• প্রচ্ছদ
  • সারাদেশ
  • শিক্ষা
    • পড়াশোনা
    • পরীক্ষা প্রস্তুতি
  • সাহিত্য পাতা
    • গল্প
    • ইতিহাসের পাতা
    • প্রবন্ধ
    • কবিতা ও ছড়া
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
  • অন্যান্য
    • বিশ্ব রাজনীতি
    • মতামত
    • বড়দিনের বিশেষ লেখা
  • স্বাস্থ্য
  • বিনোদন
  • ভ্রমণ
  • ধর্ম-দর্শন
  • ফিচার
No Result
View All Result
বুধবার, মে ৬, ২০২৬
  • প্রচ্ছদ
  • সারাদেশ
  • শিক্ষা
    • পড়াশোনা
    • পরীক্ষা প্রস্তুতি
  • সাহিত্য পাতা
    • গল্প
    • ইতিহাসের পাতা
    • প্রবন্ধ
    • কবিতা ও ছড়া
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
  • অন্যান্য
    • বিশ্ব রাজনীতি
    • মতামত
    • বড়দিনের বিশেষ লেখা
  • স্বাস্থ্য
  • বিনোদন
  • ভ্রমণ
  • ধর্ম-দর্শন
  • ফিচার
Somoyer Bibortan
No Result
View All Result

পুজোর বিশেষ গল্প ► আশ্রয় • জয়শ্রী গাঙ্গুলী

পুজোর বিশেষ গল্প ► আশ্রয় • জয়শ্রী গাঙ্গুলী

Admin by Admin
অক্টোবর ৪, ২০২২
in গল্প, প্রচ্ছদ
0 0
0
পুজোর বিশেষ গল্প ► আশ্রয় • জয়শ্রী গাঙ্গুলী
0
SHARES
54
VIEWS
Share on FacebookShare on Twitter

RelatedPosts

আজ পবিত্র ইস্টার সানডে

বিশেষ নিবন্ধ ● রক্ত ▌ পাস্টর এএম চৌধুরী

বিশেষ নিবন্ধ ● না চিনি আমার প্রকৃত ঈশ্বর, না চিনি আমার প্রতিবেশী ▌ডা. অলোক মজুমদার

প্রবীণবাবু সকালেই দোকানটা খোলেন। শীতের সকাল, আটটা বাজে তবু যেন কত সকাল। পাকা কামরাঙার মতো কচি রোদ এসে বারান্দাটায় পড়ে। কাপড়ের দোকান, খদ্দেররা তো আসে সেই বেলার দিকে। চাঁপাডালি মোড়ের এই কাপড়ের দোকানটা যেন তাঁর নিজের হয়ে গেছে। প্রায় তিরিশ বছর এ দোকানটার দেখাশোনা করছেন তিনি। মধাব ঘোষের এই দোকানের দায়িত্ব তো তাঁকেই সামলাতে হয়। কর্মচারী অনেক আছে, কিন্তু বেশির ভাগ দেখাশোনা তো তাঁকেই করতে হয়। ঘোষেদের এই দোকান ছাড়া আরো অনেক ব্যাবসা, শেঠপুকুরে বিশাল বাড়ি। প্রবীণবাবু ঐ বাড়িরই একতলার একটা ঘরে থাকার জায়গা পেয়েছেন, খাওয়াটাও ওদের বাড়িতে। বিনিময়ে সারাদিন দোকানের তত্ত্বতালাশ করা। আর এই দীর্ঘ তিরিশটা বছর সেই কাজই করে আসছেন। দোকানটা তাঁর ধ্যানজ্ঞান হয়ে গেছে। ঘোষরা ভালো লোক, সম্মান করে তাকে। কাপড়ের দোকান কত রকমের যে লোক আসে তার ঠিক নেই। সারাদিন কেনাবেচা আর ক্যাশবাক্সের হিসাব সামলাতে তাঁর কেটে যায়। বয়স তো আটষট্টি পেরিয়ে গেছে। আজকাল ফেলে আসা ভিটেমাটির কথা বড্ড মনে পড়ে। দেশ তো ছিল সাতক্ষীরায় কালিন্দী নদীর ধারে। ছবির মতো ছিল সেই গ্রামখানা। এখনও কিছু কিছু কথা মনে পড়ে। দেশ ভাগের পর চলে এলেন কলকাতায়। ম্যাট্রিক দেবার পরই লেগে পড়েছেন কাজে। প্রথমে বেশ কয়েক বছর এক মাড়োয়ারি গদিতে কাজ করতেন। তারপর এই দোকানে কাজে লাগলেন। মা-বাবাও চলে গেলেন এক এক করে। সেসব কতদিন আগের কথা। এখনতো এই দোকানটাই তাঁর ঘরবাড়ি হয়ে গেছে। মাইনে খুব একটা খারাপ দেয় না এরা। যেটুক পান ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রাখেন। কত বছর আর কাজ করতে পারবেন কে জানে। বয়স তো হচ্ছে…

একটু বেলা হলে খদ্দের আসতে শুরু করে। দোকানের অন্য কর্মচারীরা জামাকাপড় দেখায়, শাড়ি দেখায় আর তিনি  ক্যাশবাক্স সামলান।

হারুর দোকান থেকে চা বিস্কুট আসে। কত রকমের যে খদ্দের আসে দোকানে! এক বৃদ্ধ দম্পতি এলো। সত্তরের ওপর বয়স হবে। ভদ্র মহিলা শাড়ি পছন্দ করছেন, এটা দেখান ওটা দেখান করে যাচ্ছেন আর ভদ্রলোক খুশি হয়ে এটা নাও ওটা নাও করে যাচ্ছেন। দেখে খুব ভালো লাগল। নিজের তো আর বিয়ে করা হয়ে ওঠেনি। আর সেভাবে রোজগারইবা করলেন কোথায়। নিজের বলতে কেউ তো আর ছিল না যে দেখে দেবে। এখন বুড়ো বয়েসের জন্যই চিন্তা। চিন্তায় ছেদ পড়ে, বৃদ্ধ দম্পতিটি টাকা পয়সা মিটিয়ে চলে গেল।

মোট আটজন কর্মচারী দোকানে। ফর্সা তাকিয়ায় হেলান দিয়ে ক্যাশবাক্স সামনে নিয়ে বসে থাকেন তিনি। আজ আবার বড়বাজার থেকে নতুন কাপড়ের পেটি আসার কথা। ক্যাশ মেলাতে হবে। শীতের এই সময়টায় উলের গরম জামাকাপড়ের চাহিদা থাকে খুব। উলের জিনিসও কিছু রাখা হয়, চাদর, সোয়েটার, মাফলার। এক অল্পবয়সী দম্পতি এলো, ফুটফুটে বাচ্চাটা ওদের। বাচ্চাটার টুপি, সোয়েটার কিনল ওরা। বাচ্চাটা গোল গোল চোখ করে দেখছে। হাতে দুটো লজেন্স দিতেই দৌড়। কত রকমের লোক যে আনে, কেউ কেউ আাবার দাম কমানো নিয়ে তুমুল ঝগড়া বাধিয়ে দেয়। প্রবীণ বাবু আর পেরে ওঠেন না তখন। তারক, হরেন ওরাই এসে সামলায়।

এই এক জায়গায় বসে বসে দিব্যি কেটে যায় সারাদিন। ভ্যান, রিক্সা, অটো এক এক করে যেতে থাকে সামনের রাস্তাটা দিয়ে। দুপুরে ঘোষেদের বাড়ি থেকে খাবার আসে। ভাত, ডাল, একটা তরকারি আর এক পিস মাছ। ক্যাশবাক্স ছেড়ে তো আর নড়া যায় না। অন্যান্যরা এক এক করে খেয়ে আসে। দুপুরের দিকে খদ্দেরের ভিড় একটু কম খাকে। তখন একটু সময় পান কাজটায় চোখ বোলাতে। ঝিমুনি আসে শীতের দুপুরে। হারু, গোপাল, তারক ওরা আড্ডা মারে রেডিও চালিয়ে। বিধু বাবু মাঝে মাঝে বলে ওঠেন… কত যে পরিবর্তন দেখলাম এ জায়গাটার। আগে তো, এই ঘোষেদের দোকানটা ছাড়া সেরকম বড়ো দোকান ছিলই না। আর এখন দেখুন কত দোকান গজিয়েছে আশেপাশে, আগাছার মতো। বিধুবাবুর মেয়ে বাইশ বছরেরটি হলো, পাত্রের খোঁজে রয়েছেন তারই গল্প করেন রোজ। দেখতেও সেরকম নয়, টাকা-পয়সার জোরও তো সেরকম নেই—এই তো দোকানের কাজ করে যেটুকু আয়। কর্তা গিন্নির ভবিষ্যৎই বা কি। মনের কথা, দুঃচিন্তার কথা সব খুলে বলেন প্রবীণ বাবুর কাছে। আবার শোনা যাচ্ছে নাকি, উল্টোদিকের জমিটায় প্রমোটারি হবে। তখন এই দোকানের কেনাবেচাই বা কতটা হবে কে জানে! চিন্তাটা মাথায় ঘুরপাক থেতে থাকে। রাতে ভালো ঘুম আসে না। এই তো সেদিন ঘোষ মশাই কথায় কথায় জানান দিলেন—মুখুজ্জেমশাই, চাকরি করলেও তো অবসর বলে একটা জিনিস আছে, আর আপনারও তো বয়েস হয়েছে— বাকিটুকু বুঝতে আর অসুবিধে হয়নি। বড়ো চিন্তা হয় কোথায় আর যাবেন এই বয়সে, নিজের বলতে, ব্যারাকপুরে এক দূরসম্পর্কের ভাগ্নে থাকে। তার নিজেরও তো সংসার আছে। আর এতদিন বাদে সে কি আর চিনতে পারবে। ভাবনায় চিন্তায় ঘুম আর আসে না।

যা ভেবেছিলেন তাই হলো, আজ সকালেই মাধব বাবু কথাটা পাড়লেন। সাতদিন সময় লাগলো ক্যাশের টাকাপয়সা, দোকানের জিনিসের হিসেব বুঝিয়ে দিতে। নিজের যেটুকু সম্বল ছিল, কয়েকটা ফর্সা ধুতি, সাদা পাঞ্জাবি কটা, একটা টিনের ছোটো তোরঙ্গ আর সঞ্চিত কিছু টাকা এই নিয়েই বেরিয়ে পড়েন এতদিনের আশ্রয় থেকে। যাবার দিনে দোকানের সব কর্মচারীরা—বিভুবাবু, হারু, তারক, পল্টু, গোপাল সকলে মিলে ফুলের মালা মিষ্টি দিয়ে বিদায় জানায় তাঁকে। চোখে জল আসে, এতদিনে এরাই তো সব আপনার হয়ে গেছিল।

এরপর অকূল সাগরে পড়া। কোথায় যে যাবেন। ছোট্ট বাক্সটা নিয়ে মেন লাইনের ট্রেনে উঠে পড়েন। ব্যারাকপুরে কুঞ্জর বাড়ি যাওয়া ঠিক করলেন। চোখের সামনে ভাসছে মাধববাবুর নাতি দুটোর মুখ। প্রতি রবিবার, প্রবীণ বাবু খেলতেন ওদের সাথে। আর নীলু, বাবলু ও খুব ভালোবাসতো এই ফর্সা দাদুটাকে। আসার সময় দুজনের সে কি কান্না।—দাদু তুমি আর আসবে না!

অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন, প্রবীণ বাবু, ট্রেনটা গতি নিয়েছে।

ব্যারাকপুর স্টেশনে নেমে প্রবীণবাবু একখানা রিক্সা নেন। কত বছর আগে এসেছেন, রাস্তাঘাট চেনার কথা নয়। ঠিকানা দেখে খুঁজে খুঁজে বার করলেন কুঞ্জর বাড়ি। বেশ বড়ো দোতলা বাড়ি। পৈতৃক বাড়িটাকেই বেশ সুন্দর করে সাজিয়েছে কুঞ্জ। দরজার কাছে হাঁকডাক করতে একটি অল্পবয়সী বৌ এসে দরজা খুলে দিল।

—কাকে চাইছেন,কাকু?

—কুঞ্জ আছে, এটা কুঞ্জর বাড়ি তো?

—হ্যাঁ, এদিকে আসুন।

 দোতলার একটা ছোটো ঘরে বৌটি নিয়ে গেল, প্রবীণ বাবুকে।

বছর পঞ্চান্নর এক প্রৌঢ় বসে আছে খাটে, কি একটা বই পড়ছে।

—কুঞ্জকে দেখে তো চেনাই যায় না, চেহারার কি পরিবর্তন!

প্রবীণবাবু বলে ওঠেন কেমন আছো বাবা, কুঞ্জ। কত দিন দেখিনি তোমাদের। তাই ভাবলাম একটু…

কুঞ্জ অবাক হয়, —মামাবাবু আপনি! তা আমাকে একটু খবর দিলেই তো হত, স্টেশন থেকে নিয়ে আসতে পারতাম। বসুন বসুন।

পায়ের ধুলো নেয় কুঞ্জ।

একই রকম রয়ে গেছে, কথাবার্তায় আন্তরিক টান। পুরো মাধুদিদির মতো স্বভাবখানা। তিনি তো কবেই চলে গেছেন স্বগ্গে।

খাটের পাশে একটা চেয়ারে বসে পড়েন তিনি। এবার আসল কথাটা শুরু করেন। ততক্ষণে বৌটি এসে চা, মিষ্টি দিয়ে গেছে প্লেটে করে। খেয়ে নেন। খিদেও পেয়েছে খুব, সেই সকালে ঘোষেদের বাড়ি থেকে চা বিস্কুট খেয়ে বেরিয়েছেন, মাঝে শিয়ালদা স্টেশনে দুকাপ চা খেয়েছেন শুধু।

—তা মামাবাবু, আপনি তো বারাসাতের ওই দোকানটায় ভালোই কাজ করলেন, কুঞ্জ বলে।

—হ্যাঁ বাবা, বয়সও হয়েছে, চোখেও এখন কম দেখি তাই ওরা বললে মুখার্জী বাবু এবার আপনি কিছুদিন বিশ্রাম নিন। অল্প কিছু টাকাপয়সা দিয়ে বিদায় জানালো। তাই ভাবলাম তুমি তো কাছাকাছি আছো, আর কটা দিনইবা, বয়স তো সত্তর ছুঁই ছুঁই।

কুঞ্জ এতক্ষণে ব্যাপারটা বুঝতে পারে।

বলে ওঠে, হ্যাঁ মামাবাবু থাকুন না, আমার বাড়িটা তো বড়োই আর দুই ছেলেই স্বাবলম্বী। বৌমারা, নাতি-নাতনী সবার মাঝে থাকতে আপনার কোনো অসুবিধা হবে না।

 বেশ বড়ো বাড়ি করেছে কুঞ্জ। ব্যবসাটাও ভালো দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু একই রকম রয়ে গেছে। পরিবর্তন হয়নি একটুও। শুধু বৌটা অকালে চলে গেছে। সবই কপাল।

যাক তবু বুড়ো বয়সে একটা আশ্রয় তো পাওয়া গেল। কুঞ্জ নিজে এসে একতলার একটা ছোটো ঘর দেখিয়ে দিয়ে গেল। ঘরের সামনে সিমেন্ট বাঁধানো উঠোন, কুয়োতলা আর ওপাশে ছোটো একটা বাগান। পেয়ারা, আম আর কিছু ফুলের গাছ রয়েছে। একপাশে তুলসীমঞ্চ। বেশ ভালো লাগলো দেখে। কুঞ্জ সবকিছু দেখিয়ে দিয়ে বলে গেল, মামাবাবু, যখন যা লাগবে আমাকে একটু ডাক দেবেন। ঘরটায় ঢুকে ছোটো একটা টেবিল, চেয়ার আর ছোটো একটা খাট রয়েছে। সেই বৌটি এসে একটি পরিষ্কার চাদর পেতে এক জাগ জল রেখে গেল।

প্রণাম করে বলল, দাদা বাবু যখন যা লাগবে আমায় বলবেন একটু। অবাক লাগলো এদের আন্তরিকতায়। দিদি, জামাই বাবু তো কবেই চলে গেছেন। কুঞ্জকেও দেখেছেন সেই ছোকরা বয়সে। ভরভরন্ত সংসার ওর। বুড়ো বয়সে এমনভাবে এই আশ্রয়টুকু পেয়ে যাবেন ভাবতে পারেননি প্রবীণবাবু। টেবিলের ওপর ব্যাগটা রেখে, হাত পা ধুয়ে একটা পরিষ্কার লুঙ্গি পরে খাটে এসে বসেন। বড়ো মনে পড়ছে ঘোষেদের ছোট নাতিটার কথা। আসার সময় এমন কাঁদছিল।

কী হবে, মনে করে আর দুঃখকে বাড়িয়ে। ঝোলার ভেতর থেকে ছোট্ট একটি শিবলিঙ্গ আর গোপালের মূর্তি বার করেন। টেবিলের ওপর রাখেন। স্নান করে ঠাকুরকে একটু জল আর ধূপ দেয়া এ তার নিত্য দিনের কাজ। ঘরের কোণার তাকটায় একটা কাগজ পেতে ঠাকুরকে বসান। এগারোটা বাজে, ভাত খেতে দেরি আছে। খাটে শুয়ে পড়েন একটু। নতুন জায়গা, নতুন লোকজন অস্বস্তি তো একটু হচ্ছেই।

 চোখটা কখন লেগে গেছিল, একটি বাচ্চা মেয়ে ডাকছে, ও দাদু খাবে চলো। লম্বা ডাইনিং হল, কুঞ্জর ছেলেরা, নাতি নাতনীরা সব সারসার দিয়ে খেতে বসেছে। বাচ্চাগুলো হৈচৈ করছে।

 ছেলেরা জিজ্ঞাসা করল, দাদাবাবু আপনার কোনো অসুবিধা হচ্ছেনা তো। যা দরকার হবে বলবেন। প্রবীণবাবু মাথা নাড়েন। চুপচাপ খেতে থাকেন। কী আতিথেয়তা এদের আর খাবারের এক প্রাচুর্য! সুক্তো, ভাজা, মাছ, চাটনি থেকে শুরু করে পায়েস, আম খাওয়াটা অনেক বেশি হয়ে গেল। হাত মুখ ধুয়ে ঘরে এসে শুয়ে পড়েন একটু। বিকেলে রাস্তার দিকে হাঁটতে বেরোন। এখানে কাছেই একটা ছোট্ট পার্ক আছে। তারই কোনায় একটা বেঞ্চে চুপ করে বসে থাকেন। ছোটো ছোটো বাচ্চাগুলো বেশ খেলা করছে, অনেক বয়স্ক মানুষ নাতি, নাতনি কে নিয়ে দোলনায় চড়াচ্ছে, স্লিপে চড়াচ্ছে। বেশ ভালো লাগছে দেখতে। সন্ধের একটু পরে কুঞ্জ ঘরে এল। অনেক পুরনো দিনের গল্প করল, বেশ ভালো কাটলো সময়টা।

 দেখতে দেখতে মাসখানেক কেটে গেছে কুঞ্জর বাড়িতে থাকা। ঐ ছোট পার্কটায় অনেক বুড়ো মানুষের সাথে আলাপ হয়েছে। সকলেই তাঁদের বাড়ির সংসারের, পরিজনদের গল্প করেন। চুপ করে শোনেন প্রবীণবাবু। তবে ওরা খুব আন্তরিক। বেশ ভালোই কাটে বিকেলটা। মাঝে মাঝে ছোট নাতনিটার সাথে আসে। প্রবীণবাবু একটু মোটাও হয়ে পড়েছেন। বয়স্কদের এই আড্ডায় সময়টা ভালোই কেটে যায়। সন্ধ্যের মুখে মুখে ঘরে ফেরেন। রাতে কাজের মেয়েটি রুটি, তরকারি দিয়ে যায় ঘরে। সাথে একটা মিষ্টি থাকে।

মাসখানেক কেটে গেল, কিন্তু একটু যেন হাঁপিয়ে উঠেছেন এখানে। একই রুটিন। সংকোচও হয়। কেউ বিরক্ত হচ্ছে না তো! কুঞ্জও অনেকদিন এই ঘরে আসেনি। কাল পার্ক এর কয়েকজন বন্ধুতো হাসতে হাসতে বলেই দিল, আপনার আর কি মশাই পিছুটান বলতে তো আর কিছু নেই। ম্লান হাসেন প্রবীণ বাবু।

পুজোটা কেটে গেছে, হেমন্ত এখন। সামনেই শীত আসছে। শান্ত নীল আকাশে সাদা মেঘগুলো ভেসে বেড়ায়। মাঝে মাঝে ছোটো নাতিটা এসে কোলের কাছে বকবক করে। আজকাল কিরকম ক্লান্ত লাগে। ভরভরন্ত সংসার আর তার মাঝে নিজেকে ওই ভেসে চলা মেঘগুলোর মতোই উদ্দেশ্যবিহীন মনে হয়। বাগানের কোনায় একটা চেয়ার পেতে বসে থাকেন। মালিটা পেয়ারা পাড়ছিল। ব্যাগ থেকে দুটো পেয়ারা বার করে বলে, ও দাদু পেয়ারা খাবেন নাকি, দাঁত আছে আপনার?

  বেলা পড়ে আসে। হেমন্তের নরম রোদ গাছগুলোর আগায় এসে পড়েছে। ঠান্ডাটা পড়ছে একটু একটু করে। চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েন। চা খাওয়া হয়নি। ছোট বৌমা হয়তো চা নিয়ে ফিরে যাবে। বড়ো ভালো মেয়েটি। দাদা বাবু খাচ্ছেন কিনা ঠিক খবর রাখে। সংসারের সব কাজে সেই অগ্রণী।

বছর খানেক কেটে গেছে কুঞ্জর বাড়িতে। কিন্তু আর ভালো লাগছে না। দমটা যেন আটকে আসে, এই চার দেয়ালের মধ্যে। আজকাল, ছেলেবেলার কথা বড্ড মনে পড়ে, সাতক্ষীরার সেই ছোট্টো গ্রামটার কথা। ভিটেমাটির সে গন্ধ হাতছানি দিয়ে ডাকে। এ জীবনে একবারটি যদি সেই মাটিতে গিয়ে দাঁড়াতে পারতেন। সেদিন কুঞ্জকে কথাটা বলেই ফেললেন। আকাশ থেকে পড়ে কুঞ্জ, —বলেন কি মামাবাবু, এই বয়সে আপনি সেখানে যাবেন কি করে, আর সে ভিটেমাটি কি আর আছে? আপনি থাকবেন কোথায়?

কুঞ্জ এককথায় উড়িয়ে দেয়, কিন্তু মনের মধ্যে যে স্বপ্নটা ঢুকে গেছে তাকে লালন করতে থাকেন প্রবীণবাবু।

অবশেষে অদম্য ইচ্ছা আর লালিত স্বপ্নের অমোঘ টানে, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পাসপোর্ট ভিসা যোগাড় করলেন প্রবীণবাবু। কুঞ্জও অবশ্য অনেকখানি সাহায্য করেছে। স্বপ্নের সেই ছোটো গ্রামখানা যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

শরতের এক মেঘবিহীন ঝকঝকে সকালে চড়ে বসলেন বাংলাদেশগামী বাসে। শহরটা ছাড়ানোর পরই বাসটা গতি নিল, আর মনটা যেন মুক্তির আনন্দে ভরে উঠল। দুপুরের দিকে পৌঁছে গেলেন সাতক্ষীরায়। মাঝে অবশ্য বর্ডারে বেশ কিছুক্ষণ সময় গেল। কালিন্দী নদীর ধারের সেই ছোট্ট হরিণটুলি গ্রামটা থেকে চলে গেছেন কলকাতায় সে কতদিন আগের কথা। তবু কত কী যে মনে পড়ে, গ্রামের সেই ছোট্ট নদীটার বুকে সাঁতার কাটা, বর্ষায় গামছা পেতে চুনোমাছ ধরা, আর কালবোশেখের ঝড়ে আব্বাসদের বাগানে আম কুড়োনো সব যেন ছবির মত মনে পড়ে। আর মনে পড়ে সেলিমদের বাড়ির সামনে এক হাটু কাদায় ফুটবল খেলা। ওরা এখন কেমন আছে কে জানে! আর এতদিন বাদে ভিটেতেই বা কে আছে কে জানে! এক ধরনের অনিশ্চয়তা আর ভয় মনের মধ্যে ঢুকে যায় প্রবীণবাবুর, কিন্তু এই কটা মাস যেন দম আটকে আসছিল। সংসারে কোনো দায় কর্তব্য নেই, শুধু চারবেলা খাওয়া আর বিকেলে পার্কে যাওয়া—ভালো লাগছিল না একেবারেই।

তিনি চলে আসাতে, সকলেই খুব দুঃখ পেয়েছে। কুঞ্জ কিছুটা বুঝেছে স্বাধীনচেতা মামার কষ্টটা, তাই বিশেষ আপত্তি করেনি।

 বেলা দেড়টা বাজতে চলল। বাসটা এখন কালিন্দী নদীর ধার দিয়ে যাচ্ছে। চারিদিকে জলে আধডোবা কচি ধানক্ষেত। গ্রামের অনেক লোক সওদা করে ফিরছে। কন্ডাক্টর চেঁচাচ্ছে হরিণটুলি, হরিণটুলি। প্রবীণবাবু এগিয়ে যান গেটের দিকে। বাস থেকে নেমে তাজা হাওয়ায় শ্বাস নেন একটু। কিন্তু গ্রামের কিছুই তো চিনতে পারেন না। কয়েকটি ছেলেপুলে খেলা করছিল, ডেকে জিজ্ঞাসা করেন, মুখুজ্জেদের বাড়িটা কোন দিকে। ওরা বুঝতে পারে না। শেষে আব্বাসের নাম বলতে দেখিয়ে দেয়। সামনের জীর্ণ মন্দিরটা  দেখে, প্রবীণবাবু চিনতে পারেন। আর পোড়ো দরদালানটাও তো রয়ে গেছে। পাশেই খড়ে ছাওয়া কাঁচা বাড়ি। প্রাণভরে শ্বাস নেন একটু, এই তো তার ভিটেমাটি।

মাটির দাওয়াটার সামনে গিয়ে ডাকাডাকি করতে এক মধ্যবয়সী মহিলা বেরিয়ে এল ঘরের ভেতর থেকে—আরে এ আব্বাসের সেই ছোটো বোনটা না! রাজিয়া অবাক হয়ে বলে ওঠে— আপনি বিলুদা না! আসেন আসেন। মাটির ঘরে পরিষ্কার তক্তপোশের ওপর বসতে দেয়, অবাক হয়ে যায় এতদিন বাদে ভাইজান এর বন্ধুকে দেখে। গুড়বাতাসা আর জল দেয় খেতে। ততক্ষণে আব্বাস ফিরে এসেছে ক্ষেতের কাজ সেরে। ছেলেবেলার খেলার সাথীকে এতদিন বাদে দেখে অবাক হয়ে যায় সে। জড়িয়ে ধরে বন্ধুকে। এই বাড়ির উঠোনেই কত খেলাধুলা করে কাটিয়েছেন এদের সাথে। এতদিন বাদে দুজনে প্রাণখোলা গল্প করতে থাকেন। আব্বাস বলে ওঠে, বিলু কি মাছ খাবা কও। দরদালানের কোঠাবাড়িটা এখনও অক্ষত রয়ে গেছে, সেখানেই থাকার ব্যবস্থা হয়।

স্নান সেরে আসেন খিড়কির পুকুরটায়। আব্বাসের সাথে মাটির দাওয়ায় বড়ো তৃপ্তি করে চুনোমাছের ঝাল দিয়ে ভাত খান। ভরভরন্ত সংসার, চারটি ছেলে-মেয়ে ওর। রাজিয়ার ছেলেপিলে হয়নি। এ বাড়িতেই আশ্রয় তার। এ সংসারের কর্ত্রী সে। বড়ো ভালো লাগলো এখানে এসে। আজ যেন আব্বাস, রাজিয়াদেরই একান্ত আপনজন মনে হয়। সম্বিত ফেরে আব্বাসের ডাকে, বিলু বুড়াকালডা বন্ধুর লগে থাইক্যা যাইতে পারস না? এখন বিশ্রাম কর কাল ভোরে তরে শাপলা বিলে লইয়া যামু। মনে পড়ে তর শাপলা বিলটার কথা?

খাওয়া দাওয়া হয়ে গেলে, পরম নিশ্চিন্তে ঘুম আসে প্রবীণ বাবুর। ঘুম নাকি একান্ত নির্ভরতা আর ভালোবাসার টান! দাওয়ার পাশের মাটির পাঁচিলের গায়ে শরতের বাঁকা রোদ হেলে পড়ে। একটা শ্যামাপাখি লেজ ঝুলিয়ে দোল খায়।

 চোখ বুজে এসেছিল। আব্বাস সন্ধ্যার মুখে মুখে ক্ষেত থেকে ঘরে ফেরে। নারকেল গাছের ফাঁক দিয়ে ত্রয়োদশী চাঁদের আলো তেরছাভাবে এসে পড়েছে উঠোনটায়। দুই বন্ধু ছেলেবেলার কত গল্প করে। মাটির দাওয়াটায় আব্বাসের ছেলেপুলেরা খেতে বসে হৈচৈ করচে। আব্বাস বলে, তাড়াতাড়ি খাইয়া, শুইয়া পড় বিলু, কাল ভোরে উঠবা। শাপলা বিলে যামু। ঠান্ডা হাওয়ায় দুচোখ বুজে আসে প্রবীণবাবুর। দর দালানটায় পরিষ্কার তক্তপোশে শোয়ার ব্যবস্থা।

খুব ভোরে দুই বন্ধু বেরিয়ে পরে শাপলা বিলে। সবে আলো ফুটছে। পাখির কিচিরমিচির শব্দে কানপাতা দায়। এই সেই স্বপ্নের শাপলা বিল। ঘাটের কাছে ডিঙিনৌকোটা বাঁধা ছিল। দুই বন্ধু লগি ঠেলে ঠেলে এগোতে থাকে। স্বচ্ছ জলের ওপর লাল শালুকগুলো ফুটে আছে। চারিদিকে গোল গোল পাতা। অপূর্ব লাগছে, আকাশটা লাল হচ্ছে, আস্তে আস্তে। দুই বন্ধু চুপ করে দেখতে থাকে চারদিক। মনে পড়ে দুই বন্ধু ছেলেবেলায় লুকিয়ে চলে আসতেন শাপলা বিলে। এটুকুর জন্যেই যেন এতোদিন বেঁচে ছিলেন, ভাবেন প্রবীণ বাবু।

হঠাৎ আব্বাস বলে ওঠে—ঐ দ্যাখ বিলু, পানকৌড়ির ঝাঁক। মাঝে মাঝে ডুব দিচ্ছে। জলের ধার ঘেঁষে পানিফল রয়েছে কতো। বিলের এপার ওপার দেখা যায় না। আস্তে আস্তে রোদের তেজটা বাড়ছে। নৌকোর মুখ ঘোরায় আব্বাস। ক্ষেতের কাজ আছে ওর। কী আন্তরিক টান ওদের, প্রবীণ বাবু ভাবেন। দুপুরে স্নান সেরে খেতে বসেন, পুঁইশাক চচ্চড়ি আর দেশি হাঁসের ডিমের ঝোল দিয়ে বড়ো যত্ন করে খাওয়ায় রাজিয়া। তৃপ্তি করে খান। কতো আপনজন মনে হয় আব্বাসদের।

অনেক ভোরে উঠেছেন, দাওয়ায় পাশে খাটিয়ায় শুয়ে পড়েন। দুচোখ শান্তিতে বুঁজে আসে প্রবীণ বাবুর—ঘুম ঘুম, ভিটে মাটির স্নিগ্ধ ছায়ায় পরম নিশ্চিন্তে, নির্ভরতার ঘুম দুচোখ বেয়ে নেমে আসে।

[গল্পটি সাপ্তাহিক সময়ের বিবর্তনের বর্ষ ৬, সংখ্যা ৩০, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ — পুজোর বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত]

Previous Post

‘র‌্যাব সংস্কারের কোনো প্রশ্নই আসে না’— র‌্যাবের নতুন ডিজি

Next Post

বিশেষ লেখা ► শারদীয়া দুর্গা পূজার ইতিহাস • বিকাশ রঞ্জন দাস

Admin

Admin

Next Post
বিশেষ লেখা ► শারদীয়া দুর্গা পূজার ইতিহাস • বিকাশ রঞ্জন দাস

বিশেষ লেখা ► শারদীয়া দুর্গা পূজার ইতিহাস • বিকাশ রঞ্জন দাস

Leave a Reply Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ADVERTISEMENT

সময়ের বিবর্তন

সম্পাদকঃ
আবদুল মাবুদ চৌধুরী

বিভাগীয় সম্পাদকঃ
নায়েম লিটু

ফোনঃ ০২-৯০১১১৫৬ বাসাঃ -০৪, রোডঃ ০৪, ব্লক- এ, সেকশনঃ ০৬, ঢাকা -১২১৬

Our Visitor

0 3 6 1 7 4
Users Today : 20
Views Today : 25
Total views : 177910
Powered By WPS Visitor Counter

  • Setup menu at Appearance » Menus and assign menu to Footer Navigation

Developer Lighthouse.

No Result
View All Result
  • প্রচ্ছদ
  • সারাদেশ
  • শিক্ষা
    • পড়াশোনা
    • পরীক্ষা প্রস্তুতি
  • সাহিত্য পাতা
    • গল্প
    • ইতিহাসের পাতা
    • প্রবন্ধ
    • কবিতা ও ছড়া
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
  • অন্যান্য
    • বিশ্ব রাজনীতি
    • মতামত
    • বড়দিনের বিশেষ লেখা

Developer Lighthouse.

Login to your account below

Forgotten Password?

Fill the forms bellow to register

All fields are required. Log In

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In