বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির কবলে দেশের সব স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গত ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে। সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটি ৩ অক্টোবর পর্যন্ত। স্কুল-কলেজ কবে খুলবে কেউ তা জানে না। কারণ, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ফলে অনিশ্চিত যাত্রাই এখন শিক্ষা-শিক্ষার্থী। শুধুমাত্র কওমি মাদ্রাসা ব্যতিত দেশের সব স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেল আবার। এর ফলে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা, (পিইসি), জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা (জেএসসি), জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট পরীক্ষা (জেডিসি) পরীক্ষাও বাতিল হয়ে গেছে। আগের ঘোষণা অনুযায়ী এই ছুটির মেয়াদ ছিল ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। মহামারি করোনার কারণে গত ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পর শিক্ষা খাতে এত বড়ো সংকট আর আসেনি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন কবে খুলবে, কেউ তা বলতে পারবে না। তবে খোলার বিষয়টি নির্ভর করছে করোনা ভাইরাস কবে নিয়ন্ত্রণ আসবে, তার ওপর। আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষা বিষয়ে এখন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। দীর্ঘদিন স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকার ফলে চলতি বছরে বন্ধ হয়ে গেছে, প্রাথমিকে প্রথম ও দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা, মাধ্যমিকে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা, উচ্চ মাধ্যমিকে প্রথম বর্ষ সাময়িক পরীক্ষা।
তাই বলা যায়, সব মিলিয়ে পড়াশুনা ও পরীক্ষা ছাড়া চলতি শিক্ষা বর্ষ শেষ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এর চেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, শিক্ষার্থীদের একাংশ ঝরে পড়তে পারে। বাল্য বিবাহের হারও বেড়ে যেতে পারে। বাড়তে পারে শিশুশ্রম। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও শহরের সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে ক্লাস করছে, যদিও সিংহভাগ সে সুবিধার বাইরে। মফস্বলের শিক্ষার্থীদের কাছে স্মার্টফোন বা অন্যান্য উপকরণ নেই, যা অনলাইন ক্লাস করতে লাগে। সরকার টেলিভিশনে রেকর্ড করা ক্লাস স¤প্রচার করছে, সেখানে উপস্থিতি ভালো না। তাছাড়া বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকরা ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে নামদামি স্কুল-কলেজগুলি অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে। তবে সব প্রতিষ্ঠানেই বর্তমান পরিস্থিতিতে অনলাইন ক্লাস বাড়াতে হবে। আবার বেসরকারি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনলাইনে ক্লাস করিয়ে পুরো টিউশিন ফি নিচ্ছে। অভিভাবকরা যদিও তা দিতে রাজি না। বিপরীতে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা বেতন না পাওয়া ও চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে আছে। বর্তমান পরিস্থিতি নজিরবিহিন। দেশ স্বাধীনের পর এ পর্যন্ত কোনো পাবলিক পরীক্ষা বাতিল হয়নি। এই পরিস্থিতি চললে এই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের অটো প্রমোশনের বিষয়টি ভাবতে হবে।
বাংলাদেশ শিক্ষা, তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় পোনে তিন কোটি। ইতিমধ্যে এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীও পড়াশোনার ওপর বড়ো ধরনের প্রভাব পড়েছে। সংকটে প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত থাকলেও বেশি প্রাথমিকে ও মাধ্যমিকে। বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে, যদিও উপস্থিতি ভালো নয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা একে তো ছোট, তার ওপর এই দুটি স্তরে বাসায় থেকেও পড়াশোনা ঠিকমতো হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের হার এখনও আশানুরূপ কমেনি। এমন অবস্থায় হুট করে স্কুল-কলেজ খুলে দিলে সংক্রমণের হার আরও বেড়ে যাওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি তৈরি হবে প্রাথমিক বিদ্যালয় নিয়ে। কারণ, এসব বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষ ছোট, এক সঙ্গে অনেক শিশুকে বসে ক্লাস করতে হয়। একটি শিশু আক্রান্ত হলে অন্য শিশুরাও আক্রান্ত হতে পারে। এমন ঝুঁকির মধ্যেও পড়ালেখার ক্ষতির কথা বলে কেউ কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পক্ষে বলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই ক্ষতি আমাদের মেনে নিতে হবে। অনলাইনে যতটুকু সম্ভব, পড়ালেখা চালিয়ে যেতে হবে। মা-বাবাদের সন্তানদের পড়ালেখায় সময় দিতে হবে। ঘরে বা বাসার ছাদে যতটা সম্ভব ব্যায়াম, হাঁটাচলা বা বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে শিশুদের জন্য। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনা ও তাদের সহায়তার জন্য তহবিল থাকতে হবে। সে জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে প্রণোদনা প্যাকেজ দরকার। একই সঙ্গে এর যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে কি না, সে জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সব ক্ষেত্রের ক্ষতি হয়ত পুষিয়ে নেওয়া যাবে, কিন্তু শিক্ষার ক্ষতি পোষাতে না পারলে অন্য ক্ষতি পুষিয়েও লাভ হবে না। বিদ্যালয় বন্ধ রাখার চেয়ে ভালো বিকল্প এই মুহূর্তে মনে হয় নেই। জীবিকার তাগিদে বড়োদের ঘর থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সন্তানকে স্কুলে পাঠানো বিষয়টি মেলানো যাবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার জন্য আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে।
রবিউল ইসলাম : শিক্ষক-কলামিস্ট।





Users Today : 156
Views Today : 199
Total views : 182047
