তালেবান আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ নিয়ে নতুন সংকটের আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের অনেকেই বলেছেন, বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ এবং জঙ্গি তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে এলেও তারা আবার মাথা চাড়া দিতে পারে। এই উদ্বেগের পেছনে ভিত্তি হিসাবে তাঁরা আফগান যুদ্ধ এবং সিরিয়ায় আইএস-এর পক্ষে যুদ্ধে বাংলাদেশের কিছু লোকের অংশ নেয়ার প্রেক্ষাপটকে তুলে ধরেন।
তালেবানের কাবুল দখলের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ নিয়ে নানা আশঙ্কা বা উদ্বেগ নিয়ে আলোচনা চলছে। এবারের প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে এই শঙ্কা কতটা বাস্তব নির্ভর তা আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, সাংবাদিক, দীর্ঘদিন আফগানিস্তানে জাতিসংঘ মিশনে কর্মরত, ধর্মীয় নেতা, বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতামতের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
আশির দশকে বাংলাদেশের অনেক যুবক যারা আফগানিস্তানে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের অনেকে দেশে ফিরে জঙ্গি তৎপরতায় জড়িয়ে পড়েছিলেন।
আফগানিস্তান থেকেই বাংলাদেশে জেএমবি, হরকাতুল জেহাদ ও অন্যান্য জঙ্গি তৎপরতা এসেছে। পূর্ববর্তী এসব প্রেক্ষাপট থেকেই বিশ্লেষকরা সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন আফগানিস্তানের পট পরিবর্তনে।
আফগানিস্তান থেকেই জঙ্গি তৎপরতা বাংলাদেশে এসেছে
অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন, শিক্ষক ঢাবি।

আফগানিস্তান থেকেই জঙ্গি তৎপরতা বাংলাদেশে এসেছে এবং সেজন্য সেখানে আবার তালেবানের উত্থানে নতুন করে শঙ্কার বিষয় রয়েছে। বাংলাদেশে ইসলাম নিয়ে উগ্রবাদ আগে কখনও ছিল না। আফগান ফেরতরা প্রথমে মুসলিম জাগ্রত বাহিনী গঠন করেছিল। এই জঙ্গিবাদ একেবারে আফগানিস্তান থেকে এসেছে। সেজন্য এখন আবার শঙ্কার বিষয় আসছে।
আফগানিস্তান থেকে আশি এবং নব্বইয়ের দশকে যারা ফেরত এসেছিল, তাদের সঠিক তালিকাও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে নেই। এখন এই আফগান ফেরতদের ব্যাপারে নতুন করে নজর দেয়া উচিত।
আফগানিস্তান থেকে আশির দশকে যারা ফেরত এসেছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম দুজন হলেন আব্দুর রহমান এবং মুফতি আব্দুল হান্নান। তাদের নেতৃত্বে জেএমবি এবং হরকাতুল জিহাদ নামের দু’টি জঙ্গি সংগঠনে ১৪ জন আফগান ফেরত ছিলেন। জঙ্গি তৎপরতার দায়ে ইতিমধ্যেই শীর্ষ দুজন এবং অন্য ১৪ জনের ফাঁসি হয়েছে।
শুধু আফগানিস্তান নয়, কসোভো যুদ্ধ এবং সিরিয়ায় জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের যুদ্ধেও বাংলাদেশের অনেক যুবক অংশ নিয়েছেন। গত কয়েক বছরে সিরিয়া থেকে ফিরে ঢাকায় বিমান বন্দরে বেশ কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। গত জুন মাসেই সিরিয়া থেকে ফেরত আসা একজন আইটি বিশেষজ্ঞকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
আল কায়দার কৌশলের ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের মাথা চাড়া দেবার বিষয়
তাসনীম খলিল, সুইডেন প্রবাসী সাংবাদিক।
আফগানিস্তানের মুজাহেদিনের পরে তালেবানের সাথে বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠনগুলোর যোগাযোগ মূলত আল কায়দা এবং ইসলামিক স্টেটের মাধ্যমে। এখন আল কায়দার কৌশলের ওপরই বাংলাদেশের মাথা চাড়া দেয়া না দেয়ার বিষয় নির্ভর করবে।
তালেবানের সাথে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক হলো আল কায়দার। ভারতীয় উপমহাদেশে আল কায়দার যে শাখা আছে, তার সাথে যোগাযোগ বাংলাদেশের জঙ্গিদের।
২০১৪ সালে আল কায়দার একটা মিডিয়া উইং আস সাহাব নয় মিনিটের একটা ভিডিও প্রকাশ করেছিল। তাতে দেখানো হয়েছিল আফগানিস্তানে একটি ক্যাম্পে তালেবান এবং আল কায়দার সাথে কয়েকজন বাংলাদেশিকে। আল কায়দা এখন আফগানিস্তানের এই নতুন তালেবান ইস্যু কীভাবে ব্যবহার করবে তার ওপর নির্ভর করবে বাংলাদেশে জঙ্গি বা ধর্মীয় উগ্রবাদ মাথা চাড়া দেবে কিনা।
আফিস্তানের ঘটনা প্রচলিত ইসলামপন্থী দলগুলোকেও উজ্জীবিত করতে পারে। তালেবানও দেওবন্দ মাদ্রাসার আলোকে তাদের শিক্ষার কথা বলে। বাংলাদেশেও দেওবন্দ অনুসারিরাই বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসা শিক্ষায় এবং ইসলামপন্থী রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী। এখানে একটা মিল আছে। তালেবান যদি শরীয়া আইন প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে বাংলাদেশে যারা এই আইন কায়েম করতে চায়, তাদের মিল হচ্ছে। তারা এখন এক ধরনের উৎসাহ অবশ্যই পাবে।
দুর্বল হওয়া জঙ্গি নেটওয়ার্ক আবার শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা
জঙ্গি সংগঠন জেএমবি ১৬ বছর আগে দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা হামলা চালিয়েছিল। এরপর সর্বশেষ ভয়াবহ জঙ্গি হামলা ছিল ঢাকার গুলশানে হোলি আটিজান বেকারিতে। হোলি আটিজানের হামলার পর আর বড়ো কোনো জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেনি।
আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অব্যাহত অভিযানে জঙ্গি সংগঠনগুলো দুর্বল হয়েছে বলা হয়। এরপরও এখন আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থানে বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠনগুলো উজ্জীবিত হতে পারে, এমন আলোচনা চলছে।
জঙ্গিরা দুর্বল হয়ে পড়লেও আফগানিস্তানের প্রেক্ষাপটে এদের নিয়ে নতুন করে চিন্তার বিষয় রয়েছে
মোখলেসুর রহমান, সাবেক অতিরিক্ত আইজি, বাংলাদেশ পুলিশ
জঙ্গিরা দুর্বল হয়ে পড়লেও আফগানিস্তানের প্রেক্ষাপটে এদের নিয়ে নতুন করে চিন্তার বিষয় রয়েছে। আনেকেরই ধারণা বা সন্দেহ করছেন যে, আবার হয়তো সেই ধর্মীয় উগ্রবাদ বাংলাদেশে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে আফগানিস্তান থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে।
যারা ছোট ছোট অংশ বিভিন্ন নামে এখানে সন্ত্রাস চালিয়েছে, তাদের কাছে মনে হতে পারে, যেহেতু ওখানে (আফগানিস্তানে) তালেবানের আবার উত্থান হয়েছে। ফলে বিভিন্ন জায়গায় তাদের আদর্শ আবার পুনঃস্থাপিত হবে। শঙ্কার জায়গাগুলো চিহ্নিত করে কর্তৃপক্ষকে সেগুলোতে নজর দিতে হবে।
আফগানিস্তান, কসোভো বা সিরিয়ায় যুদ্ধে বাংলাদেশের কিছু লোক গিয়েছিল, এমন ইতিহাস আছে।
মাত্র কয়েকদিন আগে ঢাকার পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেছিলেন, এবারও আফগানিস্তানে তালেবানের সাথে যোগ দিতে বাংলাদেশ থেকে কিছু লোক সেদেশে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিল।
তবে জঙ্গি তৎপরতা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছে সরকার।
আমাদের দেশের জঙ্গিসংগঠনগুলো ছিল এখানকার হোমগ্রোন
আসাদুজ্জামান খান কামাল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠনের বাইরের কোনো যোগাযোগ নেই এবং এগুলোর সাংগঠনিক শক্তি না থাকায় নতুন কোনো সংকট আমরা দেখছি না। আফগানিস্তানে এখান থেকে গেছে-এমন গুজব উঠেছিল। এটা যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। আর সিরিয়াতে যারা গিয়েছিল, তারা ঠিক বাংলাদেশ থেকে যায়নি। বাংলাদেশে যারা বিভিন্ন দেশের নাগরিক, তারা ঐসব দেশ থেকে অনেকেই সিরিয়া গিয়েছিল। তাদের অনেকে বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করলে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। আমাদের দেশের জঙ্গিসংগঠনগুলো ছিল এখানকার হোমগ্রোন। এগুলো বাইরের দেশের কোনো গোষ্ঠীর মতাদর্শের বা বাইরে থেকে কোনো পরিকল্পনা করা জঙ্গি নয়।
আমাদের স্বাধীনতা বিরোধী যারা ছিল, তারা এসব করে বিভিন্ন সময় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করে। কিন্তু দেশের মানুষ এদের সমর্থন করেনি। দেশের সর্বস্তরের মানুষ এদের বিরোধীতা করেছে।
তালেবানের উত্থানকে আফগানিস্তানের মুক্তিযুদ্ধ মনে করছে অনেক ইসলামপন্থী দল
আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ তালেবানের হাতে চলে যাওয়ার পর বাংলাদেশে প্রচলিত সব ইসলামপন্থী দল বা সংগঠনে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের অনেকে এর বড়ো কারণ হিসাবে দেখছেন তালেবানের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়কে। বাংলাদেশে প্রকাশ্যে ইসলামপন্থী যে দলগুলো কাজ করে, এই দলগুলোর সাংগঠনিকভাবে তালেবান, আল কায়দা বা আইএস এর সাথে যোগাযোগ নেই-এটা বলা যায়। তবে এই দলগুলোও শরীয়া আইন প্রতিষ্ঠা বা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের কথা বলছে। ফলে আদর্শের দিক থেকে এসব অনেক দলের সাথে তালেবানের মিল রয়েছে।
ইসলামপন্থী দলের মধ্যে উচ্ছ্বাস বেশি তবে আমরা উগ্রবাদের দিকে যাব না
আব্দুর রব ইউসুফী, নেতা, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম
তালেবানের এটা মুক্তিযুদ্ধ ছিল। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি নয় মাস। আর তারা দখলদার আমেরিকা এবং নেটো বাহিনীর বিরুদ্ধে ২০ বছর যুদ্ধ করেছে। সেই হিসাবে আমরা তালেবানদের পক্ষে ছিলাম এবং আছি। তারা যেহেতু ইসলামপন্থী, সেজন্য ইসলামপন্থী দলের মধ্যে উচ্ছ্বাস বেশি। তাই বলে আমরা উগ্রবাদের দিকে যাব না। কোনো সেøাগান দেয়া আর বাস্তবতা এক নয়।
বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় ধর্মীয় উগ্রবাদ যে মাথা চাড়া দিয়েছে, তার পেছনে উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর নিজেদের শক্ত ভিত্তি ছিল বলে অনেকে মনে করেন। তবে বিভিন্ন সময় রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় প্রশ্রয় দেয়ার বিষয় নিয়েও অনেক বিতর্ক হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকদের অনেকে আবার এখন নতুন করে এবং অদূর ভবিষ্যতেও শঙ্কার বিষয় মানতে চান না।
জঙ্গিবাদ প্রশয় না পেলেও বেড়েছে ধর্মীয় উগ্রতা
অধ্যাপক খন্দকার ফারজানা রহমান
শিক্ষক, অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাবি।
সরকার এবং রাষ্ট্র থেকে জঙ্গি তৎপরতায় প্রশ্রয় না দেয়ার বিষয়টি এখন দৃশ্যমান করা হচ্ছে। কিন্তু দেশের মানুষের একটা অংশে ধর্ম নিয়ে উগ্রতা বেড়েছে এবং সেটা এখন আরও বাড়তে পারে। একটা সময় কিন্তু আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্যে ধর্মীয় উগ্রবাদকে প্রমোট করা হয়েছে। আরেকটা বিষয় আমাদের দেশের মানুষের একটা বড় অংশ মানসিকভাবে ধর্মভীরুতা উগ্রবাদের দিকে গিয়েছে। সেটা আরও বাড়তে পারে। আমাদের রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে উগ্রবাদকে প্রমোট করা না হলে উগ্রবাদ পাকাপোক্তভাবে এখানে বসতে পারবে না।
আফগানিস্তানে তালেবানের পুনরাগমনে আমাদের তেমন আতঙ্কের কারণ নেই
অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ
শিক্ষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাবি।

মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে এ ধরনের জঙ্গিগোষ্ঠী তৈরি হতে পারে না। ২০ বছর আগে যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন, তারা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জঙ্গিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন। রাজনৈতিক স্বার্থেও তাদের ব্যবহার করেছেন। কিন্তু এখন বাংলাদেশে যে সরকার আছে, তাদের বিরুদ্ধে এ রকম কোনো অভিযোগ নেই। বরং হোলি আর্টিজানের হত্যাকাণ্ডের পর সরকার জঙ্গিদের বিষয়ে শূন্য সহিষ্ণুতা দেখিয়ে আসছে। জঙ্গিদের বিচার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতেও কাজ করেছে। তাই আমি মনে করি না, আফগানিস্তানে তালেবানের পুনরাগমনে আমাদের আতঙ্কের কারণ আছে। তবে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। জেনে হোক, না জেনে হোক আগে যারা জঙ্গিদের নানাভাবে সহায়তা করেছেন, তাদেরও এই গোষ্ঠী থেকে দূরে থাকা উচিত।
সরকারকে মৌলবাদীদের বিষয়ে আরও কুশলী হতে হবে
মোশতাক আহমেদ
আফগানিস্তানে নিযুক্ত জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা।
বাংলাদেশে অনেকেই কাবুলের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে তালেবানের বিজয় মনে করে নীরব উল্লাসে মেতে উঠেছেন। অনেকেই আবার উদ্বিগ্নও হচ্ছেন। আমি মনে করি, দুই শিবিরের প্রতিক্রিয়াই স্বাভাবিক। একজন বাম ঘরানার মানুষ যদি ভেনেজুয়েলা কিংবা ল্যাটিন আমেরিকার কোনো দেশে লাল পতাকার বিজয়ে উল্লসিত হতে পারেন, তাহলে ধর্মীয় মৌলবাদে বিশ্বাসী একজনও তালেবানের বিজয়ে স্বাভাবিকভাবেই উল্লসিত হবেন। এতে হয়ত সমস্যা নেই, কিন্তু সমস্যাটা হবে তখনই, যখন পরদেশে কোনো শক্তির বিজয় নিজ দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর লালিত মূল্যবোধে আঘাত হানার কারণ হয়ে দেখা দেয়। এ কারণেই বাংলাদেশের অনেকের মনেই এ প্রশ্ন জাগছে, আফগানিস্তান পরিস্থিতি কি বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে বা ফেলতে পারে? যদি ফেলে, এর রূপটা কী হতে পারে? আমার ধারণা-অবশ্যই প্রভাব ফেলবে। তালেবান সমর্থক গোষ্ঠী যে এতে একটা বড়ো ধরনের ‘বুস্ট’ পাবে। অন্যদিকে, সরকারকে মৌলবাদীদের বিষয়ে আরও কুশলী হতে হবে। দেশের গণতান্ত্রিক পরিসর যদি বিস্তৃত না হয়, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দমন করতে গিয়ে সরকার যদি মৌলবাদীদের ছাড় দেওয়ার কৌশল নেওয়া অব্যাহত রাখে তবে আমাদের জন্য বিপদ অপেক্ষা করছে।
সাঈদ ইফতেখার আহমেদ
শিক্ষক, স্কুল অব সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্লোবাল স্টাডিস, আমেরিকান পাবলিক ইউনিভার্সিটি সিস্টেম, পশ্চিম ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র।

তালেবান কর্তৃক মার্কিন ও পশ্চিমা সমর্থিত আশরাফ গানির ‘ইসলামিক স্টেট অব আফগানিস্তানের’ পতন ঘটবার পর বাংলাদেশের প্রায় সব ঘরানার ‘ইসলামপন্থি’দের কাছে এটি তাদের রাজনীতির বিজয় বলে মনে হয়েছে।
রাজনীতিতে অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়া ‘ইসলামপন্থি’রা আঞ্চলিক এবং জাতীয় রাজনীতির সমীকরণের দিকে না তাকিয়ে তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যত নিয়ে এক ধরনের আশার আলো দেখতে শুরু করেছেন। এটি অস্বীকার করবার উপায় নেই যে, তালেবানদের হাতে কাবুলের পতন তাদের নৈতিক মনোবল বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ইসলামপন্থা’ আফগানিস্তানের মত মূল ধারা নয়। আফগানিস্তানের লড়াইটা ছিল মূলত ‘ইসলামপন্থা’র দুই পক্ষের লড়াই-যার এক পক্ষকে সমর্থন করেছে আমেরিকা। বাংলাদেশেও ‘ইসলামপন্থি’দের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অতীতে নানাভাবে সমর্থন করে গেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় দেশটি শক্তভাবে জামায়াতের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল।
মার্কিন ভূমিকা দুর্বল হবার ফলে আগামী দিনে তাদের পক্ষে এ ভূমিকা পালন করা সম্ভব হবে না। তৃতীয় দুনিয়ায় গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ও সমস্ত দেশের সরকার সমূহকে চাপে রাখার কৌশল আমেরিকা সব সময় করে এসেছে। বাংলাদেশ সরকারের উপর এ ধরনের চাপ বিএনপির রাজনীতিকে অতীতে সুবিধা দিয়েছে।
আফগানিস্তানে পরাজয়ের ফলে আগামী দিনগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আর এ ধরনের ভূমিকা পালন করা সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে মার্কিন ভূমিকা যত দুর্বল হবে চীন তত প্রভাবশালী হয়ে উঠবে। আর চীন যত প্রভাবশালী হতে থাকবে বিএনপির ওপর সরকারের চাপ তত বৃদ্ধি পাবে এবং ‘ইসলামপন্থি’ দলগুলোকে আরো কোণঠাসা করবার চেষ্টা করা হবে।
সময়ের সাথে সাথে বিশ্ব রাজনীতিতে যেমন পরিবর্তন এসেছে, বাংলাদেশেও ইসলামপন্থী দলগুলো তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টিয়েছে। এসব দলের বেশিরভাগেরই এখন সশস্ত্র বা চরম উগ্র অবস্থান নেয়ার মনোভাব নেই। যদিও এখনও তাদের কট্টর মনোভাব রয়েছে। অন্যদিকে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলো দুর্বল হলেও আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থানে তারা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করতে পারে। এই শঙ্কা থাকছেই। তাই প্রথম থেকেই সরকারকে এ বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে যাতে কোনোভাবেই জঙ্গি সংগঠনগুলো আবার সক্রিয় হতে না পারে। আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় আসায় দেশে বিদ্যমান জঙ্গি সংগঠনগুলো ইতিমধ্যেই সক্রিয় হবার পরিকল্পনা করছে নিশ্চয়।
এই পরিকল্পনাকে প্রাথমিক অবস্থাতেই নস্যাত করতে হবে। আর সেটা সম্ভব হলেই দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল তাকবে ও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে।





Users Today : 7
Views Today : 9
Total views : 175513
