পরেশ্বর সরকার চাকরি থেকে অবসর নিয়েছে আজ থেকে দু’বছর আগে। অবসরের পর থেকে তার দাতব্য চিকিৎসা আরো বেড়েছে। বিয়ে করেনি, তাই কোনো পিছুটান নেই। এক ভাইপো আছে এখন রংপুর মেডিক্যালে চতুর্থ বর্ষে পড়ছে। ভাইপো রমেশের মা ছেলেবেলায় মারা গেছে, বাবা আর একটি বিয়ে করেছে। তাই রমেশ ছেলেবেলা থেকেই তার বড়ো জেঠা পরেশ্বরের সাথেই থাকে। রমেশ যেমন তার জেঠা অন্ত প্রাণ। ঠিক তেমনি পরেশ্বরও একমাত্র ভাইপোটির জন্যই এখন পর্যন্ত আছে নতুবা অনেক আগেই সংসার ত্যাগ করে চলে যেত। সবকিছু দেখে আমাদের পাঠকের হয়ত মনে হতে পারে এই রমেশের জন্যই তার জেঠা চিরকুমার হয়ে আছেন। এই চিরকুমার থাকার কারণ জানতে হলে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে সেই ১৯৭১ সালে। সেসময় পরেশ্বরের বয়স বারো বছর। তখন সবে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। হঠাৎই একদিন পরেশ্বরের বাবা জানকী এসে বলল, বাড়ির সবাইকে নিয়ে ভারতে যাবে। পরেশ্বরের ছোটো ভাই তখন মাত্র পাঁচ বছর বয়সের ,সাথে তার বড়ো বোন। নাটোরের শ্যামনগর গ্রামে ছিল ওদের বাড়ি। সবাই একসাথে যখন রাস্তায় হাঁটা আরম্ভ করল তখন পরেশ্বর অবাক হয়ে দেখল তাদেরই মতো অনেক পরিবার প্রাণের ভয়ে ছুটে চলেছে। দুদিন পর তারা ভারতে পৌঁছায়। জানকী সরকারের এক বন্ধু মুর্শিদাবাদ থাকত। জানকী তার পরিবার নিয়ে সেখানে থাকা শুরু করেছিল। ইচ্ছা ছিল একটা কাজ পেলে পরিবার নিয়ে অন্যত্র থাকবে। এভাবেই শুরু হয়ে গেল পরেশ্বরের নতুন জীবন। নতুন দেশে গিয়ে পরেশ্বর শুরুতে খুব কান্নাকাটি করত, ঠিকমতো খেতেও চাইত না। হঠাৎ করেই পরেশ্বরের মন বদলাতে শুরু হলো। তার মা অন্তি ভেবেছিল ছেলের হয়ত নতুন বন্ধু হয়েছে তাদের নিয়েই ছেলে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। মুর্শিদাবাদ গিয়েই পরেশ্বরের পরিচয় হয় নিবেদিতার সাথে। নিবেদিতা দত্ত তার বাবার সাথে যুদ্ধের জন্যই উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে গিয়েছিল। নিবেদিতার বাড়ি রাজশাহীর পুঠিয়া। নিবেদিতার পরিবার অনেক বড়ো। তার চার ভাই, নিবেদিতা সবার বড়ো। নিবেদিতা সবে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে। প্রথম যেদিন নিবেদিতার সাথে পরেশ্বরের পরিচয় হয় তখনই পরেশ্বর বুঝতে পারে এর চেয়ে ভালো বন্ধু তার আর একটিও নেই। নিবেদিতাকে সাথে নিয়ে পরেশ্বর প্রতিদিন ঘসেটি বেগমের মতিঝিলে ঘুরতে যেত। সেখানে গিয়ে চলত তাদের খেলা। বেশিরভাগ দিনই অবশ্য পুতুল খেলা চলত। পরেশ্বর সবসময়ই নিবেদিতাকে বলত, বড়ো হলে আমি তোমাকে বিয়ে করব। নিবেদিতা জিজ্ঞাসা করেছিল বিয়ে কী গো পরেশ্বর দাদা? পরেশ্বর মিষ্টি করে হেসেছিল। রাতে নিবেদিতা তার মাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, মা বিয়ে কী বলত? জয়া মেয়ের কথা শুনে হেসেছিল, দেশ স্বাধীন হলে তোর বিয়ে দিব। তখন নিবেদিতা বলেছিল, তবে পরেশ্বর দাদার সাথেই আমার বিয়ে দিও। জয়া বলল, আচ্ছা তোর পরেশ্বর দাদাকে কাল একবার আমাদের এখানে নিয়ে আসবি। পরদিন পরেশ্বরকে সাথে নিয়ে নিবেদিতা বাড়িতে যায়। জয়া পরেশ্বরকে দেখে বলে বাবা এখানে তো আমাদের বাড়িও নাই, ক্যাম্পে থাকি। দেশ স্বাধীন হলে তুমি আমাদের পুঠিয়ার বাড়িতে যাবে। তোমাকে আমি নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াব। এভাবেই বেশ কেটে যাচ্ছিল। একদিন পরেশ্বর নিবেদিতাকে বলেছিল, কাল তুমি মাসিমার শাড়ি নিয়ে আসবে। আমরা শাড়ি দিয়ে খেলব। নিবেদিতা শাড়ি নিয়ে আসার পর পরেশ্বর বলল, এবার শাড়িটা পরো দেখি। নিবেদিতা শাড়ি পরতে জানে না। পরেশ্বর নিবেদিতাকে শাড়িটা পরিয়ে দিল আর বলল,আমার যখন তোমার সাথে বিয়ে হবে তখন আমি এভাবেই তোমাকে শাড়ি পরিয়ে দিব। নিবেদিতা বলেছিল, মা আমাকে বলেছে বিয়ে হলেই আমি তোমার বৌ হয়ে যাব। বলেই নিবেদিতা খিলখিল করে হেসে ওঠে। দেখতে দেখতে ১৬ ডিসেম্বর চলে এলো। দেশ স্বাধীন হয়ে গেল। সবাই যে যার মতো দেশে চলে গেল। দেশে যাওয়ার পর পরেশ্বর আর নিবেদিতার সাথে দেখা করার সুযোগ পায়নি। পরেশ্বরের এমন একটি দিন ছিল না যেদিন সে নিবেদিতার কথা মনে করেনি। পরেশ্বর এসএসসি পাস করে রাজশাহী কলেজে ভর্তি হয়েছে। একদিন সে কলেজ ছুটির পর পুঠিয়া গেল। পুঠিয়া রাজবাড়ির পাশে গিয়েই খোঁজ করেছিল নিবেদিতার কিন্তু কেউ কোনো খোঁজ দিতে পারল না। এক মুহূর্তের মধ্যেই সকল আশা যেন শেষ হয়ে গেল। এরপর পরেশ্বর রাজশাহী মেডিক্যাল থেকে পড়া শেষ করে নাটোর সদর হাসপাতালে যোগদান করে। একদিন হাসপাতালে রোগী দেখছে। একজন মহিলা অপুষ্টিতে ভুগছে। নাম জিজ্ঞাসা করতেই বললো নিবেদিতা সাহা। সঙ্গে সঙ্গে পরেশ্বরের হৃদয়ে যেন দোলা লেগে গেল। পরেশ্বর তাকিয়ে দেখল সেই চোখ, গালের বাম পাশের তিল। এই তো সেই নিবেদিতা কিন্তু মুখটা মলিন হয়ে গেছে। ঘোর কাটতেই পরেশ্বর জিজ্ঞাসা করল, আপনার কী হয়েছে? আপনার সাথে কে এসেছিল? আমার মা এসেছেন সাথে। পরেশ্বর বাইরে গিয়ে দেখল জয়া। পরে খোঁজ নিয়ে জানলো যে মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সেই নিবেদিতার বিয়ে দেয় তার পরিবার। এখন তার চার সন্তান আছে। নিবেদিতা অবশ্য পরেশ্বরকে চিনতে পারেনি। এরপর চিকিৎসার জন্য কয়েকবার নিবেদিতা এসেছে কিন্তু পরেশ্বর তার পরিচয় জানতে দেয়নি। কারণ নিবেদিতার জন্য পরেশ্বরের মন আজও কাঁদে কিন্তু নিবেদিতার মন কোনোদিন পরেশ্বরের জন্য কেঁদেছিল কিনা তা কেউ জানে না।





Users Today : 2
Views Today : 2
Total views : 177964
