অনেক প্রাণীকেই প্রাচীন সংস্কৃতিতে অশুদ্ধ বা অপবিত্র বলে বিবেচনা করা হতো, যা সাধারণত সেই সময়ে বসবাসরত মানুষের জীবনের বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ যেমন ভালো-মন্দ, আলো-অন্ধকার, মৃত্যু-অনন্তকাল ইত্যাদি বিষয়গুলোকে প্রতিফলিত করেছে।
এই আদিম শ্রেণীকরণ, ধর্মের উত্থানের মধ্যে দিয়ে বরং আধ্যাত্মিক হয়ে ওঠেছে। একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসরত বিভিন্ন প্রাণীদের সঙ্গে আদিম মানুষদের ক্রমাগত যোগাযোগের মধ্য দিয়ে তারা সেটিকে হয় বিশুদ্ধ, পবিত্র কিংবা মঙ্গলের অথবা অভিশপ্ত, অমঙ্গলে প্রতীক হিসেবে দেখেছে।
এমনই তিনটি প্রাণী শূকর, গেকো এবং সাপকে পৃথিবীর প্রায় অনেক সংস্কৃতি নিকৃষ্ট হিসেবে দেখে আসছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অশুচি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কেমন করে আদিম মানুষের নিকট এই তিন প্রাণীর প্রতি অবজ্ঞা তৈরি হলো তা স্পষ্ট অনুধাবন করা যাবে সেই সময়ের পুরাণ, লোকগল্প এবং মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের পর্যালোচনার মাধ্যমে।
শূকর
হোরাসের শত্রু এবং তম্মুজের হত্যাকারী
আদিমকাল থেকে এখন পর্যন্ত আরব সমাজসহ পৃথিবীর অন্যান্য অনেক জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে নিকৃষ্টতম কিছু প্রাণীর মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয় শূকরকে। কেননা এটি অপরিষ্কার। একারণে শুকরের মাংস খাওয়াও নিষিদ্ধ হয়েছে। মিশরীয়, ব্যাবিলোনিয়ান, কেনান এবং ফিনিশীয় পুরাণে পাপ, আবেগপ্রবণতা এবং সহিংসতার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে শূকরকে। প্রাচীন মিশরীয়দের মরু এবং ঝড়ের দেবতার মুখমণ্ডলের আকৃতি হুবুহু শূকরের মতো বর্ণনা করা হয়েছে। ঝড়ের দেবতা ওসিরিস এবং তার পুত্র হোরাসের সাথে সংগঠিত যুদ্ধের খলনায়ক ছিল শূকর।
শত শত বছর ধরে বেঁচে থাকা বেলজিয়ান পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী শূকরকে শয়তান হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে কেননা প্রাচীন মেসোপটেমিয় মেষপালকদের দেবতা তম্মুজকে হত্যা করেছিল শূকর। ওল্ড টেস্টামেন্টের ‘দ্যা বুক অব লেভিটিকাস’ অধ্যায়ে শূকর মাংসসহ শূকরের আকৃতির মতো কিছু নির্দিষ্ট পশুর মাংস খাওয়ার উপর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এমনকি তৃণভোজী হওয়ার কারণ হিসেবে অনেক পশুর মাংস খাওয়ার প্রতিও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
অন্যদিকে খ্রীস্টান ধর্মে শূকর খাওয়ার প্রতি কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। ম্যাথিও’র একটি অধ্যায়ে আছে, ‘কোনো ব্যক্তির মুখের মধ্যে যা যায় তা তাদের অশুচি করে না, কিন্তু তাদের মুখ থেকে যা বেরিয়ে আসে সেগুলো তাদের অশুচি করে।’ আর একারণেই পশ্চিমের বেশিরভাগ দেশেই যেকোনো অনুষ্ঠানে শূকর খাওয়া হয়ে সানন্দে।
আরেকটি খ্রীষ্টধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, শূকরকে ঘৃণা করা হয়েছে কারণ খ্রিস্ট ধর্ম মূলত পুরাতন নিয়মের পরিপূরক। যিশু বাইবেলে বলেছিলেন, ‘মনে করো না যে আমি ঈশ্বরের প্রেরিত অন্য মহাপুরুষদের আইন পরিত্যাগ করতে এসেছি; আমি তাদের আইন পরিত্যাগ করতে আসিনি রবং তা পরিপূর্ণ করতে এসেছি’।
ইসলাম ধর্মেও শূকর মাংস নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোরানে অন্তত চার জায়গায় (২:১৭৩, ৫:৩, ৬:১৪৫, এবং ১৬:১১৫) এবং হাদিসে সেটির স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। হাদিসের প্রধান উৎস সহীহ আল-বুখারীর মতে, নবী তাঁর সাহাবীদেরকে বলেছিলেন যে, পৃথিবী ধ্বংসের দিন ঈসা নবী পুনরায় পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন করবেন। তাঁর আগমন পৃথিবীর ধ্বংসের একটি লক্ষণ। আরেকটি লক্ষণ হলো তিনি ক্রুশ ভেঙে ফেলবেন, শূকর হত্যা করবেন।
গেকো
নিষিদ্ধ যৌনতার প্রতীক
নৃবিজ্ঞান শব্দকোষ অনুযায়ী আদিম কাল থেকেই গেকো এবং টিকটিকি দুটো প্রাণীর উল্লেখ রয়েছে। কোনো কোনো আদিম গোত্রে গেকোকে পবিত্র হিসেবে দেখা হয়েছে আবার অনেকের নিকট পিতৃপুরুষরা মৃত্যুর পর পুণরায় গেকো হয়ে জন্মলাভ করেন বলেও ধারণা রয়েছে। আবার অনেক জয়গায় গেকোকে জাদু এবং স্বর্গীয় শক্তির সঙ্গেও তুলনা করা হয়েছে।
প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতায় গেকোকে দুষ্ট মহিলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অন্য আরেকটি পুরাণ অনুযায়ী নগ্ন নারীকে প্ররোচিত করতে পুরুষকে সহযোগিতা করায় গেকোকে তার বর্তমান রূপে অভিশপ্ত করা হয়েছে। ইসলাম ধর্মেও এই প্রাণীকে ঘৃণার চোখে দেখা হয়েছে। ইসলামের একটি হাদিস অনুসারে নবী গেকো দেখলেই হত্যা করার কথা বলেছেন কেননা গেকোর পূর্বপুরুষরা বাতাসকে উসকে দিয়ে আগুন জ্বালাতে সহযোগিতা করেছিল আর সেই আগুনে আব্রাহামকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। তবে কোরআন কিংবা কোরানের পূর্বে আগত ধর্মগ্রন্থগুলোর কোথাও এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো উল্লেখ নেই। ধারণা করা হয় এই কাল্পনিক গল্পটি অধিক জনপ্রিয়তার ফলে পরবর্তীতে আধুনিক ইসলামিক রেফারেন্সের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
ইসলামের শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যেও গেকোসহ আরো বেশ কয়েকটি প্রাণীকে অপরিষ্কার হিসেবে ঘৃণা করা হয়েছে। শিয়া হাদিস সংগ্রাহক যিনি কিতাব আল-কাফি রচনা করেছিলেন তিনি একবার ইমাম জাফর আল-সাদিককে গেকো বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন, গেকো অপবিত্র। যেকোনো ব্যক্তি যেন গেকো হত্যা করার পর গোসল করে ফেলে।
একটা প্রশ্ন স্বভাবতই চলে আসে অন্যান্য অনেক বিষাক্ত প্রাণী থাকা সত্তে¡ও গেকো কেন ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়েছে। ফ্রয়েডের মনোঃবিশ্লেষণ অনুযায়ী একজন গবেষক এই বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করে বলেছেন, মানুষের আদিম বিশ্বাস এবং টোটেমবাদের ধারণা অনুযায়ী নিষিদ্ধ যৌনতার প্রসঙ্গে পুরুষের প্রতীক হিসেবে গেকোর প্রতি একরকম ঘৃণা জন্ম নিয়েছে। অন্যভাবে বললে গেকো আসলে পুরুষ লিংগকে উপস্থাপন করে এবং গোপনে নারীদের বিছানায় প্রবেশ করে তাদের অবৈধ সঙ্গমে প্ররোচিত করে।
সাপ
জীবন ও মৃত্যুর প্রতীক
বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে জানা যায় সাপের ভয় মানুষের মধ্যে আদিমকাল থেকেই ছিল। উত্তর মিশরের দেবী ওয়াদজেটকে সাধারণত মিশরীয় কোবরা রূপে দেখানো হয়েছে। প্রাচীন মিশরীয় প্রতীকে দেখা যায় দেবী ওয়াদজেট হোরাসের চোখকে মূর্ত করেছেন। এ থেকে ধারণা করা যায় যে মিশরীয়দের সাপের প্রতি একটি মিশ্র অনুভূতি ছিল। সাপকে তারা পবিত্র এবং ভয়ের দৃষ্টিতে দেখেছিল।
অন্যদিকে ওল্ড টেসট্যামেন্টে উল্লেখ আছে আদম এবং ইভকে শয়তান সাপের বেশে প্ররোচিত করেছিল নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার জন্য। শয়তান তাদের বলেছিল, ‘ঈশ্বর জানেন এই ফলটি খেলে তোমাদের জ্ঞানের দ্বার উন্মুক্ত হবে এবং তোমরাও ভালো এবং মন্দের পার্থক্য নির্ণয় করতে পারবে।’ ঈশ্বর সাপকে তার পাপের জন্য শাস্তি হিসেবে পৃথিবীর সকল পশু পাখি থেকে আলাদা করে দিয়েছে। ওল্ড টেস্টামেন্টে সাপকে স্বর্গীয় শাস্তির প্রতীক (যারা ঈশ্বরের আদেশ অমান্য করেন) হিসেবে দেখানো হয়েছে। বুক অব নাম্বার অনুযায়ী, ‘এরপর ঈশ্বর একটি আগুনের তৈরি সাপ পৃথিবীতে প্রেরণ করেছিলেন এবং সেই সাপের কামড়ে ইসরাইলে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।’ পরবর্তিতে ইসরাইলীয়রা অনুশোচনা করে এর পরিত্রাণ চেয়ে মূসাকে জিজ্ঞেস করেছিল, এখন কী উপায়? তখন ঈশ্বর মূসাকে নির্দেশ দিয়েছিল, ‘একটি বিষাক্ত সাপের প্রতিলিপি তৈরি কর এবং কোনো একদিকে সেটি ঝুলিয়ে রাখ। যারা সাপের কামড় খেয়েছে তাদের সবাই বাঁচবে যদি তারা এই প্রতিলিপিটি একবার দেখতে পায়!’
মূসা নবীর তৈরি করা সেই সাপের মূর্তিটি ঐতিহাসিকভাবে দীর্ঘদিন পূজা করা হত কিন্তু শেষমেষ নবী হেজেকিয়া সেটিকে ধ্বংস করে দেয়।
অন্যদিকে আদম-হাওয়াকে প্ররোচিত করার কারণ হিসেবে সাপের ভ‚মিকা কোরানে স্পষ্ট উল্লেখ না থাকলেও ইসলামী সংস্কৃতিতে সাপকে শয়তান হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আরো বলা হয়েছে জ্বিন এবং শয়তান উভয়েই সাপের রূপ ধারণ করতে পারে।
আবু দাউদ পার্সিয়ান হাদিস বিষয়ক পণ্ডিতদের মতে নবী বলেছিলেন, ‘সাপের মতো বিষাক্ত প্রাণী জ্বিনের মধ্যেও রয়েছে। তোমাদের মধ্যে কেউ যদি বাড়িতে সাপ দেখতে পাও তাহলে তিনবার তাড়াবে। এরপরও যদি ফিরে আসে তাহলে সেটিকে হত্যা করবে।’
এছাড়াও উল্লেখ রয়েছে, যারা যাকাত আদায় করেনি, শেষ বিচারের দিন তাদের সম্পদকে টেকো (বিষের তীব্রতার কারণে) মাথা বিশিষ্ট বিষধর সাপের আকৃতি দান করে তার গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হবে।
[মিশরীয় গবেষক মোহাম্মদ ইয়োসরি’র লেখা থেকে অনুবাদ করেছেন ম্যাগডিলিনা মৃ ]





Users Today : 20
Views Today : 24
Total views : 177909
