সংযুক্ত আরব আমিরাত মনে হচ্ছে ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু উভয়েরই হাতে খেলছে। উভয় নেতা তাদের দেশে কোভিড-১৯ এর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যর্থ হওয়ার পরে তাদের নিজের দেশে রাজনৈতিকভাবে বেঁচে থাকার লড়াই করছেন। কোভিড-১৯ মোকাবেলায় ট্রাম্পের অক্ষমতা আমেরিকার অর্থনীতি এবং বেকারত্ব পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়। ইসরাইলের সাথে ক‚টনৈতিক সম্পর্ক সৃষ্টির বিষয়ে রাজি হয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু উভয়েরই রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে একটি লাইফলাইন দেয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু উভয়ই ‘শতাব্দীর চুক্তির’ অংশ হিসেবে পশ্চিম তীরের ইসরাইলভুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করার কারণে বিব্রত অবস্থা থেকে তাদের বাঁচানোর চেষ্টাও এর মধ্যে থাকতে পারে। সম্ভবত সংযুক্ত আরব আমিরাতকে এই অঞ্চলে আরো বৃহত্তর ভ‚মিকার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। এটি আরব লীগ এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা কাউন্সিল (জিসিসি) উভয়েরই ভ‚মিকাকে ছাড়িয়ে যাবে। আর এটি যে ইসরাইলের জন্য সম্পূরক ভ‚মিকা হবে সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। এই মাসের শুরুর দিকে, দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক শত্রু ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবসহ বেশ কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় এবং আঞ্চলিক বিষয়ে বিরল আলোচনা করেছেন। ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তিনি ইরানের সাথে একটি চুক্তি করতে প্রস্তুত এবং সম্ভবত ইরান ও আমেরিকার মধ্যে একটি চুক্তি প্রত্যক্ষ করবে বিশ্ব। আশ্চর্যজনকভাবে, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, বাহরাইন ও মিসর মে ২০১৬ সালে কাতার অবরোধ করেছিল কাতারের ইরানের সাথে ক‚টনৈতিক সম্পর্ক হ্রাস করা, কাতার থেকে ইরানের সামরিক প্রতিনিধিদের বহিষ্কার করা এবং অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সীমাবদ্ধ করার দাবিতে। শেষ অবধি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের পারমাণবিক শক্তি ক্লাবে প্রবেশের জন্য প্রস্তুত করার বিষয়টি এবং ইসরাইলের সাথে সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ হতে পারে খেলার মাঠের প্রস্তুতি। ২০২০ সালের ১৩ আগস্ট ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক সংযুক্ত আরব আমিরাত-ইসরাইল ঐতিহাসিক চুক্তি এটিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে। ধনী উপসাগরীয় আরব দেশ কোনো শঙ্কা ছাড়াই এই শর্তটি (ইসরাইলের পাশাপাশি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা) বাদ দিয়ে দিয়েছে এবং ইহুদি রাষ্ট্রের সাথে দীর্ঘকালীন গোপনীয় সম্পর্কের আবরণ তুলে নিয়ে আনুষ্ঠানিকতা প্রদান করেছে। আরব বিশ্বের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্কের যেকোনো আলোচনা হতে পারে, তার আগে নেতানিয়াহুর পূর্বসূরিরা এবং পশ্চিমা শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতাকারীরা ফিলিস্তিনিদের সাথে শান্তির জন্য ইসরাইলকে কতটা মূল্য দিতে হবে তা নিয়ে ভাবতে বাধ্য হতেন। হঠাৎ করে, আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদ এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে দেয়া-নেয়াতে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেল। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু পশ্চিম তীরের ইহুদি অঞ্চলগুলোতে ইসরাইলের সার্বভৌমত্ব স¤প্রসারণে তার পরিকল্পনা স্থগিত রাখতে রাজি হন, যদিও তিনি নির্বাচনে জনসাধারণকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা আসলে আইন, মানচিত্র বা কোনো টাইমলাইনের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
তদুপরি, ফিলিস্তিনি ইস্যুটিকে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব এবং মারাত্মক অর্থনৈতিক পরিণতির কারণে পেছনের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছিল ইসরাইল ও আমিরাতের এই সম্পর্কের বিষয় নিয়ে অনেক দিন ধরে বৈশ্বিক গণমাধ্যমে লেখালেখি হচ্ছিল। বলা হচ্ছিল, স্বীকৃত সম্পর্ক না দেখানো হলেও আমিরাত মধ্যপ্রাচ্যে যে ভ‚মিকা পালন করছে তা ইসরাইলি নীতিরই ছায়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় নতুন চুক্তি হওয়ার পর এখন আর দুদেশের সম্পর্কে রাখঢাক থাকল না। এখন থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও এর নেতা জায়েদ আল নাহিয়ান মধ্যপ্রাচ্য তথা পুরো মুসলিম দুনিয়ায় ইরাইলের ছায়া রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ভ‚মিকা পালন করবে। আর দেশটির শাসকদের ক্ষমতার নিশ্চয়তা বিধান করবে ইসরাইল। কেবল যে আমিরাতই এই ভ‚মিকায় আসছে তাই নয়। ট্রাম্প আর নেতানিয়াহুর ইঙ্গিত অনুসারে আরো আরব রাষ্ট্র ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়ে এর সাথে ক‚টনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে যাচ্ছে। আমিরাতের পরে বাহরাইন, ওমান ও সৌদি আরব একই পথে এগোচ্ছে বলে ইসরাইলি মিডিয়াতে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। আরব রাষ্ট্রগুলোর ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়ার এ ঘটনা শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয় গোটা মুসলিম বিশ্বে যে এক ধরনের ‘পেরাডাইম শিফটের’ সূচনা করতে পারে তারই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বিশ্লেষকদের বক্তব্যে। এটিকে ক্যাম্পডেভিড চুক্তির পর ইসরাইলের জন্য সবচেয়ে বড়ো সফলতা হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। আর ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র ও অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো আঘাত হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে এটিকে।
ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকার বিসর্জন সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে ইসরাইলের চুক্তির সবচেয়ে বড়ো দিকটি হলোÑইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে শর্ত ছিল সেটিকে বিসর্জন দেয়া। এক দিকে মিসর, জর্দান ও সিরিয়া এবং অন্য দিকে ইসরাইলের মধ্যে ১৯৬৭-এর ইসরাইল-আরব যুদ্ধের পরে আরব দেশগুলো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ২৪২ প্রস্তাবকে বাস্তবায়নে চাপ দেয়। নিরাপত্তা পরিষদের এই প্রস্তাবকে (ইসরাইল ও ফিলিস্তিন দুটি রাষ্ট্র পাশাপাশি থাকা) বছরের পর বছর ধরে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল আরব এবং ইসরাইল মধ্যে আলোচনার। এই প্রস্তাবের মূল উপাদান হলো ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের সময় দখল করা সব অঞ্চল ইসরাইল ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ফিরিয়ে দেবে। ইসরাইল এই অঞ্চলগুলোকে সমর্পণ না করা পর্যন্ত আরব লীগ একমত হয়েছিল যে ইসরাইল রাষ্ট্রের সাথে শান্তি প্রতিষ্ঠা, স্বীকৃতি দান বা সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ নিয়ে কোনো আলোচনা হবে না। তবে মিসর ও জর্দান ১৯৭৭ এবং ১৯৯৪ সালে ইসরাইলের সাথে আলোচনা এবং পরে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করে দেশটির সাথে আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। ২০২০ সালের ১৩ আগস্ট ইসরাইলের সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাত তৃতীয় আরব দেশ হিসেবে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে এবং সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় সম্মত হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে এই ঘোষণা দেয়ার সময় অনেকে অবাক হন। ট্রাম্প নিশ্চিত করেছেন যে, ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে চুক্তির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর ও ধুমধামের ঘটনা ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত হবে।
ট্রাম্পের মতে, ইসরাইল নিজ মানচিত্রে পশ্চিম তীরের সংযোজন স্থগিত করতে সম্মত হয়েছে। আরব লীগের সদস্য রাষ্ট্রের এই সর্বশেষ পদক্ষেপ ফিলিস্তিনিদের লড়াইয়ে আরেকটি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করল এবং আরব লীগকে এটি নিঃসন্দেহে আরো দুর্বল করে দেবে ফিলিস্তিনিদের সাথে সমস্যার ন্যায়সঙ্গত সমাধানে ইসরাইলকে চাপ দেয়া এখন আরো কঠিন হবে। আরব লিগের অন্যতম উচ্চাকাক্সক্ষা ছিল আরব দেশগুলোর মধ্যে একটি সুসঙ্গত আঞ্চলিক পররাষ্ট্রনীতি প্রতিষ্ঠা করা। এই প্ল্যাটফর্মে ঐকমত্য হয় কম। এখন বিভাজনটা আরো বেড়ে গেল। অ-আরব মুসলিম দেশগুলো যখন ভেতরে ও বাইরে শক্তি সংগ্রহ করছে, লড়াই করছে, তাদের নিজস্ব শক্তি সক্রিয় করছে তখন আরব মুসলিম দেশগুলো বাইরে থেকে এ শক্তির ওপর আক্রমণ করছে, বিদেশি শক্তির সাথে মিলে তারা নিজেদের মধ্যে সংঘাত জোরালো করে তুলছে। আরব দুর্বলতা এর অন্তর্নিহিত কারণ নয়, বরং তাদের প্রশাসন পশ্চিমাদের সাথে যে একতরফা নির্ভরশীল সম্পর্ক তৈরি করে সেটিই এর কারণ। এই সম্পর্ক প্রায় সবসময়ই আরব জনগণ এবং তাদের দেশগুলোর স্বার্থের বিরুদ্ধে ছিল। দুজন ক্রাউন প্রিন্স ও এক স্বৈরশাসকের অক্ষ নির্ভরতার সম্পর্কটি এখন নতুন করে তৈরি করা হচ্ছে এবং এটি আরো ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠছে। তারা প্রথম দিকে ইরানের বিরুদ্ধে আরব সরকারগুলোকে ব্যবহার করেছিল। এই রূপটি তাদের আগ্রহের ভিত্তিতে নয়, বরং ইসরাইলের অগ্রাধিকার এবং মার্কিন পরিকল্পনার ভিত্তিতে ছিল। তারা তিন দশক ধরে এই প্রসঙ্গে লড়াই করে আসছে এবং সর্বদা হেরে গেছে। কারণ তাদের পরাজয়কে অনিবার্য করা হয়েছে।
সুতরাং, আরব-পারস্য সীমানাটি ইরান-ইরাক সীমান্ত থেকে ভ‚-মধ্যসাগর পর্যন্ত টানা হয়েছিল। তারা ইরাক ও সিরিয়াকে হারিয়েছে এবং তারা এখন লেবানন ও ইয়েমেনকে হারাতে চলেছে। কিন্তু এবার প্রায় একই মানসিকতা নিয়ে তুরস্কের বিরুদ্ধে আরব শক্তিকে সক্রিয় করা হচ্ছে। তারা সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, উপসাগরীয় দেশ এবং মিসরের সমন্বয়ে একটি ‘তুরস্ক-বিরোধী ফ্রন্ট’ প্রতিষ্ঠা করেছে। এই মোর্চা আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত সন্ত্রাসবাদী সংগঠন পরিচালনা, অর্থনৈতিক আক্রমণ, হত্যা ও মৃত্যুদÐ কার্যকর করা-ইত্যাদির মাধ্যমে তুরস্ককে প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। তারা তুরস্কের সাথে লিবিয়ায়, পূর্ব ভ‚মধ্যসাগরে, ককেশাসে, পারস্য উপসাগরে, লোহিত সাগরের আশ পাশে এবং মধ্য আফ্রিকায় অঘোষিত যুদ্ধ চালাচ্ছে। এসব করতে গিয়ে তারা ইসরাইল, ফ্রান্স, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ তথা বাস্তবে গ্রিস এবং গ্রিক সাইপ্রিয়ট প্রশাসনের সাথে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে। কথিত ইসলামী গৃহযুদ্ধের যে আয়োজন হচ্ছে তা এই অঞ্চলের দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং মিসর সরকারকে শিয়া-সুন্নি যুদ্ধের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল। তাদের এখন সুন্নিদের মধ্যে গৃহযুদ্ধের জন্য চালিত করা হচ্ছে। আর তুরস্ককে তাদের সামনে প্রাথমিক লক্ষ্য হিসেবে হাজির করা হচ্ছে। এই সরকারগুলো প্রতিটি যুদ্ধে এর আগে পরাজিত হয়েছিল এবং অঞ্চলটি এখন ধ্বংসের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। তারা পরের যুদ্ধেও হয়ত হারতে চলেছে। তবে আরব জনগণের জন্য তাদের রাষ্ট্রকে এদিকে নিয়ে যাওয়া আত্মহত্যার প্রস্তুতি ছাড়া অন্য কিছু নয়। তারা আরব দেশগুলোতে ফাঁদ পেতেছিল। এসব নেতা এবং তাদের শাসন ব্যবস্থা আরব অঞ্চলকে ধ্বংসের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
রায়হান আহমেদ তপাদার : গবেষক-কলামিস্ট।





Users Today : 128
Views Today : 166
Total views : 182014
