যাবার সাথে সাথে ও বিভিন্ন অঞ্চলের থেকে আসা খবর সমূহ আমাদেরকে ক্ষমতা ভাগাভাগীর প্রশ্নে যেকোনো উপায়ে আমরা নিরুৎসাহিত ছিলাম। ছাত্র আন্দোলনের ১১ দফা ও আওয়ামী লীগের ৬ দফা আমাদেরকে এমন এক স্তরে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল যে স্বাধীনতা ছাড়া আমাদের আর অন্য কিছুতে স্বপ্ন দেখার অবকাশ ছিল না। ক্রমশ ২৬ই মার্চের সেই ভয়াল রাত্রি এসে গেল, আমাদের সমস্ত সন্দেহের দোলাচল পাকিস্তানীদের নির্মমতায় লুণ্ঠিত হলো, নিরস্ত্র বাঙালিদের উপরে সশস্ত্র পাক সেনারা সু-পরিকল্পিতভবে যে হত্যাযজ্ঞ চালাল তার সাক্ষী পৃথিবীর ইতিহাসে আর নেই। প্রচ- গোলাগুলির শব্দ আমদের জানিয়ে দিচ্ছিল ঢাকা শহরের বিভিন্ন জাগায় যে হত্যাকা- হচ্ছিল তা শব্দময় আর্তনাদ পাক সেনারা গুলি ও বোমা মেরে স্তব্ধ করে দিচ্ছিল। আমাদের আর সন্দেহ করার আর কোনোই অবকাশ রইল না। পাকিস্তানীরাই বুঝিয়ে দিল তারা কী করতে যাচ্ছে ও আমাদের এখন কী করা উচিত।
২৬ই শে মার্চের ভয়াল রাত আমাদের ঢাকাবাসীকে এতটাই বিহ্বল করেছিল যে, পরের দিন আমরা ইউনিভার্সিটি এলাকা যেতেই ভই পেলাম। সারাদিন আড্ডার মধ্যে এই ভয়াল কা-কারখানার কথা এক বন্ধু আরেক বন্ধুর সাথে আলোচনা করলাম। পরিষ্কার বুঝলাম যে শুধু পুরান ঢাকাতে নয় ঢাকা শহরের বিভিন্ন জাগায় একই রকম ভয়াভয় ঘটনা ঘটেছিল। বুঝলাম আজ রাতেও একই ঘটনা পুনরাবৃত্তি হবে। ২৭ই মার্চ রাতেও একই ঘটনা ঘটে ছিল। রাজারবাগ পুলিশফাঁড়ি, ইপি আর (ইস্ট পাকিস্থান রাইফেল) রোকেয়া হল, প্রায় প্রতিটি থানায় পাক আর্মি আক্রমণ চালিয়েছিল। পরবর্তীতে পাক আর্মিদের রোকেয়া হলে নির্মম অমানবিক ও পৈশাচিক কর্মকা-ের খবর আসতে শুরু করল। ইপি আরের প্রায় প্রত্যেকটি ক্যাম্পেই বাঙালি জোয়ানেরা প্রস্তুত হয়েছিল। তাই সেসব জায়গায় পাক আর্মিদের কিছুটা প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়, সেই সুযোগে বেশিরভাগ সৈন্যই অস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল। প্রতিটি থানায় দু-একজন করে মারা গিয়েছিল এবং ঢাকার প্রথম মুক্তিবাহিনী দল থানায় থানায় গিয়ে অস্ত্র সংগ্রহ করে সরে পড়েছিল। কাজটা অনেক সহজ ছিল না, অনেক থানার ওসি এই কাজের সাহায্য করতে চাইছিলেন না, তারা প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখে পড়ে তারা তাদের নিজ নিজ দূর্গ ( থানা) ও সম্মান রক্ষায় সচেষ্ট ছিলেন। তাদের মধ্যে অনেককেই শেষ পর্যন্ত পাক আর্মিদের কাছে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়। এই খবর যখন দেশের অন্যান্য জাগায় ছড়িয়ে পড়ে, তখন অন্যান্য থানার ওসিরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অস্ত্র সরিয়ে ফেলতে সচেস্ট হন, তবুও সবাই নন। মুক্তিযুদ্ধের স্বার্থে অনেক মুক্তিযোদ্ধা ওসিকে বন্দী করে হলেও অস্ত্রাদি ও রসদ কুক্ষিগত করে। সেই রসদ ও খুব বেশি একটা উন্নত মানের নয়, বেশিরভাগই ছিল কাঠের বন্দুক ও দু-একটা স্টেইনগ্যান ও দু-একটা পিস্তল। এই রসদ নিয়েই আমাদের প্রথম মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। প্রথম দিকে এই অস্ত্র নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে লুকিয়ে ছিলেন ও ছোটখাটো বিহারীদের উপর অ্যাম্বুস করেছিল। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করারা জন্য সেতু ধ্বংস করার কাজ তখনও শুরু হইনি। এইভাবে ২৮ তারিখ পর্যন্ত আমরা দিন কাটালাম। দিন কাটানো বললে ভুল হবে বরং ভয়ে শঙ্কায় ও পাক আর্মিদের নির্মমতায় আমরা ক্রমাগত পিষ্ট হয়েচ্ছি।
২৯শে মার্চ সকালে আমি মা ও ছোট দুই বোনকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। উদ্দ্যেশ্য এইÑ আমরা সকলেই ফরিদপুরের রাজবাড়ীতে গিয়ে আশ্রয় নেব। অবস্থা বুঝে ঢাকায় ফিরে আসব বা বর্ডার পাস করে কোলকাতা চলে যাব। সকালে উঠে রিকসা নিতে গিয়ে এক বিভ্রাট বাধল, যদিও রাস্তায় খুব একটা বেশি রিকসার চলাচল ছিল না তবে বেশিরভাগ রিকসা কমলাপুর বাসস্ট্যান্ড অবধি যেতে অস্বীকার করল। শেষে এক রিকসাওয়ালা রাজি হল কিন্তু ভাড়া চাইলো দেড় টাকা, যুদ্ধ করবার আগেই গা গরম হয়ে গেল, বলি বলে কি বেটা যা আটানার চেয়েও বেশি ভাড়া হয় না, লক্ষ্মীবাজার থেকে কমলাপুর বাসস্ট্যান্ড খুব বেশি হলে দুই কি.মি. দূরত্ব। আমাদের তো যেতেই হবে পথে পা রেখে আর ফিরে গেলে চলবে না, তাই বললাম ঠিক আছে এক টাকা নাও। রিক্সাওয়ালা বলল জানের ভয় সকলেরই আছে। সারা দিনে কয়টা খেপ মারতে পারি তাই একটু বেশি ভাড়া না দিলে কীভাবে চলে। মনে আছে সেইদিন পাঁচ সিকায় রফা হয়েছিল। বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখি প্রচ- ভিড়। বাস-চালক সবই আছে ঠিক কিন্তু তারা বাস ছাড়তে চাইছে না। কেউ বলছে মিরপুরের পর রাস্তা ঠিক নেই কি জানি মিরপুর ব্রিজও ভেঙে ফেলা হয়েছে। সেই অনিশ্চয়তার মধ্যে আমাকে একটু নেতৃত্ব দিতে হলো। বাংলাদেশে তখন সংগ্রামে পুরধায়ে ছাত্ররা। নাতি দীর্ঘ এক বক্তৃতায় সবায় রাজি হলো আরিচা অবধি বাস যাবে, পথে কোনো বাধা এলে আমরা সেটা মোকাবিলা করব। কথায় কাজ হলো, বাস চালক বাস ছাড়তে রাজি হলো। তিনি বললেন, দেখুন আমি কিন্তু কোনো বড় রাস্তা দিয়ে যাব না অনেক অলিগলি পেড়িয়ে মিরপুরে উঠবো, মিরপুরে গিয়ে দেখব মিরপুর ব্রিজ আছে কিনা। ঢাকা ছেড়ে মন যেতে চাইছিল না, অনেক বন্ধুদের সাথে শেষ দেখা করে আসা হয়নি। ভয় ও দুরুদুরু বুকে মিরপুর এসে উপস্থিত হলাম। মিরপুর ব্রিজ পার হয়েছি মাত্র, বিকট শব্দে একটা চাকা ফেটে গেল, বাসের মধ্যেই এক মহিলা সহযাত্রীর প্রাণ যাওয়ার উপক্রম হলো। তিনি চেতনা হারালেন, শীঘ্রই বোতল থেকে নেওয়া পানির ছিটা ও তালপাতার পাখার বাতাসে তার জ্ঞান ফিরে এলো। অনেক বয়স্করা নিয়মিত দরুদ পড়তে শুরু করেছে, একজনতো বলেই ফেললেন, হায় আল্লাহ এ কিসের আলামত। আমরা কি আরিচা পৌঁছাবার আগেই মারা যাব নাকি? বুঝলাম ঢাকা ছাড়লেও মৃত্যু ভয় অনেককে ছেড়ে যায়নি। বুঝলাম বাসের চাকা ফেটেছে, বাসের চাকা বদলানোর পর বাস আবার চলতে শুরু করল। ঢাকা শহর ছেড়ে এসেছি পথে অনেকে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে আমাদেরকে জয় বাংলা বলে আভিনন্দন জানাচ্ছিল, আমরাও জয় বাংলা বলে উত্তর দিচ্ছিলাম তবে সেটা খুব মৃদু স্বরে। তখনকার সময় পতাকাগুলো ছিল সবুজ ও লালের মাঝে বাংলাদেশের লাল মানচিত্র আঁকা, তথাপি সেই মানচিত্রগুলো মনে হতে লাগল আমাদের কত আপন, মনের আকাক্সক্ষা দিয়ে সৃষ্ট পতাকা। ধীরে-ধীরে আমরা নয়ারঘাট ফেরিঘাটে এসে পৌঁছালাম। ঢাকা থেকে আসা গাড়ি বলে আমাদেরকে সবাই জয়বাংলা রবে অভিনন্দন জানাচ্ছিল। তারা বলছিল ভয় নেই আর আপনারা স্বাধীন বাংলাদেশে চলে এসেছেন। মনের ভয় তখনও আমার কাটেনি, কতক্ষণে নদীটা পার হব মনের ভিতর সেটাই ছিল মূল ভাবনার বিষয়। গ্রাম থেকে অনেকে কলা, পেঁপে, কামরাঙ্গা, নিয়ে এসেছিল। আমাদেরকে দেওয়ার জন্য। পয়সার বিনিময়ে নয় শুধুমাত্র দেশকে ভালবাসার স্বার্থে। আমি দুটি কলা খেয়েছিলাম, আর বাসে বসে থাকা আমার দুই বোনের জন্য নিয়ে গেলাম। এখন যখন সেই দিনের স্মৃতিচারণ করি তখন গ্রাম বাংলা থেকে পালিয়ে যাওয়া অন্য সব শরণার্থীদের সাথে নিজেকেও একাকার করে ফেলি, কোনোই বৈসাদৃশ্য দেখি না। অন্যরা সবাই পায়ে হেঁটে গিয়েছিলÑঢাকা থেকে আগত বিধায় আমরা বাসে করে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। নয়ার হাটের মানুষরা আমাদের যে সম্ভাষণ দেখাল বুঝলাম দেশ স্বাধীন একদিন হবেই। আমাদের যতবড় যুদ্ধেরই মোকাবিলা করতে হোক না কেন। মনে মনে ভাবছিলাম রাজবাড়ীতে গিয়ে অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করব। ফেরি পার হয়ার পর আবার বাস চলতে শুরু করল। চালক বললেন ফেটে যাওয়া টায়ারটি ঠিক করতে হবে। তা না হলে পথে বিপদ হলে আজ আর আরিচা পৌঁছানো যাবে না। একটা বেশ বড় নদী পার হয়ে এসেছি, সবাই বলছে আমরা এখন স্বাধীন দেশে, তবে কিছুটা যে নিরাপদ অনুভব করছিলাম সেটা ঠিকই। রাস্তার পাশে বাসটি কিছুক্ষণের জন্য থামল ফাটা টায়ারটি ঠিক করার জন্য, আমার মা আমার বোনদের নিয়ে গেল নিকটস্থ গ্রামীণ পরিবারের শৌচাগারে। দেখলাম সকলেই তাকে সাদরে গ্রহণ করল, সম্মানের সাথে পানি এনে দিল, রাস্তায় খাওয়ার জন্য মুড়ি, গুড় পানি এনে দিল, ইতিমধ্যে আমি কিছু বিস্কুট, রুটি ও কলা কিনে ফেললাম। জানি না কখন কোথায় গিয়ে পৌঁছাব। চাকা ঠিক করার পর বাসটি কিছুক্ষণের মধ্যে তরার ঘাটে এসে পৌঁছাল। ফেরি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল, গাড়ি-ঘোড়া তেমন একটা ভিড় ছিল না। ঢাকার খবর কী জানার জন্য সকলেই উৎসুক নয়নে আমার দিকে ঘিরে ধরল। মনে জয়ী জয়ী ভাব ফিরে এসেছিল। যুদ্ধ করিনি তবুও ঢাকা থেকে তো বেরিয়ে আসতে পেরেছিলাম। সেই আনন্দে আমরা সবাই পুলকিত হয়েছিলাম। ভাবছিলাম আমরা তো রক্ষা পেলাম কিন্তু যাদের রেখে এলাম তাদের কি হবে? বাবার কথা খুব মনে পড়তে লাগল। তিনি সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়ারে কাজ করতেন। তিনি কোনদিন অফিস কামাই করতেন না। যুদ্ধের সময় তিনি অফিসে গিয়েছেন নিয়মিত। তার এই সাহসের জন্য আমি এখনও অনেক গর্ব অনুভব করি। হাত নেড়ে তরারঘাটবাসিদের তাদের আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে আবার খোদা হাফেজ বলে যাত্রা শুরু করলাম। তরারঘাট বাসিদের আন্তরিক আতিথেয়তার কথা, সে গুড় আর মুড়ির কথা মনে হলে তাদের প্রতি শ্রদ্ধায় মন অবনত হয়ে আসে। সেদিন উপলদ্ধি করেছিলাম এই আমার দেশ, এই আমার দেশবাশী আমরা সবাই বাংলাদেশী। স্বাধীনতা উপলক্ষে অনেক শোকগাথা লেখা হয়েছে ও হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের ও আত্মত্যাগের কথা আর কতই না প্রকাশিত হবে। কিন্তু গ্রামের মায়েদের করুণায় ভরা চোখ দিয়ে আমদের যে বিদায় জানিয়েছিল তা আজও ভুলতে পারি না।
বাস এসে মানিকগঞ্জ থামল। না মানিকগঞ্জে কেউ নামছেন না আমাদের বাসের সমুদয় যাত্রিদের গন্তব্যস্থল গোয়ালন্দ অনেকেই উৎসুক-নেত্রে এগিয়ে এল। সবাই জিজ্ঞাসা করতে শুরু করল আপনারা কীভাবে পালালেন, ঢাকাকে কি সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে? আমাদের মুখে বিষাদ ও ভয়ের ছায়া ওরা স্পষ্টই পড়তে পারছিল। তখন আমাদের মনে কোনো উত্তেজনা ছিল না। কেন জানি একটা নির্জীব ভয়ার্ত ভাব আমাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। বলেছিলাম ঢাকা শহরকে গুঁড়িয়ে দেয়া এত সহজ কথা নয়, তবে পাক সেনাদের আকস্মিক ও নির্দয় নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। হাজার হাজার লোকের মৃতদেহ রাস্তাঘাটে পড়ে আছে। ২৬ শে মার্চ রাত থেকে ২৮ মার্চ রাত পর্যন্ত প্রতিদিনি গোলাগোলির শব্দ আমরা শুনতে পেয়েছি। বিভিন্ন অঞ্চলে আগুনের শিখা বাড়ির ছাদ থেকে দেখেছি। ঢাকা হয়ে পড়েছিল এক নিস্তব্ধ মৃতের শহর। দিনের বেলায় নিঃশব্দে নড়াচড়া বাকহীনভাবে নিকটস্থ আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ নেয়া ও অজানা লাশের সৎকার এই ছিল আমাদের প্রধান কাজ। প্রতিশোধে স্পৃহা যত না জেগেছে মনে তার থেকে বেশি ছিল ঘৃণার ঘনঘটা। রাতের বেলা নিশ্চুপ থেকেছি মৃত শহরকে আরও মৃত মনে হতো। এই বিহ্বলতা কিছু কালের মধ্যেই কেটে গিয়েছিল। কিন্তু ভয়ার্ত ভাব তখনো কাটেনি। মানিকগঞ্জের লোকেরা আমাদেরকে অনেক সাহস জোগাতে সহযোগিতা করেছিল, বলেছিল জয় বাংলা আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক এখানে আর ভয় নেই, আপনেরা ভয় মুছে ফেলুন যান এগিয়ে যান আরিচা পর্যন্ত আমাদের জানামতে রাস্তা ঠিক আছে। ভয়ের ভাবটা একটু করে কেটে যাচ্ছিল কিন্তু যাদের ঢাকা রেখে এলাম তাদের কী হবে ভেবে শিউরে উঠছিলাম। আমার মনে আছে তিন মাস পর বাবা আমাদের সাথে যোগাযোগ করেছিল লন্ডনের সূত্র ধরে। সে অনেক পরের কথা যদি এই ৩ মাস আমরা প্রচ- উৎকণ্ঠা নিয়েই কাটিয়েছি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র আকাশ বাণী ও বিবিসি সংবাদই আমাদের একমাত্র খবর শোনার মাধ্যম ছিল। যদিও ৩ মাস পর কলকাতায় ঢাকা থেকে ফিরে আসা কিছু বন্ধুদের সাথে দেখা হয়েছিল ততদিনে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। পরে সে সম্বন্ধে ব্যক্ত করব। পথ যেন আর ফুরায় না আরিচা থেকে গোয়ালান্দ পর্যন্ত যাওয়ার ব্যবস্থা হবে কি হবে না সেই বিষয়ে সকলের মনেই সংশয় ছিল। সেই ভয় আর উৎকণ্ঠা নিয়ে আস্তে আস্তে আরিচা এসে পৌঁছালাম দেখলাম আমাদের মতো অনেকেই জড়ো হয়েছে পথে তেমন একটা দেখা হয়নি কারও সাথে কখন কীভাবে তারা এসেছিল তা অনেকের মনে বিস্ময় সৃষ্টি করেছিল। দেখলাম সকলের মুখে সেই ভয় আর উৎকণ্ঠার ছাপ ছিল স্পষ্ট। দ্বিগুণ ভাড়ায় একটি লঞ্চ গোয়ালন্দ পর্যন্ত পৌঁছে দিবে বলে লোক ভরতে শুরু করল। এসেছিলাম তো এক বাস লোক এখন দেখি প্রায় দশ বাস লোক একটি লঞ্চে উঠার জন্যে অপেক্ষা করছিল। যেন এই লঞ্চে সুযোগ না হলে আর যেন কোনো সুযোগ নেই পরিত্রাণের। একজন তো বলেই ফেললেন কোনোমতে প্রাণ নিয়ে বেঁচেছি এবার বুঝি নদীতে ডুবেই মরতে হবে শেষ পর্যন্ত তাই বেশি তর্কাতর্কিতে না জড়িয়ে নিজেদের আসন পোক্ত করার জন্য ব্যস্ত হলাম। লঞ্চের কর্মচারীরা ভারসাম্য রক্ষার জন্য আমাদের ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসার ব্যবস্থা করলেন আর বারবার বললেন চুপচাপ বসে থাকেন আমরা ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আরিচা পৌঁছে যাব। আমার মনে আছে প্রায় দুই ঘণ্টা লেগেছিল সেই দিন।
গোয়ালন্দ ঘাটে এক বিশাল কাফেলা সেই দিন আমাদের সবাইকে জয় বাংলা রবে অভিনন্দন জানিয়েছিল। আমরা সকলেই হুরমুর না করে চরম প্রশান্তিতে মুক্তির আনন্দ নিয়ে গোয়ালন্দ ঘাটে পা রেখেছিলাম আমরা এখনো জয় বাংলা বলে শ্লোগান দেই কিন্তু সেই সব দিনে জয় বাংলা সুরের মধ্যে যে মাদকতা ছিল তা আজ আর খুঁজে পাই না। ঘাটে অবতরণ করার পর সবাই বলল একটা ট্রেন আছে কিছুক্ষণের মধ্যেই ছাড়বে সেটা কুষ্টিয়া অবধি যাবে। আমাদের গন্তব্যস্থল ছিল রাজবাড়ি। বেশ অনেকটা পথ হেঁটে আমরা ট্রেনে গিয়ে চাপলাম ট্রেনে প্রায় সাত/আটটা বগি ছিল ট্রেনে উঠে এক প্রশান্তির বাতাস আমাদের সবাইকে ছুঁয়ে গেল। ট্রেনে বসে প্রথম উপলব্ধি করলাম যে যারা বলছিল, আপনারা স্বাধীন দেশে এসে গিয়েছেন সেই সত্যতা সেই দিন উপলব্ধি করেছি যদিও সেই সত্য বেশি দিন টিকেনি। তথাপি সেই দিন সেই ক্ষণ সেই উবলব্ধি আমি মনের মনি খাতায় সঙ্গোপনে উঠিয়ে রেখেছিলাম। আমরা কেউ টিকিট কাটিনি কেউ আমাদের টিকিট কাটতে বলেনি কিন্তু আমাদের সাহায্যে সেবার যে পরকাষ্ঠতা দেখিয়ে ছিল তা বলার মতো নয়। এ দেশ একটু স্বাধীন ভাব একটু একটু স্বাধীনতার চেতনা ক্রমশ আমাদেরকে আবেসিত করেছিল। উত্তেজনা যেন ফিরে আসছিল ধীরে ধীরেÑক্রমেই ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে গেল তখন বিকেল প্রায় ৪ টা ছুঁই ছুঁই নিজস্ব গতিতে ট্রেন চলছিল। একেবেঁকে আমি শুধুমাত্র স্টেশনের নাম পড়তেই ব্যস্ত ছিলাম আর প্রতিটা স্টেশন থেকেই জয় বাংলা করে সম্ভাসন জানাচ্ছিল। স্থানীয় অনেক মানুষ আমাদের ট্রেনে উঠেছিল ঢাকা থেকে আগত জেনে তারা সবাই বিস্ময়ে হতবাক হয়েছিল। ওরা জিজ্ঞাসা করছিল আমরা যা খবর পাই তা কি সত্যি আমরা সকলেই নিঃশঙ্কচিত্তে উত্তর দিয়েছিলাম শুধু সত্যি নয় প্রকৃত ব্যবস্থা আরো নিদারুণ আরো ভয়াবহ। অনেকেই সেই বর্ণনা বিশদভাবে শুনতে চেয়েছিল অনেকেই বলছিলেন আবার অনেকেই চুপ ছিলেন। সহসাই আমরা রাজবাড়ী এসে পৌঁছালাম আমাদের গন্তব্য ছিল প্রায় স্টেশনের কাছে তথাপি একটু ঘুরে যেতে হয় বিধায় একটি রিকসা নিয়ে নিলাম। আমার খালু ও খালা আমাদেরকে পেয়ে কি মহাআনন্দিত হয়েছিল তা ভাষায় প্রকাশযোগ্য নয়। তাদের সকলের জন্য চিন্তিত ছিলাম তোরা যে এখানে আসবি আমরা কল্পনাও করতে পারি নাই এখানে আসার সিদ্ধান্তটা তোদের সঠিক। খালা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন সারাদিন অভুক্ত থাকার পর আমাদের খাদ্য জোগারের জন্য।
আমাদের স্বাধীনতা দিবস তারিখটি আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ স্থির করেছিল পরবর্তীতে। কারণ এই দিনটি থেকেই আমরা আমাদের যাত্রা শুরু করতে পেরেছিলাম স্বাধীন দেশের অভিমুখে। নির্দয় ও পিশাচ পাক আর্মিরা আমাদের নিরস্ত্র বাঙালি যে করুণ সুরের গাথা লিখতে শুরু করেছিল সেটা সেই দিন বুঝেনি ঠিক কিন্তু পরবতীতে তারা বহুবার বহুভাবে অনুশোচনা করেছে। পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ এই নিদারুণ হত্যাকাহিনী শুনতে পায়নি। অনেক দিন পর যখন তারা শুনতে পেয়েছিল তখন তাদের বলা হয়েছিল ভারত থেকে আগত কিছু দাঙ্গাকারী পূর্ব পাকিস্তানের পাক ভূমিতে প্রবেশ করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছিল। তাদেরকে তাই মেরে পাক আর্মি মেরে উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে ছিলেন এবং এই মন্তব্যকে স্বীকৃতি দেবার জন্যে পাকিস্তান সরকার অনেকের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছিল। আপাত দৃষ্টিতে তারা স্বার্থক হয়েছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই কিন্তু এখন পাকিস্তানের জনগণ জানে ও বলে সেই ভয়াবহ নৃশংসতা পাকিস্তানি সৈন্যরা না চালালে পাকিস্তান এখনো অটুত থাকতো (এটা তাদের কথা ও তাদের স্বীকারোক্তি) কিন্তু আমরা জানি এই নৃশংস হত্যাকা- অনেক জানা ও অজানা শহীদের রক্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইাতহাস লেখা শুরু হয়েছিল। এই ইতিহাস রক্তে লেখা, এই ইতিহাস পাকিস্তানের বর্বতরতার ইতিহাস, এই ইাতিহাস পাকিস্তানের বঞ্চনার ইতিহাস যা আস্তে আস্তে সমস্ত পূর্ব পাকিস্তানের মাটিকে ক্রমানয়ে সঞ্জীবিত করেছিল। ইতিহাস থেকে জানি এ দেশের আগেকার দিনে রাজারা রাজ্য জয়ে প্রবিষ্ট হওয়ার সময় অশ^মেধ যজ্ঞের আয়োজন করতেন। অর্থাৎ যুদ্ধের প্রধান বাহন অশ^কে বলি দিয়ে তারা যুদ্ধের জয়রথ চালু করতেন। বাংলাদেশ অশ^মেধ যজ্ঞ দিয়ে নয় জীবন্ত দেশ প্রেমিকের রক্ত দিয়ে তাদের যদ্ধের রথ চালু করেছিল। ২৬ শে মার্চে অনেক জানা অজানা লোকের আত্মাহুতি আমাদের স্বাধীনতা সূর্য উদয়কে প্রস্তুত করেছিল সেই যোগ্যের যূপকাষ্ঠে যারা নিজেদেরে প্রাণ বলিদান করেছিলেন তারাই আমাদের জন্য অজানা ইতিহাস হয়ে রইবেন। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথের দুইটি লাইন তাদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করলাম
যে ফুল না ফুটিতে ঝরেছে ধরণীতে
যে নদী মরুপথে হারালো ধারা,
জানি হে জানি, তাও হয়নি হারা॥
ক্স ড. এলগিন সাহা : এনজিও ব্যক্তিত্ব, কলামিস্ট।




Users Today : 8
Views Today : 10
Total views : 175514
