১.
গত এপ্রিল ২ তারিখ ছিল খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের গুড ফ্রাইডে অর্থাৎ এ দিনে প্রভু যিশু খ্রিষ্টকে ক্রুশোরোপণ করে হত্যা করা হয়েছিল। বিশ্বের কোটি কোটি খ্রিষ্টানুসারী অত্যন্ত গুরুত্ব ও সম্মানের সাথে দিবসটি উদযাপন করেন। গুড ফ্রাইডের ঘটনাগুলোকে বিশ্লেষণ, আত্মোপলব্ধি এবং ভাবগাম্ভির্যের মধ্যে দিয়ে ধর্মানুসারীরা নিজেদেরকে ক্রুশমুখী, ক্রুশের আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করে থাকেন। আমার বাংলাদেশে প্রায় ১০ লক্ষাধিক খ্রিষ্ট বিশ্বাসী বসবাস ও প্রতিটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি, আচার-ঐতিহ্য, অনুশাসন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালনে রত হন।
আমরা খুবই মর্মাহত হয়েছি যে, গুড ফ্রাইডের দিনে দেশের সরকারি ও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে প্রথম বর্ষ এমবিবিএস কোর্সের ভর্তি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। ১ লাখ ২২ হাজার ৮৭৪ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ১৯টি কেন্দ্রে ৫৫টি ভেন্যুর ৭৫টি হলে। আমাদের প্রশ্ন হলো—কেন এই বিশেষ দিনক্ষণকে বেছে নেওয়া হলো? জনসংখ্যার বিবেচনায় খ্রিষ্ট বিশ্বাসীরা দেশকে সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে চলেছে, রয়েছে—হাসপাতাল, ক্লিনিক, দাতব্য প্রতিষ্ঠান যেখানে নামেমাত্র ভিজিট নিয়ে ডাক্তারগণ নিভৃত পল্লীতেও রোগীকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করছে। অসুস্থ, পীড়িতদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদেরকে সাহায্য করাকে ধর্মের অংশী হিসেবেও বিশ্বাস করে। ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ মেডিকেল পরীক্ষায় অংশগ্রহণের কারণে আমাদের অনেক ছেলেমেয়ে ধর্মীয় দিনটিকে উদযাপন করতে পারেনি; এর দায়ভার সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্ববানদেরকেই নিতে হবে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১২ অক্টোবর খসড়া সংবিধান প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ দেন তাতে ছিল: …হিন্দু তার ধর্ম পালন করবে; মুসলমান তার ধর্ম পালন করবে; খ্রীষ্টান, বৌদ্ধ—যে যার ধর্ম পালন করবে। কেউ কারও ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, বাংলার মানুষ ধর্মের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ চায় না। রাজনৈতিক কারণে ধর্মকে ব্যবহার করা যাবে না। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ধর্মকে বাংলার বুকে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। যদি কেউ ব্যবহার করে, তাহলে বাংলার মানুষ যে তাকে প্রত্যাঘাত করবে, এ আমি বিশ্বাস করি’(বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, পৃষ্ঠা-৩২)। মেডিকেল পরীক্ষার আড়ালে সাম্প্রদায়িকতার বীজ রোপিত কী না, সেটিও বিবেচনা ও খতিয়ে দেখতে হবে।
২.
সম্প্রতিকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে অতিথি হয়েছিলেন। তার এই আগমন ও উপস্থিতিকে নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বহু মত-অভিমত শ্রবণ করেছি।
ক্ষুব্ধ-সংক্ষুব্ধ হয়ে পরিশেষে দেখলাম, হেফাজতে ইসলাম ২৮ মার্চ রবিবার দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাক দিয়েছিল। রবিবার কেন? দেশের ক্ষুদ্র খ্রিষ্ট বিশ্বাসীরা সপ্তাহান্তে রবিবার গির্জা-উপাসনায় মিলিত হয়ে থাকেন। দেশব্যাপী সহিংসতা, আন্দোলনের ব্যাপকতায় খ্রিষ্ট বিশ্বাসীরা অর্থাৎ প্রবীণ-প্রবীণা, স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে নিঃশঙ্কচে গির্জায় সামিল হবেন, এটির নিশ্চয়তা ছিল না। যদি কোনো ধর্মাবলম্বী উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা কিংবা নিরাপত্তাহীনতা বোধ করে, কোনো উগ্রবাদীর দ্বারা অপদস্ত, অপমান বা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হোন; এটি তো কখনোই স্বাধীন দেশের নাগরিকের কাছে কাম্য নয়। মনে করি, একটি ধর্মকে হেয়জ্ঞান করে কখনো নিজের মহত্বতাকে বহিঃপ্রকাশ করা যায় না। বোধকরি, হেফাজতে ইসলাম ক্ষুদ্র খ্রিষ্ট বিশ্বাসীদের ধর্মীয় অধিকারই ক্ষুণ্ন করেনি; পবিত্র আল-কোরআন পুড়িয়ে, মানব সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তছনছ করে রাষ্ট্রদ্রোহীতার সামিল কাজ করেছে। ধর্মীয় দৃষ্টিতে যেমন জঘন্যতম; সাংবিধানিকভাবেও এটা গর্হিত অপরাধ।
১৫ ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে উল্লেখ করেছিলেন—প্রত্যেককে নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার রাখেন। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান—সব ধর্মের বর্ণের মানুষের রক্তের বিনিময়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে।’ স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিকে হেফাজতে ইসলাম কলঙ্কের তিলক লেপে দিয়েছে। বিষবৃক্ষকে উৎপাটন করেই সোনার বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে ত্বরান্বিত করতে হবে।
৩.
বেশ কয়েকদিন আগে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে সিলেট সদর উপজেলার টুকেরবাজার ইউনিয়নের তালুকদার পাড়া গ্রামের আজাদ বক্সের ছেলে মহসিন তালুকদার হত্যার হুমকি দিয়েছে। ঘটনাটি ঘটে ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ নভেম্বর, ১৭ নভেম্বর তাকে গ্রেফতার করা হয়। মহসিন তালুকদার ১৫ নভেম্বর রাত ১২টা ৭ মিনিটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুক লাইভে এসে চাপাদি দেখিয়ে সাকিবকে গলাকেটে হত্যার হুমকি দেন। সাকিবের অপরাধ হলো—কলকাতায় গিয়ে কালীপূজার অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেছেন বলে হুমকিদাতার বক্তব্যে এসেছে। প্রসঙ্গত: গত ১২ নভেম্বর কলকাতায় গিয়ে একটি কালীপূজার অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন সাকিব আল হাসান। পূর্ব কলকাতার কাঁকুড়গাছিতে ‘আমরা সবাই ক্লাব’র ৫৯তম শ্যামাপূজার অনুষ্ঠানে তিনি শুধু উপস্থিত ছিলেন, পূজা উদ্বোধন করেননি বলে জানান আয়োজকরা। ওই অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম, আমরা সবাই ক্লাব’র প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক পরেশ পাল, দক্ষিণেশ্বর আদ্যাপীঠের আচার্য মুরাল ভাই, কলাকাতায় বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনের উপদূতাবাস তৌফিক হাসান, দূতাবাস প্রধান কনসুলার বিএম জামাল হোসেন প্রমুখ।
৯ মার্চ জামিন আবেদন শুনানির সময় মাননীয় হাইকোর্ট উষ্মা প্রকাশ করেন। বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. বদরুজ্জামান আসামীপক্ষে আইনজীবীকে উদ্দেশ্যে করে বলেন, ‘একজন বিশ্বমানের ক্রিকেটার কালীপূজায় নাকি মসজিদে যাবে, এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এজন্য তো তাকে কেউ হত্যার হুমকি দিতে পারে না।’ আমার দেশের পবিত্র সংবিধানের ৪১. ক-তে রয়েছে—‘প্রত্যেক নাগরিকের যে কোন ধর্ম অবলম্বন, পালন বা প্রচারের অধিকার রহিয়াছে।’ আমরা হতবাক হয়ে যায়, কীভাবে আমাদের নতুন প্রজন্মরা বেড়ে উঠছে— ধর্মীয় উগ্রবাদিতা, সহিষ্ণুতা কিংবা মানবতার মূল্যবোধ শূন্য হয়ে পড়েছি। মহসিন তালুকদাররা নিশ্চয় হযরত মুহাম্মদ (সা.) জীবনী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন, ইসলাম ধর্মের মৌলিকতা সম্পর্কে অজ্ঞ কিংবা হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য বা দেশের আইন-কানুন সম্পর্কেও সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। মাননীয় হাইকোর্ট যর্থাথই বলেছে, ‘কালীপূজায় নাকি মসজিদে যাবে, এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার’; দেশের কোনো নাগরিক মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান বা অন্য কোনো ধর্ম গ্রহণ করবে, সেটি তার একান্তই ব্যক্তিগত। আমাদের মন-মানসিকতার দৈন্যতা যেন দিন দিন প্রকাশিত হতে চলেছে।
৪.
অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘দেশে বিদেশে’র অন্যতম শিরোনাম ছিল—‘গ্রামে ধর্মীয় স্থাপনা ও বাড়ি নির্মাণে ইউপির অনুমতি লাগবে’। বলা হয়েছে, ‘সারাদেশেই ইউনিয়ন পরিষদের আওতাধীন এলাকাকে একটি পরিকল্পনার আওতায় আনতে একটি রোডম্যাপ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়। এই রোডম্যাপের প্রণয়ন করার আগে কোনো ব্যক্তি চাইলেই যত্রতত্র কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা বসতভিটা বা কোনো স্থাপনা নির্মাণ করতে পারবে না। যদি কোনো ব্যক্তি স্থাপনা নির্মাণ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন—সেক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের অনুমতি নেয়ার সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি। বিগত ২৫ মার্চ সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ সুপারিশ করা হয়েছে। গ্রামে-গঞ্জে বিশেষ করে ধর্মীয় হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কিংবা অন্য কোনো ধর্মের ধর্মানুসারীরা যত্রতত্র বা খাস জায়গায় তাদের উপাসনালয়/গির্জা/প্যাগোডা/মন্দির নির্মাণের সংখ্যা খুবই কম বলে বিশ্বাস করি। ব্যক্তির ইচ্ছায় নিজস্ব জায়গায় কিংবা দান করা সম্পত্তির ওপর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পাদিত হচ্ছে। তবে দু’একটি জায়গায় খাস জমিতে মসজিদ নির্মাণ করার বিষয়টি অবগত হওয়া যায়। আমরা বিশ্বাস করি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ হবে ন্যায়ত নিজস্ব রেজিষ্ট্রিকৃত জায়গায় অর্থাৎ এ জায়গায় যারা উপাসনা, আরাধনা ও ধর্মীয় রীতি রেওয়াজ অনুযায়ী স্র্রষ্টার উদ্দেশ্যে নিজেদেরকে উৎসর্গ করবেন, সেটি অবশ্যই হতে হবে প্রতিষ্ঠানের নামাঙ্কিত স্থানে। এটিই বিধেয়, এটিই আবশ্যিক। আমার দেশের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সুপ্রিম কোর্ট প্রায় এক যুগ আগে অন্তবর্তী নিদের্শনা দিয়েছিল। বলা হয়েছিল—‘প্রকাশ্যে রাস্তা দখল করে আর কোনো ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণ করা চলবে না। ওই অন্তর্বতী নির্দেশে আরও বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে যেসব রাস্তা দখল করে মন্দির, মসজিদ, গির্জা, গুরুদুয়ারা বা অন্য কোনো ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মিত হয়েছে, এগুলোর ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। প্রয়োজনে ওই সব উপাসনালয় অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া যায় কি না তা বিবেচনা করে দেখবে সরকার’ (প্রথম আলো ১.১০.২০০৯)। বিচারপতি দলবীর ভাণ্ডারী ও বিচারপতি মুকুন্দকম শর্মাকে নিয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ এ নির্দেশনা দেন। নির্দেশে আরও বলা হয়, প্রকাশ্য রাস্তায় উপাসনালয় নির্মাণের ব্যাপারে সর্বোচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায় না দেওয়া পর্যন্ত এই অন্তর্বতী নির্দেশ বহাল থাকবে। জানা যায়, ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে গুজরাট হাইকোর্ট এক রায়ে রাজ্যের পৌরসভাগুলোর বিভিন্ন রাস্তায় যেসব অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ হয়েছিল, তা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন। এই অবৈধ স্থাপনার মধ্যে ছিল বেশ কিছু ধর্মীয় উপাসনালয়। ওই নিদের্শকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্ট দায়ের করা হয় একটি মামলা। সেই মামলার শুনানি চলাকালে এই অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেন সুপ্রিম কোর্ট। এটিও সত্য যে, রাজনৈতিক প্রভাবান্বিত হয়ে সরকার দ্বারা ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বরে কয়েক শতাব্দী কালের পুরোনো বাবরি মসিজদ ভেঙে মন্দির নির্মাণের ঘোষণা। সে ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক মসজিদের জন্য জায়গা বরাদ্দ করা হয়।
৫.
দৈনিক প্রথম আলোতে একটি সংবাদ, ‘মসজিদ-মন্দিরে বিতরণে সাংসদের বরাদ্দ দ্বিগুণ করার সুপারিশ’ (৬.১.২০২১)। বলা হয়েছে, প্রত্যেক সাংসদের নির্বাচনী এলাকায় মসজিদ ও মন্দিরে বিতরণের জন্য ২০২০-২১ অর্থবছরে বরাদ্দ ৫ লাখ টাকা করার সুপারিশ করেছ ধর্ম মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। আমরা খুবই উগ্রীব হয়ে দেখলাম, মসজিদ-মন্দির উল্লেখ থাকলেও প্যাগোডা, গির্জা, উপাসনায় অনুল্লেখ করা হয়েছে। আমার বাংলাদেশে কতোগুলো ধর্ম ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেটি সঠিকভাবে বলা মুসকিল। পবিত্র সংবিধানে রয়েছে—‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করবেন’। অন্যান্য ধর্মের মধ্যে রয়েছে—শিখ, বাহাই, ক্রামা, সাংসারেক, সানামাহি, সারিসারণা, অপকোপা ইত্যাদি। অনুল্লেখ থাকলে, আবেদন কিংবা প্রাপ্তির জায়গাতে ফাঁক থেকে যায়। আমরা মনে করি, উপাসনালয় উল্লেখ থাকলে অনেকগুলো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্তের বিষয়টি নিশ্চিত হয়। যেমনটি আমরা বিগত সময়ে দেখেছি, ‘সরকার জনস্বার্থে মসজিদ, মন্দির, গির্জা, কবরস্থান ও শ্মশান হিসেবে ব্যবহৃত জমি অধিগ্রহণ করতে পারবে। তবে এ ক্ষেত্রে ওই সব ধর্মীয় স্থাপনা স্থানান্তর করে পুননির্মাণ করে দিতে হবে (প্রথম আলো, এপ্রিল ৪, ২০১৭)। বর্তমান মহামারি কোভিড ১৯-এর প্রজ্ঞাপনেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় মসজিদসহ সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রার্থনার আগে ও পরে সব ধরণের সমাবেশ ও গণজমায়েত নিরুৎসাহিত করে নির্দেশনা জারি করেছে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
৬.
২০২১ জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ২টি গির্জাঘর আক্রান্ত হয়েছে। একটি উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি উপজেলার চরগোরকমণ্ডপ পিবিটি চার্চ, অপরটি বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলার কুকপাতা ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ড সাথীরাম ত্রিপুরা পাড়ায় নির্মাণাধীন গির্জা ২৫ ফেব্রুয়ারি লামা বনবিভাগ গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ২০১১ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত চরগোরকম-প পিবিটি চার্চে বিগত ১০ ফেব্রুয়ারি উগ্রবাদীরা সদলবলে গিয়ে গির্জার অভ্যন্তরে থাকা চেয়ার, গির্জায় ব্যবহৃত জিনিসপত্র নিয়ে যায় এবং গির্জার সাইনবোর্ড, টিনের নির্মিত গির্জাঘরটিকে বেধড়ক পিটিয়ে খানাখন্দ করে দিয়েছে। স্থানীয় চার্চের পাষ্টর লাবলু সাদিক লেবিও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েও সময়মতো কোনো সহযোগিতা পাননি। তিনি জানিয়েছেন, চিহ্নিত ধর্মান্ধ উগ্রবাদীরা গির্জায় থাকা পবিত্র বাইবেল, গানের বই ইত্যাদি বস্তাবন্দি করে নিয়ে গেছে; গির্জাঘরকে গির্জা হিসেবে ব্যবহার করলে বিপদের হুমকি দিয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন খ্রিষ্টিয়ান ধর্ম থেকে ইসলামে প্রত্যাবর্তন করেছেন। বান্দরবানের ইটের নির্মাণাধীন গির্জাটি বন টিমের স্পেশাল টহল বাহিনীর প্রধান (ওসি) মো. আতিকুল ইসলাম ও মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনের রেঞ্জ কর্মকর্তা জহির উদ্দিন মো. মিনার চৌধুরীর নেতৃত্বে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। আলীকদম ত্রিপুরা কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফিলিপ ত্রিপুরা জানিয়েছেন, ‘গির্জা ভেঙে বনবিভাগ আমাদের খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে। আমরা এ গর্হিত ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি।’ ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, বনবিভাগের নেতৃত্বে গির্জা ভাঙা কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। অপরদিকে বন কর্মকর্তা এসএম কায়চার জানান, ‘আমরা কোন গির্জা ভাঙ্গিনি। আমরা সংরক্ষিত বনে অবৈধ স্থাপনা ভেঙ্গেছি মাত্র। মাতাহুমুরী রিজার্ভে কোনো স্থাপনা তৈরি করতে বন বিভাগের অনুমতি লাগে। তারা কেনো আমার কাছ থেকে কোনো অনুমতি নেয়নি। …তিন চারটি ত্রিপুরা ঘর নিয়ে গির্জা তৈরি করার কোনো প্রয়োজন নেই। ঐখানে কোন গির্জা নেই আছে শুধু সন্ত্রাসী’ (ডিসি নিউজ, ৩ মার্চ, ২০২১)। বাংলাদেশ খ্রীষ্টান এসোসিয়েশন ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, ‘ছোট-বড় যে গির্জাই হোক গির্জা ভাঙার অধিকার কারো নাই’। বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধা হতে পারতো, তাহলে কেন স্থানীয় প্রশাসন ক্ষমতার দম্ভে এরূপ পেশিশক্তি ব্যবহার করতে উদ্যত হয়েছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিজের হাতে আইনভঙ্গ, শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে অবশ্যই আইনানুযায়ীই শাস্তির বিধান নিশ্চত করতে হবে।
সরকার প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মন্ত্রীপরিষদের মন্ত্রীগণ প্রায়শই ঘোষণা দিচ্ছেন, ‘হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সবার মিলিত রক্তস্রোতের বিনিময়ে বাংলাদেশ অভ্যুদয়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে এক অনন্য উদাহরণ’। আমার বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে কাউকেই অপাংক্তেয় মনে করে না। বঙ্গবন্ধুর দর্শন—ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সোনার বাংলার উন্নয়নে, গঠনে, সংরক্ষণে ও লালন-পালনে তাঁরই সুযোগ্য কন্যা সুদক্ষ হাতে হাল ধরেছেন। সংবিধানে উল্লেখিত ‘জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম’ এখনো অব্যাহত রয়েছে; এই মুক্তি যেমন দারিদ্র্যতা, বৈষম্যতা, ধর্মান্ধতা, কূপুমণ্ডতা, উগ্রবাদিতা থেকে। জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমেই নিশ্চিত হবে, প্রস্তাবনার ‘সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে’।
মিথুশিলাক মুরমু : গবেষক ও কলামিস্ট।





Users Today : 26
Views Today : 27
Total views : 177167
